রোকেয়ার জীবনে কয়েকজন মানবিক পুরুষ

মাহমুদা আকতার

মাহমুদা আকতার

বাঙালি নারীর মুক্তির দূত হিসাবে স্বীকৃত বেগম রোকেয়া। কেবল উনবিংশ শতাব্দীতে নয়, এই সময়েও নারীদের অনুপ্রেরণার প্রতিশব্দ রোকেয়া। সময়ের তুলনায় অনেকখানি এগিয়ে ছিলেন এই নারী, যার প্রমাণ তার গল্প, কবিতা, কল্পকাহিনী, প্রবন্ধ ও নানা রস রচনায় ছড়িয়ে আছে। এইসব সাহসী লেখালেখির জন্য অনেকেই তাকে নারীবাদী হিসাবে উল্লেখ করে থাকেন। তবে তিনি কিন্তু কোনও গতানুগতিক নারীবাদী ছিলেন না। বরং পুরুষদের সহযোগিতা নিয়েই সামাজিক প্রতিবন্ধকতার প্রাচীরে অব্যাহতভাবে আঘাত করে গেছেন। নারীশিক্ষার প্রসার, বাল্যবিবাহ রোধ, পর্দা প্রথার বিরোধিতা এইসব সামাজিক সংস্কারমূলক কর্মকাণ্ডে সেসময়কার আধুনিক ও বিবেকবান পুরুষরা ছিলেন মূলত রোকেয়ার সহযোদ্ধা।

ব্যক্তি রোকেয়া যে সময়ের চাইতে এতটা আধুনিক আর মুক্তমনা হয়ে উঠেছিলেন তার পিছনেও রয়েছে কয়েকজন মহান পুরুষের অবদান। এই প্রসঙ্গে রোকেয়ার দুই ভাই এবং তার স্বামীর কথা উল্লেখ করতে হয়। এই তিন পুরুষের সহযোগিতা ব্যতীত তার পক্ষে বেগম রোকেয়া হয়ে উঠা আদতে সম্ভব ছিল কিনা সেই প্রশ্ন থেকেই যায়। রোকেয়ার বড় দু’ভাই  মোহাম্মদ ইব্রাহীম আবুল আসাদ সাবের ও খলিলুর রহমান আবু যায়গাম সাবের ছিলেন বিদ্যানুরাগী। কলকাতার সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে অধ্যয়ন করে তারা আধুনিকমনস্ক হয়ে ওঠেছিলেন। বেগম রোকেয়ার শিক্ষালাভ, সাহিত্যচর্চা এবং সামগ্রিক মূল্যবোধ গঠনে বড় দু’ভাই ও বোন করিমুন্নেসার যথেষ্ট অবদান ছিল।

যোগেন্দ্রনাথ গুপ্ত রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন সম্পর্কে বঙ্গের মহিলা কবি গ্রন্থে লিখেছেন, ‘বঙ্গের মহিলা কবিদের মধ্যে মিসেস আর,এস, হোসায়েনের নাম স্মরণীয়। বাঙ্গালাদেশের মুসলমান-নারী-প্রগতির ইতিহাস-লেখক এই নামটিকে কখনো ভুলিতে পারিবেন না। রোকেয়ার জ্ঞানপিপাসা ছিল অসীম। গভীর রাত্রিতে সকলে ঘুমাইলে চুপি চুপি বিছানা ছাড়িয়া বালিকা মোমবাতির আলোকে জ্যেষ্ঠ ভ্রাতার কাছে ইংরাজী ও বাংলায় পাঠ গ্রহণ করিতেন। পদে পদে গঞ্জনা সহিয়াও এভাবে দিনের পর দিন তাহার শিক্ষার দ্রুত উন্নতি হইতে লাগিল। কতখানি আগ্রহ ও একাগ্রতা থাকিলে মানুষ শিক্ষার জন্য এরূপ কঠোর সাধনা করিতে পারে তাহা ভাবিবার বিষয়।’

বিয়ের পর রোকেয়ার বিদ্যার্জনের সাধনার আরও ব্যাপ্তি ঘটে তার স্বামী সৈয়দ সাখাওয়াৎ হোসেনের কল্যাণে। তিনি ছিলেন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট, তদুপরি সমাজসচেতন, কুসংস্কারমুক্ত এবং প্রগতিশীল দৃষ্টিভঙ্গিসম্পন্ন। উদার ও মুক্তমনের অধিকারী স্বামীর উৎসাহ ও সহযোগিতায় রোকেয়া দেশি-বিদেশি লেখকদের রচনার সঙ্গে নিবিড়ভাবে পরিচিত হবার সুযোগ পান এবং ক্রমশ ইংরেজি ভাষায় দক্ষতা অর্জন করেন। তার সাহিত্যচর্চার সূত্রপাতও ঘটে স্বামীর অনুপ্রেরণায়। ১৯০২ সালে পিপাসা নামে একটি বাংলা গল্প লিখে সাহিত্যজগতে তার অবদান রাখা শুরু হয়। স্বামীর সহযোগিতায় বেগম রোকেয়া শুধু যে ইংরেজি ভাষা রপ্ত করেছিলেন তাই নয়, ‘সুলতানাজ ড্রিম’ নামে একটি বইও লিখে ফেলেন ইংরেজিতে। সম্ভবত এটিই বাংলা ভাষায় কোনও বাঙালির লেখা প্রথম কল্পবিজ্ঞানের কাহিনি।

নারীপুরুষের সম্মিলিত সহযোগিতায় যে নিজের এই উত্তরণ, তা কখনও ভুলে যাননি বেগম রোকেয়া। আর সে জন্যই কখনও ধর্ম, সমাজ বা পুরুষের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে জড়াননি তিনি। সমাজের অন্ধকারময় জগদ্দল পাথর সরাতে অতিবিপ্লবীয়ানা যে সবসময় মঙ্গলজনক পথ বয়ে আনে না, এটা তিনি মর্মে মর্মে উপলব্ধি করেছিলেন। তাই নীরবে নারী জাগরণের চেষ্টা চালিয়ে গেছেন। বিভিন্ন গল্প আর প্রবন্ধে বাবার নারী সমাজকে জাগ্রত করার অণুপ্রেরণা জুগিয়েছেন। তাদের শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে স্বাবলম্বী হওয়ার মন্ত্রণা জুগিয়েছেন। তাদের পর্দাপ্রথার ঘৃণ্য অবরোধ ভেঙে বাইরে বেরিয়ে আসার আবেদন জানিয়েছেন। বহুবিবাহ, পর্দাপ্রথার কুফল নিয়ে নিরন্তর চালিয়ে গেছেন কলম।

নারী বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য তার স্বামীই রেখে গিয়েছিলেন ১০ হাজার টাকা। তার মৃত্যুর পর ওই অর্থ দিয়ে স্বামীর নামে শুরু করেন শাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস স্কুল। মাত্র পাঁচজন ছাত্রী দিয়েই যাত্রা শুরু এই বিদ্যালয়ের। এই বালিকা বিদ্যালয়ে শুধু মুসলমানেরা পড়ুক, তা চাননি তিনি। সামাজিক অচলায়তনের বিরুদ্ধে এই লড়াইকে তিনি কখনও ধর্মের গণ্ডিতে বাঁধতে চাননি। বিদ্যালয়টির আজকের সাফল্য তাই নিত্য প্রণাম জানায় বেগম রোকেয়াকে, এক অগ্নিশিখাকে।

আজকের দিনেও ক্ষমতায়নসহ নারীর সামগ্রিক উন্নয়নে মানবিক পুরুষের সহযোগিতা প্রয়োজন। এই প্রয়োজনকে অস্বীকার করা সত্যের অপলাপ মাত্র। আমাদের সবারই এটা মনে রাখা প্রয়োজন-নারী ও পুরুষ জৈবিক কারণেই দুটি আলাদা সত্ত্বা। তাই বলে তারা পরস্পরের শত্রু বা সর্বক্ষেত্রে প্রতিদ্বন্দ্বী নয়। এই সত্যটা দুই পক্ষকেই উপলব্ধি করতে হবে এবং মিলেমিশে সামাজিক বিকাশে ভূমিকা রাখতে হবে।

মাহমুদা আকতার: সাংবাদিক ও লেখক

ওমেন্স নিউজ ডেস্ক/