মুক্তিযুদ্ধের গল্প ‘একজন সিন্ডারেলা’

 আফরোজা অদিতি

তখন পাকিস্তানীদের সময়। পাকিস্তানের দুই প্রদেশের এক প্রদেশ পূর্ব পাকিস্তান। সেই পূর্ব পাকিস্তানেরই একটি গ্রাম। গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে গিয়েছে নদী। নদীর তীর ধরে  কাশবন। কাশবনের ধার ঘেঁষে মাটির রাস্তা। গ্রামটি খুব সুন্দর। প্রত্যেক বাড়িতেই বাঁশবাগান। বাঁশবাগানের মাথায় রাতে চাঁদ ওঠে। বাতাস হলে বাঁশপাতার ঝিরিঝিরি শব্দ শোনা যায়। পাওয়া যায় লেবু ফুলের গন্ধ। গ্রামের মাঠে মাঠে ওড়ে ফড়িং, ওড়ে প্রজাপতি।  ওই গ্রামে থাকতো সিন্ডারেলা। না, রূপকথার সিন্ডারেলা নয়, ওই মেয়েটি বিংশ শতাব্দির। সিন্ডারেলার বাবা ছিলেন হেডমাস্টার। খুব নামডাক তার। ছাত্ররা খুব ভালোবাসে, পছন্দ করে, সম্মান করে তাকে।

মেয়েটির বাবা রূপকথা খুব ভালোবাসে। মেয়ের জন্মের পরে যখন ওর বাবার কোলে দেওয়া হয় তখন বাবার সিন্ডারেলার গল্পের কথা মনে পড়েছিল বাবার। বাবা তখনই ওর নাম রেখেছিলেন সিন্ডারেলা। সিন্ডারেলার আরও একটি বোন আছে, প্রিসিলা। ছোট বোন প্রিসিলা সিন্ডারেলার প্রাণ। একবেলা না দেখলে চোখের কোণে কান্না জমে-যেমন সিন্ডারেলার তেমন প্রিসিলারও। মেয়ে দুটোকেই খুব ভালোবাসে  হেডস্যার। ছোট মেয়েটি খুব ছোট তাই তিনি বড়টিকেই নিয়ে বেশি বেশি বেড়াতে নিয়ে যান।  সিন্ডারেলাকে সঙ্গে নিয়ে বাবা যখন চাঁদের আলোতে নদীর কিনারে হাত ধরে হাঁটেন তখন সিন্ডারেলার খুব ভালো লাগে। বাবার হাত ধরে আকাশের চাঁদ দেখতে  দেখতে মেয়েটি বাবাকে বলে, ‘বাবা, বাবা দেখ চাঁদটাও আমাদের সঙ্গে সঙ্গে হাঁটছে।’ বাবা হাসতেন। চুলগুলো নেড়ে দিতেন। হাঁটতে হাঁটতেই বাবা কবিতা শোনাতেন -‘বাঁশবাগানের মাথার ওপর চাঁদ উঠেছে ওই…।’ কিংবা শোনাতেন ‘আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে, কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে…।’ সিন্ডারেলা মন দিয়ে বাবার বলা কবিতা শুনতো আর বাবার হাত ধরে হাঁটতো।

সিন্ডারেলার মন খুব নরম আর কল্পনাপ্রবণ মন।  কল্পনা করতে খুব ভালোবাসে। কখনও কখনও ওর মনে হয় কোন রূপকথার পরী এসে ওর সঙ্গে কথা বলছে! পরীর সঙ্গে ঘুরে বেড়াচ্ছে ফুলবাগানে! অনেক অনেক ফুল ছুয়ে দেখছে, গন্ধ নিচ্ছে! কখনও ওর মনে হয় পরী গান শেখাচ্ছে, নাচ শেখাচ্ছে ওকে। এত্ত ভালো নাচছে যে চারদিকে হাততালি। হাততালির সঙ্গে সঙ্গে ওর কালো সুন্দর চুল অনেক লম্বা হয়ে গেছে ঠিক ডাইনির কাছে বন্দি রাজকন্যার মতো!
 
ওরা ভালোই ছিল। কিন্তু হেডস্যার  সেই সময়ের গরিব অসহায় মানুষের জন্য ভালো খাবার, চিকিৎসায় ওষুধ, ছেলে-মেয়েদের শিক্ষার প্রয়োজন অনুভব করে। ওদের জন্য চিন্তা করেন। ভাবতেন, তিনি তো মোটামুটি ভালো খাচ্ছেন, পরছেন; অনেকে তো তা পাচ্ছে না। তা কেন হবে! তিনি সেই মতো কাজও করতে থাকেন। তিনি রাজনীতিতে যোগ দেন। তিনি বলতেন, সুজলা সুফলা এই পূর্ব পাকিস্তান। পূর্ব পাকিস্তান একাই এক রাষ্ট্র হতে পারে, এর জন্য মাঝখানে এক রাষ্ট্র রেখে তার পরের রাষ্ট্রের সঙ্গে এক হওয়ার কোন প্রয়োজন নেই।  তিনি তখনকার সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে তুলতে লাগলেন। পূর্ব পাকিস্তানকে একটা আলাদা রাষ্ট্র করতে হবে। হেডমাস্টার সাহেব রাজনীতি করছেন, এই খবর গেল পাকিস্তান সরকারের কাছে আর রাজনীতি করার অপরাধে সিন্ডারেলার বাবার চাকরি চলে গেল। পাকিস্তান সরকার স্কুল থেকে চাকরি ছাড়িয়ে দিলো তাকে। এক কথায় চাকরি নট।

সিন্ডারেলার মায়ের মাথায় হাত! তিনি বললেন, ‘তুমি রাজনীতিতে যে যোগ দিলে এখন তোমার এই মেয়েদের কেমন করে বড় করে তুলবো, লেখাপড়া শেখাবো।’ বাবা বললেন, ‘চিন্তা করো না, হয়ে যাবে। নিজের জন্য না, দেশের জন্য ভাবো।’ সিন্ডারেলা তখন ক্লাস থ্রি’তে পড়ে। রেজাল্ট ভালো এই জন্য ফ্রি পড়ে। মা চিন্তা করেন কবে কখন সিন্ডারেলার বেতন লাগে না কিন্তু বইপত্র-খাতাসহ আনুষাঙ্গীক অনেক কিছুর প্রয়োজন! তাছাড়া পেটে তো খাবার দিতে হবে। কী করবেন! খুবই চিন্তায় পড়লেন! বাবাকে আর পাওয়া যায় না। দেশ, দেশ আর দেশ। মা সংসারের হাল ধরলেন। হাঁস মুরগী পালন, ছাগল, গরু পুষতে শুরু করলেন। বাড়ির পাশে আম-বাগান, তার ফাঁকে ফাঁকে লাগালেন লাউগাছ, সিমগাছ। এদিকে দিন চলে যায়। সিন্ডারেলার প্রাইমারি শেষ হয়। এখন কোথায় হবে লেখাপড়া? মায়ের চিন্তা শেষ হয় না।  

বাবার পার্টি থেকে বলা হলো শহরে পড়ার কথা। বাবা যে রাজনৈতিক দলের সদস্য সেই দলের একজন কর্মীর বাবা অনেক ধন-সম্পত্তির মালিক। শহর ছাড়াও শহরের আশেপাশের অর্ধেক সম্পত্তির মালিকই সেই পরিবার। ওই পরিবারে থেকে  অনেক মানুষ লেখাপড়া শিখে এখন চাকরি করছে। সিন্ডারেলা মা-কে ছেড়ে, বোনকে ছেড়ে যেতে রাজি হয় না। কান্নাকাটি করে। সিন্ডারেলা ছোট্ট মেয়ে। বলে, ‘মা, আমি কেন তোমার কাছে থাকতে পারবো না!’ মা বলেন, ‘ওখানে গেলে সোনা, লেখাপড়া করতে পারবে, আমার কাছে থাকলে তো তা হবে না মা। সিন্ডারেলা ভাবে, সত্যই যদি ওর পরীটা আসতো তাহলে গ্রাম ছেড়ে যেতে হতো না ওকে। কিন্তু ও জানে পরী নেই! তবুও ভাবে সত্যিই যদি পরীটা আসতো, খুব ভালো হতো। এত ওর মনের কল্পনা! পরী শুধু গল্পেরই থাকে।
সিন্ডারেলা শহরে যাওয়া ঠিক হলো। বোনকে কাঁদিয়ে, নিজে কেঁদে চলে এলো শহরের সেই ধনী পরিবারে। মায়ের জন্য, বোনের জন্য প্রাণ কাঁদে। তবুও মা বলেছে, বাবা বলেছে এখানে থেকে পড়তে হবে তাই কষ্ট হলেও ওখানে থেকেই পড়ে। মা-বাবার কথা মানতেই হবে। স্কুল ছুটিতে মায়ের কাছে আসে সিন্ডারেলা। বছরে একবার দুইবার আসা হয় তার প্রাণপ্রিয় গ্রামে, ওর বাড়িতে। বাবার কাছে, মায়ের কাছে, প্রিয় বোনের কাছে। কয়েকদিন থাকে তারপর চলে যায়। মা, বাবা, বোনের সঙ্গে থেকে মন ভরে না।
মন ভরে না ছোট বেলার সাথীদের সঙ্গে খেলে। মন ভরে না গ্রামের মন ভাসানো জোছনা দেখে। সিন্ডারেলা যখন চলে যায় শহরে তখন মনে হয় বাঁশবনের পাতাগুলো ঝিরিঝিরি ডেকে বলছে, ‘সিন্ডারেলা, সিন্ডারেলা যেয়ো না, যেয়ো না সিন্ডারেলা, তুমি না থাকেলে  আমাদের কষ্ট হয়।   

সিন্ডারেলা যখন বাড়িতে আসে তখন মা জিজ্ঞাসা করেন, ‘ সিন্ডারেলা, ওখানে খুব কী কষ্ট হয় তোর?’
সিন্ডারেলা মায়ের কাছে কষ্টের কথা গোপন করে। বলে, ‘না, মা আমার কোন কষ্ট নাই। খুব ভালো আছি। ওখানে খুব আদর করে ওরা।’ সিন্ডারেলা মাকে বলতে পারে না, মাগো, এখানে না খেয়ে ভালো ছিলাম মা। একবেলা খেয়ে আর এক-বেলা তালের রসে রুটি খেয়ে কিংবা চিনির পানিতে বিস্কুট ভিজিয়ে খেয়ে ভালো ছিলাম মা।
সিন্ডারেলা বলতে পারে না, মাগো, আমার খুব খেলতে ইচ্ছা করে। আমার গল্পের বই পড়তে ইচ্ছা করে। মাগো, মা আমার গান শিখতে, নাচ শিখতে ইচ্ছা করে মা। ওদের বাড়ির ছেলে মেয়েরা খেলতে থাকে মা, আমি তখন কাজ করি, ওদের দিকে তাকিয়ে থাকি। কাজ শেষ হয় না বলে বকা খাই মা। ওরা আমার কাজ শেষ না হওয়ার জন্য আমাকে মারে,  মা। সিন্ডারেলা এসব কিছুই বলতে পারে না মাকে।

সিন্ডারেলা মায়ের দিকে তাকায়। মায়ের মুখে আশার আলো দেখতে পায়। মা-কে কিছু না বলে মায়ের বুকে লুকিয়ে থাকে।  মা, সিন্ডারেলার মুখ তুলে মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। কেন যেন মায়ের মনে হয় মেয়ে সব কথা তাকে বলছে না। মা বলে, ‘সিন্ডারেলা তুই যদি না যেতে চাস, আমি তোকে যেতে দিবো না সোনা।’ কিন্তু সিন্ডারেলা জানে, ওখানে না গেলে ওর পড়া হবে না। মায়ের ইচ্ছা পূরণ করতে পারবে না। এখানে ধারে কাছে কোন স্কুল কলেজ নেই, কোথায় পড়বে ? সিন্ডারেলা মাকে বলে, ‘না মা, আমি ওখানে থেকেই পড়বো।’
সিন্ডারেলা যে সময়ে পড়ালেখা করতো তখন বিদ্যুৎ যায়নি জেলা শহরে। ধনী ওই পরিবারে অনেক ঘর, অনেক মানুষ। সব ঘর আলো করার জন্য অনেক হ্যারিকেন জ্বালাতে হতো। তেল ভরতে হতো, হ্যারিকেনের চিমনি মুছতে হতো, সন্ধ্যায় আলো জ্বেলে ঘরে ঘরে রেখে আসতে হতো। প্রতিদিন সিন্ডারেলাকে এই কাজ করতে হতো। এই কাজ ছাড়াও বাসন-কোশন মাজতে হতো, ঘর ঝাড়– দিতে হতো, কাপড় ধুতে হতো ছুটির দিনে। সিন্ডারেলার খেলার সময় ছিল না। পড়ার সময়ও ছিল না।
বাড়ির ছেলেমেয়েরা যখন লেখাপড়া করতো, তখন ঘর ঝাড়– দিতো না হয় কাপড় গোছাতো, না হয় কাপড় ধুয়ে শুকাতে দিতো কিংবা শুকনা খড়ি তুলে খড়ির ঘরে সাজিয়ে রাখতো। তখন তো গ্যাস ছিল না। সব বাড়িতে খড়ি দিয়ে রান্না হতো।  শুধু এইটুকুই নয় ধনী পরিবারটিতে অনেক জমি ছিল, সেই জমির ফসল ছিল। ঝি-চাকর-কামলাদের সঙ্গে ফসল তুলতে হতো। ফসল রাখার গোলা-ঘর পরিষ্কার করতে হতো।  কাজ করতে সিন্ডারেলার কষ্ট হতো কিন্তু ভয় পেতো না। মাঝে-মধ্যে যখন স্কুল কামাই হতো তখন খুব কষ্ট লাগতো সিন্ডারেলার। কাজের জন্য যেতে পারতো না স্কুলে। ক্লাস-টিচারের বকা শুনতে হতো। কিছু বলতে পারতো না। সিন্ডারেলা কখনও কাউকে কড়া কথা বলতে পারতো না। সিন্ডারেলা বিশ-শতকের হলেও মনটা ছিল রূপকথার সিন্ডারেলার মতোই। রূপকথার সিন্ডারেলার মতো মন, রূপকথার সিন্ডারেলার মতোই ছিল শৈশব।

রাত জেগে পড়ালেখা করতো সিন্ডারেলা। ময়ের ইচ্ছা, বাবার ইচ্ছা ছাড়াও নিজেরও ইচ্ছা লেখাপড়া করার। ও জানে লেখাপড়া ছাড়া বড় হয়ে কোন লাভ নেই। তাছাড়া মায়ের কথা মনে পড়ে সিন্ডারেলার। মা ছোট বেলায় বলেতো, মেয়েদের লেখাপড়া করাটা খুবই প্রয়োজন। মন দিয়ে পড়বে। লেখাপড়া ছাড়া জীবনে বড় হওয়া যায় না। তখন তো মেয়েদের খুব লেখাপড়া শেখা অনেক পরিবারেই পছন্দ করতো না। কিন্তু সিন্ডারেলার মায়ের ইচ্ছা মেয়ে ডাক্তার হবে। গ্রামের মানুষের, দেশের মানুষের সেবা করবে। মায়ের ইচ্ছা পূরণ করার জন্য সিন্ডারেলা মন-প্রাণ দিয়ে চেষ্টা করে। ওখানে কাজের পরেও হ্যারিকেনের আলোয় লেখাপড়া করে। ওকে যে ডাক্তার হতেই হবে। মায়ের ইচ্ছা পুরণ করতেই হবে।

সময় যায়। এস.এস.সি পাশ করার পর যুদ্ধ শুরু হয়। যুদ্ধ শুরু হওয়ার কয়েক মাস আগে ওকে বিয়ে দিয়ে দেয় সিন্ডারেলার বাবা-মা। বাবা মায়ের বিয়ে দেওয়ার ইচ্ছা ছিল না। কিন্তু গ্রামের ব্যাপার! যদিও সিন্ডারেলা তখনও শৈশব পেরোয়নি তবুও এস.এস.সি পাশ করা মানে অনেক বড় হয়ে যাওয়া! বিয়ের যুগ্যি মেয়ে ঘরে তো রাখা যায় না! যুদ্ধ শুরু হলো। পাকি-সৈন্যরা একদিন গ্রামের হাটে হঠাৎ এসে পড়ে। এলোপাথারি গুলি করে।  সিন্ডারেলার স্বামী সেদিন হাটে গিয়েছিল সদাইপাতি কিনতে। পাকিদের গোলাগুলি থামে কিন্তু থামে না কান্না। অন্য সবার সঙ্গে সিন্ডারেলার কান্নাও থামে না। ফিরে আসে না সিন্ডারেলার স্বামী। বাবা-মা, ওদের দুই বোন আর ওর স্বামীকে  মামা বাড়ি পাঠিয়ে বাড়িতেই ছিল। সিন্ডারেলা আর বোন যুদ্ধের কয় মাস অন্য গ্রামে রইলো। এরমধ্যে দেশ স্বাধীন হলো। যুদ্ধ শেষে ফিরে এসে দেখে ঘরে দুটো কঙ্কাল শুয়ে আছে। বাবা মা নেই। সিন্ডারেলা বুঝলো এই কঙ্কাল দুটোই ওদের বাবা মা।
দুই বোন একসঙ্গে থাকে। সিন্ডারেলার বয়স এখনও সেই ষোলতেই দাঁড়িয়ে আছে! এখনও যেন তার শৈশব চলছে! ওর পোশাকের কোন রঙ নেই, নেই জীবনের রঙ! কোন ভাবনাও নেই,,বাড়েনি বয়স!

লেখক পরিচিতি: আফরোজা অদিতির জন্ম পাবনা জেলার ঈশ্বরদী উপজেলায়। দীর্ঘদিন ধরে লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। দু হাতে লিখে চলেছেন কবিতা, গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, শিশুতোষ  ইত্যাদি নানা ধরনের লেখা। তার প্রকাশিত একক গ্রন্থের সংখ্যা ৫০টিরও বেশি। এছাড়া তার সস্পাদনায় তটিনী নামে একটি সাহিত্য পত্রিকা প্রকাশিত হয়।

ওমেন্স নিউজ ডেস্ক/

লাইক, কমেন্টস, শেয়ার দিয়ে আমাদের সাথে থাকুন