গ্রামে গ্রামে ঘুরে নাপিতগিরি করেন বৃদ্ধ হরিদাস

হাসানুজ্জামান হাসান

আধুনিক যুগে সব বয়সের মানুষই সেলুনে গিয়ে চুল দাড়ি কাটান। আজকাল তাই গ্রামে গঞ্জেও গড়ে উঠেছে সেলুন। শহরে তো দূরের কথা গ্রামেও আর এখন তেমন কোনও নাপিতের দেখা মেলে না। এদিক দিয়ে ব্যতিক্রম বৃদ্ধ হরিদাস শর্মা (৭০)। তিনি কোনও সেলুনে নয়, চুল কাটেন গ্রাম থেকে গ্রামে ঘুরে ঘুরে।

সারাদিন বাই সাইকেলে করে গ্রামে গ্রামে ঘুরে বেড়ান হরিদাস শর্মা। বাড়ির সদর দরজায় গিয়ে হাঁক দেন- ‘কই গো, চুল দাড়ি কাটাবেন কেউ।’ তার ডাক শুনে বেরিয়ে আসে ছেলে পুলে ও বয়স্করা। তিনি কারো কাটেন চুল, আবার কারো দাড়ি। সাধারন সেলুনের চেয়ে স্বল্প মূল্যে গ্রামের মানুষের চুল-দাড়ি কাটতে দেখা যায় তাকে। তাই নিম্ন আয়ের লোকজন সেলুনে না গিয়ে চুল কাটেন হরিদাসের কাছে। টাকার পরিবর্তে অনেকে  তো চাল দিয়েও কাজ সেরে নেয়।

হরিদাস শর্মা লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ  উপজেলার কাকিনা এলাকার বাসিন্দা। হারিয়ে যাওয়া পেশাকে ধরে রেখেছেন তিনি। জীবিকার তাগিদে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত গ্রামে গ্রামে ঘুরে চুল ও দাড়ি কেটে তার আয় হয় ২০০/৩০০ টাকা। তা দিয়ে চার সন্তান নিয়ে কোন রকম সংসার চলছে।

নিজের বসার জন্য এক টুকরো ইট,আর নিত্য-দিনের কাস্টমারদের বসার জন্য ছোট্ট একটি পিঁড়ি। খোলা আকাশের নিচে রোদ মাথায় নিয়ে এ পেশায় ৪০ বছর পার করেছেন হরিদাস শর্মা।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, কালীগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন হাট বাজারে ফুটপাতে চুল-দাড়ি কেটে সংসার চলে হরিদাসের। এখন আর তেমন কেউ নতুন করে এ পেশায় আসছেন না। বিশেষ করে যারা নিম্ন আয়ের মানুষ তারা বেছে নিচ্ছেন ভিন্ন পেশা। আবার কেউ গার্মেন্টস শ্রমিকের কাজ করছেন।

হরিদাস শর্মা ওমেন্স নিউজ প্রতিনিধি হাসানুজ্জামান হাসানের সঙ্গে কথা বলার সময় জানান, ৪০ বছর ধরে এই পেশায় আছি। অন্যের বাড়িতে কাজ না করে বাপ-দাদার ঐতিহ্য ধরে রেখেছি। বাজারের সেলুনের চেয়ে স্বল্প মূল্যে চুল-দাড়ি কেটে দেই। আমার কাছে সাধারণত নিন্ম আয়ের মানুষ কাজ করে নেয়। বাজারের সেলুনে গিয়ে চুল ও দাড়ি কাটতে ৮০ টাকা লাগে। সেখানে আমি চুল কাটার মূল্য নেই ২০ টাকা। সেভ করিয়ে দেই ১৫ টাকায়। এটা আমার এখন পেশা থেকে নেশায় পরিণত হয়েছে। কোনও রকম সংসার চললেও বাপ-দাদার ঐতিহ্যকে ধরে রেখেছি।

স্থানীয় শিক্ষক আসাদুজ্জামান জানায়, নর সুন্দর হরিদাসকে আমরা জ্ঞান হয়েছে থেকে দেখি চুল-দাড়ি কাটতে। অনেকে টাকার পরিবর্তে চাঁল দিয়েও কাজ করিয়ে নেয়। এই এলাকায় আগে বেশ কয়েকজন কে এই কাজ করতে দেখা যেত। এখন শুধু হরিদাস একাই আছে। গ্রামের মানুষেরা স্বল্পমূল্যে চুল-দাড়ি কাটতে পারছে।

তার সম্পর্কে কাকিনা ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান শহিদুল হক বলেন, ‘হরিদাসকে বয়স্ক ভাতা করে দেয়া হয়েছে। তিনি অনেক আগে থেকেই গ্রামে গ্রামে গিয়ে কাজ করেন। তাকে ভিজিডি কার্ড করে দেয়া হবে। পরিবার নিয়ে যাতে ভালোভাবে চলতে পারেন সেজন্য বরাদ্দ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।’

ওমেন্স নিউজ ফিচার/