প্রসঙ্গ সিডও সনদ: নারীকে নারী সম্মান করবে কবে?

হোমায়রা হুমা

হোমায়রা হুমা

জগতে মানুষে মানুষের বিভেদ কিসে? শুধু কি অর্থের বৈষম্যের,শিক্ষার সার্টিফিকেটের,বংশ মর্যাদার? এছাড়াও আরো অনেক দিগবিদিক বৈষম্যের পীড়ন আমাদের পীড়িত করছে প্রতি মুহূর্তে।

আগামী ৩ সেপ্টেম্বর নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য বিলোপের সনদ সিডও দিবস পালনের প্রস্তুতি চলছে। আমরা জানি বৈষম্য একটি অপরাধ। বিশ্বজগতে প্রতিটি মানুষ-ই সমস্ত কিছু পাওয়ার ও ভোগের অধিকার রাখে। খোলা চোখে আমরা নারীবাদীরা বৈষম্য বলতে নারী পুরুষের মধ্যবর্তী অধিকার প্রতিষ্ঠা ও ভোগের বৈষম্যকেই প্রকটতর হিসেবে চিহ্ণিত করে থাকি। কিন্তু এ বৈষম্যের ধারণা আরো গভীরে প্রোথিত।

আমরা মোটা মার্জিনে বলতে অভ্যস্ত পুরুষের সাথে সম-অধিকার চাই। প্রকৃতপক্ষে সমাধিকারের এ ধারণা হওয়া উচিত মানুষে-মানুষের সমাধিকার। নারীতে নারীতেও সমতাভিত্তিক সমাজ, পরিবার, অফিস আদালত হওয়াও উচিৎ। কেননা নারীতে নারীতে মনমানসিকতা, সংস্কৃতি, মনোভাব, দৃষ্টিভঙ্গিসহ প্রতিটি ক্ষেত্রেই বৈষম্যের প্রকাশ প্রকট। আমি নারীপুরুষের বৈষম্যে নারী অধিকার প্রাপ্তি ও প্রতিষ্ঠা বাধার গণ্ডিকে স্বীকার করেও নারীর অভ্যন্তরীণ বৈষম্যে নারীর দুঃখজনক অবস্থান ও পরিণতিকে পাশ কাটিয়ে অগ্রসর হতে পারি না।

আচ্ছা ‘মানিয়ে চলা’র নীতির অর্থ কি সকল অন্যায়কে মাথা পেতে মেনে চলাকে বুঝানো হয়? নাকি নিজ সত্ত্বাকে অন্যের মেজাজ মর্জির পদতলে বিসর্জন করে নতজানু হয়ে দিন যাপনকে বুঝায়? বস একটি পদবী, ব্যক্তি  কর্মচালনার সে-ই শক্তিধর উপাধি। পরিবার ও অফিসের সেই শক্তিধর উপাধিখ্যাত নারী বসের কুদৃষ্টি থেকে মুক্তির পথ কোথায় তবে? বিনা কারণে জুলুম, গসিপ ছড়ানো,চরিত্র হরণ করার কাজটি শুধু কি পুরুষ সহকর্মীরাই  করে? গলায় গলায় মিলে নিজের পদ নিরঙ্কুশ রাখার জন্য বান্ধবীখ্যাত সহকারী বান্ধবী একে অপরের বিরুদ্ধতা করে না. কে বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবে বলুন তো!

অধিনস্ত হলেই যে তাকে পায়ে মাড়িয়ে হেনস্তা করতে হবে এমন কথা কিন্তু বিশ্ব অভিধানে নেই, কারণ বসেরও বস থাকে। মানুষ মাত্রই কারো না কারো অধিনস্ত। তাই বস হলেই তিনি যা ইচ্ছে করতে পারেন না। উপরতলার বসের সাথে সুসম্পর্কের দোহাই দিয়ে ক্ষণিক পার পাওয়া যায় হয়তো কিন্তু ‘আল্লাহর মাইর দুনিয়ার বাইর’ প্রবাদ বাক্যটি মনে রাখাটা জরুরি।

মানুষকে প্রতিবাদ করতে হয় অন্যের জন্য, প্রকৃতপক্ষে নিজের জন্য। তাই যুগে যুগে প্রতিবাদী মানুষরা মহাপুরুষ হয়ে ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছেন। আর যারা প্রতিবাদের বদলে চুপ করে উস্কে দিয়ে,গলা মিলিয়ে কলহের পয়েন্ট ধরিয়ে দেয়, তাদের জন্যই কবি লিখেছেন- ‘অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে, তব ঘৃণা যেন তারে তৃণসম দহে..’।

নারী সম্পদের অধিকার পায় না, আর আমরা সমগোত্রকে সম্মান দেই না। তাদের বেঁচে থাকার নিঃশ্বাসটুকু কেড়ে আস্তাবলে ছুঁড়ে ফেলি; আমাদের অস্ত্র জিহ্বা। পল্লিকবি কবি জসীমউদ্দিন তার কবর কবিতায় তার কন্যার ওপর শ্বশুরবাড়ির নির্যাতনের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেছেন- ‘হাতেতে যদিও না মারিত তারে শত যে মারিত ঠোঁটে।’

এই ঠোঁটের মাইর তো মানসিক নির্যাতনের অন্তর্ভুক্ত। ভেবে দেখুন নির্লজ্জের মতো আমরা একে অপরকে কি নির্যাতনই না করছি- কখনো নীরবে, কখনো সরবে, কখনো বা গণমানুষের সামনে। কেন? আমরা নারীরা এমনিতেই নারীপুরুষের বিবাদমান বৈষম্যের প্রত্যক্ষ যুদ্ধে অবতীর্ণ প্রতিক্ষণ; কত আইন, সনদ, চুক্তি,ঘোষণার গ্যাড়াকলে নিষ্পেষিত হচ্ছি। এর ওপর নারীতে নারীতে প্রত্যক্ষ বৈষম্য, কী জঘন্য! আমরা নারীরা এসব দিককে অস্বীকার করি, পাশ কাটিয়ে ফেরেশতা বনে যাই, যতক্ষণ জ্বলন্ত অঙ্গার নিজের ওপর না পড়ে। –এখানেও উপমায় বয়োজ্যেষ্ঠরা বলেন–‘আজ আমার কাল তোমার।’

এই বৈষম্যের প্রতিকার কি নেই? দৃশ্যমান এ নির্যাতন  পদদলিত হয়েই মেনে নিতে হচ্ছে কারণ এর প্রতিকার ও রোধ যারা করবেন তারাও দৃষ্টি-বিবেকহীন। কেউ সম্পর্কে ভাবি কেউবা আপা কেউবা খালা,নানি. দাদি। কিন্তু মুখচোখ বন্ধ করে যারা ডাকাডাকিতে সন্তুষ্টি খুঁজে পায় তাদের কাছ থেকে বিবেচনার আশা করাটা বোকামি। কারণ বিবেক ধুয়ে তারা চা পান করে রক্তের বাঁধনে, অথবা মুখে বলা সম্পর্কের চিনিমিশ্রিত ঘনত্বে। অধিনস্ত মারা যাক, উচ্চপদস্থরাও আরো সুউচ্চকে তোষামোদিতে নিজে টিকে থাকে।

মা যখন জানেন ছেলে তার করতলগত তখন বৌ নিষ্কাশন প্রক্রিয়া সহজ হয়। বিবাহিত ননদ যত বাকপটু, পিত্রালয়ে অবিবাহিত ননদ ততই তটস্থ। ক্ষমতার কাছাকাছি এক নারী অন্য নারীতে হামলে পড়তে কখনো পিছপা হয় না।

নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য বিলোপে সিডও সনদে নারী বৈষম্য দূরীকরণ ও ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার আদেশ ও পথনির্দেশ দেয়া হয়েছে। এ সনদ দুর্বল নারীর জন্য সবল আদেশ। সকল নারীর ওপর বৈষম্য বিলোপের জন্য এ চুক্তি। অতএব নারীর প্রতি নারীর যে বৈষম্য, নিষ্ঠুর আচরণে তার অধিকার হরণ, তার প্রতিও এই সনদের প্রতিটি ধারা প্রযোজ্য বৈকি। শুধু দৃষ্টিভঙ্গির ব্যপার।

দুর্বলের ওপর সবলের নির্যাতনের গুনাহ ও তার শাস্তি সম্পর্কে আল্লাহর পবিত্র কোরানেও স্পষ্টভাবে নির্দেশ দিয়েছেন। নারী বলে কিন্তু পরাকালের  হিসেব মাফ হবে না। সবচেয়ে বড় বিচার নিজের কাছে। অন্যকে জিহ্বার চাবুকে হত্যা করে নিজের কাছে নিজে বড় হওয়া সম্ভব কি? আয়নার সামনে নিজকে যাচাই করি আসুন সবাই, নিশ্চয়ই লজ্জিত হই  নিজের ওপর।

পুরুষের নিকট থেকে অধিকার প্রাপ্তির জন্য আমাদের সকলকে বিবেধ দূরে ফেলে একাট্টা হতেই হবে। আমাদের এ আদর্শে জিততে হলে নিজেকে বিশুদ্ধ হতে হবে। অথচ মুখে অধিকারের শ্লোগান, জিহ্বায় নারী হত্যার বিষ। হবে? অন্তরে-বাহিরে আদর্শচ্যুত হয়ে কী জয় করবো আমরা? নিজ অধিকার ও চেয়ার দৃঢ়প্রতিষ্ঠিত করতে সমকর্মীকে অধিকারবঞ্চিত করতে আমি ও আমরা বিন্দুমাত্র কুণ্ঠিত নই। কেন?

নারী জাগরণের উৎসমূলে বেগম রোকেয়া,কবি সুফিয়া কামাল,আনা ফ্রাঙ্ক, মনরোমা বসু,হেনা দাশ, আশালতা সেন,প্রতিলতা ওয়াদ্দেদার, আয়শা খানমের দেখানো-শেখানো পথ ও পাথেয় কি নির্দেশ করেছে? মানুষে মানুষে সম-অধিকার ও সমমর্যাদার লড়াইয়ে সমতাভিত্তিক আচরণে আমরা কবে অভ্যস্থ হবো..কবে? কবে?

লেখক পরিচিতি- হোমায়রা হুমা দীর্ঘদিন ধরে লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত আছেন। তিনি কবিতা, গল্প, উপন্যাস, নিবন্ধসহ নানা ধরনের লেখা লিখছেন। একই সঙ্গে তিনি একজন সোশ্যাল এক্টিভিস্ট। জড়িত আছেন সাহিত্য ও মানবাধিকার বিষয়ক বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে। এ পর্যন্ত লেখকের ৯টি কবিতা, ২টি প্রবন্ধের বই এবং ৩টি আবৃত্তির সিডি প্রকাশিত হয়েছে। সাহিত্য চর্চার জন্য পেয়েছেন বেশ কিছু পুরস্কার।

ওমেন্স নিউজ ডেস্ক/