বিস্ময়কর এক অনুপ্রেরণাদায়ী লেখকের নাম বেবি হালদার

বেবি হালদার

আহমেদ জহুর

‘পৃথিবী বদলাচ্ছে, মানসিকতারও পরিবর্তন হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে আমি নারীদের বলতে চাই-কারও উপর নির্ভরশীল হবেন না। নিজেকে বলুন- আমি গুরুত্বপূর্ণ এবং বেরিয়ে পড়ুন। আরও গুরুত্বপূর্ণ, কীভাবে পড়তে হয় তা শেখার উদ্যোগ নেয়া। পড়তে শিখুন এবং তারপর পড়তেই থাকুন।  কেননা পড়াটা খুব জরুরি। এটা আপনার মন খুলে দেয়।’

ওপরের অসাধারণ বাক্যটি যার লেখা, তিনি আর কেউ নন-বেবি হালদার। একজন অসাধারণ সংগ্রামী, পরিশ্রমী, আত্মপ্রত্যয়ী ও বিস্ময়কর এক লেখকের নাম বেবি হালদার। ষষ্ঠ শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করেছেন তিনি। অথচ তার লেখা পড়লে তা বোঝবার জো নেই। তার আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ 'আলো আঁধারি' ইতিমধ্যে ১৩টি আন্তর্জাতিক ভাষাসহ মোট ২১টি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। তিনি স্থান পেয়েছেন বিশ্ব সাহিত্য সভায়।

বেবি হালদারের জন্ম ভারত অধিকৃত কাশ্মীরে, ১৯৭৩ সালে। চার বছর বয়সে মুর্শিদাবাদ-এ থাকাকালীন তার বাবার মদ্যপান স্বভাবের জন্য মা তাদের ছেড়ে যান। অত্যাচারী বাবা ও সৎ মায়ের কাছে তিনি বেড়ে ওঠেন এই লেখক। কাশ্মীর থেকে মুর্শিদাবাদ হয়ে শেষ পর্যন্ত তারা পশ্চিমবঙ্গের দুর্গাপুরে থাকতে শুরু করেন। এখানেই বেবির বড় হয়ে ওঠা। ষষ্ঠ শ্রেণীতে পড়াকালে মাত্র ১২ বছর বয়সে জোরপূর্বক বিয়ে দেওয়া হয় তাকে। স্বামী তার থেকে ১৪ বছরের বড়, গৃহসজ্জার কাজ করতেন। বিয়ের মাত্র এক বছর পর অর্থাৎ মাত্র ১৩ বছর বয়সে প্রথম সন্তানের জন্ম দেন বেবি এবং এর পরপরই আরো দুটি সন্তানের মা হন তিনি। কিন্তু গরীবের মেয়ে হওয়ায় সংসার জীবনে তাকে অকথ্য নির্যাতনের শিকার হতে হয়। সময় যতই গড়াতে থাকে নির্যাতনের মাত্রা এবং নৃশংসতা ততই বাড়তে থাকে। এক পর্যায়ে আত্মহত্যা করারও চিন্তা করেন দিশাহারা বেবি। কিন্তু তিনটি অবোধ সন্তানের কথা ভেবে আত্মহত্যা নয়, সংগ্রামের পথ বেছে নেন। শেষমেশ ১৯৯৯ সালে ২৫ বছর বয়সে ছেলে সুবোধ ও তাপস এবং মেয়ে পিয়াকে নিয়ে স্বামীর বাড়ি ছেড়ে নয়া দিল্লীতে পালিয়ে যান এই নারী।

নিজের লেখা ‘আলো আঁধারি’ গ্রন্থ হাতে লেখক বেবি হালদার

দিল্লিতে বাড়িতে বাড়িতে ঠিকা ঝিয়ের কাজ করে অতীব কষ্টে চলছিলো তার দিনমান। কাজ করতে গিয়েও বিভিন্ন গৃহস্থ বাড়িতে মালিক ও মালিকানদের নানা শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতনের শিকার হন বেবি হালদার। তাতেও তিনি দমে যাননি, থেমে যাননি। এভাবেই কষ্টের সাগরে হাবুডুবু খেতে খেতে একদিন তার সাথে পরিচয় হয় বিখ্যাত হিন্দী সাহিত্যিক মুন্সি প্রেমচাঁদের নাতি নৃবিজ্ঞানের অধ্যাপক প্রবোধ কুমারের সঙ্গে। শেষমেশ ওই অধ্যাপকের বাড়িই হয়ে ওঠে বেবির নিরাপদ আশ্রয়স্থল। বেবি ও তার তিন সন্তানের থাকার জন্য অধ্যাপক সাহেব বাড়ির ছাদে একটি টিনের ঘর বানিয়ে দেন। বেবি হালদারের সন্তানদের পড়াশোনার দায়িত্বও স্বেচ্ছায় নিজের কাঁধে তুলে নেন ওই মহান মানুষটি। বেবিও তাকে নিজের বাবার মতোই যত্নআত্তি করেন।

অধ্যাপক প্রবোধ কুমারের সঙ্গে বেবি হালদার

একদিন অধ্যাপক সাহেব লক্ষ্য করলেন, বইয়ের তাক মুছতে মুছতে একটি বই উল্টে পাল্টে দেখছেন তার গৃহকর্মী বেবি। বইয়ের নাম 'আমার মেয়েবেলা'। তিনি বেবিকে বললেন, 'বইটি ভালো লাগলে অবসরে মন দিয়ে পড়ো এবং পড়া শেষ হলে আমাকে জানিও।' কয়েকদিন রাত জেগে বইটি পড়ে শেষ করলেন বেবি হালদার এবং তারপর কাচুমাচু হয়ে অধ্যাপক সাহেবের সামনে গেলে তিনি তার গৃহকর্মীর হাতে একটি বড় খাতা ও কলম দিয়ে বললেন, 'মন চাইলে তুমিও এমন বই লিখতে পারো।… তোমার জীবনে যত যা-ই ঘটেছে, নির্দ্বিধায় লিখে ফেলো। আমি পরে দেখবো।' সারাদিন কাজ আর কাজ। পুরো বাড়ি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা, সবার জন্য রান্নাবান্না করা, সবাইকে খাওয়ানো, সন্তানদের লেখাপড়া করানো এবং অধ্যাপক সাহেবের যত্নআত্তির পর রাতের নির্জনতায় বেবি লিখতে থাকলেন।

কিছুদিন পর অধ্যাপক প্রবোধ কুমার জানতে পারলেন বেবি লিখতে লিখতে খাতা শেষ করে ফেলেছেন। লেখাটা পড়ে তিনি হতবাক হলেন। একজন নবীন লেখক, যিনি মাত্র ষষ্ঠ শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করেছেন, তিনি এত সাবলীল ভাষায় লিখতে পারেন, তা ভাবাই যায় না। এরপর তিনি বেবি হালদারের বাংলায় লেখা আত্মজীবনী নিজেই হিন্দীতে অনুবাদ করলেন এবং বইটি প্রকাশ করার জন্য বিভিন্ন প্রকাশকের সাথে কথা বললেন। অবশেষে ২০০২ সালে প্রকাশিত হলো বেবির প্রথম বই 'আলো আঁধারি'।  প্রথম বই দিয়েই বাজিমাত করলেন লেখক বেবি। বেস্ট সেলারের মর্যাদা পেলো তার 'আলো আঁধারি'। কেবল ভারতে নয়, বিশ্বের অন্যান্য দেশের সাহিত্যমোদিরাও বেবি সম্পর্কে আগ্রহী হয়ে উঠলেন। একসময়ের গৃহকর্মী বেবি হালদার এখন লেখক হিসাবে বিভিন্ন সাহিত্য সভার শোভা বাড়াতে লাগলেন।  কলকাতা, নয়াদিল্লি, হংকং, ফ্রাঙ্কফুর্ট, প্যারিস-সহ বিভিন্ন শহরের সাহিত্য অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসাবে যোগ দিতে লাগলেন লেখক। কেবল নিজের আত্মজীবনী লিখেই থেমে রইলেন না বেবি। ইতিমধ্যে আস্ত একটি উপন্যাস লিখে ফেললেন, যার নাম 'ঈষৎ রূপান্তর'। বেস্ট সেলারের মর্যাদা পেলো তার এই বইটিও।   

লেখা প্রসঙ্গে বেবি হালদার বলেছেন, ‘কলমটা হাতে নিয়েই কাঁপতে শুরু করেছিলাম আমি। স্কুল ছাড়ার পর তো আর কিছু লিখিনি। কিন্তু লেখা শুরু করার পর যেন আপনা থেকেই সব হতে থাকলো। সত্যি বলতে কি, লেখাটাই যেন আমার ধ্যান, আমার আশ্রয় হয়ে দাঁড়াল।’

বেবী হালদার 'আলো আঁধারি'তে লিখেছেন, 'বেবি নিজের শৈশবকে চাটে, যেমন নবজাত বাছুরকে ওর মা চাটে।’ অথবা ‘বুকের হাড়গুলো কাঁপছে, শরীর তখন জল হয়ে গিয়েছে৷’ এমনই নি:সঙ্কোচ বেবির ভাষা। সহজ, সরল বাক্য গঠন পাঠককে বেশ আকৃষ্ট করে। 'আলো আঁধারি'র ভূমিকায় বাংলার অন্যতম কবি শঙ্খ ঘোষ লিখছেন, ‘তার লেখা কেন কারো ভালো লাগতে পারে, সেকথা বুঝবার ক্ষমতা তার না থাকাই সম্ভব, না থাকাই ভালো। কিন্তু তার স্বছ সহজ দৃষ্টি দিয়ে চারপাশের জীবনকে সে কত যে ভাল বুঝতে পারে, বিচার করতে পারে, আর সাহস নিয়ে তার মুখোমুখি দাঁড়াতে পারে, বিস্ময়কর এই বইটির পাতায় পাতায় তার চিহ্ন আছে ছড়ানো।’

লিখেই জীবনে সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য এনেছেন 'কাজের মেয়ে' বেবি হালদার। কলকাতাতে তিনি একটি বাড়ি কিনেছেন। তিন সন্তানকে লেখাপড়া শিখিয়ে মানুষ করেছেন। তিনি মনে করেন, 'লেখার কোন বয়স নেই, সময়-সীমা নেই। ভালো লেখা যেকোনও সময় শুরু করা যায়।' বেবি হালদারকে স্যালুট।

আহমেদ জহুর

আহমেদ জহুর: কবি, সাংবাদিক ও লেখক।

ওমেন্স নিউজ সাহিত্য/