নারীর হিস্যায় মুক্ত কথা

নূরুন্নাহার বেগম

নূরুন্নাহার বেগম

জাতীয় আয়ে নারীর হিস্যা বাড়াতে হবে শীর্ষক ২২ – ১১-২১ তারিখ " প্রথম আলো " সম্পাদকীয়তে বিষয়টি সুন্দরভাবে লিপিবদ্ধ হয়েছে ৷ পত্রিকায় প্রকাশিত – " শনিবার সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম) ও মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন আয়োজিত ওয়েবিনারে উপস্থাপিত মূল প্রবন্ধে নারীর অদৃশ্য বা মজুরিবিহীন কাজের যে চিত্র পাওয়া গেছে, তা হতাশাব্যঞ্জক। তথ্য-উপাত্তে উঠে এসেছে, পুরুষের চেয়ে নারীরা তিন গুণ মজুরিবিহীন কাজ করেন। ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী নারীরা যেখানে দৈনিক ৫ দশমিক ৯৩ ঘণ্টা মজুরিবিহীন গৃহস্থালির কাজ করেন, সেখানে পুরুষেরা করেন ১ দশমিক ৪৯ ঘণ্টা। অন্যদিকে ৩০ থেকে ৬০ বছর বয়সী নারীরা মজুরিবিহীন অদৃশ্য কাজ করেন গড়ে ৫ দশমিক ৮৭ ঘণ্টা আর পুরুষেরা করেন ১ দশমিক ৮৭ ঘণ্টা। প্রতি ঘণ্টায় মজুরিবিহীন কাজে সময় দেওয়ার কারণে শ্রমবাজারে নারীর অংশগ্রহণ ১ দশমিক ৮ শতাংশ কমে যায় বলে অর্থনীতিবিদেরা মনে করেন।

আলোচনায় প্রণোদনা, আর্থিকমূল্য, হিস্যা, নিরাপত্তা, মনস্তাত্তিক বাধা, দক্ষ জনশক্তি, কাজ ভাগ , শ্রম বাজার, বৈষম্য এই শব্দগুলি বিশেষ অর্থ বহন করেছে ৷ বহু বছর ধরে একটি কথা প্রচলিত , ‘নারী জনসংখ্যার অর্ধেক, কাজ করে তিন চতুর্থাংশ, আয়ের পায় ১০ ভাগের একভাগ, সম্পদের মালিক ১০০ ভাগের ১ ভাগ ৷’ তখনো যে অবস্থা ছিল আমরা এখনো বোধকরি সেখানেই দাঁড়িয়ে আছি ৷ নারী মনস্তাত্ত্বিকভাবে খুব একটা পরিবর্তিত অবস্থায় নেই ৷ পরিবর্তন হয়েছে নারী শিক্ষার ৷  নারী শিক্ষার হার বেড়েছে, পাশাপাশি নির্যাতনের হার বৃদ্ধি পেয়েছে , ধরন পাল্টিয়েছে , বিভৎস্যতা বেড়েছে , নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে নারী ৷ কোর্টে মামলা দায়েরের সংখ্যা বেড়েছে ৷ নারী বেশি আধুনিক হতে যেয়ে লজ্জাহীন হয়ে পড়েছে , অপরপক্ষ বলতে পুরুষপক্ষ বেশি মাত্রায় বেপরোয়া হয়ে উঠছে ৷ বাজার বলতে যেখানে পণ্য কেনাবেচা হয় , শ্রম বাজার সেই অর্থে শ্রম কেনাবেচার স্থান ৷ নারীকে মনে করা হয় যৌনদাসী , নারীর যৌনতা বাজারে কেনাবেচা , তার সাথে যথেচ্ছাচার ব্যবহার , যৌন অত্যাচার,এমনকি কুকুর বিড়ালের মত  মেরে ফেলতেও দ্বিধা করেনা পুরুষ শক্তিধর।

নানা কারণে প্রতিদিন চাষযোগ্য জমির পরিমান  কমছে ৷  জমির মূল্য দিনকে দিন উর্দ্ধগতি ৷ যে কোনো পরিবার জমি বিক্রয়ের ক্ষেত্রে নারীকে তার হিস্যা বা অংশ প্রদানের কথা না ভেবে বা যেনতেন ভাবে ভাগীদারের অংশ মিটিয়ে বিক্রয়ের মাধ্যমে পুরুষ জমির স্বত্ব হস্তান্তর করে ৷ নারী স্বামীর সম্পত্তিতে বা পিতার জীবদ্দশায় বা তার অবর্তমানে হিস্যা প্রাপ্যতার ক্ষেত্রে প্রায়সময়ই ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকে ৷ অর্থ বা সম্পদ প্রাপ্তিতে নারীকে নগন্য হিসাবেই ভাবা হয়ে থাকে ৷ নারী রক্ত বা আত্নীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখার কথা ভেবে তাদের বিরুদ্ধাচরণ সাধারণত করে না ৷ মনে কষ্ট নিয়ে দাবী পরিত্যাগ করে মাত্র ৷ চাকুরিজীবি নারীদের মাসিক বেতনটাও স্বামী নিজ হাতে নিয়ে নেয় বা সংসারে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয় যে নারীর রোজগারের টাকা না হলে কোনো কাজই সম্পূর্ণ হতে চায় না ৷

নারীর রোজগারের অর্থ , কায়িক পরিশ্রম , সন্তান সন্ততি প্রতিপালন করেও কখনো কখনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হয় ৷ পারিবারিক কাজের আর্থিকমূল্য দূরে থাক ভালো ব্যবহার অনেক সময় নারীর ভাগ্যে জোটে না ৷ স্বামীর পরকীয়া ঠেকাতে সব সুখ জলাঞ্জলি দিয়ে শেষে স্বামীর হাতেই জীবনপাত ৷ এগুলোই সমাজে বিরূপ প্রভাব ফেলে ৷ নারী রোজগেরে  হলেও বিপদ, না হলেও সমস্যা ৷ নিজের শ্রমলব্ধ শিক্ষা সব চুলোয় ঢালতে হয় ৷ নারীর কায়িক পরিশ্রমের অর্থমূল্যের চেয়ে তাকে যদি পরিবারের লোকজন মানসিক,কায়িক শ্রম ভাগাভাগি করে তাহলে সেটাই হয় সুখকর ৷ বাইরে নারীর কাজ করার বিষয়ে অনেক পরিবার থেকে বলা হয় নারী পুরুষ বসের অধীনে , ব্যাংকে, এনজিও তে মোটকথা কিছু নেতিবাচক বিধিনিষেধ আরোপ করা হয় ৷ এর বাইরে গেলেই বিপদ ৷ শিক্ষিত নারী এ বোর্ডার ক্রস করতে পারেনা ফলে ভাগ্য প্রসন্ন হয়না ৷ ' হাউস করলেই  হলদিয়া পাখি'  পাবার জন্য  নারীর কর্মস্থল, চলাচলের মাধ্যম নিরাপদ হওয়া চাই ৷ পরিবারের লোকজন যদি কোনো নেশায় পেয়ে বসে তাহলে তার কাছ থেকে নারী কোনো হিস্যাই আশা করতে পারে না ৷ মানবিকগুনাবলী শূন্য একজন অমানুষে রুপ নেয় সে তখন ৷

নারী হিস্যা পেলে আর্থিক নিরাপত্তা, সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি পায়  ৷ নারী অসুস্থতার জন্য ৫০% ভাগ দায়ী তার মানসিক অবস্থা ৷ পরিবার তথা  সমাজ  তাকে নানাভাবে হেনস্থা করে তাকে উপর্যুপরি মানসিক আঘাত করতে করতে দূর্বল করে ফেলে ৷ নারীর এ অবস্থার জন্য নারীও দায়ী সাথে বাতাস দেয় পরিমন্ডলের পুরুষ ৷ বিতর্ক করার জন্য করা নয় নারী অধ:স্তন অবস্থা, অসচেতনা এ পরিস্থিতির জন্য দায়ী ৷ ধর্মীয় বিধান, রাষ্ট্রীয় আইন সবই আছে তারপরেও নারী তার হিস্যা পায় না ৷ হিস্যা দিলেই যেন সম্পদ কমে যাবে এমন একটা পরিস্থিতি আমাদের সমাজে বিরাজমান ৷ এ অচলায়তন কবে স্বাভাবিক হবে জানিনা ৷ নারীর গতর যতভাবে খাটিয়ে নিয়ে ভালো থাকার ভাবনা আর কতকাল ? অনিরাপদের জন্য দায়ী একটা পক্ষ সেটা পুরুষপক্ষ। কিন্তু কেন ? নারী কি খাঁচায় আবদ্ধ করে রাখা জন্তু ? তার কর্মক্ষমতা, যোগ্যতা, দক্ষতা, বিচক্ষনতা ,মেধা সব আছে ৷ শুধু জুজুবুড়ির ভয়ে নারী পিছিয়ে থেকে কর্মহীন হয়ে পড়ছে ৷ আমরা এমন পরিস্থিতি তৈরি করি না কেন নারী দিনে কি রাতে নিজের মত করে কাজ করে নিরাপদে আপনজনদের কাছে ফিরবে ৷ নারী ভালো থাকলে সুবাতাস প্রবাহিত হবে ৷ নারীও ভাববে ভালো থাকার জন্য উচ্ছৃঙ্খলতা কখনো কাম্য নয় ৷ বিপথকে চিনতে ,জানতে হবে ৷ এ নিশ্চয়তাটুকু  সমাজের কাছে কি নারী পেতে পারে না? বরং নারী নিরাপদ থাকলে পরিবারের লাভ, সমাজের তথা রাষ্ট্রের লাভ ৷

 নূরুন্নাহার বেগম: গাইবান্ধা জেলাধীন সুন্দরগঞ্জ থানায় এই লেখকের জন্মস্থান ৷ বর্তমানে রংপুর শহরে বসবাস ৷ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯৭৪ –৮০ সাল পর্যন্ত প্রাণীবিদ্যা বিভাগে অধ্যয়ন করে বি,এস- সি( সম্মান ), এম,এস-সি ডিগ্রী অর্জন করেন। মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রনালয়ের অধীন জেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন। ছাত্রজীবন থেকেই লেখালেখি করেন ৷ অবসর জীবনে ছড়া,কবিতা, প্রবন্ধ ,ছোট গল্প লেখেন ৷ প্রকাশিত একক গ্রন্থ দুটি। তবে যৌথভাবে তেত্রিশটির বেশি কবিতার বই প্রকাশিত হয়েছে তার।

ওমেন্স নিউজ সাহিত্য/

লাইক, কমেন্টস, শেয়ার দিয়ে আমাদের সাথে থাকুন