শিশুর প্রতি পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের দায়

কাজী দিলরুবা রহমান

কাজী দিলরুবা রহমান

আমরা যারা কম বেশি লিখতে পড়তে পারি অথবা কিছুটা হলেও শহরকেন্দ্রীক জীবনযাপন করি তাদের অধিকাংশেরই খবরের কাগজ পড়ার কিম্বা টেলিভিশন, অনলাইনের মাধ্যমে প্রতিদিনের দেশে বিদেশে ঘটে যাওয়া নানা শুভ-অশুভ ঘটনা সম্পর্কে কিছুটা ধারণা আছে। ধারণা থেকেই বলছি, শিশুদের নির্ভয় নিরাপত্তা কোথায়?কেবল জন্মদানের ঋণ শোধের বদলা নিতে গিয়ে সমাজের নিম্নবিত্ত, নিস্ন মধ্যবিত্ত থেকে শুরু করে উচ্চবিত্তের ঘরেও নানা ভাবে শিশুরা অধিকার বঞ্চিত হচ্ছে প্রতিনিয়ত।

সমাজের নিম্নবিত্ত পরিবারগুলোতে শিশুদেরকে উপার্জনের মাধ্যম হিসেবে বাবহার করা এখন গা সওয়া হয়ে গেছে । শিশু কোলে ভিক্ষে করতে দেখা যায় অসংখ্য মাকে, একটু বড় হতে না হতেই আবার তাদেরকে পাঠানো হয় গৃহকর্ম থেকে শুরু করে কল-কারখানা, গাড়ির গ্যারেজ, হোটেল, ওয়েল্ডিং এর দোকানে, কামারের দোকানে, রাস্তায় চলন্ত গাড়ি মোছার কাছে, ফুল বিক্রির কাজে এমনকি ভিক্ষা বৃত্তিতে। আর এসব শিশুদের জেনে বুঝে কাজে নিয়োগ দিচ্ছেন বিবেকবান মানুষেরা। প্রায়ইএসব ঘটনা ভয়াবহ রুপ নেয় যখন দেখি কোন শিশু গৃহকর্মী কিংবা কারখানার শ্রমিককে সামান্য অপরাধে নানা ভাবে শারীরিক নিপীড়নের মাধ্যমে মেরে ফেলা হয় পর্যন্ত। ঘরে -বাইরে প্রতিনিয়ত চলে শিশুর উপর যৌন নির্যাতন। শিশু গৃহ পরিচারিকা গৃহস্বামী দ্বারা যৌন হেনস্তার শিকার হয়। অথচ পরিবারের দায়িত্বশীল নারী ব্যক্তির দায় থাকা উচিত শিশুর সম্ভ্রম রক্ষা করার। কিন্ত এসব ক্ষেত্রে আমার পরিচিত একজন গৃহকর্ত্রী তার স্বামী এবং শশুরের বিরুদ্ধে গৃহ পরিচারিকার অভিযোগ অগ্রাহ্য করে তাকে উলটো হুমকি দিয়েছিল এই বলে যে-এসব সহ্য করে থাকতে পারলেই থাকবে। ওই নারীও হয়তো অসহায় ছিল এইভেবে যদি প্রতিবাদ করতে গিয়ে নিজের সংসার বিচ্যুতি ঘটে? এভাবেই অন্যায় করা আর মেনে নেয়ার মধ্য দিয়ে সমাজে অন্যায় শিকড় গেঁথে বসে।

শুধু কি তাই, অহরহ শিশু চুরির ঘটনা ঘটছে শহরের বস্তিগুলোতে যেখানে বাবা-মা দুজনই যখন দু বেলা দুমুঠো খাবারের জোগান দিতে কাজের তাগিদে বাহিরে কাজে থাকেন। এই সব শিশুদের হাত- পা কেটে প্রতিবন্ধী বানিয়ে ভিক্ষা বৃত্তিতে লিপ্ত করা হচ্ছে বাধ্যতামূলক ভাবে। সমাজ,  রাষ্ট্র কতোটা মনিটরিং কিম্বা নিরপেক্ষ দৃষ্টিপাতের মাধ্যমে এসব শিশুদের অধিকার ফিরিয়ে দেয়ার দায়িত্ব পালন করছে? একমাত্র অভাবই শিশুকে তার অধিকার থেকে বঞ্চিত করছে না। সামাজিক অস্থিরতাও এর জন্য অনেকাংশে দায়ী হয়ে পরছে আজকাল। প্রায় প্রতিদিনই পত্র-পত্রিকা কিংবা অনলাইনে চোখ পরতেই দেখা যায় পারিবারিক অশান্তির জের হিসেবে সন্তান হত্যা করে নিজে আত্মহত্যা করেছেন কোন মা । এমন কি কোন কোন বাবাকেও দেখা যায় ব্যক্তিগত অর্থনৈতিক হতাশা বা দাম্পত্য কলহের জের হিসেবে সন্তানকে হত্যা করে নিজে আত্মহত্যা করেন। কিছুদিন আগে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা উচ্চশিক্ষিত একজন মা তার দুই সন্তানকে হত্যা করেন। তার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে তিনি উল্লেখ করেছিলেন যে তিনি তার সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে উৎকন্ঠিত ছিলেন। আমাদের দেশে কেন কোন মনিটরিং থাকেনা সন্তানের প্রতি বাবা-মায়ের শারিরীক নির্যাতনের উপর। শুধু কি বাবা-মা এক্ষেত্রে স্কুলের, কোচিং এর শিক্ষক পর্যন্ত বাচ্চাদের উপর অকারণের শারীরিক নির্যাতন চালায়। গ্রাম অঞ্চলে জমিজমা কিম্বা পারিবারিক কলহের জের হিসেবে শিশু হত্যার ঘটনা নেহায়াত কম নয়। নিস্পাপ শিশুদের উপর সমাজ, পরিবারে কেন এত সব ভয়ংকর আক্রোশ।

আমি ব্যক্তিগতভাবে জানি কোচিংগুলোতে বাচ্চাদের কোন কারণ ছাড়াই পেটানো হয় এই কারণে যে, কোচিং থেকে বাসায় টিউটর নিয়োগ দেয়া হবে। এসব টর্চারিং এর মধ্য দিয়ে যে সব বাচ্চারা বেড়ে উঠে তাদের মধ্যে কতটুকু মানবতা থাকে বাবা-মা কিংবা সমাজের প্রতি। গৃহকর্মী হিসেবে যারা শিশু ও কিশোরীদের দিয়ে কাজ করান তাদের জন্য যেমন আইনি ব্যবস্থা থাকা দরকার তেমনি যে সব বাবা-মায়েরা দারিদ্রতার অযুহাত দেখিয়ে বাচ্চাদের গৃহকর্মে নিয়োগ করেন তাদের জন্য ও আইনি ব্যবস্থা থাকা জরুরি। অনেকে ডিভোর্সকে সন্তানের মানসিক স্বাস্থ্যের উপর প্রভাব ফেলে বলে মনে করেন। হ্যা, এটাকে পুরোপুরি অস্বীকার হয়তো করা যাবে না।তবে মানুস এখন অনেক সচেতন। বিশেষ করে মিডিয়াতে ডিভোর্সের সংখ্যা বেশি। কিন্তু তারা সন্তানের মানুসিক স্বাস্থ্যের কথা বিবেচনায় রেখেই বিচ্ছেদের পরও বাবা-মা এক সংগে বাচ্চাকে নিয়ে ঘোরাফেরা থেকে শুরু করে জন্মদিন, বাচ্চার স্কুলের প্যারেন্টস ডেতে এক সংগে হওয়া বিষয়গুলো মেনে চলেন।উন্নত দেশেগুলোতে বাবা-মায়ের সন্তান লালন – পালন বিষয়ক কোন ধরনের অক্ষমতা কিম্বা বাচ্চাদের প্রতি শারীরির মানুষিক নির্যাতনের বিরুদ্ধে রিপোর্ট পুলিশের কাছে পৌঁছা মাত্র বাবা-মাকে সন্তানের কাস্টাডি থেকে বঞ্চিত করা হয় আর এই সব রিপোর্ট পুলিশের কাছে সন্তান নিজেই কিংবা পাড়া-প্রতিবেশীরাই করে থাকেন। আমাদের দেশেও শিশু ও নারী বিষয়ক মন্ত্রনালয় আছে। এই মন্ত্রণালয়ের অধিকার শিশু কিম্বা নারীর প্রতি পরিবারের সদস্যদের নির্যাতনের ইস্যু আমলে এনে সুষ্ঠ তদন্তের ভিত্তিতে বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার। সেক্ষেত্রে যদি বাবা-মা বলেন যে আমার সন্তানকে আমি যেভাবে খুশি শাসন করবো সেটা কতটা গ্রহণযোগ্য হবে আজকের সময়ের প্রেক্ষিতে? প্রতিদিন রাস্তায় বের হতেই দেখা যায় শিশু কোলে মা ভিক্ষে করছে, এমন কি শিশুকে দড়ি দিয়ে বেঁধে ভিক্ষে করছে, কখনো কখনো দেখা যায় প্রতিবন্ধী শিশুকে নিদারুন যন্ত্রনায় রাস্তায় শুয়ে রেখে ভিক্ষে চাওয়া হচ্ছে। একজন শিশু তার জন্মের জন্য কখনোই দায়ী নয় কিন্তু সমাজ পিতৃপরিচয়হীন যাকে আমরা লাভ চাইল্ডও বলতে পারি তাকে সহজ করে দেখে না, বাংলাদেশের একজন উপস্থাপক কিবরিয়ার পরিকল্পনা ও উপস্থাপনায় পরিচালিত জীবনের গল্প থেকে জেনেছি একজন অভিনেত্রী সেতুলির কথা যে এরকমই একজন লাভ-চাইল্ড শিশুর জন্ম দিয়েছিলেন। গর্ভে থাকা কালিন ভ্রুন শিশুর বাবা সামাজিক কারনে পরিচয় বহন করতে অপারাগতা প্রকাশ করায় ওই অভিনেত্রীকে সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল সন্তানকে বিদেশে রেখে বড় করে তোলা।

এছাড়া শিশুর প্রতি যে জঘন্যতম অপরাধ অহরহ ঘটে যাচ্ছে তাতে করে তারা নুন্যতম শিশু অধিকার পাওয়া থেকে বঞ্চিত। উন্নত দেশে হোমলেস অথবা ভিক্ষুকদের যেখানে ছবি তোলার আপত্তিকে গ্রাহ্য করতে হয় সেখানে ইচ্ছে হলেই পথশিশুকে যে কেউ বিনা অপরাধে গায়ে হাত তুলতে পারে। আর যৌনাচার সেতো ঘটছেই। শিশুদের জন্মগত যেসব অধিকার ভোগ করার অধিকার একটি স্বাধীন দেশের সংবিধানে আছে সেগুলো আদায়ের পক্ষে সরব হওয়ার দায়িত্ব রয়েছে শিশু অধিকার সচেতন জনগণের। শিশুরা সেক্ষেত্রে নিজের অধিকার কি করে বুঝে নিতে পারে যদি সচেতন অবিভাবকরা এগিয়ে না আসেন? এখানে আমি আমার ব্যক্তিগত কিছু অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করছি, আমি একটি স্বনামধন্য ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে শিক্ষকতা করতে গিয়ে জানতে পারি কিছু ছাত্র ছিল যাদেরকে বাংলায় এমন কি অংকেও স্পেশাল ক্লাশ নিতে হতো। আমি লক্ষ্য করে দেখি তারা পড়াশুনায় ভীষণ উসাসীন। অথচ তাদের পারিবারিক কোন প্রকারের দৈন্যতা কিংবা অস্বাভাবিকতা ছিল না। পড়ানো ফাঁকে ফাঁকে আমার কৌতুহল জেগে উঠে তাদের উদাসীনতার মৌলিক কারণ জানার জন্য। এক পর্যায় তারা আমাকে বিশ্বাস করে এবং তাদের সমস্যা সম্পর্কে জানায়। অবশ্য এই উদ্যেগটি ছিল সম্পূর্ণ আমার নিজস্ব কৌতুহল বসত। তারা প্রত্যেকেই মূলত বাড়িতে একাকিত্বে ভুগছিল। তাদের ভাষ্যমতে কারো বাবা-মা দুজনই কর্মক্ষেত্রে ব্যস্ত, কারো বাবা হয়তো কর্মক্ষেত্রে ব্যস্ত মা অনলাইন ব্যবসায় আবার মা ব্যবসার প্রয়োজনে দেশ-বিদেশ ট্যুর করেন। ভাষা থেকে শুরু করে আচার -আচারণ সবটাই তাদেরকে অর্জন করতে হয় বাড়ির গৃহ পরিচারিকা, দারোয়ান, পিয়নের কাছ থেকে। তাদের সঙ্গী সাথী বাড়ির কুকুর- বিড়াল, ল্যাপটপ এবং অন্যান্য পেট এনিম্যাল। স্কুল থেকে এসব বিষয়ে গার্ডিয়ানদের জানানো নিষেধ ছিল তাই আজ আমি সেসব অভিজ্ঞতার কথা লিখে প্রকাশ করছি। এভাবেও কি পিতা-মাতা তাদের শিশু সন্তানদের প্রাপ্য স্নেহ মমতা থেকে বঞ্চিত করে অধিকার বঞ্চিত করছেন না? যে সব শিশু আগামীর ভবিষ্যৎ তাদের ধ্বংস করে বাবা-মায়ের অর্জনের এমন কি থাকতে পারে!

লেখক পরিচিতি: কাজী দিলরুবা রহমান একাধারে একজন কবি, কথা সাহিত্যিক এবং প্রাবন্ধিক। তার জন্ম জেলা বরিশাল এবং বেড়ে উঠা ঢাকায়। পড়াশুনা করেছেন উদ্ভিদ বিজ্ঞানে। বেশ কিছু বছর যাবত লেখালেখির সাথে যুক্ত তিনি। বিভিন্ন সাহিত্য এবং পোর্টাল পত্রিকায় তার লেখা নিয়মিত প্রকাশ পেয়ে আসছে অনেক দিন থেকে। এ পর্যন্ত তার প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা পাঁচটি। এ বছর বইমেলায় দুটি নতুন গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে।

ওমেন্স নিউজ ডেস্ক/

লাইক, কমেন্টস, শেয়ার দিয়ে আমাদের সাথে থাকুন