চিতায় দেহের দাহ হয় সংগীতের নয়

লতা মঙ্গেশকর

তাহমিনা আক্তার

চিতায় শরীরকে পোড়ানো গেলেও সংগীতকে নয়। একজন কিংবদন্তী সুর সম্রাজ্ঞীর চলে যাওয়া মানে তার দেহখানার প্রস্থান হলো কিন্তু তার সুপ্রিয় সুর রয়ে যাবে পৃথিবী যতদিন থাকবে ততদিন। সংগীতের ঈশ্বর সবার মাঝে বাস করেনা। যার ভিতর করেন তিনি থাকেন উঁচু সীমানায়। গানের ঈশ্বর লতা মঙ্গেশকরের কণ্ঠে যেন ঈশ্বর নিজে গানের সুরধারা সাজিয়ে দিয়েছিলেন। লতা হয়ে উঠেছিলেন ভারতের সবচেয়ে সুরেলা কণ্ঠস্বর। সংগীতের সাম্পানে চড়ে সবাই ফিরতে পারেন না গানের ঈশ্বরের কাছে। লতাজি পেরেছেন। কারণ, স্বর্গ থেকে আসে গীত স্বর্গে যায় চলে।

আর এভাবেই কোটি কোটি ভক্তকে চোখের জলে ভাসিয়ে চলে গেলেন কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী লতা মঙ্গেশকর। পঞ্চাশের দশক থেকে একের পর এক হিট গানে মুগ্ধ করেন দর্শক-শ্রোতাদের। গেয়েছেন বাংলা গানও। লতার মতো গায়কি এই উপমহাদেশ আর পায়নি। স্বর্গীয় গলায় মোহিত করার ক্ষমতা ছিল তার। লতার মৃত্যু ভারতের সংগীত জগতে অপূরণীয় ক্ষতি।

ভারতের সাংস্কৃতিক জগতের উজ্জ্বল নক্ষত্র সুরসম্রাজ্ঞী লতা মঙ্গেশকর। দশকের পর দশক এই সংগীতশিল্পী শ্রোতাদের মন জুগিয়েছেন। তাদের হাসি-কান্নায়, দুঃখ-কষ্টে, প্রেম-ভালোবাসায়, আনন্দ-উল্লাসের মুহূর্তে লতার গান বাজবে না, তা হয় না। তার সুরেলা কণ্ঠ যুগ যুগ ধরে জাতি-ধর্ম-বর্ণ-শ্রেণি নির্বিশেষে মানুষের চোখ ভিজিয়েছে। অকৃতদার লতা সারা জীবন ঈশ্বরের পাশাপাশি সংগীতকে জীবনের একমাত্র আরাধ্য, উপাস্য বিষয় মেনেছেন। ১৯৫৫ সালের রোমান্টিক হিন্দি চলচ্চিত্র ‘শ্রী ৪২০’-এ মান্না দে ও লতা মঙ্গেশকরের কণ্ঠে রাজকাপুর ও নার্গিসের বৃষ্টিতে ভেজা কালজয়ী গান ‘পেয়ার হুয়া ইকরার হুয়া’ এখনো শ্রোতাদের উজ্জীবিত করে, উদ্বেলিত করে। এই সুরের দেবী গত রোববার (৬ ফেব্রুয়ারি) সকালে তার কোটি কোটি ভক্ত-শ্রোতাকে কাঁদিয়ে চলে গেছেন। এর আগের দিন শনিবার বিদ্যা ও সুরের দেবী সরস্বতীর পূজা ছিল। পরের দিন রবিবার দেবী বিসর্জনের দিন যেন সরস্বতী তার আশীর্বাদপুষ্ট প্রিয় শিষ্যা লতাকে ডেকে বলেন, ‘মর্ত্যলোকে সুরের সাধনা অনেক হয়েছে। এবার আমরা একসঙ্গে দেবলোকে সুরের সাধনা করি।’

শাস্ত্রীয় সংগীতের দীক্ষা নেওয়া লতার বলিউডে আসেন প্লেব্যাক সিঙ্গার হিসেবে। কয়েক দশক ধরে অনেক চলচ্চিত্রের গানে কণ্ঠ দেন তিনি। প্রায় অর্ধ শতাব্দী ধরে ৩৬টি ভাষায় ৩০ হাজারের মতো বিভিন্ন ঘরানার গান গেয়ে দর্শক-শ্রোতাদের মুগ্ধ করেন লতা। তার গানের হাজার হাজার রেকর্ড বাজারে বিক্রি হয়। ভারতের সংগীত জগতে অনবদ্য অবদান রাখায় এই শিল্পীকে ‘সুরের রানী’ ও ‘ভারতের নাইটিঙ্গেল’ হিসেবে বেশি ডাকা হয়।

হেমা থেকে লতা
১৯২৯ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর ভারতের মধ্যপ্রদেশ রাজ্যের ইন্দোর শহরে জন্ম হয় লতা মঙ্গেশকরের। বাবা পণ্ডিত দীননাথ মঙ্গেশকর ছিলেন শাস্ত্রীয় সংগীতশিল্পী ও মারাঠি মঞ্চনাটকের অভিনেতা ও প্রযোজক। মা শুধামতী ছিলেন গুজরাটি। জন্মের পর কিংবদন্তি এই সংগীতশিল্পীকে ‘হেমা’ নামে ডাকা হতো। পরে তার বাবার এক মঞ্চনাটকের চরিত্র লতিকা থেকে হেমার নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় লতা। পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে লতা ছিলেন সবার বড়। বোন মীনা খাদিকার, আশা ভোঁসলে, ঊষা মঙ্গেশকর ও ভাই হৃদয়নাথ মঙ্গেশকর সবাই আজ প্রতিষ্ঠিত সংগীতজ্ঞ। বাবা দীননাথ মঙ্গেশকরের কাছ থেকেই লতা সংগীতের তালিম নেন। পাঁচ বছর বয়সে বাবার মিউজিক্যাল মঞ্চনাটক ‘সংগীত নাটকে’ প্রথম অভিনয় করেন তিনি। ছোট বোন আশা ও লতা ছিলেন হরিহর আত্মা। স্কুলের প্রথম দিন লতার সঙ্গে আশাকে স্কুলে ঢুকতে না দেওয়ায় বেজার হন বড় বোন লতা। এ জন্য তিনি আর কখনো স্কুলেই যাননি। একবার এক সাক্ষাৎকারে লতা মঙ্গেশকর জানিয়েছিলেন, শাস্ত্রীয় সংগীতের প্রতি গভীর অনুরক্ত ছিল তার পরিবার। সিনেমার গান গাওয়ার চল বাড়িতে তেমন একটা ছিল না। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বলতে যা বোঝায়, সেটা লতা পাননি। এক গৃহপরিচারিকা তাকে মারাঠি ভাষা শেখাতেন। স্থানীয় এক পুরোহিত শেখান সংস্কৃত ভাষা। আর অন্যান্য বিষয় বাড়িতেই তাকে শেখান আত্মীয়-স্বজন ও গৃহশিক্ষকরা।        
দীননাথ মঙ্গেশকর একপর্যায়ে অর্থসংকটে পড়লে তিনি তার মঞ্চনাটকের স্কুল বন্ধ করে দিতে বাধ্য হন। বাড়ি নিলামে উঠলে লতার পুরো পরিবার ভারতের পশ্চিমাঞ্চলীয় মহারাষ্ট্র রাজ্যের পুনে শহরে চলে যান। ১৯৪২ সালে লতার ১৩ বছর বয়সে বাবা দীননাথ মঙ্গেশকর হৃদরোগে মারা যান। বাবার মৃত্যুর পর সংসারের দায়িত্ব বড় সন্তান লতার কাঁধে এসে পড়ে। এ সময়ে লতার পরিবারের সুহৃদ ও শুভাকাঙ্খী নবযুগ চিত্রপট মুভি কোম্পানির স্বত্বাধিকারী বিনায়ক দামোদর কর্নাটকি ওই পরিবারের দেখভালের দায়িত্ব নেন। সংগীত ও অভিনয়ের জগতে ক্যারিয়ার গড়তে লতাকে সহায়তা করেন বিনায়ক। চল্লিশের দশকের শুরুর দিকে ভারতীয় চলচ্চিত্রে গানের ব্যবহার তেমন হতো না। এ জন্য লতাকে অভিনয়ের দিকে ঝুঁকতে হয়। বাবার কয়েকটি মঞ্চনাটকে ছোটবেলায় অভিনয় করেছিলেন তিনি। সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে চলচ্চিত্রে অভিনয় করা শুরু করেন লতা। ১৯৪২ সালে মারাঠি ‘কিতি হাসালে’ চলচ্চিত্রে ‘নাচু ইয়ে গাড়ি’ গানটি গান লতা। তবে পোস্ট প্রডাকশনে সেই গানটি বাদ দিয়ে দেওয়া হয়। একই বছর নবযুগ চিত্রপট প্রযোজিত মারাঠি সিনেমা ‘পাহিলি মাঙ্গালা-গৌরে’ ছোট্ট একটি চরিত্রে লতাকে অভিনয়ের সুযোগ করে দেন বিনায়ক। অভিনয়ের পাশাপাশি সেই ছবিতে একটি গানও গান লতা। অভিনয় করতে করতে একপর্যায়ে ১৯৪৩ সালে মারাঠি সিনেমা ‘গাজাভাউ’য়ে প্রথম একটি গানে গলা দেন লতা। যদিও সেটি পূর্ণাঙ্গ কোনো গান ছিল না। কেবল কয়েকটি লাইন ও শব্দ ছিল তাতে।

মোট আটটি মারাঠি ও হিন্দি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন তিনি। ১৯৪৭ সালের দিকে অভিনয় করে প্রতি মাসে ২০০ রুপি কামাতে সক্ষম হন লতা। সে সময়ের হিসেবে এই পরিমাণ অর্থ নেহাতই কম ছিল না। অবশ্য এতে সন্তুষ্ট ছিলেন না লতা। অভিনয় তাকে টানত না। সে সময়ের কথা স্মরণ করে তিনি বলেছিলেন, ‘অভিনয়ের কাজ কখনোই আমার ভালো লাগেনি। মেকাপ, লাইট এসবে আগ্রহ পেতাম না। মানুষজন খালি নির্দেশ দিচ্ছে, এই ডায়লগ বলো তো, ওই ডায়লগ বলো তো। আমার এত অস্বস্তি হতো।’ লতার ভ্রু মোটা হওয়ায় একবার এক চলচ্চিত্র পরিচালক তাকে ভ্রু প্লাক করতে বলেন। এতে খুব বিস্মিত ও আহত হন তিনি। অর্থ রোজগারের জন্য অপ্রিয় সেই কাজ করতেও শেষ পর্যন্ত বাধ্য হন তিনি।

অভিনয় থেকে গানে
১৯৪৫ সালে বিনায়ক দামোদর তার নবযুগ চিত্রপটের সদর দপ্তর বোম্বেতে (বর্তমানে মুম্বাই) নিয়ে গেলে লতার পরিবারও সেখানে স্থানান্তরিত হয়। সে সময় বোম্বেতে ভেন্ডিবাজার ঘরানার ওস্তাদ আমান আলি খানের কাছ থেকে হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সংগীতের তালিম নেন লতা। ১৯৪৫ সালে বিনায়কের প্রথম হিন্দি ভাষার সিনেমা ‘বড় মা’তে লতা ও বোন আশা ছোট চরিত্রে অভিনয় করেন। সেই ছবিতে ভজন সংগীত ‘মাতা তেরে চরণে মে’ গানটি গান লতা। পরের বছর বিনায়কের দ্বিতীয় হিন্দিভাষী সিনেমা ‘সুভদ্রা’ নির্মাণের সময় বিখ্যাত সংগীত পরিচালক বসন্ত দেসাইয়ের সঙ্গে পরিচয় হয় লতার।

১৯৪৮ সালে বিনায়কের মৃত্যুর পর বলিউডের আরেক বিখ্যাত সংগীত পরিচালক গুলাম হায়দার প্লেব্যাক সিঙ্গার হিসেবে লতা মঙ্গেশকরকে গড়ে তোলেন। সেই বছর বাঙালি প্রযোজক শশধর মুখার্জির সঙ্গে লতার পরিচয় করিয়ে দেন গুলাম হায়দার। তখন শশধর মুখার্জি প্রযোজিত চলচ্চিত্র ‘শহীদের’ কাজ চলছিল। লতার গলা শুনে শশধর তাকে তার চলচ্চিত্রে নিতে রাজি হননি। কারণ লতার গলা শশধরের কাছে অনেক বেশি সরু মনে হয়। লতাকে খারিজ করায় ক্ষেপে যান গুলাম হায়দার। তিনি শশধরকে বলেছিলেন, ‘এমন এক দিন আসবে, যেদিন প্রযোজক ও পরিচালকরা তাদের ছবিতে গান গাওয়ানোর জন্য লতার পায়ে পড়ে অনুনয়-বিনয় করবে।’ ১৯৪৮ সালেই ‘মজবুর’ ছবিতে নিজের পরিচালিত গান ‘দিল মেরা তোরা, মুঝে কাহি না ছোড়া’ লতাকে দিয়ে গাওয়ান গুলাম হায়দার। এই গান সে সময় এত জনপ্রিয় হয় যে, লতাকে আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। এক নামে তখন লতা বলিউড জগতে পরিচিত। নিজের প্রথম হিট ওই গান সম্পর্কে লতা তার ৮৪তম জন্মদিনে বলেছিলেন, ‘গুলাম হায়দায় সত্যিকার অর্থেই আমার গডফাদার। তিনিই প্রথম সংগীত পরিচালক যিনি আমার মেধার ওপর সে সময় পূর্ণ আস্থা রাখেন।’

পাকিস্তানের বিখ্যাত গায়িকা নুরজাহানের গায়কি লতা নকল করতেন বলে শুরুতে কানাঘুষা ওঠে, যা লতার কানেও পৌঁছায়। এই অভিযোগ বিবেচনায় নিয়ে লতা পরে তার গায়কিতে পরিবর্তন আনেন। ধীরে ধীরে ভারতীয় চলচ্চিত্রের গানে নিজস্ব স্বতন্ত্র এক শৈলীর জন্ম দেন তিনি। মেহফিল ঘরানার গায়কি থেকে সরে এসে আধুনিক ও চিরাচরিত নায়িকাদের সঙ্গে যায়, এমন গায়কি রুপালি পর্দায় প্রথম তুলে আনেন লতা। পঞ্চাশের দশকে অনিল বিশ্বাস, শঙ্কর জয়কিশান, নৌশাদ আলি, এস ডি বর্মণ, সারদুল সিং, অমরনাথ, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, সলিল চৌধুরী, খৈয়ামসহ ভারতের বড় সংগীত পরিচালকদের সঙ্গে কাজ করা শুরু করেন লতা।

পরবর্তী চার দশকে বলিউডের স্বর্ণযুগে পাকিজাহ, আওয়ারা, মুঘল-ই-আজম, আরাধনাসহ অবিস্মরণীয় ও জনপ্রিয় আরও বহু ছবির গানে কণ্ঠ দেন লতা। ভারতে এমন কোনো জনপ্রিয় নায়িকা পাওয়া যাবে না, যার ছবিতে লতা গান গাননি। সেই চল্লিশের দশকের নায়িকা মধুবালা থেকে শুরু করে নব্বই দশকের নায়িকা কাজল প্রায় সবাই লতার গানে ঠোঁট মেলান। প্রখ্যাত ভারতীয় চলচ্চিত্র পরিচালক রাজ কাপুর, গুরু দত্ত থেকে শুরু করে হালের মণি রত্নম, করন জোহরের ছবিতেও কাজ করেন লতা। ১৯৬২ সালে চীন-ভারত যুদ্ধে ভারতের নিহত সেনাদের শ্রদ্ধা জানিয়ে ‘এ মেরে ওয়াতান কে লোগো’ গানটি এক অনুষ্ঠানে গান লতা। সেই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওয়াহেরলাল নেহরু। লতার ওই গান শুনে কেঁদে ফেলেন তিনি।

লতার ছোট বোন আশা ভোঁসলেও বলিউডের নামকরা সংগীতশিল্পী। দুই বোন পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী এমন কানাঘুষা শোনা গেলেও লতা এ বিষয় বরাবরই প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি বলেন, ‘আমরা দুজনেই খুব ঘনিষ্ঠ। একে অপরের সঙ্গে প্রতিযোগিতার প্রশ্নই ওঠে না। আশার সঙ্গে বেশ কয়েকটি গান গাওয়া হয়েছে। তার সঙ্গে গান গাওয়া বরাবরই উপভোগ করেছি আমি।’ বলিউডে লতাই প্রথম নারী সংগীতশিল্পী যিনি ভালো সম্মানী ও রয়্যালটির দাবি জানান। তিনি বলেন, ‘আমি একজন স্বপ্রতিষ্ঠিত ব্যক্তি। লড়াই করা শিখেছি আমি। কাউকে কখনো ভয় পাইনি। আমি নির্ভীক। তবে এত কিছু জীবনে পাব, তা কখনো ভাবিনি।’

সংগীতে অর্জন
সংগীত জগতে অসামান্য অবদান রাখায় জীবনে বহু পুরস্কারে ভূষিত হন লতা। ১৯৮৭ সালে ভারতের চলচ্চিত্র জগতের সর্বোচ্চ পুরস্কার দাদাসাহেব ফালকে পান লতা। এ ছাড়া ২০০১ সালে  লতা মঙ্গেশকরকে দেয়া হয় দেশটির সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা ভারতরত্ন। ভারত তথা বিশ্বের নামি ক্রিকেটার শচিন তেন্ডুলকারের সঙ্গে লতার ছিল মধুর সম্পর্ক। শচিন তাকে ‘মা’ বলে সম্বোধন করতেন। এ বিষয়ে লতা বলেছিলেন, ‘শচিন আমাকে মায়ের চোখে দেখে, আমিও সবসময় মায়ের মতো তার জন্য প্রার্থনা করি। আমি সেই দিনটি কখনোই ভুলতে পারি না যেদিন সে আমাকে প্রথমবার ‘মা’ বলে ডেকেছিল। এটা আমি কখনো ভাবতে পারিনি। এটা আমার জন্য অত্যন্ত বিস্ময়ের ছিল। ওর মতো ছেলে পেয়ে আমি নিজেকে ধন্য মনে করি।’   

শোকের ছায়া
লতা মঙ্গেশকরের মৃত্যুতে শোকস্তব্ধ ভারত দুদিনের রাষ্ট্রীয় শোক পালন করেছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি টুইটারে লেখেন, ‘আমি আমার ব্যথার কথা বলে প্রকাশ করতে পারব না। দয়ালু এবং যত্নশীল লতা দিদি আমাদের ছেড়ে চলে গিয়েছেন। তিনি আমাদের দেশে একটি শূন্যতা রেখে গেলেন যা পূরণ করা যাবে না। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তাকে ভারতীয় সংস্কৃতির একজন অকুতোভয় হিসেবে মনে রাখবে। সুরেলা কণ্ঠে মানুষকে মন্ত্রমুগ্ধ করার তার এক অতুলনীয় ক্ষমতা ছিল।’

অস্কারজয়ী ভারতীয় সংগীত পরিচালক এ আর রহমান বলেন, ‘আজ আমাদের সবার কষ্টের দিন। লতাজি কেবল সংগীতশিল্পীই ছিলেন না, তিনি আমাদের, ভারতের আত্মা। ভারতের সংগীত, উর্দু কবিতা, হিন্দি কবিতা, বাংলা ভাষাসহ আরও অনেক ভাষার তিনি অংশ। তার শূন্যতা সবসময় অনুভব করব। তার সঙ্গে কাজ করে নিজেকে ধন্য মনে করি।’

পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় টুইটবার্তায় বলেন, ‘ভারতের প্রয়াত আইকন ভারতরত্ন লতা মঙ্গেশকরকে আমার অন্তরের শ্রদ্ধা। তার পরিবার ও গোটা বিশ্বে তার কোটি কোটি অনুরাগীদের আন্তরিক সমবেদনা। প্রতিভার নিরিখে তিনি সঠিক অর্থেই ভারতের নাইটিঙ্গেল। তার মৃত্যুতে গভীরভাবে শোকাহত। তার ভক্ত ও অনুরাগীদের মতো আমিও তার কণ্ঠস্বরে মুগ্ধ ছিলাম।’

ভারতের মেলোডি কুইন শ্রেয়া ঘোষাল ফেইসবুকে লেখেন, ‘খবর পেয়ে অসাড় ও বিধ্বস্ত লাগছে। গত রোববার ছিল সরস্বতী পূজা।  দেবী মা লতাজিকে তার সঙ্গে নিয়ে গেলেন। মনে হচ্ছে, পাখি, গাছ, বাতাস আজ তার মৃত্যুর খবরে চুপ হয়ে গেছে। কেউ কোনো শব্দ করছে না।’ বলিউডের কিংবদন্তি বর্ষীয়ান অভিনেতা অমিতাভ বচ্চন সুরসাধক লতার মৃত্যুর খবর শুনে মেয়ে শ্বেতা বচ্চনসহ তার বাড়িতে হাজির হন। এ ছাড়া ভারতের চলচ্চিত্র ও সংগীত জগতের আরও অনেক তারকা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লতা মঙ্গেশকরকে শেষ শ্রদ্ধা জানান।

বাংলার না হয়েও বাংলাকে ভালোবেসেছিলেন লতা। বাংলা গানও গেয়েছেন অনেক। এই বাংলার যা কিছু অহংকার তার বেশিরভাগ জায়গা দখল করে আছে ভাষার জন্য আত্মাহুতি আর মুক্তিযুদ্ধ। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের ‘ফান্ড গঠনের’ জন্য যাওয়া হয়েছিল লতা মঙ্গেশকরের কাছে। বলা হয়েছিল রিফিউজিদের আশ্রয় ও খাবার, আহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও প্রয়োজনীয় ওষুধপত্র কেনা হবে এই ফান্ডের টাকা দিয়ে। বাংলার মুক্তির কথা শুনে তখনই লতা লিখে দিয়েছিলেন এক লাখ টাকার চেক। ১৯৭১-এ এক লাখ টাকা অনেক! আরও কিছু অপেক্ষা করছিল বাংলার মুক্তিকামী মানুষের জন্য। তিনি তার কিছু গানের রয়্যালটির টাকা তুলে দিয়েছিলেন এই ফান্ডে!

বাংলার পক্ষে জনমত গঠনে নেমেছিলেন লতা মঙ্গেশকরও। ভারতের বিমান বাহিনীর সহায়তায় অজন্তা শিল্পী গোষ্ঠীর সঙ্গে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে গান পরিবেশন করে ভারতে আটকে পড়া বাংলাদেশি রিফিউজিদের জন্য টাকা তুলতেন লতাজিও। স্বাধীনতার পর তার ভালোবাসার বাংলাদেশে তিনি এসেছিলেন ১৯৭২ সালের ৩০ জানুয়ারি। ছিলেন দুই ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। বাংলাদেশে আসার পঞ্চাশ বা স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পর তিনি ফিরে গেলেন ঈশ্বরের কাছেই।

শ্রদ্ধেয় লতা মঙ্গেশকর, মুক্তির আনন্দে যতদিন থাকবে বাংলার মানুষ, যতদিন থাকবে বাংলাদেশ, আপনাকে আমরা ভুলবো না কোনও দিন! যে বাংলার মানুষের মুক্তির জন্য আপনি সহায়তা করেছিলেন, যে বাংলার রিফিউজিদের জন্য টাকা তুলতে আপনি বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে গান গাইতেন, যেখানে গিয়েছেন সেখানে যদি ঈশ্বরের সঙ্গে দেখা হয়, যদি ঈশ্বর আপনাকে গান গাইতে বলেন, আপনার কাছে সজল মিনতি করি, আপনি অন্তত একটা বাংলা গান গাইবেন।

সাংবাদিক তাহমিনা আক্তার

ওমেন্স নিউজ ডেস্ক/

লাইক, কমেন্টস, শেয়ার দিয়ে আমাদের সাথে থাকুন