নারী ও কন্যার প্রতি কেন এত নির্যাতন

হোমায়রা হুমা

হোমায়রা হুমা

ইদানিং মন ভীষণ খারাপ থাকে,,সারাদিন একই অবস্থা। খারাপের চেয়েও আতঙ্কে মন ভারী হয়ে থাকে। কখন কি হয়! সকালে পেপার পড়ে, টিভিতে খবর দেখে, আর ফেইসবুক খুলেও একই খবর বারবার। নাম, স্থান, ব্যক্তি,বয়সে ভিন্নতা থাকে কিন্তু বিষয় তো একটাই। বহু রঙ নানান রূপ,ঢং,উপায় পদ্ধতি, অযুহাত;বেশির ভাগই হচ্ছে জোরপূর্বক অনাহুত নির্যাতন। ঘটনা ঘটেই চলেছে একতরফা, বিনে কারণে,সংঘবদ্ধ বা কখনো একাই একশ।

নারী ও শিশু নিষ্পেষিত হচ্ছে, নির্যাতন প্রতিদিন প্রতিক্ষণে হচ্ছেই, ঘটেই চলছে বিরামহীন। এগুলো পড়তে পড়তে দেখতে দেখতে মানসিক বিকারগ্রস্ত হয়ে যাচ্ছি, একরকম পাগল হওয়ার যোগার। আতঙ্কময় ঘটনাগুলো ঘরে বাইরে মাঠে ঘাটে স্কুল কলেজ,মসজিদ, মাদ্রাসা, বিশ্ববিদ্যালয়, কোথায় না ঘটচ্ছে। বিবাহিত, অবিবাহিত,সন্তানের মা, বৃদ্ধা, শিশু, কিশোরী, নারী, অসুস্থ, পাগল, প্রতিবন্দী যেমনই হোক নারী হলেই হবে। বাছবিচারহীন লিঙ্গীয় এহেন অমানবিক নির্যাতনের কারণ কি? যুগের পর যুগ একতরফা এহেন অমানবিক নোংরা ঘটনা চলছে তো চলছেই। নারী শিশুর প্রতি এহেন রুগ্ন পাশবিক আচরণ রুখবার কেউ কি নেই?

যাদের ঘরে কন্যা সন্তান আছে তারা নিশ্চয়ই কন্যাদের আগামী জীবন নিয়ে ভয়ে দিনযাপন করছেন। কন্যাকে তো ঊর্ধ্বে এসএসসি পর্যন্ত সাথে নিয়ে যাওয়া যায়। কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করলে কন্যা-পুত্রকে স্বাধীনতা দিতেই হয়, সেখানে নতুন নতুন বন্ধু হয় বান্ধবীর সাথে পরিচয় ঘটে। কে ভাল কে মন্দ কে জানে! আপনি যতই তোতা পাখির মত সাবধান করে দেন না কেন, নতুন বন্ধু বান্ধবী হচ্ছে ফুচকার মত। বন্ধুদের সবকিছুই তাদের ভালো লাগে। দল বেঁধে আসা-যাওয়া আনন্দ ফূর্তি করাই যেন আধুনিকতা। আর মোবাইল কোম্পানির সিম বিক্রির বিজ্ঞাপনে প্রচারিত শ্লোগান "বন্ধুই সব" –ব্যস বর্তমান ডিজিটাল সমাজের বিধিবিধানের বাছবিচার সব ভেস্তে গেছে। মোবাইলে রঙিন পর্ণগ্রাফির নোংরা চলচ্চিত্রের মুঠোবন্দি পর্দায়। এসব অব্যবস্থার সুযোগে কত দিহানের হাতে কত আনুশকা নীরব ধর্ষনের শিকার হচ্ছে, কে কার খবর রাখে?

এখন তো আরো বেশী আতংকের ঘটনা এই যে, ধর্ষককে কঠিন শাস্তি প্রদানের পরিবর্তে ধর্ষণের শিকার কন্যার সাথে বিয়ে দিয়ে ধর্ষককে শাস্তি থেকে রেহাই দেয়য় হচ্ছে। খোদ কোর্টে মাননীয় বিচারক এ ঘটনাগুলোকে কেন হতে দিচ্ছেন? একজন মানসিক বিকারগ্রস্ত ব্যাক্তি একটি মেয়েকে ধর্ষণের মত জঘন্য কাজ করে, তাকে শাস্তি না দিলে তার ও অন্যান্য ধর্ষকের সাহস বাড়ে না কমে? শাস্তি থেকে বাঁচবার জন্যই ধর্ষক যে মেয়েটিকে বিয়ে করছে, সে নিশ্চয় সংসার করার জন্য মেয়েটিকে ধর্ষণ করে নি? তাহলে কোন্ যুক্তিতে শাস্তি ভোগের পরিবর্তে ঐ মেয়েটিকে বিয়ে দিতে মাননীয় আদালত অনুমতি প্রদান করেন? স্ত্রী হিসেবে তার ভরণপোষণ করতে সে কি বাধ্য? ধর্ষনের শিকার মেয়েটি কি পরিবারের চাপে বখাটে ছেলেটিকে বিবাহ করতে বাধ্য হচ্ছে না? সবচেয়ে বড় কথা শাস্তির পরিবর্তে বিবাহ এ কেমন আইন? কদিন পর ঐ মেয়েটিকে যৌতুকে নির্যাতন অথবা তালাকের শিকার হচ্ছে কিনা কে খবর রাখে?

প্রকাশ্য আদালতে এমন ঘটনা কি প্রমান করছে? একি ন্যায়বিচার? ধর্ষনের আইন কি তাহলে বদলে যাবে? বিবাহ নামের পবিত্র বন্ধনও কি অপবিত্র হয়ে যাচ্ছে না! বড় পরিতাপের সাথে প্রতিবাদহীন এমন বিষয়গুলো দেখতে হচ্ছে আমাদের আর ভয়ে কুঁচকে যাচ্ছে মায়েদের মন, কাঁটা দিয়ে উঠছে গা। আর প্রচন্ড ঘৃণা। নারীর প্রতি আবহমানকাল থেকে শারীরিক,মানসিক, সামাজিক, আর্থিক নির্যাতন, খুন, এসিড নিক্ষেপ, গুম,
পাচার, হত্যা, বিনা কারণে তালাক, ভরণপোষণ না দেয়া, ভিটাছাড়া করা, সন্তানের স্বীকৃতি না দেয়া, বহু বিবাহ, বাল্য বিবাহ দেদারসে চলছে। বিচারের দীর্ঘসূত্রিতায় বাদী ধৈর্যহীন হয়ে পড়ে, বিচারের সূতো হালকা হয়ে ছিড়ে পড়ে আদালতের ধূলোয়।  এভাবে সকল অন্যায় প্রত্যক্ষ পরোক্ষ আশ্রয়-প্রশ্রয় দিচ্ছে  কে কিভাবে এ সংক্রান্ত সংবাদ আমর সংবাদপত্রে দেখি অহরহ।

এ কথা সত্যি যে, নারী শিক্ষায় পদমর্যাদা যত বড়ই হোক না কেন পারিবারিক সহিংসতার শিকার তাকে হতেই হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষিকা রোমানা রশীদ ,কিছুদিন পূর্বে নারী জেলাপ্রশাসক তার অফিসের দারোয়ান কর্তৃক জঘন্যভাবে সহিংসতার শিকার হয়েছিলেন। তাদের শাস্তি হয়েছে কি? কবে হবে কে জানে?নারীর  যেন কোনো মূল্যই নেই। নির্যাতন,অবমূল্যায়ন, অপমান,মৌখিক নির্যাতন, সহ্য করতে হয় নারীকে আমৃত্যু। কিন্তু কেন? এ প্রশ্ন জিজ্ঞেস করবে কে কাকে।

এমন টলায়মান ভয়ংকর সময় অতিবাহিত করছি আমরা, পূর্বে করছেন আমাদের মা নানিরা। এ যেন বংশপরষ্পরায় এক চলমান ধারা। তবে কি আমাদের কন্যাদেরকে ঘরের দেয়ালে পোষ্টারের মত সাঁটিয়ে রাখবো?বন্ধু বনাম এই রাক্ষসদের হাত থেকে এদের কে রক্ষা করবে? বাস, সিএনজি,
রিক্সা, হেঁটে চল্লেও ভয় বুলিং আতংক। কি জানি কোথা থেকে কে হানা দেয়!

পারিবারিক মান মর্যাদা, সম্মান রক্ষা করার দায়িত্ব শুধুই কি নারীর দায়,পুরুষ ও ছেলেদের কি এর দায় নেই? অবলীলায় তারা ঘরে বান্ধবী ডেকে এনে ধর্ষণের পর হত্যা করবে আর তাকে বাঁচানোর জন্য সকল পুরুষ কায়মনোবাক্যে মাঠে নেমে যায় মেয়েটিকে দোষী সাব্যস্থ করার জন্য। প্রায় প্রতিটি ঘরে কাজের সহকারী,অফিসে নারী সহকর্মী, ধর্মীয় ও অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী, পথচারী, মার্কেটে, হাসপাতলে ডাক্তার দ্বারা নিপীড়নের শিকার হচ্ছে, কোথায় নিরাপদ নারী ও কন্যারা? এ কেমন রীতি দৃষ্টিভঙ্গি? কেমন পরিবেশে আমাদের এখন বসবাস?

আমরা আজো ভুলে যাইনি রুমি, সিমি, ফাহিমা,পূর্ণিমা, মহিমা, তৃষা, পূর্ণিমা আরো কতশত নাম আজো দুঃখের আখরে লেখা আছে। কী মর্মান্তিক পরিস্থিতির শিকার হয়ে আত্মহননের পথ বেছে নিয়ছিল এরা। আজকের পরিস্থিতি কোনো অংশেই কি পাল্টেছে? নারী নির্যাতন দমন আইন, যৌতুক বিরোধী আইন, নারী সুরক্ষা আইন, কত নামে কত আইন। কিন্তু আইন প্রয়োগকারীরা নারী নারীবান্ধব নয়, ফলে আইনের আশ্রয় নিলেও সমাধান মিলে না সহজে। দিনের পর দিনে আদালতের দরজায় ধর্ণা দিয়ে দিয়ে জীবনের প্রতিই যেন বিতৃষ্ণা এসে যায়। তাহলে এই পাশবিকতার প্রতিকার কী-কবে বন্ধ হবে এই নির্যাতন!

লেখক পরিচিতি– হোমায়রা হুমা মূলত কবি। তিনি কবিতা ছাড়াও ছোটগল্প ও নিবন্ধসহ নানা ধরনের লেখা লিখছেন। একই সঙ্গে তিনি একজন সোশ্যাল এক্টিভিস্ট। জড়িত আছেন সাহিত্য ও মানবাধিকার বিষয়ক বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে। এ পর্যন্ত লেখকের নয়টি কবিতা, দুটি প্রবন্ধের বই এবং তিনটি আবৃত্তির সিডি প্রকাশিত হয়েছে। সাহিত্য চর্চার জন্য পেয়েছেন বেশ কিছু পুরস্কার। হোমায়রা হুমা: কবি, লেখক ও মানবাধিকার কর্মী।

ওমেন্স নিউজ ডেস্ক/

লাইক, কমেন্টস, শেয়ার দিয়ে আমাদের সাথে থাকুন