ওরা আমার মুখের ভাষা কাইড়া নিতে চায়

সুলতানা রিজিয়া

সুলতানা রিজিয়া

মায়ের ভাষা প্রাণের ভাষা
বাংলা ভাষা বাংলা ভাষা,
আমার ভাষা তোমার ভাষা
বাংলা ভাষা বাংলা ভাষা,
রাষ্ট্র ভাষা বাংলা চাই, বাংলা চাই।
আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙ্গানো ২১ শে ফেব্রুয়ারী, আমি কি ভুলিতে পারি?

বাংলা, বাঙালি এবং বাংলাদেশের মানুষের কাছে উপরের স্লোগানগুলো খুবই পরিচিত এবং প্রানের অকৃত্রিম দাবির বহিঃপ্রকাশ। আমরা সেই সব স্লোগানে স্লোগানে ভাষার জন্য জীবনপণ আন্দোলনে বিজয়ী হয়েই আজ বিশ্বমাঝে সগৌরবে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছি। আমরা ভাষা সৈনিকদের উত্তরসূরী। আমরা বীর বাঙালি। আমরা আদি অন্তে বাঙালি, বাংলা ভাষাভাষী রাষ্ট্রের অধিবাসী। আমাদের রাষ্ট্রীয় ভাষা বাংলা।
‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’ আমাদের জাতীয় সঙ্গীতের বাণী। আমরা শয়নে স্বপনে বাংলাতেই কল্পনা করি, প্রানের আবেগ উজাড় করে দেই। আমাদের শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতির নান্দনিক বাতায়ন বাংলার শাশ্বত ঐতিহ্যে কারুকাজমণ্ডিত। এই বাংলাভাষা, আমাদের মাতৃভাষা বাংলার মর্যাদা একদিনে অর্জিত হয়নি। অনেক ত্যাগ তিতিক্ষা, আত্মদানের মহিমায় আমরা বাংলাভাষাকে আমাদের রাষ্ট্রীয় ভাষা করার গৌরব অর্জন করেছি।

বাংলার দাবিতে রক্তাক্ত রাজপথ

১৯৪৮ সালে ১৪ আগষ্টে ভারত বিভক্তিতে পশ্চিম পাকিস্তান ও পূর্বপাকিস্তান নিয়ে সৃষ্ট পৃথক রাষ্ট্রের আমরা ছিলাম তৎকালীন পূর্বপাকিস্তানের অংশে। যার আয়তন ছোট, আয় ব্যবসা বানিজ্যেও খাটো। এককথায় এদেশের অধিকাংশ মানুষ ছিলো চাষাভুষা, কৃষক তাঁতি, কামার কুমোর, জেলে
হতদরিদ্র আদি বাঙালি। তাই পূর্বপাকিস্তানের ভাষাভাষী জনগনের সিংহভাগ মানুষই ছিলো বাঙালি, বাংলা ভাষাভাষী। উর্দু ভাষাভাষীর সংখ্যা ছিলো নগন্য। তারা প্রায় সকলেই কর্মসূত্রে পূর্ব পাকিস্তানে আগত শ্রমজীবী জনসংখ্যা।

নব্য প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্র এই বাংলায় ( পূর্ব পাকিস্তানে ) ১৯৪৮ সালে সফরে এলেন পাকিস্তানের জনক মোহম্মদ আলী জিন্নাহ। তাকে সংবর্ধনা আয়োজন করা হয়েছিলো ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে। বিপুল জনসমাগম স্থলে পাকিস্তানের জনক ঘোষণা করলেন -‘উর্দু  এবং উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্র ভাষা।’ বিরসবদনে মনের গোপন কষ্ট নিয়ে ফিরে গেলো উপস্থিত পূর্ববাংলার জনগন। তাদের বুকের কোনে কোপ পড়লো জাতির পিতার উদ্যত খড়্গে। এই খড়্গ কেড়ে নিতে চায়লো তাদের মায়ের মুখের ভাষা। বাংলা ভাষার অধিকার। এর কিছুদিন পরেই ঢাকা বিশ্ববিদালয়ের কার্জন হলের এক সমাবর্তন অনুষ্ঠানে মোহম্মদ আলী জিন্নাহ তার বক্তৃতায় পুনরায় ঘোষনা করলেন মুখের ভাষা হরণের প্রত্যয়। এবার গোপন কষ্টের রক্তক্ষরণের বহিঃপ্রকাশ হলো তুমুল প্রতিবাদ ধ্বনিতে। না না না। আমরা মানি না মানবো না। সভা বিশৃঙ্খলার মধ্যে শেষ হয়।

মোহম্মদ আলী জিন্নাহর ১৯৪৮ সালের সেই বিজাতীয় ভাষা চাপিয়ে দেয়ার একমুখী ঘোষণার পর থেকেই বাংলাভাষার আন্দোলন জোরদার হতে থাকে। পশ্চিম পাকিস্তানের শাষকগোষ্ঠি উঠে পড়ে লাগে বাংলা ভাষাকে দাবিয়ে উর্দু ভাষাকে চাপিয়ে দিতে। দপ্তরে দপ্তরে, অফিস আদালতে, স্কুল, কলেজসহ সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নোটিশ জারি শুরু করে। তারা যতো জোর জুলুম করে বাঙালিদের ভাষাকে দাবিয়ে রাখতে, ততোই বাংলাভাষার দাবির আন্দোলন দুর্বার হতে থাকে। প্রাথমিক ভাবে ছাত্রসমাজ এই আন্দোলন চালিয়ে নিয়ে গেলেও একসময় পুরো দেশবাসী এই আন্দোলনে সামগ্রিক ভাবে জড়িয়ে পড়ে। শহরে শহরে, জেলায় জেলায় এমন কি মফস্বলে গঠিত হয় বাংলাভাষা আন্দোলনের সংগঠন, সংস্থা ও গোষ্ঠী। তাদের সভা, সমাবেশ সংবাদপত্রে প্রকাশিত হতে থাকে। দেশবাসির জোরালো সমর্থনে ছাত্রসমাজের মনোবল বেড়ে যায়, তারা আরো দ্বিগুণ উৎসাহে অগ্নিস্ফুলিঙ্গসম বাংলাভাষা আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ে।

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিতে প্রাদেশিক পরিষদের অধিবেশনকে সামনে রেখে সমগ্র পূর্ব বাংলায় বাংলাভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে আন্দোলন জোরদার করা হয়। পাকিস্তানী শাসক ঢাকায় ছাত্র সমাজের সকল প্রকার মিটিং, মিছিল, প্রতিবাদ সমাবেশ বন্ধ করার পরিকল্পনায় ১৪৪ ধারা জারি করে। কিন্তু বাংলাভাষাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা আদায় কল্পে ভাষাসৈনিকরা হয়ে উঠে দুর্দমনীয় এবং একরোখা। ছাত্রসমাজ তাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী সরকারের ১৪৪ ধারা ভঙ্গকরার মনোবলে মিছিল নিয়ে বাংলাভাষার মর্যাদা রক্ষার স্লোগান দিতে দিতে ঢাকার রাজপথে উঠে আসে। সেই মিছিলে এদেশের কতিপয় অকুতোভয় নারী শিক্ষার্থীরাও অংশ নেয়। উত্তাল সেই মিছিল পুলিশের ব্যরিকেট অতিক্রম করলে তারা লাঠিচার্জ করে মিছিলকে থামিয়ে দিতে চায়। আগ্নেয়াস্ত্রে সজ্জিত পুলিশের লাঠিচার্জ উপেক্ষা করে বাঁধভাঙা জোয়ারে মিছিল এগিয়ে যেতে থাকে সন্মুখপানে। দুর্দান্ত দুর্ধর্ষ বাঙালি জাতির মেরুদণ্ড ভেঙ্গে দেয়ার জন্য পাকিস্তানি প্রশাসন পুলিশবাহিনি মিছিলে গুলি চালানো হুকুম দেয়। এতে সালাম, বরকত, রফিক, শফিক, জব্বারসহ অনেকে রাজপথে প্রাণ হারায়। আহত হয় অনেকে।

জাগো জাগো বাঙালি জাগোর ধ্বনি প্রতিধ্বনি

আগুনে ঘি পড়ার মতো জ্বলে উঠলো পূর্ববাংলা তথা সমগ্র দেশ। টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত আওয়াজ উঠলো মাতৃভাষা বাংলা আদায়ের দাবি।
শিক্ষিত অশিক্ষিতের কোন বিভাজন সেই দাবিতে ছিলো না। পাকিস্তানি সরকার বিভাজন তৈরির সুযোগ করতে পারেনি।
এক দেশ, এক ভাষা,
বাংলা ভাষা, বাংলা ভাষা।
আমার ভাষা তোমার ভাষা
বাংলা ভাষা বাংলা ভাষা।
১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারিতে সরকার কর্তৃক ভাষা সংগ্রামীদের উপরে গুলি চালানো ও হত্যার মতো ন্যাক্কারজনক সিদ্ধান্ত নেওয়ায় সরকারের সমালোচনায় প্রতিবাদের ঝড় উঠলো। মিটিং, সভা সমাবেশে দেশের মানুষ একাট্টা হয়ে দাঁড়ালো। তারা ভাষাশহীদদের স্মরণে শোকসভা, আত্মার শান্তি কামনায় লাগাতার সমাবেশে মেতে রইলো। এর সাথে যুক্ত হলো দেশের কবি সাহিত্যিক, শিল্পী, বুদ্ধিজীবীদের কলম ও রঙের চাষ। তারা অনর্গল কলমের ডগায়, তুলির আঁচড়ে ভাষাশহীদদের কথা, মাতৃভাষা বাংলা দাবির কথা, সর্বপরি রাষ্ট্রভাষা বাংলা চালুর প্রস্তাবে মুখর হয়ে উঠলো।

তোমাকে উপড়ে নিলে, বলো তবে কী থাকে আমার
উনিষ শো বাহান্নোর দারুণ রক্তিম পুষ্পাঞ্জলি
বুকে নিয়ে আছো সগৌরবে মহীয়সী।
-কবি শামসুর রাহমান

আব্দুল লতিফের কন্ঠে সুর উঠে-‘ওরা আমার মুখের ভাষা কাইড়া নিতে চায়।’

তৎকালীন পূর্বপাকিস্তানের জনগনের ভাষায় দাবির কাছে শেষ পর্যন্ত সরকার নতিস্বীকার করতে বাধ্য হয়। ১৯৫৬ সালে সংবিধানে তারা বাংলাভাষাকে রাষ্ট্র ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করে। ২১ শে ফেব্রুয়ারি বীর ভাষাসৈনিকদের মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষায় আত্মদানের গৌরবময় দিন। ২১ শে ফেব্রুয়ারি মাতৃভাষা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি আদায়ের মাইলফলক। ২১ শে ফেব্রুয়ারি বাংলা ভাষাভাষী মানুষের ভাষার জন্য লড়াই পৃথিবীর ইতিহাসে একটি অনন্যসাধারণ অর্জন। বাঙালি জাতি বাংলাভাষার এই অর্জনকে শুধু দেশীয় গণ্ডির মধ্যেই সীমাবদ্ধ করে রাখেনি। তারা নিজেদের এই অর্জনের প্রদীপ্তশিখা বিশ্বমাঝেও জ্বালিয়ে ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসাবেও স্বীকৃতি আদায় করে নিয়েছে।

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের গৌরব

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস প্রতিষ্ঠার ইতিহাসে জানা যায় সর্বপ্রথম উদ্যোগ গ্রহণ করেন কানাডার ভেঙ্কুভারে বসবাসকারী দুই বাঙালি রফিকুল ইসলাম এবং আব্দুস সালাম। তাদেরই সার্বিক উদ্যোগে প্রথমে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘মাদার ল্যাঙ্গুয়েজ লাভারস অব দ্য ওয়ার্ল্ড’ নামে একটি সংগঠন। অতঃপর শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতির সাথে যুক্ত সুধীজনের আন্তরিক সহযোগিতায় ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর অনুষ্ঠিত ইউনেস্কোর প্যারিস অধিবেশনে ২১শে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণার প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়। সেই অধিবেশনেই মোট ১৮৮টি দেশের সমর্থন সহযোগে প্রস্তাবটি পাশ হয়। এই প্রস্তাবটি অনুমোদন পেলে তারপরের বছর ২১ শে ফেব্রুয়ারি থেকে জাতিপুঞ্জের সদস্য দেশগুলিতে যথাযথ মর্যাদায় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালিত হয়।

২০১০ সালের একুশে অক্টোবর সাধারণ পরিষদের ৬৫তম অধিবেশনে জাতিপুঞ্জ স্বয়ং একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা হিসেবে পালনের উদ্যোগ নেয়। এই প্রস্তাবটি উত্থাপন করেছিল বাংলাদেশ। পরের বছর মে মাসে জাতিপুঞ্জের ১১৩ সদস্য বিশিষ্ট তথ্য বিষয়ক কমিটিতে উক্ত প্রস্তাবটি সর্বসম্মতিক্রমে পাস হলে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের প্রতিষ্ঠা পূর্ণতা লাভ করে।

বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পরেই প্রতিবছর একুশে ফেব্রুয়ারি দিনটিকে শহীদ দিবস হিসেবে স্মরণ করে হয়। এই দিনটিকে জাতীয় ছুটি হিসাবে ঘোষণা করা হয়েছে। দেশের রাষ্ট্রপতি থেকে প্রধান মন্ত্রী তথা দেশের সকল শ্রেনী পেশার বুদ্ধিজীবীরা মহান শহীদ দিবসে জাতীয় শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবকে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। স্বাধীন বাংলাদেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেই প্রতিষ্ঠিত শহীদ মিনারে যথাযোগ্য মর্যাদায় ২১ শে ফেব্রুয়ারিতে শহীদ দিবস পালিত হয়। এই দিনটির তাৎপর্য তুলে ধরার মানসে বিভিন্ন সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয় বাংলাভাষা আন্দোলনের সচিত্র তথ্য, শিল্প, সাহিত্য, সাংস্কৃতিক সংবাদ সমূহ। দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে এখন বিশ্বের সর্বত্র বসবাসকারী বাঙালি জাতি আয়োজন করে বিভিন্ন শিল্প, সাহিত্য এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের। বাংলাদেশ টেলিভিশনসহ সকল টিভি চ্যানেলে প্রচার করা হয় অমর একুশের চেতনা। এই চেতনা আরো গভীরতম উপলব্ধিতে বাংলা একাডেমির চত্বরে আয়োজন করা হয় মাসব্যাপী একুশে বইমেলা। এই বইমেলাই বাংলাদেশ, বাঙালি জাতির জাগ্রত চেতনার বাতিঘর। এখানে থেকে তরুণ প্রজন্ম বাংলা ভাষা, বাঙালি জাতির ঐতিহ্যের সাথে সখ্য গড়ে তোলে। একুশের মাস জুড়েই থাকে বাঙালির প্রাণের উন্মাদনা, প্রাণের উচ্ছ্বাস। পহেলা ফাল্গুনের উৎসব, সাথে ভালোবাসা দিবস! বাঙালি জাতি আদিঅন্ত আবেগপ্রবণ। প্রেম ভালোবাসা স্নেহ মায়া মমতার নির্যাসেই তারা আমৃত্যু ভরপুর থাকে। তারা দুর্যোগ, দুঃসময়ে পরস্পরের সাথে যেমন মানবিকতায় একাত্ম থাকতে ভালোবাসে, তেমনি জাতির প্রয়োজনে, দেশের সংকটের সন্ধিক্ষণে তারা জেগে ওঠে বুকের রক্ত দেয়ার নেশায়।

একুশে ভাষার রক্তেই আমরা পেয়েছি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস! স্বাধীন দেশের পতাকা, সার্বভৌম রাষ্ট্র – বাংলাদেশ। ‘জয় বাংলা, বাংলার জয়’এই মন্ত্র আজ বিশ্ব শ্রেষ্ঠ। বাঙালি জাতিও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্ববন্দিত।

কানেকটিকাট, ইউএসএ
১৮/০২/২০২১

সুলতানা রিজিয়া: কবি, লেখক, প্রাবন্ধিক, সংগঠক ও প্রকাশক। তিনি দীর্ঘদিন ধরে নন্দিনী নামক একটি সাহিত্য পত্রিকা বের করছেন। এছাড়া তার রয়েছে প্রকাশনা হাউস সম্রাজ্ঞী। তার প্রকাশিত একক গ্রন্থের সংখ্যা ২৩ টি। সাহিত্য ও সাংগঠনিক অবদানের জন্য পেয়েছেন ত্রিশটির বেশি সম্মাননা পদক।   

ওমেন্স নিউজ২৪/