মিক্সড-ওয়েইট রিলেশনশিপে সমস্যা কোথায়?

ছবি: সংগৃহীত

বিয়ের সময় একটা কনেকে যতটা খুঁটিয়ে দেখা হয় তার সিকিভাগও কিন্তু বরের বেলায় নয়। বরং আমাদের সমাজে একটা প্রচলিত কথা আছে, ‘সোনার আংটি বাঁকাও ভালো।’অর্থাৎ ছেলে দেখতে যেমনই হউক না কেন এটা নিয়ে সমালোচনার কিছু নাই, সে সোনার আংটি মানে ছেলে। আর একটা মোটামুটি হ্যান্ডসাম ছেলে যদি একটু মোটা বা শ্যামলা মেয়েকে বিয়ে করেন, তাহলে ওই মেয়ের জীবন শেষ। উঠতে বসতে শুতে তাকে কথা শুনতে হবে। কেবল শ্বশুরবাড়িতেই নয়, সামাজিকভাবেই নানা নিগৃহের শিকার হবে সে। এই প্রসঙ্গে আমি আমার রাবেয়া খালার কথা বলতে পারি। তিনি আমার পাড়াতুতো খালা। চেহারাটা মিষ্টি হলেও গায়ের রং শ্যামলা এবং কানিকটা স্থূল। কিন্তু তার প্রেম হয়ে যায় একটা সুন্দর ছেলের সঙ্গে। পরে পারিবারিকভাবেই তাদের বিয়ে হয়। এ নিয়ে গোটা এলাকায় একটা ছোটখাট সাইক্লোন বয়ে যায় যেন। বেশিরভাগ লোকজনকে তখন বলতে শুনেছি, ‘বাসেদ (খালার স্বামী) এইটা কি করলো, ওর চোখ কি নষ্ট হয়ে গেসে?’অনেক সময় ওই দম্পতির উপস্থিতেই শুরু হয়ে যেত নানা ফিসফাস।

অনেকে সামনিসামনি বলে বসতেন,‘রাবেয়ার তো রাজকপাল, কেমন রাজপুত্রের মতো বর জুটিয়েছে।’কাউকে কাউকে বলতে শুনেছি, ‘আরে বাসেদ কি সজ্ঞানে ওই মেয়েকে বিয়ে করেছে নাকি? হয়তো রাবেয়া তাবিজ তুম্বা করে ওকে বশ করেছে। এসব মেয়েরা সব পারে।’ তবে রাবেয়া কালা এসব কথা গায়ে মাখতেন না, দুষ্টমির ছলে এড়িয়ে যেতেন। তখন তো ছোট ছিলাম এত কিছু বুঝতাম না। কিন্তু এখন স্পষ্ট অনুভব করতে পারি এধরনের সামাজিক কটূক্তি তাকে মানসিকভাবে কতটা ক্ষতবিক্ষত হতেন। কিন্তু বুদ্ধিমত্তা আর অনেক বেশি সহ্যক্ষমতা বেশি থাকার কারণেই রাবেয়া খালা সেইসব সামাজিক নিগৃহের মধ্যেও সংসার টিকিয়ে রাখতে পেরেছেন। এখন তার সংসারে সুখ উপচে পড়ে। বড় মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু সেসব দিনের বডিশেমিংয়ের কথা মনে পড়লে এখনও আতকে উঠেন। রাবেয়া-বাসেদ দম্পতি যা পেরেছেন অনেকে কিন্তু তা পারেন না। এইসব সামাজিক অনাচারের কারণে সংসার ভেঙে যাওয়াও কিন্তু অসম্ভব নয।

আমাদের সমাজে রাবেয়া একজন নয়, বহু। আর শুধু যে আমাদের দেশেই এমনটি হয় তা কিন্তু নয়, অনেক উন্নত দেশের নারীদেরও এই সামাজিক যন্ত্রণা সহ্য করতে হয়। পশ্চিমের দেশে এ ধরনের দম্পতিকে 'মিক্সড-ওয়েইট' কাপল বলা হয়। মিক্সড-ওয়েইট কাপল মানে স্লিম স্বামীর মোটা স্ত্রী। বিষয়টা নিয়ে যেহেতু নারীদেরই সাফার করতে হয় তাই ওই টার্মের বাংলাটা আমি এবাবেই করলাম। কেননা সমাজ তো সুন্দরী ও স্লিম স্ত্রীর সঙ্গে অপেক্ষাকৃত স্থূল পুরুষের জুটি গড়া নিয়ে কোনও প্রশ্ন তুলে না।

এ সম্পর্কে ব্রিটিশ নারী স্টেফানি ইয়েবোয়া বলেন, ‘সমাজে মোটা পুরুষ লোকের স্লিম স্ত্রীর কথা কেউ আলাদা করে নজর করে না, যেন সেটা খুবই স্বাভাবিক।’

ইয়েবোয়া নিজে এই পরিস্থিতির শিকার। কেননা তিনি কালো এবং অন্যদের তুলনায় খানিকটা বেশি মোটা। অন্যদিকে তার বযফ্রেন্ড ছিলেন পাতলা এবং ফর্সা। তখন এ নিয়ে তাকে অনেক কথা শুনতে হয়েছে। কিন্তু এখন আর এসব নিয়ে তিনি মাথা ঘামান না। উল্টো সমাজের এসব অসামঞ্জস্যতা আর বাজে বিষয়গুলো নিয়ে তিনি এখন নিয়মিত ব্লগিং করেন। ইয়েবোয়া বলছেন, তার খুবই অপমান লাগে যখন দেখা যায় যে সমাজের প্রচলিত ধারণা হচ্ছে আকর্ষণীয় কোন পুরুষের সঙ্গে মোটা নারীদের সুখী ও সুন্দর প্রেমের সম্পর্ক বা সুখী দাম্পত্য জীবন গড়ে উঠতে পারে না। এরকম ক্ষেত্রে আশপাশের পরিচিতজনেরা সবাই বলতে থাকে, এরকম একটা আকর্ষণীয় লোকের সঙ্গী কেন এমন হবে? এটা তো উচিত না। মোটা মেয়েটার থাকা উচিত একদম তার মত কোনও স্থূলাকায় পুরুষের সঙ্গেই।

পশ্চিমা সংস্কৃতিতে নারী বলতেই সুন্দর, ফর্সা আর ছিমছিপে। এর বিপরীত কাউকে দেখলেই তারা মেয়েটিকে নানাভাবে হেনস্থা করতে থাকেন।

এ সম্পর্কে ইয়েবোয়া বলেন, ‘নারীর শারীরিক আকৃতি কেমন হবে তা নির্ধারণ করে দেয় মিডিয়া এবং সমাজ। কারণ ধরে নেয়া হয় নারীরা নমনীয় হবেন, ছিমছাম-পরিপাটি হবেন, নারীসুলভ হবেন। যে কারণে কেউ মোটা হলেই ধরে নেয়া হয় সে ঠিক নারীসুলভ নয়।’

সমাজের প্রচলিত ধারণার বাইরে যদি দেখা যায় যে কোন মোটা মহিলা সুখী, আত্মবিশ্বাসী এবং কাজে উন্নতি করছেন, সমাজ সেটাও পছন্দ করে না।

ইয়েবোয়ার সাবেক বয়ফ্রেন্ড দেখতে অ্যাথলিটদের মতই হ্রান্ডসাম ছিলেন। ওই ছেলের সাথে রাস্তায় নামলে মানুষ তাদের দিকে অবাক চোখে তাকাতো। এমনকি সামাজিক মাধ্যমে দুইজনের কোন ছবি দিলে অনেকেই সেখানে অস্বস্তিকর মন্তব্য লিখতো। কেউ-কেউ এটাও লিখতো 'তুমি খুব ভাগ্যবান এমন বন্ধু পেয়েছ, এমন বয়ফ্রেন্ড কোথায় পেলে তুমি?

জবাবে ইয়েবোয়া লিখতেন, ‘আসলে আমার প্রেমিকই ভাগ্যবান, কারণ আমি দারুণ একজন মানুষ। এবং ভাবতে চাই যে আমিও আকর্ষণীয় একজন মানুষ।’

আসলে মানুষের যে ভিন্ন পছন্দ থাকতে পারে, কেবল শারীরিক দিক নয়, অন্যান্য গুণাবলী দেখে একজন পুরুষ তার সঙ্গিনী বেছে নিতে পারেন। এ সত্যটি এখনও সমাজ মানতে চায় না। এ কারণেই অনেক সমস্যা ফেস করতে হয়েছে ইয়েবোয়াকে।

ইয়েবোয়া বলেন, ‘আমাকে ও আমার সঙ্গীকে নিয়ে মন্তব্য করার সময় অনেকের মনেই ছিল না যে আমিও একজন মানুষ। বরং তারা আমাকে কোন একটি বস্তু বা জাহাজের সঙ্গে তুলনা করেছে।’

কিন্তু সেইসব সমস্যা কাটিয়ে উঠেছেন ইয়েবানা। এখন তিনি ইনস্টিগ্রামে মোটিবেশনের কাজ করেন। কে কি বললো তাতে তার কিছু যায় আসে না। নিজের কাজে এই নারী এখন দারুণ সফল। ইনস্টাগ্রামে ইয়েবোয়ার ৫০ হাজারের বেশি ফলোয়ার অনুসারী রয়েছেন।

কিন্তু এখনও অনেকে তার স্থূলতা নিয়ে আপত্তিকর কথাবার্তা বলেন। কিন্তু এসব থোড়াই কেয়ার করেন ইয়েবায়া। এ নিয়ে তার বক্তব্য, ‘আপনি যখন কোনও চৌরাস্তায় দাঁড়াবেন, সবাই একইভাবে আপনাকে দেখবে না। কেউ ভালোবাসবে, কেউ অপছন্দ করবে—এর বেশি কিছু না।’

সত্যি এভাবে যদি সব নারীরাই চিন্তা করতে পারত তাহলে তাদের পক্ষে এসব সামাজিক প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে উঠা অনেক সহজ হতো। আমরা চাই আমাদের এখানেও অনেক ইয়েবায়া গড়ে উঠুক, যারা শারীরিক সৌন্দয্যের চেয়ে নিজের ব্যক্তিত্ব আর কাজটাকে বেশি মূল্য দিতে শিখবে। এমনটা হলেই ‘বডিশেমিং’ আর 'মিক্সড-ওয়েইট' সমস্যাগুলো কাটিয়ে উঠা সহজ হবে।

মাহমুদা আকতার: লেখক ও সাংবাদিক