আসুন আমরা দেশপ্রেমী হই

হোমায়রা খাতুন

হোমায়রা হুমা

মানুষই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সৃষ্টিধর প্রাণী। মানুষের ভূমিকা তার অবস্থানগত পরিস্থিতির দায় পালনের ওপর নির্ভর করে। একটি মানুষের নানাবিধ আচরণেই তার চরিত্রকে নির্দেশ করে। কে ভাল কে চোর, কে শিক্ষিত অশিক্ষিত, জ্ঞাণী, সুজন, দুর্জন, দুর্নীতিবাজ, খুনি, প্রেমিক, প্রতারক তার আচরণেই প্রকাশ হয়।

মা-বাবা,ভাই -বোন বৈচিত্র্য পরিচয়ের বৈচিত্ত্য মানুষ সম্পর্কের আভ্যন্তরে পরিবার, সমাজ রাষ্ট্রের ভিতরেবাহিরে, প্রকাশ্য অপ্রকাশ্য দায় লালন ও পালন করার মধ্য দিয়ে জীবন চলে কাংখিত লক্ষ্যের শেষ প্রান্তে। বয়ঃজোষ্ঠ্যরা জানেন কিভাবে দেশপ্রেম, আদর্শিক রীতি-নীতি, সংস্কৃতি, ন্যায়বিচার, দৃষ্টিভঙ্গি, মনোভাবের মধ্য দিয়ে জগতের সকল শ্রেণী, স্তর ধর্মবর্ণ, পেশার মানুষের মধ্যে এবং নতুন প্রজন্মের গভীরে সত্যবান স্বপ্ন বুনে দিতে হয়।

ধর্ম বা ধর্মহীনতা,নিরপেক্ষ বা পক্ষপাত দুষ্ট, কখনো ধর্মহীনতা–প্রত্যেকটিরই ভিন্ন ভিন্ন দর্শন, মতবাদ, একদর্শী স্বজনপ্রীতি মতামত রয়েছে। কে কি মানবে, কি মানবে না সেটা সেই মানবগোষ্ঠীর জানা অজানা বিশ্বাসের অন্তর্গত। তবে যে বিষয়টি অতীব গুরুত্বপূর্ণ সেটা হচ্ছে, আমি বা আপনি যে পথে চলতে চাই সে পথ  সম্বন্ধে অবশ্যই আমাদেরকে সম্পূর্নত জানতে হবে,আত্মস্থ করতে হবে, মনে প্রাণে জানতে, মানতে ও আদ্যপ্রান্ত বিশ্বাস করতে হবে। আপনি কি কেন কোথায়,কেমন অবস্থানে আছেন সে সম্পর্কেও নিজেকে সম্পূর্ন জ্ঞাত থাকতে হবে। বুঝতে হবে এই অবস্থানগত বিষয়ে নিজের ভূমিকা, দর্শন,  মতাবাদ, বিশ্বাসীদের পারষ্পরিক সম্পর্ককে মূল্যায়ণ করতে হবে এবং তা নিজের মধ্যে ধারণ লালন ও সেনুযায়ী পালনও করতে হবে। নইলে গুরুত্ববহ  সম্পর্কগুলো সামান্য ভুল বুঝাবুঝির ফলে ভেঙ্গে পড়বে। ভেসে যাবে। সমাজ পরিবারে ও রাষ্ট্রে সমস্যা সৃষ্টি করবে। এছাড়াও আমাদেরকে অবশ্যই পূর্ববর্তিতাদের নীতিআদর্শ ও পথ চলার ভূগোল ম্যাপ, ধারাপাত থেকে বিশ্ব অভিধানকে অন্তরে গেঁথে রাখতে হবে, নিতে হবে বৈকি।

কিছুদিন পূর্বে রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও বাংলাদেশ অধ্যায়ন বিভাগের ম্যাডাম যিনি ঐ বিভাগের চেয়ারম্যানও বটে। তার এক অমানবিক আচরণ দেশবাসী অবলোকন  করেছেন। তার আচরণে বিশ্ববিদ্যালয়ে অরাজকতা সৃষ্টি হয়েছে, হয়েছে তার বহিস্কারের দাবিতে আন্দোলন। অথচ সেদিনই তিনি সরাসরি টিভির টকশো-তে দিব্যি হেসে হেসে পুরো ঘটনাই অস্বীকার করেছেন। অথচ তদন্ত কমিটি ও ক্লাসের সিসি ক্যামেরায় সত্যতা প্রমাণ হয়েছে বটে। এবং অবিশ্বাস্য যে, চুল কাটার কাঁচিটি তার হাতেই ছিল। তবে সেদিন তিনি কেন গর্হিত ঘটনাটি অস্বীকার করলেন, বলেন তো, কেন?

ঠিক একই সময়ে একই আচরণ ঘটেছে গ্রামের তরুণ সাধারণ ও নিরিহ এক বাউল গায়কের সাথেও। গ্রামের মাতবর উদীয়মান এই কিশোর বাউলের চুল চেছে ফেলা হয়েছে, তার গানের উৎসাহকে রুদ্ধ করে দেয়ার জন্যে। মুন্সিগঞ্জে মাদ্রাসার এক শিক্ষক তার ছাত্রদের চুলও নিজ হাতে কেটে ফেলে দিয়েছেন। দেখুন, কি আশ্চর্য বিষয় গ্রামের এক মাদ্রাসা, গ্রাম্য মাতবর এবং সিলেটের শ্রেষ্ঠ সর্ব্বোচ্চ বিদ্যাপীঠের উচ্চশিক্ষিত চেয়ারম্যানের মন মানসিকতা,দৃষ্টিভঙ্গী, মতবাদের মধ্যে কোনো তফাৎ আছে কি? বেশ কিছুদিন পূর্বে একটি স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানিত উপাচার্য বলেছিলেন, আমাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের পদের চেয়ে ছাত্রলীগের সভাপতির পদ বেশি টানে।

এই সমাজে বাদশা আলমগীরের (সম্রাট শাহজাহানের পুত্র, যিনি আওরঙ্গজেব নামেও পরিচিত ছিলেন) নিজ সন্তানকে শিক্ষকের পা ধুয়ে দেয়ার আদেশের কথা আজো দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। কিন্তু আমরা আজ কেমন শিক্ষক দেখছি! আমি তাদের নিয়ে কথা বলছি যারা নৈতিকতা হারিয়েছেন। প্রধান শিক্ষক তার স্কুলের শিক্ষয়িত্রী, ছাত্রী, অভিভাবকদের প্রতি কেমন করে অনৈতিক লালসাপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গী মনে মনে লালন করেন। এরা কি করে এমন নোংরা অমানবিক আচরণ করতে পারেন?  একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে কি করে অসভ্যতাকে নিজের ভেতর পালন করেন? হউক স্কুল,কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের মত উচ্চবিদ্যাপিঠেও এমন আচরণকে চর্চায় আনছেন কি করে শিক্ষকরা? কি করে সম্ভব? তারা কি শিক্ষকের মর্যাদা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল নন? সকল শ্রেণীর প্রশাসনিক পদমর্যাদার ব্যাক্তিরাও কম যান না।

শুনেছি, স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে নাকি তরুণরা হিপ্পি চুল রাখতেন। বেলবটম প্যান্ট পড়তেন-ফ্যাশানিষ্ট হয়ে। আমরা সেসময়ের ব্যান্ড শিল্পী, নায়ক ও গায়ক, পারিবারিক ছবিতে তরুণদের এমন দেখেছি। তবে চুলের প্রতি মুরুব্বীদের বা প্রশাসনের কোনো চাপ বা নির্দেশপত্র অথবা প্রকাশ্যে চুল কেটে দেয়ার জন্য কাঁচি নিয়ে ঘুরছেন এমন কোনো শিক্ষকদের ছবি দেখিনি,স্মৃতিচারণও শুনিনি।

এ কেমন পরিবেশে আমরা বিচরণ করছি? কে কাকে শাসন করবে, শিক্ষা দিবে এবং বিশ্বকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে? ভীষণ লজ্জাজনক এই যে, স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে উত্ত্যক্তকরণ ও যৌন নির্যাতনরোধে অভিযোগ দেয়ার জন্য অভিযোগ বক্স স্থাপন হওয়ায় শিক্ষকদের নামেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। আর #মি-টু ক্যাম্পেইনে বড়সর পদধারী হোক পরিবার,সামাজিক, নাট্য পরিবার, সাহিত্যিক, কল্পনার বাহিরে অভিজাত আভিজাত্যের পোশাকিদের স্বরূপ উদঘাটন হয়েছে। এভাবেই মানুষের উন্নাসিক মানসিক উঠোনের কোণাচিপায় জমে থাকা কামুক রূপকে সামনে আনছে ভুক্তভোগী নারী ও কিশোরীরা।

এই যে বৈরী আচরণ ও ভূমিকা পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রকে কুলষিত করছে এজন্য দায়ী কে? এ বিষয়ে কখনো চিন্তা করার সুযোগ কি হয়েছে কারো? প্রকৃতপক্ষে আমরা শিক্ষিত হই, সার্টিফিকেটের মালা গাঁথি, কিন্তু আচরণের সাথে শিক্ষার এই মর্যাদাকে সেঁটে নিতে পারিনা। যে ম্যাডাম নোটিশ ছাড়াই ইংরেজি পিরিয়ডে কাঁচি নিয়ে ক্লাসে গেলেন তিনি তার মর্যাদাবান  বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম ও বিভাগের নামটিকেও নিজের মননে গ্রহণ ও লালন করতে পারেননি। পরিবারের সম্পর্ক ও নিজের পদমর্যাদাকে ধুলোয় মিশিয়ে গৃহকর্মীর দিকে নির্লজ্জভাবে নোংরা হাতটি দিয়ে বিষের ছোবল দিয়ে বসেন। যারা সমাজ বদলের অঙ্গীকার করেন এবং দেশ তাদের ওপর ভরসা করে,করতে চায়-কিন্তু তারা পূর্ণাঙ্গতায় নিজেকে প্রস্তুত করতে পারে না। কোনো আদর্শ সংস্কৃতি বিশ্বাসকে কি তারা ধারণ করেন, না আত্মমর্যাদার চেয়ে বেহায়াপনা বেশি শক্তিশালী?

'মানুষ ভজলে সোনার মানুষ পাবি'-না নিজেকে নিয়ে আমরা ভাবি না। ভালো আর মন্দের ত্যাগরূপ চর্চা নেই। কেবল পোশাক-আশাক, সেন্ট, টেডি শার্টপ্যান্ট, আর ওয়ালেট, মোবাইল, গাড়ি; আহ্ কি দুরস্ত অহংকার নিজেকে নিয়ে। দার্শনিক চিন্তাচেতনাপূর্ণ স্বচ্ছ চেতনার ভাবনাহীন দেহআত্মায় শুধু পোশাক পড়ে নিজেকে হামবড়া মনে করলেই প্রকৃত মানুষ হওয়ার যায় না। তাই মর্যাদানাশকারী কাজে জড়িয়ে যায় মানুষ সহজেই। আর অনিরাপদ হয়ে ওঠে জনপথ।

নিজেকে পূর্ণতায় পূর্ণ করি মর্যাদাবান জীবনের জন্য।যে যে পেশায় জীবন নির্বাহ করি কিনা, পূর্বেই কোথায় দাঁড়িয়ে আছি সেটাকে নিজের ভেতর আত্মস্থ করি। নইলে ভুলের মাশুল গুনতে হবে মানসম্মান বিসর্জন দিতে হবে নির্লজ্জের মত মাথা হেট করে।

মূলতঃ আমরা জীবনে যে সকল ভূমিকা পালন করি সবটুকু সম্পর্কে সচেতন থাকা জরুরী। হোক আপনি মানবাধিকার নেত্রী, সমাজপতি, সুশীল সমাজ নেতা, চেয়ারম্যা, ডাক্তার, ইন্জিনিয়ার, সমাজ বদলের দায় অবশ্যই আপনাকে ভূমিকাকে বিতর্কিত করা ঠিক নয়। যখনই আপনাকে উচ্চাসন দেয়া হয়,তার মানে এই নয় আপনি সকলকে হেয় অপমান নির্যাতনের লাইসেন্স পেয়ে গেছেন। আপনি অন্যায় অবিচার করে ভবিষ্যৎ অগ্রগামী প্রজন্মকে ভুল পথের অনুগামী করতে পারেন না। তাই দায় ও দায়িত্ব সম্পর্কে আজে নিজে সম্পূর্নভাবে জানুন বুঝুন আত্মস্হ হোন, ধারণ করুণ,পালনে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হোন। অযথা সমাজকে কুলষিত করবেন না। নিয়মনীতিকে আদর্শকে প্রশ্নবিদ্ধ করবেন না। আপনি আমি আগামী প্রজন্মকে সত্যের পথ ও মতে উদ্বুদ্ধ করার জন্যই পদ ও পদবীধারী হই, বীজ নষ্ট করার জন্য নয়। আসুন আমরা ক্ষমতা পেয়ে অহংকারী নয় দেশপ্রেমী হই।

হোমায়রা হুমা: হোমায়রা হুমা: কবি, লেখক ও মানবাধিকার কর্মী।

ওমেন্স নিউজ ডেস্ক/

লাইক, কমেন্টস, শেয়ার দিয়ে আমাদের সাথে থাকুন