আবু সাইদ কামালের গল্প ‘মধুর যন্ত্রণা’

Abu shayed Kamal

মধুর যন্ত্রণা

ব্রহ্মপুত্রের সম্মোহিত তীরে যে মনোমুগ্ধকর পার্কটি আছে, ওখানেই এখন আড্ডা দিই। কখনো জয়নুল আবেদিন সংগ্রহশালার পাশে, কখনো বৈশাখী মঞ্চের সাথে নিচ্ছিদ্র ছায়া-শীতল গাছের নিচে, কখনো বা নতুন সংযোজিত পার্কের যে অংশের চারাগাছগুলো উঠতি বয়েসি তরুণের মতো বিপুল উচ্ছ্বাসে বেড়ে উঠছে- সেখানেও বসি। কিংবা কখনো বা সবুজ দূর্বাঘাসের নরম কার্পেটে মোড়ানো মনোহর স্থানে আড্ডা দেই। ছাত্রজীবন থেকে যে আড্ডা দিতে শুরু করেছি, এখনো তার যানিকা টানতে পারিনি। এর মধ্যে সময়ের আবর্তনে কত পরিবর্তন হয়েছে! কবেই তো ছাত্রজীবনের পাঠ চুকিয়েছি। এখানেÑএই ব্রহ্মপুত্রের তীরে যাদের নিয়ে বাল্যকাল থেকে আড্ডা দিয়েছি, তাদের প্রায় সবাই চলে গেছে। কেবল আছি আমি আব্দুল আলী আর আমার ঘনিষ্ঠবন্ধু ছব্দর আলী। ছব্দর আলী অবশ্য মাস্টার্স পাশ করে অনেক চেষ্টা তদবির করেছে। কিন্তু বেকারত্বে অবসান ঘটাতে পারেনি। আমার প্রতি ও বাবা-মা’র স্বপ্নের অন্ত ছিল না। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রী নেওয়ার পর থেকে আমিও কর্মজীবনে ঢোকার যে চেষ্টা করিনি এমন নয়। একাডেমিক ক্যারিয়ারের সাথে সঙ্গতি রেখে প্রথম শ্রেণীর একটি সরকারি চাকুরির জন্য কি কম চেষ্টা করেছি? কিন্তু জুটাতে পারিনি। ইতোমধ্যে মেঘে মেঘে বেলা গড়িয়েছে অনেক। বেকার জীবনের অভিজ্ঞতার থলে এতটাই পূর্ণ করেছি, ভরতে তেমন বাকি নেই।

অঢেল সময় হাতে। বিশৃঙ্খল জীবন। সারাদিন আড্ডায় কাটাই। অধিক রাতে বাড়ি ফিরি। যখন ঘুমুতে যাই তখন রাতের শেষ প্রহর উপস্থিত হয়। সেদিন সকালে যখন বিভোর ঘুমে মধুর স্বপ্নে আচ্ছন্ন, তখনি ছন্দোপতন। বাবার নির্মম গালাগালির এতটাই ঝাঁঝ ছড়িয়েছে যে তাতে শ্বাসরুদ্ধ হবার উপক্রম। ঘুম ভেঙে যায় বকাবকির অর্থহীন আস্ফালনে। কিন্তু আমি বরাবরই নিরুত্তর। ঘাপটি মেরে ঘুমের ভান করে পড়ে থাকি। গালাগাল করে ক্ষোভ আর উত্তেজনায় একাকার হয়ে তিনি ক্লান্ত হন। প্রতিপক্ষ হিসাবে কোনো সাড়া দিই না। সকালের নাস্তা শেষে যখন তিনি কর্মস্থলে যান, তখন আড়মোড়া ভেঙে শয্যা ছেড়ে উঠি। ভাগ্যিস মা আমার প্রতি এখনো সদয়। তাই এখনো সযতেœ খাবারটুকু পরিবেশন করেন। সকালের নাস্তা করে সেই যে বের হই, দুপুর গড়িয়ে বিকেলের আঙিনায় ঢলে পড়ে সূর্য। তখনও আড্ডাতেই থাকি। পেটে যখন ক্ষুধার চোটে চুঁচুঁ শুরু হয়, তখন আড্ডার ইতি টেনে বাড়ি ফিরি। বিলম্বে খাবার খেতে গিয়ে মায়ের মিষ্টি বকুনি শুনি। তা অবশ্য আমার গায়ে লাগে না। বাবাই যেখানে আঁতে ঘা লাগার মতো গালাগাল দিয়ে বিফল হয়েছেন, কোনো দিন আমাকে চটাতে পারেননি। যেদিন আমাকে মাত্রাতিরিক্ত গালাগাল করেন, সেদিন আমি সবিনয়ে তাঁর কাছে যাই। বলি, বাবা ! এই মানে -ক’টা টাকা হবে?
এমন বিনয় দেখিয়ে হাসিমুখে টাকাটা চাই, তাতে তার রাগের আগুনে পানির স্রোত বয়ে যায়। বাধ্য হয়ে গালাগালের রেশ টেনেই টাকা বের করে দেন। কিন্তু বিদ্রুপের স্বরে বলেন, বাপের ঘাড়ে চেপে আছো, আবার শুনি কবিতা লিখো। আরে এভাবে বাপের ঘাড়ে বসে এমন কবিতা সবাই লিখতে পারে। আগে যাও-আমার মত কামাই-রোজগার করো, দেখবে তখন তোমার ঘাড়ে চেপে আমিও লিখতে পারব, হ্যাঁ… !

আহা ! কত নির্মম আচরণ বাবার। পাশের বাড়ির একটি মেয়ে আমাকে খুব পছন্দ করতো। আমিও করতাম। কিন্তু বাবার নিয়মিত গালাগালে যে ঐ প্রেমিকার কাছে আমার প্রেস্টিজ পাংচার হচ্ছে,তা কি তিনি বুঝতেন? অথচ পাশের বাড়ির মেয়ে তিথি আমার প্রণয়ে অন্ধ। বেকার ছেলেদের সাথে বুঝি প্রেম খুব পছন্দ মেয়েদের! হয়ত তাই। নতুবা তিথি সব জেনেশুনে আমাকে পছন্দ করবে কেনো? অবশ্য বেকার হিসেবে তো অঢেল সময় ছিল আমার হাতে। তাই তিথিকে তার চাহিদামত সময় দিতে পারছি। যেনো আমি ছাড়া সে জীবনে অন্য কাউকে মেনেই নিতে পারবে না। মাঝে মধ্যে আমি তাদের বাসায়ও যেতাম। তিথি শখ করে একটি খাসি লালন-পালন করতো। খুব আদর করতো খাসিটাকে। মুড়ি-চিড়া-ভাত-কলার ছোলা খেতে দিত নিজের হাতে। এজন্য খাসিটাও তার খুব ভক্ত ছিল। আমার সামনেই খাসিটা লাফিয়ে তিথির কোলে উঠতো। খাসিটাও তার সোহাগ বুঝতো।  নিরিবিলি দুপুরে নদীর পাড়ের পার্কটিতে শুধু যুগল প্রেমিক-প্রেমিকাদের চারণভূমি হয়ে ওঠে। এ সময়ে তিথিও চলে আসে। দু’জনে মিলে নদীর ঢালুতে কিংবা গাছের ঝোপের আড়ালে কত সোনালি মুহূর্ত স্মৃতিময় করে সঞ্চয়ে রেখেছি। প্রাণোচ্ছল ডেটিং-এর সময়ে তিথি তার প্রিয় খাসিটির গল্প করতো। উপযুক্ত আড়াল পেলে প্রেমিক প্রেমিকার মাঝে কত কিছুই তো ঘটে। সে সব যদি প্রণয়ের অংশ হয়, তাহলে তিথির সাথে আমারও ওসব হবে -এটাই স্বাভাবিক। আমি জানতাম, তিথিই হবে আমার জীবন চলার সাথী। এখন জীবনের সাথে কর্মসংস্থান নামের ইঞ্জিনটা লাগাতে পারলেই গতি পায়। কিন্তু বেরসিক বাবার অত্যাচার আমাকে সর্বশান্ত করে ছাড়লো। প্রায় প্রতিদিন সকালে যদি আমাকে নিয়ে হই-হুল্লোড় করে একেকটা দৃশ্যের অবতারণা করেন, সে সবের সংবাদ কি প্রতিবেশী পরিবারগুলোতে ছড়ায় না ! হয়ত বা এজন্যই তিথি আমার প্রতি পৃষ্ঠ প্রদর্শন করে এমন কাণ্ডটি ঘটাতে সম্মত হয়েছে। হঠাৎ একদিন শুনলাম, তিথির বিয়ে। সংবাদটা শুনে ভেঙে পড়ার জো হল আমার। ভাবলাম, তিথি এ বিয়েতে কোনো ভাবেই মত দিবে না। কিন্তু হায়! এমন ধারণা করাটাই ছিল আমার ভুল। তিথিই নদীর পাড়ে গোপনে আমার সাথে সাক্ষাৎ করলো। সাক্ষাতে বলল, কতদিন আর তোমার অপেক্ষায় থাকব। অভিভাবকরা তো আমার মনের  মানা মানবে না। বিদায় বেলায় বিয়ের একটা কার্ড আমার হাতে তুলে দিয়ে বলল, যদি বিয়েতে না যাও- তাহলে কিন্তু অঘটন ঘটাব।

প্রতিবেশিনী বলে কথা। তিথির পরিবারও জেনেশুনেই বিয়ের কাজে আমাকে জড়িয়েছে। কারণ, তিথির সাথে আমার সম্পর্কের বিষয়টি সে পরিবারের সদস্যরা জানতো। আমিও সামাজিক দায়িত্ববোধে আগাগোড়াই বিয়ের অনুষ্ঠানে ছিলাম। অনুষ্ঠানের দিন সকালবেলার ঘটনাটা আমাকে হতবাকই করেনি, ভাবিয়েও তুলল। দেখলাম, যে খাসিটা তিথির খুব প্রিয় ছিল। সে খাসিটার গলায় কী নির্মমভাবে ছুরি চালানো হলো। তিথির প্রিয় খাসির মাংসেই আপ্যায়িত হবে বিয়ে বাড়ির অতিথি। হৃদয় বিদারক ঘটনাটি দেখে আমার মনে হল, ঐ নির্মম ছুরিতো খাসির গলাতে নয়, যেনো ছুরিটি চালানো হয়েছে আমারই গলায়। আত্মোপলব্ধির এ পর্যায়ে কেমন যেন বিমূঢ় যন্ত্রণায় অন্যমনস্ক হই আমি। হৃদয়মথিত বেদনায় কাতর হয়ে যাই। তাই মাথা ধরার অজুহাতে অল্প সময়েও মধ্যেই বিয়েবাড়ি ত্যাগ করি।

ঐ ঘটনার পর সত্যি সত্যিই আমি ব্যর্থ প্রেমিকের মত অগোছালো দিন কাটাই কিছুদিন। নদীর পাড়ের আড্ডায় মন মরা হয়ে থাকি। আমার এ অবস্থা থেকে চাঙ্গা করার জন্য বন্ধুদের মধ্যে দু-একজন সরব হয়। শিহাব বলে, ওহে ব্যর্থ প্রেমিক! প্রেমটা তো শুধু এক তরফা হলে চলে না। দু’দিকেই তার দহন থাকা চাই। যার জন্য তুমি পুড়ে মরছো, সে তো দিব্যি আনন্দে আছে। হানিমুনে গেছে শ্রীমঙ্গল কিংবা সিলেটে। বন্ধুটির কথার সত্যতা পেলাম কদিনের মধ্যেই। তিথি তার সদ্য বিবাহিত স্বামীকে নিয়ে যখন নিজেদের বাড়ি এল, তখন নদীর এ সম্মোহিত কিনার দিয়ে হেঁটে হেঁটে বেড়াতে দেখলাম। আমার কাছে দিয়ে হাঁটে ওরা। অথচ তিথি আমাকে দেখেও না দেখার ভান করে! যেনো আমাকে চিনেই না। আত্মখেঁদে বা গভীর দুঃখবোধে তখন মনে মনে বলি, হায়রে প্রণয়, হায় নারী!

তিথি গেলো। বন্ধু-বান্ধবদের সবাই কি আমাকে ঘিরে এখানে আড্ডাতে আসে? না। যতদিন বেকার অবস্থায় থাকে ততদিন ওরা থাকে পাশে। তারপর একে একে অনেকেই মধুর যন্ত্রণা দিয়ে খসে পড়ে। মধুর যন্ত্রণা এজন্যই বলছি, বেকারত্ব ঘুচাতে পারলে চুপি চুপি সবাই চলে যায়। একটিবার কেউ বলেও যায় না যে, আমার চাকুরি হয়েছে, যোগদান করতে যাচ্ছি। যন্ত্রণাটা ওখানেই। এভাবেই তো আমি বেকারত্বের আদর্শ নিয়ে ক্রমেই বন্ধুহীন হয়ে পড়ছি। তবু নদীর পাড়ে যাই। হেমন্তে কখনো নদীর দিকে তাকাই। ওপাড়ের মাঠেও দৃষ্টি বুলাই। মাঠ ভরা সোনালি ফসল একদিন শূন্য হয়। হাহাকার বুকে নিয়ে তবু পড়ে থাকে পতিত মাঠ। নাড়াদের করুণ আর্তি আমাকেও বেদনার্ত করে। এভাবে যতই আমি সঙ্গহীন হতে থাকি, ততই শাণিত হয় আমার কবিতা, ছড়া, আমার শিল্প। আজও আমি নির্বিকার, বেকারত্বকে আজও আন্তরিক সঙ্গ দিয়ে যাচ্ছি, আর শিল্প সাধনায় ততটাই মগ্ন হচ্ছি। হৃদয় দিয়ে উপভোগ করছি আমার নিরন্তর বেকারত্বকে।

ওমেন্স নিউজ সাহিত্য/