বাবা দিবসের বিশেষ প্রবন্ধ ‘বাবার জন্য আকণ্ঠ তৃষ্ণা’

সুলতানা রিজিয়া

সুলতানা রিজিয়া

"বাবা দিবস"এ পৃথিবীর সকল বাবাদের প্রতি আমার অকৃত্রিম শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও শুভকামনা জানাই। বাবাদের নিয়ে বিশেষ একটি দিন! ভাবতে অবাকই হতে হয়। পিতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা অতীতেও ছিলো, আজও আছে। তবে কিছু আদিবাসী জনগোষ্ঠীতে মাতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার কথাও আমরা জেনেছি। তবে সেটি নগন্য। তাই ধর্তব্যের মধ্যে পড়েনা। পুরুষ বিশ্বজগতে প্রথম সৃষ্ট। মহান আল্লাহ্ রাব্বুল আল-আমিন মানুষ্য সৃষ্টির প্রথম পুরুষ মানুষ হজরত আদম (আঃ ) দিয়ে শুরুই করেন। অতঃপর আল্লাহ তার সৃষ্টির সেরা আশরাফুল মখলুকাতকে বিশ্বময় ছড়িয়ে দেয়ার লক্ষ্যে বংশ বিস্তারের প্রয়োজনে মা হওয়া ( আঃ ) কে সৃষ্টি করেন বাবা আদমের ( আঃ ) পাঁজরস্থ অস্থি দিয়ে। মানুষ যতো শিক্ষিত হয়েছে, আধুনিক হয়েছে, জ্ঞান বিজ্ঞানের অশেষ কল্যাণে জীবনধারণের সুযোগ সুবিধার অধিকারী হয়েছে ততোই তারা নিজেদের চারপাশে স্বার্থের গণ্ডি তুলে খোপ ( একক পরিবার ) তৈরি করেছে। ষাট – সত্তর বছর পূর্বেও আমরা যৌথ পারিবারিক জীবন যাপনে অভ্যস্থ ছিলাম। দাদা দাদী, চাচা চাচীদের সাথে বাবা, মা'য়েরা সুসম্পর্কে, আস্থায় সন্তানদের মানুষ করেছেন। সেখানে বড় ছোট কিম্বা অর্থবিত্তের বাছ বিচার ছিলো না। ব্যক্তিগত শিক্ষা, ব্যবসা বানিজ্য, চাকরি, সন্তানদের উচ্চতর শিক্ষার সাথে উন্নত পরিবেশের প্রয়োজনে ধীরে ধীরে যৌথপরিবারগুলে টুকরো টুকরো হতে থাকে। যার ফলশ্রুতিতে আজকেরই "দু'টি সন্তানেই সুখী পরিবার" এই আদলে গড়ে উঠেছে একক পরিবার। যুগের সাথে তাল মিলাতে গিয়ে প্রায়শঃই তারা হারিয়ে ফেলেছে তাদের সুখ শান্তিময় সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ। ঘরে বাইরে হোঁচট খাচ্ছে সম্পর্কের টানাপোড়েনে। এই পরিস্থিতিকে সামাল দিতে বিশ্বের মাথা নেতারা উদ্ভাবন করেছেন গুটিকয়েক দিবস। মা দিবস, বাবা দিবস, কন্যা দিবস, ভালোবাসা দিবস ইত্যাদি ইত্যাদি। তাতে সমাজ সংসারের ক্ষতি কতটুকু পূরণ হবে সেটা বিশ্লেষণে না গিয়ে আমরা এটাকে মন্দের ভালো বলেই ধরে নিয়েছি। খুশি ও সুখী হওয়ারও চেষ্টা করছি।

বাবা ! আব্বা। আব্বু। বাপজান। বাবাই। কত্ত নামে যে একজন জন্মদাতাকে আমরা সম্বধোন করি, ডাকি সেটা সকলেই কম বেশি জানি। বাবার প্রতি ভালোবাসার চেয়ে শ্রদ্ধা, সম্মান, সমীহের দিকেই আমাদের মনটা ঝুঁকে থাকে। জন্মদাতার সামনে চোখে চোখ রাখতে পারাটা অনেক সাধ্য সাধনার বিষয়। সম্পর্কের নৈকট্য যতো দৃঢ় এবং মজবুত থাকে সাহসের লাগামটা ততোই দীলখোলা হয়। তখন নিজেকে অতি ক্ষুদ্র থেকে বাবার কাঁধ ছাড়িয়ে যাওয়ার মতোই মনে হয়। যে শিশু জন্মের পর থেকেই বাবার কাঁধে, পিঠের আশ্রয়টা একটু বেশি পায়, সেই শিশুর পা'দুটো শক্তপোক্ত হয়। তার চলা, ফেরা, দৌঁড়টা একটু আগে ভাগেই রপ্ত হয়ে যায়।

আমরা আমাদের নিজ নিজ সংসারে চোখ ফেরালে এমনটাই দেখি। এখন বুঝি আজীবন বাবার কী অপরিসীম ভূমিকা! তাদের ত্যাগে, সহনশীলতায়, পরিশ্রমে, বুকের মাঝে আপন প্রতিচ্ছবির স্বপ্ন লালনে, সন্তানদের হাত ধরে জীবনকে বহুদূর এগিয়ে দেওয়াতে সন্তানদের চোখে প্রায় প্রতিটি বাবাই হয়ে উঠেন অপরাজেয় যোদ্ধা। বীরত্বে শ্রেষ্ঠ।

মা। আম্মা। মাম্মি, মম, মা'জান! তার কাছেও সন্তানরা তেমনই অথবা ততোধিক শিরোধার্য। মা এই শব্দটা খুবই কোমল, প্রীতিময়, মায়াময়। মা ডাক এ বুকের ভেতরটায় আদর সোহাগের বুদবুদ্ সৃষ্টি হয়। মনে হয় জীবনটা মায়ের আঁচলের শীতল ছায়ায় পরম নির্ভরতায় পালিত। মায়ের বুক জুড়ে অবিরল প্রশান্তির প্রসবনের কাছে সন্তানরা নতজানু, কৃতজ্ঞ। তাদের আদরে, সোহাগে, শাসনে, তোষনের নজরদারিতে সন্তানরা দিনে দিনে বড় হয়, মানুষ হয়ে ওঠে। আজকাল অনেক নারী পুরুষের সাথে পাল্লা দিয়ে অর্থ উপর্জন করে সংসারের আর্থিক প্রয়োজন মেটাচ্ছে। তারপরও আমাদের সমাজে পরিবারের প্রধান ব্যক্তি কিন্তু পুরুষ।

বাবারা তাদের জীবনের শেষ শক্তিবিন্দু দিয়ে সংসার, সন্তান, পরিবার, পরিস্থিতির সাথে লড়ে যান। এটাই তাদের যোগ্যতার মাহাত্ম। আগলে রাখেন তার চারপাশকে। অভাব অনটন, বিপদ আপদ, অশুভ অকল্যাণ, সামাজিক ভ্রুকুটি, সকল ঝড় ঝঞ্ঝাকে প্রতিহত করেন আপন দায়িত্বে, পিতৃত্বের দায়বদ্ধতায়। এসবই প্রকৃত অর্থে বাবা হয়ে ওঠার গুণাবলী। বাবা মানেই সন্তানের ভরসার স্থল, প্রত্যাশার বাতায়ন, স্বপ্নপূরণের মহাসড়ক। এইস্বপ্ন কীভাবে পূরণ হবে, কবে কখন কতদিনে হবে, সেসবের উত্তর যেনো কেবল সন্তানদের বাবার কাছেই জমা থাকে। স্কুল থেকে খেলার মাঠ, জীবনের সহজ পাঠ, আপন পায়ে যোগ্যতায় দাঁড়ানোর কলা কৌশল রপ্ত করার সকল সুযোগ সুবিধা তো বাবারাই সন্তানদের জন্য গড়ে দেন। এই গড়ায় তারা বিন্দুমাত্র ত্রুটি রাখতে চান না। নিজের ব্যাংক বীমার সঞ্চয়, পৈত্রিক সম্পত্তির অংশ ( সকলের জন্য প্রযোজ্য নয় ), নিজেদের পেনশনের পুরো অর্থই সন্তানদের জন্য ব্যায় করতে কুণ্ঠা বোধ করেন না। সন্তান যে তারই প্রতিচ্ছায়া, বংশের প্রদীপ। সন্তানদের সুখ শান্তিতেই বাবাদের স্বস্তি। সন্তানরা নিজ নিজ পায়ে, আপন সংসারে স্থিতু হওয়ার সন্ধিক্ষণে এই সব বাবারা নিঃস্ব হয়ে যান শারিরীক শক্তিতে, অদম্য মনবলে, আর্থিক উপার্জনে। এরই মধ্যে সন্তানদের সাথে দূরত্ব সৃষ্টির জটিলতায় মানসিক চাপে বোধ বুদ্ধি হারা হয়ে পড়েন। মুখফুটে বলতে পারেন না নিজের ক্ষয়ে যাওয়ার কথা, স্বপ্ন হারানোর ব্যথা, সমাজ সংসারের কাছে হেরে যাওয়ার পরাজয়! বাবারা সন্তানদের উপেক্ষা, অনাদর, অবহেলা সহ্য করে নিজের লাগামহারা সংসারে টিকে থাকতে পারেন না। তারা আরো অধিক অসহায় ও বিদিশা হয়ে পড়েন তখন যখন তার শেষ আশ্রয়স্থল জীবন সঙ্গীর জীবনাবসান ঘটে। তখনই শুরু হয় তার জীবনে অনাকাঙ্খিত যুদ্ধ। একাকীত্বের লড়ায়ে তিনি হেরে গিয়ে আশ্রয় নেন কোন এক প্রবীণ নিবাসে। জীবনভর যিনি যুদ্ধের অগ্রসেনা ছিলেন তারই আশ্রয় হয় আবর্জনার ভাগাড়ে ( সকলে নয় )। সম্বল হারা এইসব বাবারা লাঞ্ছনা, গঞ্জনা, উপেক্ষার লজ্জা এবং কষ্ট সইতে পারেন না মা য়েদের মতো।

মা, আম্মারা সর্বংসহা ধরিত্রীর মতো। তারা নদীর জলের মতো। ধৈর্যে তারা অটল অবিচল পাহাড়ের মতো স্থির থাকেন ভবিতব্যের অগাধ বিশ্বাসে। তাই হার না মানা হারই তার একমাত্র সম্বল হয়ে ওঠে। তার চোখের অশ্রু ধুয়ে যায় অজুর জলে, তিনি সকল দুঃখ, বঞ্চনা, গঞ্জনার দীর্ঘশ্বাস সেজদায়, প্রার্থনায় লুকান। হেলা অবহেলায় যে কোনও ঘরের কোনা কাঞ্চিতে পড়ে থাকেন ভবিতব্যকে মেনে নিয়ে। নাতী নাতনীদের হাসি খুশি মুখের পবিত্রতায় সুখি হবার চেষ্টা করেন। আজকের এই আধুনিক সন্তানদের চাকচিক্যময় সংসারে কত মা যে এই ভাবে নিজেকে গুটিয়ে রেখেছেন শুধুমাত্র শেষ নিঃশ্বাসের অপেক্ষায় তার পরিসংখ্যান আমাদের অজানা।

জীবন যাত্রার মাঝ পথে বাবা কিম্বা মায়ের অভাবে সংসারের হালে অনিবার্যভাবে ফাটল ধরে। এই ফাটলের ভয়াবহতাকে সামাল দিতে বাবা কিম্বা মা কেই অগ্রণী ভূমিকা পালনে ঝাঁপিয়ে পড়তে হয়। এমন ক্ষেত্রে বাবাদের অথবা মাদের যোগ্যতার পরীক্ষা দিতে হয়। এমন পরীক্ষায় প্রায়শই দেখা যায় বাবারা মা হারা সংসারে মায়ের দায়িত্ব পালনে জয়ী হতে পারেন না। সংসার নামক রণক্ষেত্র এবং বর্হিজগত সংসার ( কর্মক্ষম, সামাজিকতা ) এক দুরূহতম কার্মযজ্ঞ। এখানেই বাবাদের ব্যর্থতা প্রকটভাবে প্রতিভাত হয়। অথচ মায়েরা অধিকাংশ ক্ষেত্রে একাধারে মা এবং বাবার কার্যাদি সুচারুরূপে পালন করতে সক্ষম হন।

বাবাকে নিয়ে লিখতে গিয়ে আজ আমি সুদীর্ঘ পথ পেরিয়ে অজান্তে সেই পাঁচ ছয় বছরের শিশু হয়ে উঠলাম! ঐ বয়সটুকুতে আমার বাবার সান্নিধ্যের সুস্পষ্ট স্মৃতি কিম্বা তাকে বুঝে উঠার কোন অভিজ্ঞতার কথা মনে নেই। বুকের মাঝে বাবাকে নিয়ে আমার যে তৃষ্ণা সেটা আজো জ্বালাময়। তার অভাবটা বয়স বাড়ার সাথে সাথে তীব্রতর হয়েছে, অন্যদের বাবা থাকায় নিজেকে হতভাগ্য মনে হয়েছে। সেটা আরো প্রকোট হতো আমার মা এর অপরিসীম পরিশ্রম ও বঞ্চনার সাথে যুদ্ধ করতে এবং সমাজ সংসারের প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে উঠার সহনশীলতা দেখে । বাবাকে নিয়ে আমার যা কিছু স্মৃতির মনিহার সেটা কেবলমাত্র শুনে শুনে।

সাধারণ পরিবেশ থেকে উঠে আসা একজন যুবক তার সাহস, অধ্যবসায় এবং বিশ্বস্ততায় কতটা উচ্চতায় পৌঁছুতে পারে সেই গল্পে আমি আজো আবিষ্ট। আমার বাবা একজন স্বনামধন্য সফল রেলওয়ের কর্মকর্তা টি তালুকদার ( তাছিরউদ্দিন তালুকদার ) তৎকালীন ব্রিটিশ শাসিত ভারতের পশ্চিমবঙ্গের সীমানা পেরিয়ে আজকের স্বাধীন বাংলাদেশের টেকনাফ থেকে তেতুলিয়ার রেলওয়ে কর্মকর্তা কর্মচারীদের কাছে তিনি যেমন ছিলেন সম্মানীয় তেমনি ছিলেন দোর্দণ্ডপ্রতাপশালী। তাকে নিয়ে দেশগ্রামের মানুষদের গর্বের অন্ত ছিলোনা, আস্থা ছিলো আকাশসমান। বৃটিশদের সাথে পাল্লা দিয়ে রেলওয়ে কর্মকর্তার পদে টিকে থাকার মূলে ছিলো তার অসাধারণ পাণ্ডিত্য এবং ইংরেজি সাহিত্যের প্রতি গভীর অনুরাগ। রাজনীতি, সামাজিক কর্মকান্ডের পুরোভাগে টি তালুকদার ছিলেন সদা সক্রিয়। গ্রামের হতদরিদ্র মানুষের কাছে টি তালুকদার ছিলেন ত্রানকর্তা, দাতা হাতেমতায়। আমাদের রেলওয়ের কোয়ার্টার ছিলো আত্মীয় এবং অনাত্মীয়দের অবাধ যাতায়াতের সরাইখানা। তার সমসাময়িক প্রজন্ম আজ আর নেই বললেই চলে। মাত্র চুয়াল্লি বছর বয়সে অকস্মাৎ মৃত্যুতে থেমে গিয়েছিলো তার পিতৃত্বের চাকা। থেমে গিয়েছিলো আমাদের নিশ্চিত যাপনের অষ্টাপ্রহর।

আমি আমার বাবা সপ্তম সন্তান! ঘুরে ফিরে বাবাকে নিয়ে অস্পষ্ট স্মৃতিতে শুধু খুঁজে পাই তার অন্তিম যাত্রার বাহন খাটিয়ায় জ্বলজ্বলে ধূপকাঠির উড়ন্ত ধোঁয়ায়, দাদার কান্নার উচ্চশব্দে, রেললাইনের দুই পাশে মানুষের ছোটাছুটি আর আমার হাতে পায়ে কাদার মাখামাখির স্মৃতিতে।

প্রার্থনা করি পৃথিবীর সকল বাবা সুখি হোন, নির্ভয় স্বস্তিতে ভরে থাক তাদের জীবন যাপন।

সুলতানা রিজিয়া: কবি, লেখক, প্রাবন্ধিক, সংগঠক ও প্রকাশক। তিনি দীর্ঘদিন ধরে নন্দিনী নামক একটি সাহিত্য পত্রিকা বের করছেন। এছাড়া তার রয়েছে প্রকাশনা হাউস সম্রাজ্ঞী। তার প্রকাশিত একক গ্রন্থের সংখ্যা ২৩ টি। সাহিত্য ও সাংগঠনিক অবদানের জন্য পেয়েছেন ত্রিশটির বেশি সম্মাননা ও পদক।

ওমেন্স নিউজ ডেস্ক/