মানবতা শুদ্ধতার প্রতীক

হোমায়রা খাতুন

হোমায়রা হুমা

মানব জাতিকে ঘিরেই এই মানবতা শব্দটির সৃষ্টি। সৃষ্টির শুরু থেকেই মানুষ মানবতার বলয়ে হাঁটছে চলছে ফিরছে। জন্মের সাথে সাথে সন্তানটি যখন মাতৃদুগ্ধের যে আস্বাদন লাভ থাকে, অমৃত এ একবিন্দু রস মানুষের অভ্যন্তরে মানবতার বীজ বোপন করে দেয়। মানবতার তৈলাক্ত এই উপাদান যার ক্রিয়া-প্রক্রিয়ায় মানুষ কখনো বিগলিত হয় কখনো রুক্ষ দৃষ্টিহীন নির্মম হয়ে ওঠে আবেগ প্রকাশ করে।

মানবতা একটি পজেটিভ শক্তিমান আবেগ। পৃথিবীর সকল প্রাণির প্রতি স্নেহপ্রীতি ভালবাসা, দূর্যোগে পরাস্ত, নিরিহ, দুখী, অন্ধ, দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে অভাবগ্রস্ত মানুষ, পশুপাখি, জীবজন্তু কীটপতঙ্গদের পাশে সাহসে বুক টান করে দাঁড়ানো, সুবিধাবঞ্চিতদের  সহায়তা-সাহায্য,দান-খয়রাত, নিজের প্রতিটি শারীরিক অঙ্গপ্রতঙ্গ ব্যবহার করে মানুষের জন্য মানুষ চেতনায় মানবতায় সমৃদ্ধতায় নিজ বিবেককে দৃশ্যমান করে ভূমিকা পালনের মধ্য দিয়ে পৃথিবীকে আমূল বদলে দেয়ার অসীম ক্ষমতা রাখে কেবল মানুষই।

প্রাকৃতিক ও মানবিক বিপর্যয়ের সময় বিবেকের সক্রিয় উপস্থতিতে মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে  মানবতাকে ক্ষতিগ্রস্থ হওয়া থেকে রক্ষা করতে পারে মানুষ, কেবলই মানুষ। মানবতাবোধ অন্য প্রাণীর মধ্যেও থাকে। নিজ নিজ পরিমণ্ডলে বিপদের সময় প্রাণির এ বোধশক্তি প্রকট আকারে দেখা যায়। নিজ নিজ প্রাণির প্রতি পারষ্পরিক ভালোবাসার অনুভবই মানবতাকে প্রভাবিত করে।

মানবতা কোনো ধর্মের সাথে সম্পর্কিত নয়। মানবতার ঐশ্বরিক ভাব পৃথিবীর মানচিত্র বদলে দিতে পারে। মানুষের ধর্মের পরিচয়ে নয়, মানবতার পরিচয়ই বড়। তবে প্রতিটি ধর্মে মানবতাকে ঊর্ধ্বে স্থান দিয়েছে। তবু ব্যক্তি মাত্রই যে সকল মানবতাবোধ সম্পন্ন হবে এমন নয়। নিষ্ঠুর মানুষের আচরণের বিরুদ্ধে মানুষের চিরদিনের বিদ্রোহ, মানবতাকে মহিমাণ্বিত করেছে যুগ যুগান্তরে। হ্যা, মানুষ যদি মানবতাকে নিজের অস্হিমজ্জা জ্ঞান গরিমা, স্বত্তায় জড়িয়ে নিতে পারে, ব্যক্তির অন্তরাত্মার গুণে পৃথিবীব্যাপী প্রাণি জগতের জীবনাচরণ আলোকিত হয়ে উঠতে পারে বৈকি।

মানবতা মানুষের বিবেকের সাথে স্পর্ষিত। বিবেক যার যত উন্নত মানবতার সাথে তার পরিচয়টি তেমনি মিষ্টিবোধক। আমরা জানি কি মানবতাকে পরিশালীত করে বিবেক নামক পরিচ্ছন্ন আয়না। মানবতা একটি শব্দ শুধু নয় বরং বিশ্বকে সঠিকপথে পরিচালিত করার একটি নির্ণয়কও বটে।

মানবতা একটি সূচক। তাই 'মানবতা' শীর্ষক দৃঢ় শব্দটির সাথে মানুষের বোধশক্তিকে সংযুক্ত করা না গেলে, মানবতা অভিধানের পাতায় শোভিত শব হয়ে রয়ে যাবে। মানবতাবোধ সম্পন্ন মানুষই কেবল পরিবার সমাজ ও রাষ্ট্রে শান্তি রক্ষায় উৎকৃষ্ট উপাদান ও উদাহরণ।

যুগে যুগে মানবতাবোধ সম্পন্ন মানুষ ইতিহাস সৃষ্টি করেছে মানুষের জন্য নিবেদিত জীবন উৎসর্গ  করে। মাদার তেরেসা, বৃটেনের রাজবধু, দাতা হাতেম তাই, হাজি মোহাম্মদ মোহসিন, বঙ্গবন্ধু, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, নেলসন মেন্ডেলা, মানুষের মুক্তির জন্য প্রাণ বিসর্জনীয় প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, মুক্তিযুদ্ধে ৩০লক্ষ প্রাণ ও ৩ লক্ষ বীরঙ্গনা। দেশের জন্য এমন আত্মদান মানবতারই কথা বলে। সমাজের কতশত দানবীরের মুক্তহস্তে বিলিয়ে দেয়া রাজত্বের ঐশ্বর্যের ছত্রছায়ায় সাধারন মানুষ অসাধারণ হয়ে উঠেছে, তার হিসাব নেই কোথাও। এমন মানবদরদী না হলে, কারো কাছ থেকে জোর করেও দানস্বত্ত নেয়া সম্ভব নয়।

মানবতা একটি বিরাট শুদ্ধতা বোধ। আল্লাহ সকলকে এই রহমত দান করেন না। আমরা পরিবারে ক'জন এই বোধকে লালন-পালন করতে পারি? যদি মানবতাকে পরিবারের এক কোণেও রেখে দিতে পারতাম তাহলে পরিবারের সদস্যদের অন্তরে বাহিরে অগণিত মহামানব জন্ম নিত নিশ্চয়ই। আমাদের সন্তানদেরকে সুশিক্ষা নেয়ার জন্য যেখানে পাঠাই, সে স্থান নিরঙ্কুশ হয় নয়। সেখানেও দুর্নীতি, লোভ লালসা, হিংস্রতা, হানাহানি, আত্মহংকারে মানুষ মানুষের মাংস খায়। এখন আর সর্পের দংশনে মানুষ মরে না, মরে মানুষের বিষাক্ত জিহ্বার কামড়ে।

মানবতার পোশাক এখন কেনাবেচা হয়। যার যত কালো টাকা তার চামড়ায় ততই তারকাখচিত মানবতার স্বীকৃতি ফলক। কি বলবেন, যে জাকাত দেয়া আল্লাহর হুকুম এবং জাকাত দেয়ার সুষ্ঠ প্রক্রিয়া বর্ণিত আছে কোরাণ শরিফে। অথচ মানুষকে 'শো-অফ' করার জন্য একটি শাড়ি বা লুঙ্গি দেয়া ও নেয়ার জন্য বাড়ির গেটে যে হাঙ্গামা তৈরি করি, সেটি কি মানবতার আস্ফালন নয়?

করোনা-১৯য়ে আমরা কি দেখেছি ? ২০২০ মার্চে মানবতার আলখেল্লার নিচে ভিক্ষার দেয়ার মনোবৃত্তিতে, এক হাজারটাকার নোট ভর্তি একটি গাড়ি থেকে টাকা মাটিতে ছিটিয়ে দেয়া হয়েছিল, ভিক্ষে দেয়ার মতো করে। এগুলো কি মানবতা? কালো টাকা সাদা করার জন্য এমন নির্লজ্জ প্রদর্শন করা হয়েছিল মানবতা নামের ঝকঝকে গাড়ি থেকে। আর বিদ্যাপিঠগুলোতে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, মসজিদ মাদ্রাসা, বাসা বাড়ি, রাস্তাঘাট, বিনোদনকেন্দ্র, ব্যক্তিগত জীবনযাপনে মানবতাবোধ ও দৃষ্টিভঙ্গী কোথায় লুকিয়ে থাকে? সকল সম্পর্কের  বেড়াজাল ভেঙ্গে মানবতার গলা টিপে মানুষ যে কোনো বয়েসের শিশু,কন্যা, বালক, নারীর সাথে কি করছে কি?  একটু অনুধাবন করুন তো!

মানবতা সকলের সমান অধিকার প্রাপ্তির মানদণ্ড। মানবতা অবশ্যই দ্রবণীয়ও বটে। যে কোনো সময় যে কারো জন্য মানবতা গলে গলে পড়তে পারে। এই মহানুভবতা ভালো, মন্দ, আবার নিরপেক্ষও হতে পারে। বন্ধ খোলা যে কোনো অবস্থাতেই মানবতা নামক তৈলকে ব্যবহার করে মানুষ তার স্বার্থসিদ্ধ করতে পিছপা হয় না।

এক সময় মানুষের সেবায় অনেক প্রতিষ্ঠান মানবতার নামে সেবায় নিয়োজিত ছিল। স্বার্থহীনভাবে তারা বিশ্বাসযোগ্যতার সাথে দিনরাত সমানে নিবেদিত ছিল। কিন্তু সেই সেবা প্রতিষ্ঠাগুলো আজ অনুদান লাভের মোহে রাজনৈতিক দলের মত বিভক্ত হয়ে গেছে। স্যারদের সেবায় আত্মহারা সেই সংগঠনগুলো জনগণকে সেবা দেয়ার মানসিকতাকে ডাষ্টবিনে ফেলে দিয়েছে। আমরা ভালোকে আলোতে আনতে চাই। মানবতাবোধ সকলের মধ্যে জাগরুখ হোক। কালোর গভীরে মানবতা বোধকে বেঁধে আবরার, তন্বী, তুষার, হেনা, সেতারা, গুলশান, থোকা থোকা নামগুলো হারিয়ে যাবে। ধর্ষণ, গণধর্ষণ,গণধোলাই, তালাক, হত্যা,গুমের গভীরে হারিয়ে যাওয়ার পথ খুঁজবে; তা আর হতে দেয়া যায় না।

নিজ বিবেককে জাগ্রত করুন। মানবতাকে মানুষের পবিত্র নিঃশ্বাসের সাথে জড়িয়ে নিয়ে পরিবারের ব্যক্তিদের জন্য ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। পরিবার থেকে মানবতার রুচিবোধক চেতনা সমাজ ও রাষ্ট্রে প্রবাহিত করতে হবে, নিশ্চয়ই। তবেই মানবতা ও মানবতাবোধ উভয়ই মানুষকে নিয়ে যাবে স্বর্গে অথবা নরকে। কবিতা ভাষায় বলতে হয়-
‘কোথায় স্বর্গ কোথায় নরক কে বলে তা বহুদূর?
মানুষেরি মাঝে স্বর্গ নরক, মানুষেতে সুরাসুর।’

প্রকৃতই মানবতা হচ্ছে বিবেকের শুদ্ধতার প্রতীক।

হোমায়রা হুমা: কবি, লেখক ও মানবাধিকার কর্মী।   

ওমেন্স নিউজ ডেস্ক/

লাইক, কমেন্টস, শেয়ার দিয়ে আমাদের সাথে থাকুন