সম্পূর্ণ উপন্যাস ‘করো স্নান নব ধারা জলে’

রানা জামান

রানা জামান

তখন বাজে সকাল এগারোটা। অফিস পাড়া দৈনন্দিন ব্যস্ততায় ঢুকে আছ। টেবিলে টেবিলে চলছে কাজ। কোন কোন টেবিলে ঘুষের বিনিময়ে কোনটায় ঘুষ ছাড়াই। ঘুষ ছাড়া টেবিল হাতে গুণা। এ সংখ্যা বাড়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর প্রচেষ্টার তুলনায় লোভী মানুষগুলোর আগ্রাসন অনকে অনকে বেশি। এই উপন্যাসের বিষয় এটা না। প্রসঙ্গক্রমে হয়তোবা মাঝে মাঝে আসতে পারে; তবে এ উপন্যাসের বিষয় সর্ম্পূণ অন্য।
জনকল্যাণ মন্ত্রণালয়। এই নামটা কাল্পনিক। এ ধরনরে মন্ত্রণালয়ের নাম বাংলাদেশে নেই। জহিরুল আবেদিন একজন সিনিয়র সহকারি সচিব। যুগ্ম-সচিব বদরুল হায়দারের ব্যক্তিগত কর্মকর্তার কামরায় ঢুকে জিজ্ঞেস করলো, স্যার কি আছেন পিও সাহেব?
ব্যক্তিগত কর্মকর্তা প্রশান্ত হাজরা মৃদু কণ্ঠে বললো, আছেন স্যার।
জহিরুল আবেদিন দরজা খুলে বদরুল হায়দারের কামরায় ঢুকে কপালে হাত তুলে সালাম জানালো,আসসালামু আলাইকুম স্যার!
বদরুল হায়দার একটা নথি দেখছিলেন। তিনি হাসিমুখে ওর দিকে তাকিয়ে সালামের জবাব দিয়ে বললেন, বসো।
থ্যাঙ্কু স্যার। বলে জহিরুল আবেদিন বদরুল হায়দারের মুখোমুখি একটা চেয়ারে বসলো।
বদরুল হায়দার নথিটা বন্ধ করে ফিতা বেঁধে নিচে ফেলে দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, কী খবর তোমার? কেমন চলছে দিনকাল?
জহিরুল আবেদিন একটা দীর্ঘশ্বাস গোপন করে বললো, ভালো চলছে না স্যার।
কেনো?
জিনিপত্রের দাম ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। কিভাবে জীবন যাপন করবো বুঝতে পারছি না স্যার। সরকার মূল্য বাড়ায় একটা বা দুটো পণ্যের। আর বাজারে বেড়ে যায় সকল পণ্য ও সেবার দাম। রিকশা চালাতে তেল পেট্রোল লাগে না; অথচ রিকশার ভাড়াও বেড়ে যায় সাথে সাথে।
সরকারের দুটো জিনিসই আছে মূল্য বাড়ানোর-ফুয়েল আর বিদ্যুৎ। রিকশা চালাতে এ দুটো না লাগলেও ওর জীবন চালাতে ওসব লাগে। তাই রিকশাওয়ালাও ভাড়া বাড়িয়ে দেয়।
কিন্তু আমাদের বেতন পণ্যমূল্য বৃদ্ধির সাথে বাড়ে না স্যার। সরকারি কর্মচারিরা কিভাবে সংসার চালাবে তা কি ভেবে দেখার দায়িত্ব সরকারের নেই?
সরকারি চাকরির এই একটা অসুবিধা। যখন তখন বেতন বাড়ে না। আগে পাঁচ বছর পরপর বেতন কমিশন গঠন করে নতুন পে-স্কেল দেয়া হতো, ২০১৫ খৃস্টাব্দের পর হতে তাও বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। এখন আর কোনো বেতন কমিশন হবে না, যে যখনই চাকরিতে যোগদান করুক না কেনো ইনক্রিমেন্ট হবে সবার সাথে জুলাই মাসে।
ভাবতে অবাক লাগে স্যার। কী ভেবে সরকারি চাকরিতে ঢুকেছিলাম। আর এখন কী দেখছি। সময়মতো প্রমোশন নেই, সম্মানজনক বেতন নেই। আমার ব্যাচমেটদের মধ্যে যারা আর্লি ম্যারেজ করেছে, ওদের ছেলে-মেয়েরা লেখাপড়া শেষ করে বেসরকারি চাকরিতে ঢুকে গেছে। আমরা বাইশ বছর চাকরি করার পর যে বেতন পাচ্ছি ওরা তার চেয়ে বেশি বেতন পাচ্ছে শুরুতেই। আমার বন্ধুদের মধ্যে যারা সরকারি চাকরি পায় নি বা নেয় নি তারা এখন সৎ জীবন যাপন করেও ঢাকায় গাড়ি-বাড়ি করে ফেলেছে; কেউ কেউ হজ্জ করে এসেছে। আর আমার নুন আনতে পান্তা ফুরায় স্যার।
জহিরুল আবেদিন একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো।
বদরুল হায়দার হাসিমুখে বললেন, এতো ক্ষোভ তোমার সরকারি চাকরির প্রতি! কোন প্রাইভেট ফার্মে ভালো অফার পেলে চলে যাবি কি?
অবশ্যই স্যার!
কিন্তু সরকারি চাকরিতে যে সম্মান আছে, তা বেসরকারি চাকরিতে নেই।
শুধু সম্মানে পেট ভরছে না স্যার!
বদরুল হায়দার প্রসঙ্গান্তরে যেতে বললেন, চা পান করবে?
সরকারি না আপনার টাকায়?
সরকারি।
তাহলে পান করা যায়।
বদরুল হায়দার কলবেল টিপতেই মান্নান ভেতরে ঢুকলে বললেন, দুই কাপ চা বানানো যাবে মান্নান?
মান্নান ঠোঁট উল্টে বললো, চিনি নাই স্যার!
আমাদের এখনো ডায়াবেটিস হয়নি। চিনি ছাড়া চা পান করা যাবে না।
জহিরুল আবেদিন বললো, থাক স্যার। চা লাগবে না।
চিনি আনিয়ে নিচ্ছি।
বদরুল হায়দার পকেট হাত ঢুকাতে চাইলে জহিরুল আবেদিন বললো, অফিসে বসে আপনার পকেটের টাকায় চা পান করবো না স্যার। সেটা বাসায় হতে পারে।
ডোন্ট বি সো সেন্টিমেন্টাল মাই ইয়ংগার কলিগ!
বদরুল হায়দার পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করে পঞ্চাশ টাকার একটা নোট দিয়ে বললেন, আড়াই শ গ্রাম চিনি আনবে। দুধ লাগবে না।
মান্নান কিছু না বলে টাকা নিয়ে চলে গেলো।
একটু গলা উচিয়ে বদরুল হায়দার বললেন, তাড়াতাড়ি আসতে চেষ্টা করো মান্নান! তুমি চিনি নিয়ে এসে চা বানিয়ে দিলে আমরা পান করবো। বুঝতে পেরেছো তো?
জহিরুল আবেদিন বললো, আপনার কাছে এলে বেশ ভালো লাগে স্যার।
বদরুল হায়দার হাসিমুখে জিজ্ঞেস করলেন, কেনো?
একমাত্র আপনিই অফিসের কাজের বাইরে ব্যক্তিগত ও পারিবারিক খোঁজ-খবর নেন। অন্যান্য স্যারদের চেম্বারে গেলে নিজকে রোবোট ছাড়া আর কিছুই মনে হয় না; তাঁরা অফিসের কাজের বাইরে কিছুই বলেন না। মাঝে মাঝে আমার কাছে অদ্ভূত লাগে স্যার। আমরা আর ভিনদেশি দ্বারা শাসিত হচ্ছি না; কিন্তু আচরণটা ভিনদেশিদের মতোই রয়ে গেছে।
বদরুল হায়দার বললেন, বাংলাদেশের আমলাতন্ত্রটা এসেছে বৃটিশ শাসন থেকে। আমরা ধাপে ধাপে টেরিটোরিয়াল সভ্রেন্টি অর্জন করলেও মাইন্ড-সেটটা এখনো ওদের মতোই রয়ে গেছে। অবশ্য এর জন্য আমাদের বিদ্যমান আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থা অনেকটা দায়ী। তবে আস্তে আস্তে ঠিক হয়ে যাবে।
ঠিক হতেই হবে স্যার। প্রাইভেট ফার্মগুলো যেভাবে বেশি বেতন ও সুবিধা দিয়ে ট্যালেন্ট হান্ট করছে তাতে আগামী দশ বছর পর সরকারি চাকরিতে ট্যালেন্টই খুঁজে পাওয়া যাবে না।
আমার কাছে ট্যালেন্ট ব্যাপারটা আপেক্ষিক মনে হয় জহির। তুমি একটা ধারালো ছুরি ঘরের কোণায় ফেলে রাখলে দেখবে কিছুদিনের মধ্যেই ওটায় জং ধরে ভোঁতা হয়ে যাবে আর একটা ভোঁতা ছুরি দিয়ে কাজ করতে থাকলে দেখবে কিছুদিনের মধ্যে ওটা ঝকঝক করছে।
চমৎকার একটা উদাহরণ দিয়েছেন স্যার! এমনভাবে আমরা খুব কমই ভাবি স্যার।
সেজন্যই আমরা এগুতে পারছি না এক কদম।
বদরুল হায়দারের ইন্টারকম বেজে উঠতেই জহিরুল আবেদিন দাঁড়িয়ে বললো, মান্নান তাড়িতাড়ি আসার ব্যক্তি না স্যার। আমি আসি স্যার। আরেকদিন আপনার চা পান করবো স্যার। আসসালামু আলাইকুম স্যার।
জহিরুল আবেদিন বের হয়ে গেলো। বদরুল হায়দার কোন মন্তব্য না করে ইন্টারকমের রিসিভার তুলে কানে ঠেকালেন। ওদিকে শুনে বললেন, আমি এক্ষুণি আসছি স্যার!
বদরুল হায়দার মোবাইল ফোনের শব্দ বন্ধ করে নোট বুক ও বলপয়েন্ট কলম হাতে নিয়ে বেরিয়ে গেলেন চেম্বার থেকে। সরাসরি ঢুকলেন সচিবের চেম্বারে। সালাম জানিয়ে মুখোমুখি একটা চেয়ারে বসলেন।
সচিব বললেন, পত্র-পত্রিকায় নিউজ এসেছে প্রশাসনে কাজের গতি স্থবির হয়ে পড়ছে। তোমার কী মনে হয়? কথাটা কি ঠিক?
বদরুল হায়দার বললেন, অফিসে কাজ করি আমরা। কাজে গতি কখন আসে বা জড়তাই বা কখন হয় আমরা টের পাই না; অথচ ওরা টের পেয়ে যায়! একটা ব্যাপার লক্ষ করেছেন স্যার?
কী সেটা?
কাজে জড়তা এলে টের পায়; কিন্তু গতি এলে কখনো তা নিউজ হয় না। বিষয়টাকে কিভাবে নেবেন স্যার?
তোমার কথায় যু্ক্তি আছে।
তাছাড়া ইনকোয়ারি করলে দেখা যাবে হয়তো বা কোন সাংবাদিক বা ওর কোন আত্মীয় বা পরিচিত কেউ কোন একটা কাজ নিয়ে এসেছিলো; কাজটা জটিল হওয়ায় বা আইনগত বাধ্যবাধকতা থাকায় সম্পাদন করতে দেরি হয়েছে বা করা যায়নি।
এটাও হতে পারে। আমি উভয় যুক্তি দিয়েই হাই কমান্ডকে বুঝাতে চেষ্টা করবো।
তবে..।
তবে?
কর্মচারীদের মাঝে একটা হতাশা ও চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে স্যর।
কেনো?
যত দিন যাচ্ছে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মচারিদের মাঝে বেতন-ভাতাদি ও অন্যান্য সুবিধাদির বিস্তার ফারাক তৈরি হচ্ছে। আমাদের দেশে জিনিসপত্রের দাম বাড়তেই থাকে এবং একবার বাড়লে তা কখনো কমে না। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মচারিদের বেতন এমনিতেই বেশি থাকে। তাছাড়াও কোন কারণে জিনিসপত্রের দাম বেড়ে গেলে সাথে সাথে বেতন-ভাতাও বেড়ে যায়। সচিব হিসেবে আপনি সরকারি বেতন কাঠামোয় সর্বোচ্চ বেতন পাচ্ছেন-আটাত্তর হাজার টাকা। এই পর্যায়ে আসতে আপনাকে পচিশ বছর চাকরি করতে হয়েছে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে সাত বছর চাকরি করলেই এর চেয়ে বেশি বেতন পাওয়া যায়। আর সুযোগ সুবিধার কথা বলা বাহুল্য। আগে সরকারিভাবে গাড়ি কেনার জন্য যে অগ্রিম দেয়া হয় তা দিয়ে দুটো টায়ারও কেনা যেতো না; সম্প্রতি উপ-সচিব থেকে উপরের কর্মকর্তাদের জন্য হায়ার পারচেজে গাড়ি কেনার জন্য অগ্রীম দেয়া হচ্ছে; প্রতুল হলেও পছন্দের গাড়ি ক্রয় করতে হলে কমপক্ষে পাঁচ থেকে দশ লক্ষ টাকা যোগ করতে হবে। সবার হাতে কি ঐ টাকা আছে? আমার কাছে নেই স্যর। তাই জিও তুলেও সারেন্ডার করে দিয়েছি। অপরদিকে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে বাজার মূল্যের সাথে সঙ্গতি রেখে অগ্রীম দেয়া হয়, সাথে ড্রাইভার পোষার খরচ ও মাসিক মেইনটেনেন্স খরচও থাকে। এভাবে চলতে থাকলে আগামী দশ বছর পর সরকারি প্রতিষ্ঠানে কোন মেধা খুঁজে পাওয়া যাবে না। মিড লেভেল থেকে টপ লেভেলের কর্মকর্তারা উচ্চ বেতনে সরকারি চাকরি ছেড়ে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চলে যাবে। এখনই কিছু কিছু চলে যাচ্ছে স্যর।
সচিব সামান্য নড়েচড়ে বসে বললেন, তোমার কথাগুলো খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। আগামী সচিব কমিটির সভায় এই বিষয়টি নিয়ে কথা বলবো। গভমেন্ট অর্গানাইজেশনকে পঙ্গু করা যাবে না কিছুতেই। তুমি এখন যেতে পারো।
বদরুল হায়দার সালাম জানিয়ে সচিবের অফিসকক্ষ থেকে বের হয়ে গেলেন।


শারমিন শিলা রিকশা থেকে নেমে পার্স খুলে ভাড়া দিয়ে হাতঘড়ি দেখলেন। দশটা বেজে সাত মিনিট। মনে মনে বললেন: সাড়ে এগারটার মধ্যে কেনাকাটা শেষ করে বাসায় পৌঁছতে হবে; জায়েদকে নিয়ে যেতে হবে কোচিং সেন্টারে। বাজারের গেটের গোড়ায় এক অন্ধ মেয়ে ভিক্ষে করে; শারমিন বাজারে এলেই প্রথমে ওকে দু’ টাকার একটা নোট দেন। আজও এর ব্যতিক্রম হলো না। তিনি পার্স থেকে ফর্দটা বের করলেন। আগে কিনতে হবে মাছ। মাছ কিনতে গেলে বিরক্ত লাগে এখন। দর কষাকষি শব্দটা এসেছে মাছবাজার থেকেই। কিন্তু এখন মাছের বাজারে দর কষাকষি চলে না-ডিপার্টমেন্ট স্টোরের মতো মাছও একদরে বিক্রি হচ্ছে। দর কষাকষি করতে গেলেই মাছ বিক্রেতার করুণার পাত্র বা হাস্যস্পদে পরিণত হতে হয়।
শারমিন শিলা মাছ মহালে ঢুকলেন। আজও মাছের সরবরাহ কম। প্রাকৃতিক মাছ নেই। নদী-নালা-খাল-বিল গুলো অকালে শুকিয়ে পড়ায় এবং ইজারা দেয়ায় প্রাকৃতিকভাবে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত মাছ নেই বললেই চলে। সেকারণে মলা-ঢেলা-কাইকা-কালিবাউস এবং অন্যান্য ছোট মাছও বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। সব মাছ চাষ করা; স্বাদহীন। তবুও খেতে হয়। উপায় নেই। আর কয়েক বছর পর শিশুদের যাদুঘরে দেশি মাছ দেখাতে হবে। এমনটা হচ্ছে কেনো?
শারমিন শিলা প্রথমে এক চক্কর দিলেন মাছ মহালে। গার্মেন্টস ফ্যাক্টটরিতে কাজ করে এমন একটা মেয়ে ছোট ছোট পুটি মাছ কেনার জন্য এক বিক্রেতাকে বললেন, কুড়ি টাকার মাছ দেন।
মাছ বিক্রেতাটি তাচ্ছিল্যের সাথে বললেন, কুড়ি টাকার মাছ নাই। এক পোয়া ত্রিশ টাকা।
মেয়েটা মাছ বিক্রেতাকে এক দৃষ্টে দেখে মুখ ভার করে অন্যদিকে চলে গেলো। পাশেই শুটকরি মহাল।
শারমিন শিলা মনে মনে বললেন: মেয়েটাকে সাহায্য করতে পারলে ভালো লাগতো; কিন্তু এটা করা ঠিক হবে না এবং মেয়েটা নেবেও না; এতে ওর সামর্থ্যে আঘাত করা হবে; তাছাড়া এটা একবার করলেই শেষ হয়ে যাবে না-ওকে এর মাঝেই বেঁচে থাকতে হবে; জিনিসপত্রের দাম আরো বাড়বে এবং ওদের নাভিশ্বাস বৃদ্ধি পাবে; আমরাও কি ভালো অবস্থায় আছি? একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস চেপে তিনি এক বিক্রেতার সামনে দাঁড়ালেন। জিজ্ঞেস করলেন, রুই মাছের কেজি কত ভাই?
মাছ বিক্রেতা পাশাপাশি দুই ধরনের আকারের মাছ দেখিয়ে বললেন, এটা তিন শ দশ আর এটা তিন শ ত্রিশ টাকা কেজি।
কিছু কম হবে?
একদাম আপু।
আগে শুধু বাটা সু’র দোকানে একদাম ছিলো; এখন আপনারাও একদাম বানিয়ে ফেললেন?
দর কষাকষি করতে ভাল্লাগে না আর। অনর্থক ফালতু প্যাচাল।
পাঙ্গাসের কেজি কত?
বড়টা দুই শ পঞ্চাশ আর ছোটটা দুই শ দশ টাকা আপু।
বড়টা মাস ছয়েক আগেও এক শ টাকা ছিলো। কী এমন হলো যে মাছের দাম এভাবে বাড়াচ্ছেন?
দাম কি আমরা বাড়াই আপু! খামার মালিকরা আর পাইকাররা একগাট্টা হয়া দাম বাড়ায় দেয়।
বুঝতে পেরেছি। গরীবের হাত থেকে মাছ খাওয়া ছুটে যাবে। শুধু শাক ভাত খেতে হবে।
মাছ বিক্রেতা একটা দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে বললেন, তারও কি উপায় আছে আপু! এক মুঠো লাল শাক কুড়ি টাকা। আর কোন তরকারিই আশি টাকা কেজির নিচে নাই। এইভাবে চলতে থাকলে কয়দিন পর খালি নুন দিয়া ভাত খেতে হবে। কাঁচা মরিচের দামও সোনার মতো হয়া যায় মাঝে মাঝে! কিছুদিন আগে মাটির লাহান আলুও যা দেখাইলো না!
ঠিক কথাই বলেছেন আপনি ভাই। আপনি আমাকে দুটো ছোট পাঙ্গাস দেন। কেটে দিতে হবে।
বড় রুই মাছটা নিয়া যান আপু। আপনার জন্য তিন শ কুড়ি টাকা কেজি নেবো।
নাহ। জিনিসপত্রের দাম বাড়লেও সবার কি আর আয় বাড়ে? তাই বাজেট ঠিক রাখতে খাওয়া কমিয়ে দিতে হয়। আমাকেও তাই করতে হচ্ছে প্রতিদিন প্রতিমাস।
মাছওয়ালা বিরাট এক দাও বের করলেন গদির নিচ থেকে। চকচক করছে পুরো দাও। শারমিনা শিলা দাওটার দিকে তাকিয়ে মনে মনে বললেন: এদের দা এমন চকচকে আর ধারালো থাকে কিভাবে? বড় মাছ কাটার বড় শখ হয় মাঝে মাঝে। এমন একটা দা থাকলে কি আমিও এদের মতো ঝটপট মাছ কাটতে পারবো? লোকটা মাছ কাটছে যেনো কচুর ডগা কাটছে। পাঁচ মিনিটেই মাছ কাটা শেষ। নিচের একটা খাঁচা থেকে পলিথিনের ব্যাগ করে মাছের টুকরোগুলো তুলে শারমিন শিলার দিকে বাড়িয়ে ধরলেন মাছওয়ালা।
শারমিন শিলা জিজ্ঞেস করলেন, কত হয়েছে আমার?
এক কেজি চারশ পঞ্চাশ। মোট দাম দুই শ ছাব্বিশ টাকা পঞ্চাশ পয়সা। আপনি দুই শ পচিশ টাকা দেন আপু।
দেড় টাকা কম দেবো কেনো? দেড় টাকার জন্য আপনার দয়া নেবো কেনো? আপনি পুরো টাকাই নেবেন।
শারমিন শিলা পার্স খুলে দুই শ সাতাশ টাকা মাছবিক্রেতাকে দিলেন।  
মাছবিক্রেতা টাকাটা নিয়ে শারমিন শিলার দিকে তাকিয়ে বললো, আট আনা খুচরা নাই আপু।
না থাকারই কথা। খুচরা হলে আট আনা ভিক্ষুককে দিয়ে দেবেন।
শারমিন শিলা হাটছেন। মাছবিক্রেতা ওর দিকে তাকিয়ে রইলো। শারমিন শিলা মাছমহালের পাশের গলিতে গেলেন। মনে মনে বললেন: কাচকি মাছ নিতে হবে। গুড়ো মাছের মধ্যে এখনো কাচকিটা আর মলা পাওয়া যাচ্ছে। মাছবিক্রেতা কাচকি মাছের ভাগা দিয়ে বসে আছে। শারমিন শিলা জিজ্ঞেস করলেন, আড়াই শ কত?
পঞ্চাশ টাকা পোয়া।
চল্লিশ টাকায় হয় না?
ভাগা নিয়া যান আপু। কুড়ি টাকা ভাগা। চাইরডা কাচকিও দিয়া দিমু নে।
কী বলছেন আপনি! কয়েকটা কাচকি মাছ ভিক্ষা দিতে চান আমাকে? মাছের দাম যতই বাড়ুক আপনি মাছ বিক্রি করবেন, আর আমি ক্রেতাই থাকবো। মনে রাখবেন ক্রেতা সবসময় বিক্রেতার চেয়ে উপরেই থাকবে। আপনাদের গডফাদাররা যতই সিন্ডিকেট করে জিনিসপত্রের দাম বাড়াক না কেনো, ওরা বিক্রেতাই আর একজন গার্মেন্ট কর্মি যতই গরিব হোক না কেনো সে ক্রেতাই।
আশেপাশের ক্রেতা-বিক্রেতাগণ অবাক চোখে শারমিন শিলার দিকে তাকিয়ে রইলেন। শারমিন শিলা কাচকি মাছ না কিনে মাছ মহাল থেকে বেরিয়ে এলেন।
তরকারি মহালে এসে মিষ্টি কুমড়োর দাম চল্লশি টাকা কেজি শুনে ক্ষেপেই গেলেন শারমিন শিলা, আরে! এ কী বলছেন আপনি? এক সপ্তাহ আগে এটার কেজি ছিলো ত্রিশ টাকা। ছয় মাস আগের কথা বাদই দিলাম। কী এমন হলো যে এক সপ্তাহে কেজি প্রতি দশ টাকা বেড়ে গেলো? দেশটা মগের মুল্লুক হয়ে যাচ্ছে নাকি?
পরিবহন খরচ বাইড়া গেছে আপু।
পরিবহন খরচ বাড়বে কেনো? তেল-গ্যাসের দাম বেড়েছে? উল্টো বিশ্ব বাজারে এগুলোর দাম কমছে; যদিও বাংলাদেশে এর প্রভাব পড়ে নি।
অন্যান্য দোকানের ক্রেতারাও শারমিন শিলার দুই পাশে এসে প্রতিবাদে সামিল হলো। একজন বললেন, দেশটা মগের মুল্লুকই হয়ে যাচ্ছে আপা। ব্যবসায়ীরা ইচ্ছেমতো জিনিসপত্রের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে। সরকার সেমিনারে-সিম্পোজিয়ামে হুশিয়ারি উচ্চারণ করে; কিন্তু সরকারের ধমক কানেই দেয় না ওরা।
আরেকজন বললেন, সিন্ডিকেট ভাইজান। এসব সিন্ডিকেটের গুণ! ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের কাছে সরকারও জিম্মি।
এক ভদ্রমহিলা বললেন, শুধু সিন্ডিকেট না, এখন দেশ-ই চালাচ্ছে ব্যবসায়ীরা। ব্যবসায়ীর মেয়র হচ্ছে, এমপি হচ্ছে মন্ত্রী হচ্ছে এবং নিজেদের মতো করে জিনিসপত্রের তথা বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে।
আরেক ভদ্রমহিলা বললেন, শুধু ভোক্তার কোনো সিন্ডিকেট নাই। যদি আমরাও ওদের মতো একগাট্টা হয়ে বলতে পারতাম  এক সপ্তাহ মাছ-তরকারি কিনবো না, মাংশ কিনবো না। তাহলে বুঝতে পারতো সবসময় ওদের ইচ্ছাই কাজ করবে না।
আরেকজন বললেন, এটা কখনো আমাদের দেশে হবে না। কারণ এর জন্য দরকার একটা শক্তিশালি নেতৃত্ব। কে দেবে এই নেতৃত্ব? কেউ নেই। কারণ আমরা সবাই দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধিতে এফেক্টেড না। যারা বড়লোক তাদের কোন দুশ্চিন্তা নেই; যারা সরকারে আছে তাদের তো নেই-ই। কারণ, সরকারের মন্ত্রী-এমপিরা কখনো বাজার করতে যায় না। এটাই আমাদের দুর্ভাগ্য।
একজন দোকানদার বললেন, আনাজ-তরকারির দাম বাড়ায় আপনারা আমাদের গালিগালাজ করেন। কিন্তু আমরা কী করতে পারি কন। বিভিন্ন অজুহাতে মহাজন দাম বাড়ায়া দেয়। আমি কত সুন্দর সুন্দর তরকারি বিক্রি করি। কিন্তু আমি এর কিছুই খাইতে পারি না।
শারমিন শিলা বললেন, আজ সকালে বিভিন্ন পেপারে সংবাদ এসেছে কুমল্লিায় এক টাকা কেজি দরেও টমেটো বিক্রি করতে না পেরে এক কৃষক খাঁচা ভর্তি টমেটো নর্দমায় ফেলে দিয়ে গেছে। কিন্তু এখানে দেখেন টমেটোর কেজি আশি টাকা। কুমল্লিা থেকে এক কেজি টমেটো আনতে কি পঞ্চাশ টাকা খরচ পড়ে?
পাশের এক তরকারিওয়ালা বললেন, আমাদের কী দোষ কন আপু? আমরা কাওরান বাজার থাইকা তরকারি আনি। কোন দরদাম করার উপায় নাই। পাল্লা ধইরা তরকারি কিনতে হয়। এক পাল্লা তরকারির মধ্যে পঁচা তরকারিও থাহে। তারপর পরিবহন খরচ। সরাসরি ভ্যান পিকাপ ভাড়া নেওয়ার উপায় নাই। দালাল ধরতে হইবো। সবখানে দালাল। দালাল না থাকলে জিনিসপত্রের দাম আরো কিছুটা কম থাকতো। এরপর মোড়ে মোড়ে পুলশিরে চাঁন্দা। মাল-বোঝাই ভ্যান বা কোনো গাড়ি দেখলে পুলিশ আটকাবোই।
মধ্যবয়সি এক গার্মেন্ট কর্মি বললেন, সবই আমাগো কপাল আপু। আামাগো পক্ষে কেউ নাই। ভোটের সমায় ভোটটা নেওনের লাইগ্যা বাড়িতে নেতাগো আনাগোনা বাইরা যায়। ভোটটা শেষ হইলেই ওগো আর দেখা যায় না। বাড়িতে দেখা করতে গেলে সারাদিন বইসা থাইকাও দেখা পাওয়া যায় না।
একজন পুরুষ ক্রেতা বললেন, খাঁটি কথা কইছো তুমি সিস্টার। আমাদের এসব মনে করে আফসোস করেই যেতে হবে সারা জীবন। আমাদের কপালে এরকমই লেখা আছে।
শারমিন শিলা বুঝলো প্রতিবাদ আর প্রতিবাদের ভাষায় কোনো ব্যতিক্রম নেই। কিন্তু এভাবে প্রতিবাদ করে কী হবে? যাদের কানে পৌঁছলে কিছুটা কাজ হতো, তাদের কানে তা কখনোই পৌঁছবে না। এখানে এভাবে প্রতিবাদ আরো এগিয়ে নেয়া নিরর্থক বুঝতে পেরে শারমিন শিলা পাশের দোকানে চলে গেলেন। অন্যান্য ক্রেতারা একে একে চলে গেলো কেনা-কাটায়।
শারমিন শিলার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এক ক্রেতা কাঁচা মরিচ কিনে বললেন, আর দুইটা কাচা মরিচ দিয়ে দেন ভাই!
শারমিন শিলার ব্যাপারটা পছন্দ হলো না। তিনি কিছুক্ষণ আগে মাছের মহালে মাছবিক্রেতা কিছু কাচকি মাছ দিতে চাইলে প্রতিবাদ করেছেন। তিনি ক্রেতাটির দৃষ্টি আকর্ষণ করে বললেন, আপনি বিক্রেতার দয়া চাচ্ছেন কেনো ভাই সাহেব? ক্রেতার হাত সর্বদা রাজার হাতের মতো। আর বিক্রেতা প্রজার মতো ক্রেতার দয়া চাইবে। কিন্তু এখন চলছে উল্টোভাবে।
ক্রেতাটি অসহায় কণ্ঠে বললেন, আর পারছি না আপা। মাঝে মাঝে মনে হয় সংসার ছেড়ে বনবাসে চলে যাই। কিন্তু উপায় নাই। সংসার ধর্ম শুরু করে দিলে আর ছাড়া যায় না।
কথা তো ভালোই বলেন দেখছি। তাহলে নিজের সম্মানের প্রতিও একটু নজর রাখেন! দুটো কাঁচা মরিচ বেশি না দিলে কিছুই ক্ষতি হবে না আপনার।
ধন্যবাদ আপনাকে আপা। আপনার আগের কথাগুলোও আমি শুনেছি। সবই সত্য। কিন্তু হাত টানাটানির কাছে নীতিকথা নীতিবোধ সম্মানবোধ থাকে না। মাঝে মাঝে নিজকে বড্ড অসহায় লাগে।
শারমিন শিলা আর কিছু না বলে প্রয়োজনীয় আনাজ-তরকারি কিনে চলে এলেন ডিমের মহালে। এক দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে মনে মনে বললেন: এক মাস ডিম না খেলে কী হবে? কিছু হবে কি? দেখি না কী হয়! বিক্রেতার আহ্বান এড়িয়ে চলে এলেন মুদি দোকানে। তিনি এই দোকান থেকে সবসময় চাল-ডাল-তেল-লবন ইত্যাদি কিনে নেন। ফর্দটা দোকানিকে দিয়ে ব্যাগগুলো দোকানের ভেতরে ফাঁকা জায়গায় ফেলে দিলেন।
দোকানি ফর্দটায় একবার চোখ বুলিয়ে বললেন, ফর্দয় কোনো ভুল হয় নাই তো আপু?
কেনো? ভুল হবে কেনো?
গুড়া দুধ নাই, এরোসোল নাই আর সবকিছুই পরিমাণে কম কম।
দুধ এরোসোল, মশার কয়েল ইত্যাদি বাদ দিযে অন্যান্যগুলোর পরিমাণ কমিয়ে মোট দাম কত আসে বলনু তো শুনি?
দোকানি ক্যালকুলেটর নিয়ে হিসেব কষে মোট মূল্য বললে শারমিন শিলা ফের বললেন, তার মানে এতকিছু বাদ দেবার পরও টাকার পরিমাণ কমে নি। এবার বুঝেন আপনারা জিনিসপত্রের দাম কিভাবে বাড়াচ্ছেন। তাছাড়া এরোসোল বা মশার কয়েল নিয়ে কী করবো। এগুলোয় এতো ভেজাল যে মশা তো মরেই না, উল্টো আরো বেশি করে কামড়াতে আসে।
দোকানি দোকানের পণ্যগুলো ডানহাতের তর্জনী দিয়ে দেখিয়ে বললেন, এই দেখেন, আমার দোকানের একটা জিনিসও আমি উৎপাদন করি না, আমদানি করার ক্ষমতাও আমার নাই। বেশি পরিমাণে কিনে স্টক করে দাম বাড়াইয়া বিক্রি করুম, এতো টাকাও আমার নাই। এই বাজারের সবারই আমার মতো অবস্থা। অথচ কাস্টোমাররা সবাই দাম বাড়ার জন্য আমাগো দোষ দেয়। ব্যবসা করতে আইসা কত যে গাইল খাইতাছি, তা মাবুদই জানে!
তাহলে দাম বাড়ায় কে?
মহাজনরা দাম বাড়ায়। ওগো সাথে আমরা কিছুই করবার পারি না আপু। বড় কষ্ট লাগে যখন মহাজন দাম বাড়ায়। কারণ আমাকেও তো সংসার খরচের জন্য এই দামে জিনিস কিনতে হয়।
দোকানদারের কথার যথার্থতা বুঝতে পেরে শারমিন শিলা থতমত খেলেন। তিনি কণ্ঠ স্বাভাবিক করে জিজ্ঞেস করলেন, আপনারা প্রতিবাদ করতে পারেন না?
আমাদের প্রতিবাদ ওরা পাত্তাই দেয় না। ওদের সিন্ডিকেট খুবই শক্তিশালি।
আপনাদের মতো খুচরা দোকানদারদের কোনো সংগঠন নেই? আপনারাও ওদের মতো সিন্ডিকেট করে প্রতিবাদ করুন। খুচরা দোকানদাররা জোরালেভাবে প্রতিবাদ করে সাপ্লাইয়ারদরে নিকট থেকে মাল কেনা বন্ধ করে দিলে দেখতেন কেমন কাজ হয়।
ব্যাপারটা নিয়ে এভাবে আমরা কখনো ভাবি নাই। সমিতির সভাপতির সাথে ব্যাপারটা নিয়া কথা কমু। দেখি কাম হয় কিনা।
কেবল আপনাদের দোষছি কেনো। আমাদের মাঝেও কি ইউনিটি আছে? আমরা ভোক্তারা যদি একত্রিত হয়ে জোড়ালো প্রতিবাদ করতে পারতাম। যদি বলতে পারতাম শাকসব্জির দাম না কমালে সাতদিন র্পযন্ত আমরা কোনো শাকসব্জি কিনবো না। তখন শাকসব্জির কী দশা হতো ভাবুন তো একবার।
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একজন ক্রেতা বললেন, আপনি ঠিক কথাই বলেছেন আপা। কিন্তু আমরা একত্রিত হতে পারবো না। যেকোন অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে হলে একজন ত্যাগি নেতার প্রয়োজন হয়। ভোক্তাদের মাঝে তেমন কেউ কি ত্যাগ স্বীকার করে নেতা হতে আসবেন?
শারমিন শিলা ভদ্রলোকটির দিকে তাকিয়ে বললেন, পত্র-পত্রিকায় মাঝে মাঝে ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ কমিটির নামে কিছু কার্যক্রম দেখি। আজ র্পযন্ত ভোক্তাদের একত্রিত করার জন্য সাধারণ মিটিঙের আহ্বান করা হয় নি।  
আমারও তাই মনে হয় আপা। আপনাকে দেখে মনে হচ্ছে আপনি বেশ প্রতিবাদি ও শক্ত মহিলা। আপনি কি এগিয়ে আসবেন ভোক্তাদের পক্ষে যথার্থ নেতৃত্ব দেবার জন্য?
কথাটা শুনে চমকে উঠে শারমিন শিলা বললেন, আমি!? এ-এভাবে আ-আমি ব্যাপারটা কখনো ভাবি নি।
এই দেখেন, আপনিও এগিয়ে আসছেন না। এভাবেই সাধারণ ভোক্তাদের কেহই ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের অমানবিক মুনাফা অর্জনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে এগিয়ে আসে না। এ কারণেই ভোক্তাদের দুর্ভোগ কখনো কমবার নয়।
শারমিন শিলা ভদ্রলোকটির দিকে তাকিয়ে বললেন, এভাবে বলবেন না ভাই। আমাকে দুটো দিন সময় দিন। আগামী পরশু ঠিক এসময় এখানে আমার মতামত জানাবো। একটা কথা। আমি যদি নেতৃত্ব দিতে রাজি হই তাহলে আপনি কি আমাদের সাথে থাকবেন?
ভদ্রলোকটি বললেন, আমি কেনো আমার মতো সকল ভোক্তাই আপনার সাথে থাকবে। আমরা সাধারণ ভোক্তারা দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির যাতাকলে পিষ্ট হতে হতে অতিষ্ঠ হয়ে গেছি। আমাদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। এখন শুধু দরকার একটা প্রতিবাদি কন্ঠের। দেখবেন কী র্পযন্ত সাড়া পড়ে।
আশে পাশের ভোক্তারাও প্রায় সমস্বরে বললেন, এই ভাই ঠিক কথাই বলেছেন। আমরাও আপনার পাশে থাকবো আপা।
শারমিন শিলা সবাইকে একবার দেখে বললেন, ভেবে দেখি। এখন আপনারা নিজ নিজ কেনাকাটা করতে যান। আমার কেনাকাটা প্রায় শেষ। আগামী পরশু এখানে আবার দেখা হবে আমাদের নতুন কিছু করার প্রত্যাশায়। ধন্যবাদ সবাইকে।

পরদিন সকাল আটটায় পত্রিকা হাতে নিয়ে প্রথম পাতাটা দেখে ভীষণ রকম চমকে উঠলেন বদরুল হায়দার। পত্রিকার প্রথম পাতায় শারমিন শিলার ছবি; তরকারি মহালে দাঁড়িয়ে বাজারের ব্যাগ হাতে কতক ক্রেতার সাথে কথা বলছে। তিনি নিচের খবরটা পড়ে শারমিন শিলাকে ডাক দিলেন।
শারমিন শিলা রান্নাঘর থেকে সাড়া দিলেন, আসছি। এক মিনিট।
শারমিন শিলা কিচেন-এপ্রনে হাত মুছতে মুছতে ড্রংয়িরুমে ঢুকে বদরুল হায়দারকে জিজ্ঞেস করলেন, কী ব্যাপার? কোনো ইন্টারেস্টিং নিউজ?
ইয়েস মাই ডার্লিং।
কী সেটা?
তুমি।
মানে?
তোমাকে নিয়েই নিউজ। এই দেখো ফ্রন্ট পেজে তোমার চমৎকার একটা ছবিও দিয়েছে। এই দেখো।
শারমিন শিলা পত্রিকাটা হাতে নিয়ে গতকালের বাজারের ব্যাগ হাতে ওর ছবিটাকে দেখে হাসি এলো প্রথমে। সংবাদটা পড়ে পত্রিকাটা পাশে রেখে বললেন, ঠিক কথাই লিখেছে।
বদরুল আলম পত্রিকাটা একবার দেখে বললেন, শেষের মন্তব্যটা দেখেছো? আকারে ইঙ্গিতে এই আন্দোলনে তোমাকে নেতৃত্ব দেয়ার কথা বলা হয়েছে। দেবে তুমি নেতৃত্ব?
শারমিন শিলা বদরুল হায়দাররে মুখোমুখি সোফায় বসে বললেন, এই আন্দোলন শুরু হলে দানা বাঁধা কি সম্ভব?
সিন্ডিকেটের আগ্রাসি মুনাফার কাছে সমাজের সবাই এফেক্টেড। একটা আন্দোলন হওয়া দরকার। কিন্তু নেতৃত্ব দেবে কে? তোমার নেতৃত্ব কি মানুষ মেনে নেবে? তাছাড়া তুমি নেতৃত্ব দিতে সাহস পাও?
সাহস না পাওয়ার কী আছে? তবে এতো আগে ভাববার দরকার নেই। আজকের পত্রিকার খবর কালকেই মানুষ বেমালুম ভুলে যাবে। আমি কিচেনে গেলাম। তোমার গোসলের গরম পানি হয়ে গেছে। বাথরুমে দিয়ে দেবো কি?
একটু আঁচ কমিয়ে রাখো। পেপারটা এখনো পুরো দেখা হয়নি।
ওকে।
বদরুল হায়দার পত্রিকায় একবার চোখ বুলিয়ে বাথরুমে গরম পানি দেবার কথা বলে চলে যেতে থাকলেন শোবার ঘরের দিকে। শরিফা বাথরুমে পানিটা রেখে যেতেই ঢুকে গেলেন। দাড়ি কামিয়ে গোসল সেরে বেরিয়ে এলেন বাইরে। ওয়ারড্রোব থেকে অফিসে যাবার কাপড় বের করে পাশের কক্ষে ঢুকে দরজা লাগিয়ে কাপড় পাল্টে তৈরি হয়ে উচু গলায় বললেন, আমি অফিসে যাবার জন্য তৈরি। টিফিন বক্সটা রেডি করো শারমিন! সাথে নাস্তাও। আমার বড় বাবাটা এখনো ঘুম থেকে উঠলো না যে!
শারমিন রান্নাঘরের দিক থেকে বললেন, তুমি আরেক গ্রাম কণ্ঠ উচিয়ে কথা বললে এখনই উঠে যাবে তোমার বড় বাবা। সাথে ছোট বাবাও। তখন তোমাকেই টিফিন বক্স রেডি করতে হবে।  
বদরুল হায়দার শয়নকক্ষে ঢুকে মশারির নিচে ঘুমিয়ে থাকা দুই পুত্রের দিকে তাকিয়ে মনে মনে বললেন: বেঁচে থাকো তোমরা বাবা; কিন্তু তোমরা যখন বড় হবে তখন দেশের কী অবস্থা হবে ভাবতে পারি না বাবারা। তিনি মশারি তুলে ভেতরে মাথা ঢুকিয়ে দুজনের কপালে আলতো করে চুমু খেয়ে বেরিয়ে এলেন ডাইনিং স্পেসে। শারমিন ওর টিফিনবক্স তৈরি করছে।
বদরুল হায়দার চেয়ার টেনে বসতে বসতে বললেন, তুমিও নাস্তা খেয়ে নাও।  
শারমিন বললেন, তুমি শুরু করো। আমি টিফিনবক্সটা রেডি করে বসছি।
বদরুল হায়দার এক বাটি সব্জি এবং একটা আটার রুটি নিয়ে বসলেন। এটাই তাঁর সকালের নাস্তা। তিনি এক কামড় রুটরি সাথে এক চামচ সব্জি খাচ্ছেন। শারমিন শিলা টিফিন রেডি করে ব্যাগে ঢুকিয়ে পাশের চেয়ারটা টেনে নাস্তা খেতে বসলেন। তিনিও বদরুল হায়দাররে মতো একটা রুটি ও একবাটি সব্জি নিয়ে বসলেন।
শারমিন শিলা নাস্তা খেতে খেতে জিজ্ঞেস করলেন, অফিস শেষে কোথাও যাবে তুমি?
এখনো কোনো প্ল্যান নেই। অফিসে গিয়ে প্রোগ্রাম পড়ে গেলে যেতেই হবে। তোমার তো আজ কলেজ ছুটি?
কলেজ ছুটি না, তবে আমার আজ কোনো ক্লাশ নেই।
তোমরাই ভালো আছো। ক্লাশ না থাকলে কলেজে যাবার দরকার পড়ে না।
নদীর এপার কহে ছাড়িয়া নিঃশ্বাস, ওপারে সুখ আছে আমার বিশ্বাস।
বদরুল হায়দার কিছু না বলে মুচকি হাসলেন শুধু। নাস্তা সেরে উঠে ব্যাগটা খুলে দেখলেন পানিও দেয়া হয়েছে।
শারমিন শিলা জিজ্ঞেস করলেন, কী দেখলে তুমি ব্যাগ খুলে?
পানি দিয়েছো কিনা দেখলাম।
কোনদনি কি আমার ভুল হয়েছে এ ব্যাপারে?
না শারমিন।
তারপও তুমি দৈনিক দেখো। জিজ্ঞেস করলে বলো আর দেখবো না। কিন্তু প্রতিদিনই তুমি দেখো। বদ অভ্যাস!
বদরুল হায়দার ব্যাগটা হাতে ঝুলিয়ে বললেন, গেলাম। আল্লাহ হাফেজ।  
শারমিন শিলা নাস্তা শেষ না করেই উঠে এলেন। বদরুল হায়দার দরজা খোলে স্ত্রীকে আলতো চুমু খেয়ে বেরিয়ে এলেন ঘর থেকে। সিঁড়ি ভেঙ্গে নেমে এলেন নিচে। ভবনের বাইরে আসতেই ড্রাইভার শফিক ওর হাত থেকে ব্যাগটা নিয়ে দরজা খোলে দিলে বদরুল হায়দার গাড়িতে উঠলেন। গাড়ির পেছনের দিক দিয়ে দ্রুত ঘুরে শফিক দরজা খোলে পাশের সিটে ব্যাগটা রেখে ড্রাইভিং সিটে বসে গাড়ি ছেড়ে দিলো। বদরুল হায়দার সিটের পেছনের বনেটের উপর থেকে হাসান আজিজুল হকের ‘আগুনপাখি’ উপন্যাসটা নিয়ে পড়তে থাকলেন। বিজয় সরণীতে গাড়ি পড়তেই বই বন্ধ করে চোখ বুজে নিলেন। বাকি পথটুকুয় ঘুমুবেন। এভাবেই তিনি নিত্য অফিসে যান। বাংলা মোটর আসতেই ওর মোবাইল ফোন বেজে উঠলে বিরক্ত হয়ে নম্বরটা দেখে বিরক্তি চেপে গেলেন: সহকর্মী বন্ধু লুৎফরের ফোন। এন্টার বাটন চেপে মোবাইল ফোন অন করে কানে ঠেকিয়ে বললেন, আসসালামু আলাইকুম। কেমন আছো বন্ধু?
লুৎফর জহির বললেন, ভালো আছি ফ্রেন্ড। তুমি কি অফিসে?
এখনো পৌঁছতে পারি নি। বাংলা মোটর র্পযন্ত আসতে পেরেছি।
ভাবির একটা নিউজ দেখলাম ভোরের চা পত্রিকায়। চমৎকার! ভাবি কি নেতৃত্ব দেবেন?
সাহস আছে। প্রয়োজনে নেতৃত্ব দেবেন। তবে এসব দানা বাঁধবে না। তুমি কি অফিসে এসেছো?
আমি আজ ছুটি নিয়েছি।
হঠাৎ ছুটি কেনো?
আমার বড় শালাটা অস্ট্রেলিয়া যাচ্ছে। ওকে সি অফ করতে এয়ারপোর্টে যেতে হবে। এ উপলক্ষে সারাদিন বাসায় হৈ চৈ খাওয়া দাওয়া হবে।
অ। এনজয় ইয়োরসেলফ উইথ শালা! বাই। রাখলাম।
আরে আরে! আসল কথাই তো বলা হয়নি।
কী কথা?
তুমি সন্ধ্যার পর বাসায় আছো?
তুমি জানো আমি বিশেষ প্রয়োজন না হলে সন্ধ্যার পর বাইরে যাই না।
সেই বিশেষ প্রয়োজন আজ নেই?
না নেই।
গুড। তাহলে এয়ারপোর্ট থেকে ফেরার পথে তোমার বাসায় আসবো। আসবো?
আসবে না মানে? অবশ্যই আসবে এবং রাতের খাবারটা খেয়ে যেতে হবে।
ডিনারে স্পেশাল আয়োজনের প্রয়োজন নেই। ডাল-ভাত হলেই চলবে।
তুমি আসো। ডাল-ভাতটা দেশের একটি দলের স্লোগান। তাই ডাল-ভাতের সাথে একটা মাছের আইটেমও থাকবে।
ওকে। বাই।
মোবাইল ফোনে লুৎফর জহিরের লাইন কেটে দিয়ে শারমিন শিলাকে ফোন করলেন। হ্যালো? শারামিন? তুমি কোথায়?
শারমিন শিলা বললেন, সকালে বলেছি আজ আমার ক্লাশ নেই। সারাদিন বাসায়ই থাকবো। বিকেলে কয়েকজন ছাত্রী আসবে। ওদের কিছু লেসন দেবো।
শোন। লুৎফর জহির ফোন করেছিলো কিছুক্ষণ আগে।
লুৎফর জহির ভাই! চমৎকার একটা মানুষ। বহুদিন উনার সাথে দেখা হয় না।
আজ রাতে দেখা হবার একটা চান্স আছে।
উনি বাসায় আসবেন। তাই না?
তুমি খুব বুদ্ধিমতি মাই ডিয়ার ওয়াইফ।
রাতে ডিনারের আয়োজন করতে হবে।
কোন স্পেশাল ডিস করার প্রয়োজন নেই। ডাল-ভাতের সাথে একটা শাদামাটা মাছ।
নো প্রবলেম। কজন আসবেন?
নিশ্চয়ই পুরো ফ্যামিলি!
ভাই ভাবি আর দুই পিচ্চি সন্তান। ঠিক?
ইয়েস!
ডোন্ট ওরি। এখন রাখবো? তুমি কদ্দূর গিয়েছো?
এইমাত্র মৎস ভবন ক্রশ করছি। বাই।
ফি-আমানিল্লাহ। সাবধানে আসা-যাওয়া করো।
ডোন্ট ওরি। মোটা টাকার জীবন বীমা করা আছে।
সব ক্ষতি টাকায় পূরণ হয় না ডিয়ার।
বলেই শারমিন শিলা মোবাইল ফোনের লাইন কেটে দিলেন। বদরুল হায়দার মোবাইল ফোনরে দিকে তাকিয়ে রইলেন। ওর চোখের সামনে শারমিন শিলার চেহারাটা ভাসছে। পরম ভালোবাসায় চোখের কোলে অশ্রু চলে এসেছে ওর। তিনি একবার নাক টেনে চোখ বুজলেন। চোখের পানি মুছতে ইচ্ছে করলো না ওর।
অফিসে ঢুকতেই সচিবের কক্ষে ঢাক পড়লো বদরুল হায়দারের। তিনি নোটবুক ও কলমটা নিয়ে ঢুকলেন সচিবের কক্ষে। সচিব চা পান করছিলেন। সালাম জানিয়ে বদরুল হায়দার বসতেই জিজ্ঞেস করলেন, চা খাবে বদরুল?
বদরুল হায়দার বললেন, রং চা খাওয়া ছেড়ে দিয়েছি স্যর।
সেকি! কবে থেকে? কেনো?
কথাটা কিভাবে আপনাকে বলি স্যর।
কেনো? কোনো খারাপ ঘটনা?
ঘটনা খারাপ না স্যার। কথাটা একটু খারাপ।
বলো। কোনো সমস্যা নেই।
সেদিন আমরা ক’বন্ধু একটা রেস্টুরেন্টে আড্ডায় বসেছিলাম। আমাদের সাথে ইউনিভার্সিটি লাইফের এক বন্ধু ছিলো যার সাথে প্রায় দশ বছর পরে দেখা। লাইট রিফ্রেশমেন্টের পর এটেন্ডেন্ট জিজ্ঞেস করলো, রং চা খাবেন না দুধ চা খাবেন?
তখন ঐ বন্ধুটি বললো, শুনো ফ্রেন্ডস, চা দুই প্রকার; দুধ চা আর মুত চা। আমি দুধ চা খাই, মুত চা খাই না।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, দুধ চা তো চিনি। কিন্তু মুত চা কোনটা?
সে বললো, তোমরা যেটাকে রং চা বা র চা বলো, সেটাকে আমি মুত চা বলি। ওটাকে দেখতে মুতের মতো মনে হয় কিনা!সেই থেকে র টির কথা এলেই ওর কথা মনে পড়ে যায়। সেজন্য র টি খাওয়া ছেড়ে দিয়েছি স্যর।
তখন সচিবও চায়ের কাপে চুমুক না দিয়ে নিচে নামিয়ে রাখলেন। মুখমণ্ডল ম্লান করে বললেন, তোমার বন্ধুর কথা ঠিকই মনে হচ্ছে। র টির রংটা ওই রকমই। আমিও আর র টি খাবো না।
সচিব কলবেল টিপে দিলেন। পিয়ন ঢুকলে চায়ের কাপটা দেখিয়ে বললেন, এটা নিয়ে যাও। আমাকে আর কখনো র টি দেবে না। আর আমাদের দুইজনের জন্য দুই কাপ দুধ চা নিয়ে এসো। তবে কনডন্সেড মিল্ক না-গরুর খাঁটি দুধ অথবা গুড়া দুধ। যেখান থেকে পারো আনো। কুইক!
পিয়ন বললো, আমরা কখনো দুধ কিনি না স্যার। স্টকে দুধ নাই।
সো হোয়াট! এখন থেকে দুধ কিনতে হবে। ডিএস এডমিনকে বলো দুধের ব্যবস্থা করতে। কুইক!
জি স্যার। বলে পিয়ন চলে গেলো।
বদরুল হায়দার নম্র কণ্ঠে বললেন, আজ চা থাক স্যার। সিরাজ বাজার থেকে দুধ কিনে এনে চা বানালে ঘন্টা পার হয়ে যাবে স্যার।  
যথার্থই বলেছো তুমি। তবে অর্ডারটা থাক। দুধের আয়োজনটা আজ হয়ে যাক।
আমাকে কেনো ডেকেছেন স্যার তা কিন্তু বলেন নি।
এই ব্যাপারটা নিয়েই ভাবছিলাম আমি বদরুল।
বুঝতে পারলাম না স্যার।
ত্রিশ বছর হলো চাকরির বয়স। আর ক’ বছর পর রিটায়ারমেন্টে যাবো। বহু বসের অধীনে কাজ করেছি এবং একই সাথে বসও হয়েছি বহু জনের। বসের ও বস হিসেবে আমাদের আচরণ বরবার টিপিক্যাল। যেনো একটা ছাঁচে আটকা সবার কোড অব কন্ডাক্ট।
এবারও ধরতে পারছি না আপনার আলোচনার বিষয়বস্তু স্যার।
তুমিও একই ছাঁচে পড়ে আছো; তাই ধরতে পারছো না আমার বক্তব্য। ভাবতেই পারছো না আমি কী বলতে চাচ্ছি। এটাই দুঃখজনক। আমরা অফিসে এসেই কাজের কথা শুরু করি। সাবঅর্ডিনেটদের ডেকে কাজের হিসাব চাই, সামান্য ত্রুটি হলে ভর্ৎসনা করি, আর সাফল্য হলে প্রশংসা করি না। কিন্তু আমাদের সবার পরিবার আছে। পরিবারের ভালোমন্দ খবরাখবর নেই না কখনো। আমরা কি মানুষ?
বদরুল হায়দার বললেন, বলা যায় ঢাকার ইট-পাথরের ঘেরাটোপে বাস করতে করতে মানবিক বোধ আমাদের ভেতর থেকে লোপ পেয়ে গেছে। এমনটা কিন্তু মফস্বল শহরে হচ্ছে না। সেখানে একজন নিম্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাও ঈদে বা সন্তানরে জন্মদিনে অফিসের বসসহ কর্মকর্তাদের দাওয়াত দেয়। একে অপরের কুশলাদি বিনিময় হয়।
ঢাকায় আমি এটা চালু করতে চাচ্ছি। আগামী শনিবার আমার বাসায় এই মিনিস্ট্রির সকল কর্মকর্তাদের দাওয়াত। এবং এটা সাইক্লিকলি চলতে থাকবে। তবে তা সীমাবদ্ধ থাকবে ডিএস র্পযন্ত; অর্থাৎ সিনিয়র সেক্রেটারি বা এর নিম্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের দাওয়াত খাওয়ানোর প্রয়োজন নেই। এটা ওদের জন্য অনেক বোঝা হয়ে যাবে। ওরা সিনিয়রদের বাসায় খেতে যাবে।
মেনি মেনি থ্যাংক ইয়ু স্যর ফর ইনিশিয়েটিং সাচ টাইপ অব ইনোভেটিভ ইনিসিয়েটিভ।  
এই মুহুর্তে আমি যদি বদলি হয়ে যাই বা মারা যাই তাহলেও মিনিস্ট্রির কাজ থেমে থাকবে না। কিন্তু হিউমিনিটি থমকে যাবে যদি আমরা একে অপরের খোঁজ নেবার কালচারটা ভুলে যাই। ঢাকায় এপার্টমেন্টে বসবাসকারিদের মাঝে হিউমিনিটি একদম উধাও; মুখোমুখি ফ্লাটের একজন অপরজনের খবর রাখে না।

শনিবার। সচিব মোস্তাকমি মাসুদের বেইলি রোডের সরকারি বাসা। মিসেস আকলিমা রান্নাবান্নার ঝামেলা বাসায় রাখতে রাজি হন নি বিধায় একটা রেস্টুরেন্টে অর্ডার দেয়া হয়েছে খাদ্য সরবরাহ দেবার। ব্যাপারটা মোস্তাকিম মাসুদের মনপুত না হলেও তিনি কিছু বলতে সাহস করেননি। সচিব-গিন্নি সচিবের অফিস সহকর্মিদের জন্য হাত পুড়িয়ে রান্না করবেন বা রান্নাঘরে ঘেমে বাবুর্চির রান্নার তদারকি করবেন, তা ভাবাই যায় না।
একটা থেকে কর্মকর্তাগণ মোস্তাকিমের বাসায় আসতে শুরু করেছে; সপরিবারে। সবার হাতেই ছোট বা বড় প্যাকেট আছেই। প্যাকেট হাতে কর্মকর্তাদের ভেতরে ঢুকতে দেখে মোস্তাকিম গম্ভীর হলেও কিছু বললেন না। মোট  চৌদ্দ জন  কর্মকর্তা এসেছেন: দুই যুগ্ম-সচিব, চার উপ-সচিব এবং আট সিনিয়র সহকারি সচিব। সঙ্গে স্ত্রী/স্বামী এবং কারো একজন এবং কারো বা দুইজন সন্তান। প্যাকেটগুলো ড্রয়িংরুমরে একটি টি-টেবিলে রাখা হয়েছে। গৃহিনীদের স্বাধীনতা রইলো ভেতরে যাবার বা ড্রয়িংরুমে থেকে আলোচনায় অংশ নেবার।
আলোচনার এক পর্যায়ে উপ-সচিব জাবেদুর রহিমের স্ত্রী জানকি ইয়াসমিন শারমিন শিলার দিকে তাকিয়ে বললেন, এখন মনে পড়ছে আপনাকে ইতোপূর্বে কোথায় দেখেছি।
হঠাৎ এ কথায় সবাই শারমিন শিলার দিকে তাকালো। শারমিন শিলা বিব্রত বোধ করলেন। তিনি কিছু না বলে মাথা নিচু করে রইলেন; কারণ তাকে উদ্দেশ্য করে আলোচনাটা কোনদিকে যাবে বা কী নিয়ে শুরু হবে বুঝতে পারছেন না।
জানকি ইয়াসমিন বলে চললেন, কিছুদিন আগে একটা পত্রিকায় ভেতরের পাতায় আপনার ছবি দেখেছি। বাজার করতে গিয়ে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি নিয়ে জ্বালাময়ী কথা বলেছেন। এবং এও বলেছেন ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে আন্দোলনে প্রয়োজনে নেতৃত্ব দেবেন।
সহকারি সচিব মৃদুলা মাহজীবন বললো, ইয়েস! আমিও খবরটা দেখেছি। কিন্তু ভাবির পুরো পরিচয় না থাকায় তখন বুঝতে পারি নি। সেদিন আপনি খুব সাহসি কথা বলেছেন ভাবি।
যুগ্ম-সচিব ড. আনোয়ারুল আকবর বললেন, সেদিন হয়তোবা ভাবি রাগের বশে কথাগুলো বলে ফেলেছেন। আসলে আমাদের মতো নির্ঞ্ঝাট মানুষের পক্ষে কি আর এমন আন্দোলন গড়ে তোলা সম্ভব?  
মোস্তাকিম মাসুদ মনে মনে বললেন: একটা অন্যন্য আন্দোলন যদি একজন সাধারণ গৃহিনীর কণ্ঠ থেকে দানা বেঁধে উঠে তাহলে ক্ষতি কী। এটা জনতার প্রকৃত আন্দোলন হবে। এ ধরনের আন্দোলন রাজনৈতিক নেতা দ্বারা কখনো দানা বাঁধবে না। রাজনৈতিক নেতারা কেবল গদির জন্য আন্দোলন করে থাকে; গদি চায়। তিনি বললেন, একটা কাজ শুরু হবার আগেই নেগেটিভ কথাবার্তা বলা শুভ নয়। শারমিন ভাবির ভেতরে যে ক্ষোভ কম বা বেশি তা আমাদের সবার ভেতরেই আছে। আমরা নেহায়েত ভদ্রতার খাতিরে প্রকাশ করি না। এবং এটাই আমাদের মস্ত বড় ভুল। এভাবে পিছু হটতে হটতে দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাবার উপক্রম হয়েছে। আমি জনকল্যাণ মন্ত্রণালয়রে সচিব; কিন্তু ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কিছুই করতে পারি না। বর্তমান রাজনৈতিক ব্যবস্থায় তা সম্ভব না; কারণ পাওয়ার পার্টির মন্ত্রী-এমপি বা মন্ত্রী-এমপিদের ভাই-বন্ধু বা নিকটাত্মীয় ব্যবসার সাথে জড়িত। ইদানিং ব্যবসায়ীরা নির্বচানে জিতে এমপি হয়ে মন্ত্রী হচ্ছনে; সিটি র্কপোরশেনরে মেয়র হচ্ছনে। একটা ইনটিগ্রেটেড সোসাল মুভমেন্টই কেবল পারে এই বলয় ভাংতে। এটা শুরু হতে পারে শারমিন ভাবির হাত দিয়ে; দানা বাঁধতে পারে অন্য কারো মাধ্যমে।
সবাই শারমিন শিলাকে নুতন করে দেখতে থাকলেও কেউ কোনো কথা বললেন না। মোস্তাকিম মাসুদ সবাইকে এক এক করে দেখে বললেন, কী ব্যাপার? সবাই চুপ কেনো? আপনারা কি শারমিন ভাবির ফিলিংসকে সমর্থন করেন? যদি শারমিন ভাবি আপনাদেরকে তাঁর পাশে দাঁড়াতে বলেন, তখন কি আপনারা তাঁর পাশে দাঁড়াবেন? আমার মনোভাবটা সবার শেষে জানাবো। তবে যদি আপনার আগে জানতে চান তাও জানাতে পারি।
সবাই একে অপরকে দেখতে থাকলেও কেউ নিরবতা ভাঙলো না।
বদরুল হায়দার বললেন, স্যার ব্যাপারটা সিরিয়াসলি নিচ্ছেন বুঝতে পারছি। কিন্তু আমার মনে হয় না বাংলাদেশে এ জাতীয় আন্দোলন কখনো দানা বাঁধবে। কারণ আজ র্পযন্ত বাংলাদেশে রাজনৈতিক আন্দোলন ছাড়া অন্য কোন আন্দোলন দানা বাঁধে নি। তাছাড়া জিনিসপত্রের লাগামহীন মূল্য বৃদ্ধিতে সবার মনইে ক্ষোভ আছে। আমরা প্রকাশ করি না; যেকোনো কারণেই হোক সেদিন শারমিন প্রকাশ করে ফেলেছে। এটা নিয়ে আর আলোচনা না করাই ভালো। সময়ের অপচয় মাত্র।
মোস্তাকিম মাসুদ বদরুল হায়দারের দিকে পূর্ণ চোখে তাকিয়ে থাকলেন কিছুক্ষণ। পাক্কা দুই মিনিট একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকার পর বললেন, আমি এই ভেবে আশ্চর্য হচ্ছি যে তুমি তোমার স্ত্রীকে আন্ডারএস্টিমেট করছো। সে একজন উচ্চ শিক্ষিত এবং বিসিএসের মাধ্যমে কলেজের শিক্ষক হয়েছে।
বসের আক্রমনে বদরুল হায়দার থতমত খেলেন। তিনি আমতা আমতা করে বললেন, না মানে আমি তেমনটা মিন করে বলিনি।
তাহলে তুমি তোমার মতামত জানাও। তুমি কি তোমার স্ত্রীকে সাপোর্ট করছো?
অবশ্যই স্যর। আমরা আমরণ একে অপরের পাশে আছি; থাকবো স্যর।
তুমি সাপোর্ট দিচ্ছো ভালোবাসার দৃষ্টিকোণ থেকে, নৈতিকতার দৃষ্টিকোণ থেকে না। যাই হোক। অন্যদের মতামত শুনি এবার। হাত তুললেই হবে।
প্রথমে জানকি ইয়াসমিন উপরে হাত তুললেন। তারপর একে একে সবাই হাত তুললেন।
উর্ধোত্তোলতি হাতগুলোকে একবার দেখে মোস্তাকিম মাসুদ মুখ টিপে হেসে বললেন, এবার আমার পালা। আমিও আপনাদের সাথে আছি। এবং শারমিন ভাবিকে বলছি আপনি এগিয়ে যান।
শারমিন শিলা লজ্জিত কণ্ঠে বললেন, আমি লজ্জা পাচ্ছি খুব স্যার। জীবনে কখনো রাজনীতি করি নি; নেতৃত্ব কী জিনিস জানি না। ওসব আমাকে দিয়ে হবে না স্যার। আপনাদের কেউ এগিয়ে আসেন।
লেখালেখিতে হাত থাকলে আমি নিজেই একটা কলাম লিখে ফেলতাম বিষয়টা নিয়ে। কলামিস্ট ফকির চান্দ আমার খুব ভালো বন্ধু। আমি ওকে বলে দিচ্ছি বিষয়টা নিয়ে একটা ফাটাফাটি কলাম লিখতে। কালকেই দেখবে খোলা সংবাদে কলামটা পাবলিস হবে। এবং তখন শারমিন ভাবির আর ভয় লাগবে না। এবার আমরা খাবার টেবিলে যেতে পারি। আগে মেয়েরা খাবে শিশুসহ। পুরুষরা পরে খাবো। তোমরা আমার সাথে আসো।
তখন সচিব-গিন্নি আতিয়া সৈয়দ এসে বললেন, তোমার উঠার দরকার নেই। তুমি ওদের সাথে গল্প করো। আমি এদের ডাইনিং টেবিলে নিয়ে যাচ্ছি। তোমরা এসো।
বদরুল হায়দার দাঁড়িয়ে বললেন, এই ফাঁকে আমি নামাজটা আদায় করে আসি স্যর।
নামাজের কথা শুনে ওর ছোট ছেলে মৃণাল ডাইনিং হল থেকে ছুটে এসে বললো, আমিও তোমার সাথে নামাজ পড়বো বাবা।
বদরুল হায়দার পাঁচ বছরের মৃণালকে কোলে তুলে কপালে চুমু খেয়ে বললেন, সবাই খেতে বসেছে। তুমি খেতে যাও। আজ তোমার নামাজ না পড়লেও চলবে বাবা।
মৃণাল বদরুল হায়দারের গলা জড়িয়ে ধরে বললো, আমি তোমার সাথে খাবো বাবা।
ওকে। তাহলে চলো ওজু করতে যাই।  
পিতা-পুত্র নামাজ আদায় করে এলে মোস্তাকিম মাসুদ বললেন, নিশ্চয়ই তোমার ছেলেটা বাসায়ও তোমার সাথে নামাজ পড়ে এবং সেটা ছোটবেলা থেকেই?
বদরুল হায়দার মৃণালকে কোলে বসিয়ে বললেন, জি স্যর। ও যখন হামাগুড়ি দেয় তখন হতে আমার সাথে নামাজ পড়ছে স্যর। তখন তো আর রুকু সেজদা বুঝতো না। আমার সেজদার সময় উপুর হয়ে শুয়ে মেঝেতে মাথা ঠেকিয়ে সেজদা দিতো।
সন্তানরা মা-বাবাকে ফলো করে। মা-বাবা সন্তানরে প্রথম ওস্তাদ; তারপর শিক্ষক। আমি আগে খুব সিগারেট টানতাম। একদিন দেখি আমার দুই বছরের শিশুটা কোত্থেকে একটা সিগারেটের পাছা কুড়িয়ে ঠোঁটে ঝুলিয়ে টানছে। সেদিনের মতো আমি আর অবাক হইনি। ওর মাকে দেখালে তিনি আমাকে খুব বকাবকি করলেন। সিগারেট ছাড়ার জন্য খুব চাপাচাপি শুরু করলেন। আমার সিগারেট ছাড়তে এক বছরের মতো লেগে গেলো। ঐ এক বছরে আমার বাবুটাকে আরো কয়েকবার সিগারেট টানার মতো ভঙ্গি করতে দেখেছি। তখন হতে সিগারেটের পাছা যত্রতত্র না ফেললেও ছেলেটা এটা সেটা তুলে সিগারেটের মতো ফুকতো। এক বছর পর আমি সিগারেট টানা ছেড়ে দিলাম। কিন্তু আমার ছেলেটা বড় হয়ে হয়ে গেলো চেইন স্মোকার। আমি নিয়মিত নামাজ আদায় করি না বলেই ছেলেটাকে নামাজি বানাতে পারি না। তোমাকে ধন্যবাদ  বদরুল। তুমি ছেলেটাকে একটা ভালো অভ্যাস গড়তে সাহায্য করছো। তোমার বড় ছেলেটা নিশ্চয়ই তোমার মতো নামাজ আদায় করে?
জি স্যর।
আজ ওকে সাথে আনোনি কেনো?
সামনে ওর পরীক্ষা। টিচার আসবে তাই আসতে রাজি হয় নি।
গুড। বদরুলরে মতো আর কোন বাবা-মার সন্তান এমন ভালো অভ্যাস শিখছে বাবা বা মার কাছ থেকে? কেউ সাড়া না দেয়ায় তিনি বিস্মিত কণ্ঠে বললনে, তার মানে তোমরা কেউ নামাজ পড়ো না বাসায়। সমীর চন্দ, তোমরাও কি বাসায় পূজা দাও না?
সন্ধ্যা আহ্নিক নিয়মিত দেয়া হয় স্যার। তা থেকে শিখার তেমন কিছু নাই স্যার।
সন্তানের সামনে সিগারেট টানো না তো আবার?
আগে সিগারেট খেতাম স্যার। বাবুটা জন্মাবার পর সিগারেট খাওয়া ছেড়ে দিয়েছি।
খুব ভালো কাজ করেছো। আর কারো কি সিগারেট টানার বদঅভ্যাস আছে? কেউ কোনো সাড়া না দেয়ায় বললেন, খুব ভালো। কিন্তু তারপরও সিগারেটের দাম কমছে না।
ড. আনোয়ারুল আকবর বললেন, সিগারেটের দাম কমলে তো ভয়াবহ অবস্থা হবে স্যার। সরকার চাচ্ছে মানুষ সিগারেট টানা কমাক, তামাক বিরোধী আন্দোনকারীরাও তাই চাচ্ছে। ওদের দাবি সিগারেট-তামাকের উপর শত গুণ ট্যাক্স বসানো হোক। তাহলে আপনিতেই তামাক খাওয়া কমে যাবে স্যার।
তুমি ঠিকই বলেছো আকবর। একটা বিষয় তোমাদের জানানো প্রয়োজন মনে করছি। তোমরা আমার সহকর্মী এবং অফিসে একই পরিবারের মতো। সকল ভালো-মন্দ তোমাদের জানা দরকার। ইদানিং মন্ত্রীর সাথে আমার সম্পর্ক ভালো যাচ্ছে না। যেকেনো সময় বদলি হতে পারি; আর বদলির অর্থ ওএসডি এবং এই সরকার ক্ষমতায় থাকাবস্থায় আর পোস্টিং না পাওয়া। কিন্তু আমি মাথা নত করবো না অন্যায়ের কাছে।
সবাই অবাক হয়ে মোস্তাকিম মাসুদের দিকে তাকালেন। কেউ-ই কিছু আন্দাজ করতে পারছে না। উপ-সচিব থেকে নিম্নের সবাই পালাক্রমে দুই যুগ্ম-সচিবকে দেখছে।
মোস্তাকিম মাসুদ বললেন, আমার বদলি বা ওএসডি হওয়া নিয়ে তোমাদের কারো কিছু করার নেই। আমি চাইও না। কিছু করতে হলে তা আমিই পারি-মন্ত্রীর কথা শুনলেই হয়। কিন্তু আমি অন্যায়ের কাছে কখনো নতি স্বীকার করবো না। তোমাদেরকে এ কথার বলার অর্থ হলো আমাদেরকে বদলি হতে হবে, ওএসডি হতে হবে, রিটায়ারমেন্টে যেতে হবে। আমরা যে যেখানেই থাকি না কেনো, যতদূর চেষ্টা করবো আমাদের মনে রাখতে, দেখা হলে কুশলাদি জিজ্ঞেস করতে, সুযোগ থাকলে সাহায্য করতে।
ড. আনোয়ারুল আকবর বললেন, সরকারের এই অন্যায় আমাদের নিরবে সহ্য করে যাওয়া ঠিক হচ্ছে না স্যার। যখন সিএসপিরা আমলাতন্ত্রে ছিলেন তখন কোনো সরকার ওদের ঘাটাতো না, তাঁদের মধ্যে অটুট ঐক্য ছিলো। সকল সরকারের খড়গ নেমে আসছে আমাদের উপর। আর তা হচ্ছে আমাদের মাঝে ঐক্য না থাকার কারণেই।
বদরুল হায়দার বললেন, তা আমরা সবাই জানি। কিন্তু আমরা কি ঐক্যবদ্ধ হতে পারবো? কোনোদিনই পারবো না। কারণ আমরা ক্ষমতাসীন দলের লেজুরবৃত্তি করে ভালো পোস্টিং আর পদোন্নতি বাগিয়ে নেবার স্বাদ পেয়ে গেছি। আমলাতন্ত্র বেশিদিন টিকে থাকবে না এদেশে। প্রশাসন থেকে জুডিসিয়ারি আলাদা করে নিয়ে যাওয়া হলো। এখন জেলাতে ডিসিকে কেউ পুছেও না। ডিসির তুলনায় এসপি খুবই জুনিয়র; কিন্তু এসপি ডিসিকে থোরাই কেয়ার করে এখন। আমি ভেবে পাই না এই বৈরি পরিবেশে ডিসিরা কাজ করে কিভাবে!কলামিস্ট ফকির চান্দের কলামটা দুটো দৈনিকে ছাপা হলো। মোস্তাকিম মাসুদ ভোরে ফোন করে বদরুল  হায়দারকে তা জানালেন। বদরুল হায়দার প্রাতঃভ্রমণে বেরিয়ে দুটো পত্রিকাই কিনে আনলেন। বাসায় এসে বারান্দায় বসে দুটো কলাম পড়লেন। বেশ কয়েক জায়গায় শারমিন শিলার নাম এসেছে। আশাবাদ আছে, নৈরাশ্যও আছে যা স্বাভাবিক। এখন কী হবে? শারমিন শিলা কী করবে? ওর কি কিছু করতে হবে, না একটা অভাবনীয় আন্দোলন আল্লাহর কুদরতে দানা বাঁধতে থাকবে? দেখা যাক কী হয়! তিনি পত্রিকাটা হাতে নিয়ে শয্যাকক্ষে ঢুকলেন। শারমিন তখনো ঘুমুচ্ছে, বুকের কাছে ছোট বাবু। বদরুল হায়দার দুটো পত্রিকারই পাতা উল্টে কলামের পাতা বের করে শিয়রের কাছে রেখে চলে এলেন ড্রয়িংরুমে।  
সকাল সাতটার দিকে আজকের তাজা খবরের এক রিপোর্টারের ফোন এলো ল্যান্ডফোনে। নাম সোহরাব কাদের। শারমিন শিলার সাথে কথা বলতে চায়। বদরুল হায়দার জানালেন আজ কলেজে ক্লাশ না থাকায় দেরি করে ঘুম থেকে উঠবেন। আটটার পর তাঁর মোবাইল ফোনে কল করতে বললেন।
কিন্তু আটটায় প্রতিবেদক সোহরাব কাদের ক্যামেরাম্যান সহ চলে এলো। বদরুল হায়দার বিরক্ত হলেও কিছু বললেন না। তিনি অফিসে যাবার প্রস্তুতি নিতে থাকলেন। শারমিন শিলা ফিটফাট হয়ে ড্রয়িংরুমে আসতেই ক্যামেরাম্যান ফটাফট ছবি তুলতে লাগলো। তিনি কিছু বলার সুযোগই পাচ্ছেন না। একসময় ক্যামেরার ক্লিক কমে এলে তিনি বললেন, এবার ক্যামেরাটা বন্ধ করেন প্লিজ!
ক্যামেরার ক্লিক বন্ধ হলে সোহরাব কাদের বললেন, আপনি ওই সোফাটায় বসুন ম্যাডাম।
শারমিন শিলা সোফাটায় বসে বললেন, এবার কী হবে মিস্টার রিপোর্টার?
সোহরাব কাদের পাশের সোফায় বসে মাউথপিসটা শারমিনের মুখের সামনে ধরে বললেন, আজকের দুটো দৈনিকে আপনাকে নিয়ে কলামিস্ট ফকির চান্দের কলাম পাবলিসড হয়েছে। এ ব্যাপারে আপনার অপিনিয়ন কী ম্যাডাম?
শারমিন শিলা বললেন, আমি এখনো কলামটা পড়তে পারি নি। কী অপিনিয়ন দেবো। বেটার হয় কলামিস্টকেই জিজ্ঞেস করেন উনি কেনো আমাকে নিয়ে লিখেছেন।
কলামে খারাপ কিছু লিখেন নাই আপনাকে নিয়ে ম্যাডাম। আপনি যে আন্দোলনের সূত্রপাত করেছেন, তার প্রশংসা করা হয়েছে এবং এই আন্দোলনকে বেগবান করার পরামর্শ দিয়েছেন। আন্দোলনকে বেগবান করার জন্য আপনার পরবর্তী পদক্ষেপ কী বলবেন ম্যাডাম?
আমি আগে কলামটা পড়ি। তারপর মন্তব্য করবো।
সোহরাব কাদের ব্যাগ থেকে দৈনিক সারকথার একটা কপি বের করে কলামটা দেখিয়ে বললো, পড়ে নিন ম্যাডাম। আমরা আপনার পড়া অবস্থায় কিছু ছবি তুলে নেবো।
শারমিন শিলা পত্রিকাটা আড়চোখে একবার দেখে বললেন, আমি এভাবে পরীক্ষা দিতে পারবো না ভাই। আপনারা এখন যান। আমি সকালের কাজগুলো সেরে পত্রিকা পড়তে বসবো। আপনি বিকেলে একবার ফোন করবেন। আমি তখন মতামত দিতে চেষ্টা করবো।
সোহরাব কাদের চুপসে গেলেন। তিনি চেয়েছিলেন সবার আগে শারমিনের মতামতটা তাদের পত্রিকায় ছাপাতে। এখন বিকেলের মধ্যে যদি অন্য পত্রিকা থেকে কেউ যোগাযোগ করে মতামতটা নিয়ে নেয় তাহলে ওর উদ্যোগটাই ব্যর্থ হয়ে যাবে। সোহরাব শেষ চেষ্টা করতে চাইলো। বিনম্র কণ্ঠে বললেন, আমি আধাঘণ্টা বাইরে অপেক্ষা করি। যদি এই আধাঘন্টায় কলামটা পড়ে মতামতটা দিতেন।
কী বলছেন আপনি মিস্টার….!
আমার নাম সোহরাব কাদের। আমি দৈনিক সারকথা পত্রিকার রিপোর্টার।
ও। বিষয়টা নিয়ে সারাদেশে তোলপাড় হতে যাচ্ছে মিস্টার সোহরাব কাদের। এরকম একটা গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু নিয়ে এতো তাড়াতাড়ি মতামত দেয়া যায় না। আমাকে ভাবতে হবে। আমি কোনো মতামত দিবো কিনা সেটাও ভাবতে হবে।
তাহলে একটা অনুরোধ আমার রাখেন ম্যাডাম। বলেন রাখবেন?
কী সেটা?
আমাকে ছাড়া আর কাউকে আপনি মতামত দেবেন না। আমাকে দেবার পর যাকে ইচ্ছে তাকে দিয়েন।
কেনো?
আমি সবার আগে সকালে এসে আপনার সাথে যোগাযোগ করেছি ম্যাডাম।
ঠিক আছে। যদি আমি কোনো মতামত দেই তো সর্বাগ্রে আপনাকেই দেবো। আপনি ঠিক চারটায় আমাকে কল দেবেন। ওকে?
ওকে ম্যাডাম।
সোহরাব কাদের ফটোগ্রাফারকে নিয়ে বেরিয়ে গেলেন বাসা থেকে। সাথে সাথে শারমিন শিলা একটা লম্বা স্বস্তরি নিঃশ্বাস ছেড়ে ভেতরের দিকে গেলেন। দুই ছেলে তখনো ঘুমুচ্ছে। বদরুল হায়দার বাথরুমে। বিছানায় পড়ে থাকা পত্রিকাটা তুলে কলামটা পড়তে চাইলেন; কিন্তু কেনো জানি এখন পড়তে ইচ্ছে করছে না। পত্রিকাটা ভাঁজ করে পাশের ড্রেসিং টেবিলে রেখে দিলেন। মৃণালকে আদর করতে ইচ্ছে করছে ওর খুব। তিনি ঝুকে মৃণালের কপালে চুমু খেলেন; কিন্তু তৃপ্ত হলেন না- দুই গালে টুক টুক করে দুটো চুমু খেলেন। বড়টার দিকে চোখ পড়লে মনে মনে বললেন: বড়টাকে বঞ্চিত করছি কেনো? তিনি পূর্বের মতোই প্রসুনের কপাল ও গালে তিনটি চুমু খেলেন।
তখন বদরুল হায়দার বাথরুমের দরজা খুললেন। স্ত্রীকে বড় ছেলের গালে চুমু খেতে দেখে বললেন, শুধু বড়টাকেই আদর করা হচ্ছে, নাকি ছোটটাকেও আদর করা হবে?
শারমিন শিলা বললেন, ছোটটাকে আগেই আদর করেছি। এখন বড়টাকেও দিলাম। সমান সমান হয়ে গেলো।
বললেই কী আর সমান সমান হয় মাই ডিয়ার ওয়াইফ।
কেনো হবে না? আমি তো দুজনের মাঝে কখনো ডিসক্রিমিনেট করি না।
বড়টা পাঁচ বছরের বড় ছোটর। এই পাঁচ বছর কভার করবে কিভাবে? তাছাড়া প্রসুন প্রথম সন্তান হওয়ায় ওর প্রতি খুব খুব বেশি ভালোবাসা আদর ছিলো আমাদের। সেটা কি ছোটটার প্রতি দেখাতে পারছি আমরা?
এভাবে ভাবলে তো কখনোই সমান হবে না; সম্ভবও না। মৃণালের জন্মের পর থেকে আমি চেষ্টা করছি সমান সমান আদর দিতে।
তর্ক করে এর সমাধান হবে না। তবে দেখতে হবে দুজনের কেউ যেনো মনে না করে যে, আমরা একজনকে অপর জনের চেয়ে বেশি আদর দিচ্ছি। যাক সে কথা। রিপোর্টারকে বিদায় করলে কিভাবে?
বললাম আমি এখনো কলামটা পড়ি নি। পড়ে ভাববো, তারপর। ওকে বিকেল চারটায় মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করতে বলেছি।
ব্যাপারটা ক্রমশ: বাড়ছে। তুমি কী করবে ভেবেছো কিছু?
এটা নিয়ে বেশি ভাবতে চাই না। যা হবার হবে। পরিস্থিতি বুঝে সিদ্ধান্ত নেবো। তবে একটা বিষয় ভেবেছি: যদি আমার কোনো কাজে সাধারণ জনতার উপকার হয়, তাহলে তা আমি করতে চেষ্টা করবো।
এটা আদর্শ নেতার মতো কথা হয়েছে। হোল্ড ইট।
টিটকারি মারছো না তো?
টিটকারি মারছি ভাবলে কেনো?
নেতার সাথে তুলনা করলে যে সেজন্য।
আমি একজন আদর্শ নেতার কথা বলেছি। বর্তমানে পৃথিবীতে আদর্শ নেতা বলতে কেউ নেই। কাজেই মন খারাপ করো না তুমি। নাস্তা কি তৈরি হয়েছে?
জমিলা টেবিলে এখনই নাস্তা দেবে। তুমি কাপড় পরে খেতে আসো। আমি তোমার টিফিন বক্সটা রেডি করে দিচ্ছি।

লুৎফর জহির তেতে আছেন। তাঁর ইচ্ছে করছে এজি অফিসটাকে চিবিয়ে খেয়ে ফেলতে। তাঁর সামনে হিসাবরক্ষক ইমরান খন্দকার দাঁড়িয়ে আছে। ও নির্বিকার।
রাগ চেপে রাখার ব্যর্থ চেষ্টা করে লুৎফর জহির বললেন, ফাজিল ঘুষখোর অডিটরটা কী বলেছে বলেন শুনি।
ইমরান খন্দকার বললেন, অনেক টাকার কাজ। টু পার্সেন্ট না দিলে বিলে আপত্তি দেবে।
ঘুষখোরটা এভাবে কথা বলার সাহস পায়! সে কি জানে না কাদের বিল নিয়ে কথা বলছে। আমি চিফ একাউন্টস অফিসারের সাথে কথা বলবো।
কী লাভ হবে স্যার?
কেনো? লাভ হবে না কেনো?
এই ঘুষের টাকায় সবাই ভাগ পায় স্যার।
বিলটা কত টাকার?
পাঁচ লাখ টাকার।
টু পার্সেন্ট হিসেবে কত টাকা হয়?
দশ হাজার টাকা স্যার।
এরকম কয়টা বিল আছে আমাদের?
আপতত: চারটা বিল আছে।
ওকে। ফাঁদ পাতবো।
বুঝলাম না স্যার।
ঘুষ দেবার ফাঁদ পেতে দুদক দিয়ে ধরিয়ে দেবো।
স্যার!
চমকে উঠলেন কেনো ইমরান খন্দকার?
এরপর তো কোন বিল পাশ করবে না এজি অফিস।
সে দেখা যাবে। আপনি আয়োজন করেন।
কিভাবে?
ফাজিলটার নাম কী?
কোন ফাজিলটার স্যার?
ঘুষখোর অডিটরটার।
নজরুল ইসলাম।
জাতীয় কবির নামটার ইজ্জত থাকলো না আর! আপনি ওকে বলেন আমরা ঘুষ দেবো। কোথায় কবে নিতে চায় জানুন।
ওরা তো অফিসেই নেয় স্যার। ওরা কোনো রাখঢাক করে না স্যার।
অফিসে না। বাইরে কোথাও আয়োজন করুন। আধাঘণ্টার মধ্যে আমাকে জানান। আর একটা কথা। ও যেনো ঘূর্ণাক্ষরেও বুঝতে না পারে আমরা ওর বারোটা বাজাতে যাচ্ছি। যদি কোনো গড়বড় হয় তো আপনাকে এরেস্ট করবো সবার আগে। মাইন্ড ইট!
ইমরান খন্দকার লুৎফর জহিরের কক্ষ থেকে বের হয়ে হাফ ছেড়ে বাঁচলেন যেনো। মনে মনে বললেন: জয়েন্ট সেক্রেটারি সাহেব যেভাবে জেরা করা শুরু করেছিলো, আরেকটু হলে আমার জড়িত থাকার কথা ফাঁস হয়ে যেতো। এখন কী করবো? কিভাবে আম ও ছালা দুটাকেই রক্ষা করবো? চিন্তা করতে হবে, প্রয়োজনে কারো সাথে পরামর্শ করতে হবে। তিনি হাটতে হাটতে চলে এলেন বাথরুমরে সামনে। বাথরুমে ঢুকে মনে মনে বললেন ফের; এটাই নিরিবিলি জায়গা; কমোডে বসে ভাবতে হবে। ইমরান একটা টয়লেটে ঢুকে কমোডের উপর বসলেন। ভাবছেন তিনি: শ্যাম রাখি না, কূল রাখি? শ্যাম রাখি না, কূল রাখি? শ্যাম রাখি না, কূল রাখি? কিন্তু কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছতে না পেরে একসময় বাথরুম থেকে বেরিয়ে এলেন। তখন অফিস ফাঁকা। ভাবতে ভাবতেই তিনি চলে এলেন বাসায়।
মলিন মুখ দেখে স্ত্রী আরজিনা আক্তার জিজ্ঞেস করলেন, তোমার মুখটা আজ মলিন লাগছে কেনো? অফিসে কোনো প্রবলেম হয়েছে?
ইমরান খন্দকার ভেতরে ঢুকে ড্রয়িংরুমে বসে বললেন, একটা মারাত্মক সমস্যায় পড়ে গেছি আরজিনা।
আরজিনা দরজার ছিটকিনি আটকে স্বামীর পাশে বসে জিজ্ঞেস করলেন, সমস্যাটা কী শুনি। দেখি আমি সমাধান দিতে পারি কিনা।
সব শুনে আরজিনা বললেন, এটা নিয়ে ভাবনার কী আছে!
কী বলছো তুমি!
হু। তুমি তোমার বসের কথা শুনবে।
কিন্তু আমি তো ওর কাছ থেকে সুবিধা নিয়েছি।
উহু, ঠিক হলো না। তুমি অসৎ পথে গিয়ে ওকে সুবিধা দিয়েছো। এখন তুমি সৎ পথে ফিরে আসবে আর ওকে ধরিযে দেবে।
এ কী কথা বলছো তুমি আরজিনা!?
ঠিক কথাই বলেছি। তুমি ঘুষ খাও, আমার জানা ছিলো না। আমার এখন বমি করে সব বের করে দিতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু সম্ভব না-যেগুলো দেহের অণুপরমাণুর সাথে মিশে গেছে তা বের করা সম্ভব না।
তুমি ভুল বলেছো। আমি ঘুষ খাই না-পার্সেন্টেজ নেই।
একই কথা। অসৎ পথে উপার্জন।
তোমার কথাগুলো শুনতে বেশ ভালো লাগছে। আমি যদি শুধু বেতনের টাকায় সংসার চালাতে পারতাম, তাহলে তোমার মতো উচু গলায় কথা বলতে পারতাম। কিন্তু তা কোনোভাবেই সম্ভব না। সরকারি চাকরিতে যে বেতন তাতে চলা যায় না।
তাহলে সরকারি চাকরি নিয়েছো কেনো? কোনো প্রাইভেট কোম্পানিতে ঢুকে যেতে।
সরকারি চাকরির একটা নিশ্চয়তা আছে। চাকরি শেষে পেনসন পাওয়া যায়, যা বুড়োকালে বেশ কাজে লাগে।
এসব প্রাগৈতিহাসিক ধারনা মাই ডিয়ার হাসবন্ডে। বুড়োকালে টাকা-পয়সা দিয়ে কী হবে। টাকার দরকার জোয়ানকালে। শখ থাকে, সংসার থাকে, মা-বাবা থাকে। প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরি করলে এসব সমস্যা থাকে না। এটা হলো একটা দিক। আরেকটা দিক হলো প্রাইভেট কোম্পানিতে এক্সপার্টদের কদর সবসময়। এক কোম্পানি ছেড়ে দিলে আরেক কোম্পানিতে চাকরি পাওয়া যায়। সরকারি চাকরি ছাড়লে তুমি আরেকটা সরকারি চাকরিতে ঢুকতে পারবে না, বয়স বাঁধা হয়ে দাঁড়াবে। তুমি আমাকেও চাকরি করতে দিতে চাচ্ছো না। তুমি সৎ পথে ফিরে আসো; আর আমি একটা চাকরি নেই। নইলে….
নইলে কী হবে?
নইলে আমি তো চাকরি নেবোই। তবে তোমার সাথে থাকবো না।
কী বলছো তুমি আরজিনা!
একজন অসৎ মানুষের সাথে এক বিছানায় থাকা আমার পক্ষে সম্ভব না। আই মিন ইট মিস্টার ইমরান খন্দকার।
ইমরান খন্দকার স্ত্রীর দুই কাঁধ ধরে আদরের ঝাকি দিয়ে বললেন, তুমি দেখছি এখনই আমাকে পর করতে শুরু করেছো! সংসারটা আমার একার না ডার্লিং। আমাদের দুজনেরই। আমি এখন থেকেই সৎ পথে চলে এলাম। তুমি চাকরি নাও। আর ঐ অডিটর বেটাকে আমি দুদক দিয়ে ধরিয়ে দেবো। প্রমিজ।
আবেগের মুহুর্ত এটা। ভালোবাসা দেবার মুহুর্তও এটা। আরজিনা স্বামীকে জড়িয়ে ধরে ভালোবাসতে শুরু করলেন। ইমরান খন্দকার প্রস্তুত না থাকলেও ধীরে ধীরে তিনিও সাড়া দিতে শুরু করলেন।
 
সেগুনবাগিচার চিটাগাং হোটেলে ঘটনাটা ঘটলো। অডিটর নজরুল ইসলাম মোবাইল ফোনে কথা বলতে বলতে হোটেলে ঢুকলেন, ভাই রে, কম নেওয়ার উপায় নাই। এই টাকা অনকে উপর র্পযন্ত সবাইকে দিতে হয়। ওখান থেকে রেট বেঁধে দিয়ে পার্সেন্টেজ করে দিয়েছেন কে কত পাবে। আমার ভাগে পরে মাত্র পয়েন্ট ফাইভ পার্সেন্ট। কালকের মধ্যে টাকাটা না পাইলে অবজেকশান দিয়ে দেবো! এখন রাখলাম।
নজরুল ইসলাম মোবাইল ফোনের লাইন কেটে দিয়ে এদিক ওদিক তাকিয়ে ইমরান খন্দকারকে খুঁজতে লাগলেন। ওকে একটা টেবিলে একা বসে থাকতে দেখে এগিয়ে গেলেন সেদিকে। মুখোমুখি চেয়ারে বসে বললেন, খালি টেবিল নিয়া বইসা আছেন ক্যান খন্দকার ভাই? হোটেলে ঢুকতে ঢুকতে শিক কাবাবের গন্ধটা নাকে খুব সুড়সুড়ি দিলো। খাইতে ইচ্ছা করছে খুব। অর্ডার দেন খন্দকার ভাই।
ইমরান খন্দকার শুকনো কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন, বিলটা কে দিবে অডিটর সাহেব?
এক টুকরো শব্দ করে হেসে নজরুল ইসলাম বললেন, ক্যান? আপনি দিবেন?
আমি দিবো কেনো?
পার্টির সাথে খাইলে আমরা কখনো বিল দেই না। পার্টিই আমাগো ভরপেট খাওয়ায়।
ভুলেই গেছিলাম। শিক কাবাব পরে খান অডিটর সাহেব। আগে ঘুষ খান!
ইমরান খন্দকার পকেট থেকে একটা খাম বের করে টেবিলে রেখে নজরুল ইসলামের দিকে ঠেলে দিলেন। নজরুল ইসলাম খামটা তুলে ওজন অনুভব করে জিজ্ঞেস করলেন, কত?
আপনি যা চেয়েছেন তাই আছে। গুণে দেখতে পারেন।
নজরুল ইসলাম খাম থেকে টাকাটা বের করতে করতে বললেন, গুণে দেখাই ভালো। তাতে সন্দেহ থাকে না।
নজরুল ইসলাম একটা একটা নোট টিপে টিপে দেখে টাকা গুণছেন। উনি টেরই পেলেন না কখন চারজন শাদা পোষাকধারী চারদিক থেকে এসে ওঁকে ঘিরে দাঁড়িয়েছে। টাকা গুণা শেশ করে চারজনকে দেখতে পেয়ে চোখের তারা নাচিয়ে নজরুল ইসলাম জিজ্ঞেস করলেন, কী ভায়েরা, আপনারা কি টাকা দেখেন নাই? এইগুলা বাংলাদেশি টাকা। সবই আসল। এখন যান। এই বেয়ারা, দুইডা শিক কাবাব দে। সাথে দুইডা কড়া ভাজা পরাটা দিবি। বেশ ক্ষিধা পাইছে।
পাশের একটা টেবিলে বসে ছিলেন লুৎফর জহির। নজরুল ইসলামকে ইমরান খন্দকারের মুখোমুখি বসা থেকেই তাঁর গা জ্বলছিলো। এখনকার কথাগুলো শুনে আর বসে থাকতে পারলেন না। তিনি ঐ টেবিলে গিয়ে উত্তেজিত কণ্ঠে বললেন, অন্যের পয়সার শিক কাবাব কোর্মা পোলাও খাইতে খুব মজা লাগে! শালা ঘুষখোর!
নজরুল ইসলাম চট করে দাঁড়িয়ে রাগত কণ্ঠে বললেন, আপনি কে? এভাবে কথা বলছেন কেনো? জানেন আমি কে?
দুনীর্তি দমন কমিশনের পরিচালক মেজর কামাল বললেন, আমরা দুদকের লোক। ঘুষ নেয়ার অপরাধে আপনাকে হাতেনাতে ধরতে পেরে এরেস্ট করছি।
সাথে সাথে বাইরে অপেক্ষমান সাংবাদিকরা হুড়মুড়িয়ে ভেতরে ঢুকে ছবি তুলতে লাগলো। নজরুল ইসলাম হতভম্ব হলেও দুহাতে মুখ ঢাকার চেষ্টা করছেন। এদিকে রিপোর্টাররা ছেকে ধরলো মেজর কামালকে। মেজর কামাল লুৎফর জহিরকে দেখিয়ে বললেন, উনি এলজিডি মন্ত্রণালয়ের জয়েন্ট সেক্রেটারি। উনিই ওকে ঘুষসহ হাতেনাতে ধরার জন্য প্ল্যান করেছেন।
রিপোর্টারদের প্রশ্নের জবাবে লুৎফর জহির বললেন, বহুদিন থেকেই বিরক্ত করছিলো ঘুষখোরটা। এবার আর সহ্য করতে পারলাম না।

প্রেসক্লাবের ভিআইপি কনফারেন্স রুমে গোল টেবিল বৈঠক চলছে। বিষয়: দুর্নীতি দমন। কী-পেপার উপস্থাপন করেছেন সেন্টার ফর ট্রান্সপারেন্সি এগইেনস্ট করাপসান-এর চেয়ারম্যান রফিকুর রহমান। এখন আলোচনা চলছে। কমব্যাট এগেনস্ট করাপসন-এর এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর হানসাইন জাহিদ লুৎফর জহিরের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বললেন, সেদিন এজি অফিসের এক অডিটরকে হাতেনাতে ঘুষ নিতে ধরিয়ে দেবার আপনাকে জন্য ধন্যবাদ। কিন্তু আপনার মন্ত্রণালয়েও ঘুষের লেনদেন হয়। সেটাকে আগে বন্ধ করেন মিস্টার লুৎফর জহির।  
লুৎফর জহির মাইক অন করে বললেন, দুর্নীতি দুই ধরনের। একটায় সমাজ/ব্যক্তি ক্ষতিগ্রস্থ হয় এবং অপরটায় রাষ্ট্র ক্ষতিগ্রস্থ হয়; অবশ্য এতে সমাজও ক্ষতিগ্রস্থ হয়। দেশের প্রায় সকল সরকারি অফিসে চাকরিতে ঢুকতে হলে ঘুষ কাউকে না কাউকে দিতে হয়। আর ঐ লোকটি চাকরিতে যোগদান করে ঘুষের টাকা আদায়রে জন্য যে কোনো উপায়ে ঘুষ খাওয়া শুরু করে এবং এভাবইে একজন অভ্যাসগত ঘুষখোড়ে পরণিত হয়!….. যদি যথাযথভাবে অডিট হতো তাহলে অফিসগুলোয় আর্থিক অনিয়ম/দুর্নীতির সংখ্যা ও পরিমাণ অনেক কমে যেতো। অফিসগুলোয় আর্থিক শৃঙ্খলা থাকলে দুর্নীতি থাকতো না এবং প্রশাসনও আমজনতার মঙ্গলে পরিচালিত হতো। অডিট প্রসঙ্গে একটা কথা বলতে চাই: মান্ধাতা আমলের অডিট পদ্ধতির পরিবর্তন দরকার। অডিট একবারই হবে প্রি অথবা পোস্ট। বর্তমানে দুইবার অডিট হয়: প্রথমে বিল পাশের নামে অডিট হয়, যা প্রিও না পোস্টও না; তারপর বছর শেষে ঘটা করে পোস্ট অডিট করা হয় যাতে ঘুষ বানিজ্যই বেশি থাকে। বিল পাশ প্রথা বাদ দিয়ে অডিটিংকে বেসরকারিকরণ করা হলে ঘুষ বানিজ্য এবং অফিসগুলোর দুর্নীতিও কমে যাবে। সরকার তথা অর্থ মন্ত্রণালয় অফিসগুলোকে সরাসরি থোক টাকা দিয়ে দেবে; অফিসগুলো প্রাপ্ত টাকা খাতওয়ারি খরচ করবে এবং বছর শেষে কোনো অডিট ফার্ম অডিট করবে। এতে বর্তমান অডিটিং সিস্টেমের দুর্নীতি থাকবে না এবং স্বচ্ছতাও সৃষ্টি হবে। অডিট অফিসের বিল পাশের প্রথা না থাকলে এক পর্যায়ের দুর্নীতি আপনিতেই কমে যাবে। বেসরকারি অডিট ফার্মগুলো নিবিড় মনিটরিং-এ থাকলে পোস্ট অডিটেও দুর্নীতি হবে না। বাকিটা আপনার সহজেই বুঝতে পারছেন। আমার দীর্ঘ কথা ধৈর্য ধরে শোনার জন্য সবাইকে ধন্যবাদ।
সঞ্চালক বললেন, একজন সরকারি কর্মকর্তা হয়েও আপনি দুর্নীতি ও দুর্নীতি কমানোর বিষয় যা বলেছেন তা চমৎকার এবং তা বাস্তবায়নের পদক্ষেপ নিলে আশা করা যায় দুর্নীতি কমতে থাকবে। আমরা সরকারের কাছে সুপারিশ রাখবো আপনার কথাগুলো বিবেচনা করার জন্য। এবার বক্তব্য রাখতে অনুরোধ জানাবো টিআইবির উপদেষ্টা ড. রবিশঙ্কর পাইককে।
গোলটেবিল বৈঠক শেষ হলে লাঞ্চের সাথে খোশ গল্প শুরু হলো। এটা অনানুষ্ঠানিকভাবে মত বিনিময়ের একটা সুন্দর মাধ্যম। খাবারের প্লটে হাতে একজন শ্রোতা এগিয়ে গেলেন লুৎফর জহিরের দিকে। লুৎফর জহির স্যুপ পান করছিলেন।
লোকটি ওর পাশের চেয়ারে বসে বললেন, আপনি অত্যন্ত সাহসের সাথে দিবালোকের মতো সত্য কথাগুলো বললেন। কিন্তু যাদের নিয়ে কথাগুলো বললেন তারা কি আপনার কথাগুলো সহজভাবে নেবে?
লুৎফর জহির বললেন, আপনার সাথে আলাপ জমাবার আগে আপনার পরিচয় জানা দরকার। যদি আপনি আপনার পরিচয়টা দেন।
লোকটি বললেন, আমার নাম ড. অমিতাভ পাল। আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ বিজ্ঞান বিভাগের প্রফেসর।
সর্বনাশ! আপনি সাধারণ শ্রোতা নন! আপনার সাথে আলাপ জমাতে হলে যথেষ্ট জ্ঞানগর্ভ কথা বলতে হবে।
এভাবে বললে আমি বেশ লজ্জা পাবো লুৎফর ভাই।
ভাই বলে ভালোই করলেন। আমাদের স্বল্প সময়ের পরিচয় হলেও নৈকট্য বেড়ে গেলো বেশি। তাহলে আমি আপনাকে দাদা বলেই ডাকবো: অমিতাভ দা। এবার আপনার প্রশ্ন প্রসঙ্গে বলি। আমার কথাগুলো কে কিভাবে নিলো বা নেবে তা আমি ভাবি না। যা সত্য ও বাস্তব তা-ই বলেছি।
আমরা আশা করবো সরকার নড়েচড়ে বসবেন। আপনি তো বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের দুর্নীতির কথা বললেন, দমনের পদ্ধতির কথাও বললেন। কিন্তু ব্যবসায়ীদের দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতা রুখবনে কিভাবে? কোনো পদ্ধতি কি আপনার জানা আছে লুৎফর ভাই?
ব্যবসায়ীদের দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচার সরকার বন্ধ করতে পারবে না।
কী বলছেন আপনি লুৎফর ভাই? কেনো পারবে না? ব্যবসায়ীরা কি সরকারের চেয়ে শক্তিশালী?
আপনি সব জানেন অমিতাভ দা। তারপরও আমার কাছ থেকে শুনতে চাচ্ছেন। বলছি। সত্য বলতে আমি কখনো ভয় পাই না। যা বলছিলাম সরকার ব্যবসায়ীদের দুর্নীতি বা স্বেচ্ছাচারিতা বন্ধ করতে পারবে না। কারণ সরকারে একাধিক মন্ত্রী ব্যবসায়ী, কোনো মন্ত্রীর ভাই বা আত্মীয় ব্যবসায়ী, অধিকাংশ এমপি ব্যবসায়ী, বিরোধী দলেও অধিকাংশ এমপি ব্যবসায়ী, সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ব্যবসায়ী ইত্যাদি ইত্যাদি।
ড. অমিতাভ পাল বললনে, তাহলে এদের সামলাবে কে? নাকি এভাবেই চলবে অদ্ভূত উঠের পিঠে দেশটা?
আমজনতা।
আমজনতা?
ইয়েস অমিতাভ দা। কিছুদিন আগে শারমিন শিলা নামের এক কলেজ শিক্ষিকার নড়াচড়া দেখেছেন পত্রিকায়। ভদ্রমহিলা আমার এক কলিগের সহধর্মিনী। ওকে নেতৃত্বে নিয়ে আসতে পারলে কাজের কাজ হবে। ওনার ভেতরে আগুনের স্ফুলিঙ্গ আছে, সুযোগ বুঝে আগুন লাগিয়ে দিন। দেখবেন সব দুর্নীতি আর স্বেচ্ছাচার পুড়ে ছাড়খার হয়ে গেছে।
এসময় লুৎফর জহিরের মোবাইল ফোন বেজে উঠলো। নম্বর দেখে ইয়েস বাটন চেপে কানে ঠেকিয়ে বললেন, হ্যালো। এনি বেড নিউজ?
ওদিক থেকে আয়েশা নাজনিন বললেন, তোমার রাউন্ড টেবিল বৈঠক এখনো শেষ হয়নি?
একটু আগেই শেষ হয়েছে। এখন লাঞ্চ হচ্ছে। তুমি কোথায়?
আমি ব্যাংক থেকে বাসায় চলে এসেছি। তুমি আসবে পারবে?
এতো জরুরী তলব কেনো? কী হয়েছে বাসায়?
ডিউককে নিয়ে একটা সমস্যা হয়েছে।
নিশ্চয়ই চাকরিতে রিজাইন দিতে হয়েছে ওকে? ফের নেশাসক্ত হয়ে পরেছে ও?
ঠিক তাই। তুমি একটু আসো না প্লজি!
আসছি আমি। যত তাড়াতাড়ি পারি চলে আসবো।
লুৎফর জহির দাঁড়াতেই অমিতাভ পাল বললেন, নিশ্চয়ই ভাবির ফোন?
জি অমিতাভ দা। আমি গেলাম।
আপনার লাঞ্চ করা হলো না লুৎফর ভাই।
এখানে ফুল লাঞ্চ করা আমাকে রিজিকে নেই অমিতাভ দা। বাকিটা বাসায় সেরে নেবো।
সমস্যাটা নিশ্চয়ই আপনার শ্যালককে নিয়ে?
জি অমিতাভ দা। সরি! আমি আর কথা বলতে পারছি না। বাই।
বাই। আবার দেখা হবে।
লুৎফর জহির বাইরে এসে গাড়িতে বসে ড্রাইভাকে বাসায় যেতে বললেন। তিনি ভাবছেন: ডিউকটা বেশ যন্ত্রণা করছে। শ্বশুর শাশুড়িকে এক দণ্ড শান্তি দিলো না। কত আশা নিয়ে কত আদর দিয়ে ওকে ক্যাডেটে পড়ালেন। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হলো না। ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ইউনিভার্সিটি থেকে মেকানিক্যাল এঞ্জিনিয়ারিঙে পাশ করেও একটা ভালো চাকরি নিতে পারলো না। উল্টো ইউনিভার্সিটিতে পড়াকালে অসৎ বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে মাদকাসক্ত হয়ে পড়লো। দুটো চাকরি ওকে ছাড়তে হলো মাদকাসক্তি ধরা পরায়। এ অবস্থায় তৃতীয় চাকরিটা ছাড়া কী ওর ঠিক হলো? এতো কিছু করার পরও মাদকদ্রব্য থেকে ওকে পুরোপুরি দূরে রাখা গেলো না। বাবা এতো চেষ্টা করলেন ওকে বিয়ে দিয়ে বিদেশ পাঠাবার; কিন্তু ও রাজি না হয়ে প্রেম করে বিয়ে করে ফেললো। কিন্তু এখন? ঢাকায় বাসা নিয়ে চাকরি ছাড়া চলবে কিভাবে? সঞ্চিতার মাসিক ছয় হাজার টাকায় সংসার চলবে? এ ছেলেটা নিজ ভবিষ্যৎ মঙ্গল নিয়ে ভাবলো না।
বাসায় ঢুকে লুৎফর জহির স্ত্রীকে বললেন, কোথায় আমার শ্যালক বাবু? তখন শাশুড়িকে আসতে দেখে সালাম জানিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কখন এলেন মা? নাজনিন তো আপনার কথা কিছু বলে নি!
খাদেজা বেগম আঁচল মুখে চাপা দিয়ে ফুপিয়ে উঠে বললেন, আমার জীবনে আর শান্তি আসলো না জামাই। গতকাল সঞ্চিতা জানালো ডিউক আজ চাকরি ছেড়ে দিচ্ছে। কথাটা শুনে মাথায় আকাশ ভেঙে পড়লো আমার। তুমি তো তোমার শ্বশুরকে জানো উনি কথাটা শুনে স্বভাবসুলভভাবে বললেন, যা খুশি করুক; আমি কুলাঙ্গারটাকে নিয়ে আর ভাবি না। আজ ভোরের গাড়িতে রওয়ানা দিয়ে আমি একা চলে আসলাম।
লুৎফর জহির বললেন, আমিও আসতে আসতে তাই ভাবছিলাম। ডিউক ওর জীবন নিয়ে ভাবেই না। ফালতু নেশা করে জীবনটাকে বরবাদ করে দিলো। নিশ্চয়ই নেশা করার কারণে কোম্পানির মালিক ওকে রাখতে রাজি হয় নি; তাই সে রিজাইন দিয়েছে?
হ জামাই।
গর্ধভটা কী করছে এখন?
চুপচাপ শুয়ে আছে।
এটা খুব পারে। শুয়ে থাকতে পারে আর ঘুমাতে পারে। দায়িত্বশীল পুরুষ বা নারী কখনো সকাল এগারোটা/বারোটা র্পযন্ত ঘুমিয়ে থাকতে পারে না। একটু কথা বলে আসি শ্যালক মহোদয়ের সাথে!
লুৎফর জহির এগিয়ে গেলেন গেস্টরুমরে দিকে। খাদেজা বেগম ও আয়েশা নাজনিন ওর পিছু নিলেন। ডিউক শুয়ে আছে উল্টোদিকে মুখ করে। লুৎফর জহির ভেতরে ঢুকে বললেন, যুবরাজ কি ঘুমিয়ে আছো নাকি?
ডিউক এদিকে ফিরে নির্বিকার কণ্ঠে বললেন, না দুলাভাই।
পঁচা কাজটা আর ছাড়তে পারলে না। মা-বাবাকে তো শান্তি দিলেই না। বউটাকেও অশান্তি দেয়া শুরু করেছো। কবে থেকে শুরু করেছো আবার?
উিউক ম্লান হাসলেও কিছু বললেন না।
খাদেজা বেগম বললেন, মাস দুই আগে থেকেই শুরু করেছে।
লুৎফর জহির খাদেজা বেগমের দিকে তাকিয়ে বললেন, তিনবার কারেকশান সেন্টারে দেবার পরও ইডিয়টটা মানুষ হলো না। ওর এখন ওষুধ একটাই-মাইর। আমার ছোট ভাই হলে কোনো কথা না বলে কমপক্ষে দুটো বেত ভাঙতাম ওর পিঠে। আমার এতোদিনের ক্ষোভ আজ আমি প্রকাশ করতে বাধ্য হচ্ছি মা। ডিউকের অধপতনের অংশিধার আপনিও মা। বাবা চেয়েছিলেন ওকে প্রথমে এক বছর কারেকশান সেন্টারে রাখতে। এবং এটাই নিয়ম। কিন্তু আপনার জন্য তা হলো না। রেজাল্ট তো দেখতেই পাচ্ছেন। কিছুদিন পরপর মাদক দ্রব্য নেয়া শুরু করছে ও। ইডিয়টটার প্রগ্রেস দেখেন মা। প্রথমে খেতো চরস; পরে হেরোইন; আর এখন প্যাথেডিন নিচ্ছে নিজেই। থাই দুটো ওর ফুটোয় ফুটোয় জালের মতো হয়ে গিয়েছে। এবার কী করবেন মা?
ও বলেছে বাসায় থেকে উইথড্রয়াল করবে।
পারবে সে?
পারবে।
কারেকশান সেন্টারে গেলে সমস্যা কী?
ওখানের পরিবেশ ভালো না; তাছাড়া খাওয়াও ভালো না।
এখানেই তো সমস্যা মা। আপনি ডিউকের কথায় পড়ে যান। একটা নেশাখোরের কথা বিশ্বাস করার কোনো মানে নেই মা। যতদিন আপনি শক্ত হতে না পারবেন ততোদিন ওকে পূর্ণরূপে মাদকদ্রব্য মুক্ত করতে পারবেন না।
আয়েশা নাজনিন বললেন, এটাই শেষ লুৎফর। এরপর আমি আর মার সাথে থাকবো না।
কিন্তু বাসায় কিভাবে সামলাবে? মেহমান এলে কী বলবে? মেয়েটা ক্লাশ নাইনে পড়ছে। ওকে কী বলে বুঝ দেবে।
বলবো বড় মামার অসুখ করেছে। আর স্থানীয় এক ডাক্তারের সাথে কথা হয়েছে। দরকার পড়লে ওকে ডেকে নিয়ে আসবো। তুমি আর অমত করো না প্লজি!
এভাবে বলছো কেনো তুমি নাজননি? আমি অমত করবো কেনো? আমি বলছিলাম এভাবে হয়তো বা ও সাময়িকভাবে সুস্থ হবে; কিন্তু কিছুদিন পর ফের প্যাথেডিন নেয়া শুরু করবে। এটাই হয়ে থাকে। এর জন্য আমি ডিউককে দুষছি না। থাক ওসব কথা।
লুৎফর জহির ডিউকের দিকে তাকিয়ে বললেন, মা-বাবার জন্য না হোক সঞ্চিতার জন্য এবার একটু ভাবো। তুমি এখন আর একা না। একটা নির্দোষ মেয়ের জীবন নরক করো না ডিউক।
লুৎফর জহির বেরিয়ে চলে এলেন বেডরুমে। পেছনে এলেন আয়েশা নাজনিন। বললেন, তুমি কি আবার অফিসে যাবে?
লুৎফর জহির বললেন, নাহ! যেতে যেতে সাড়ে চারটা বেজে যাবে। তখন দেখা যাবে স্টাফরা বাসায় যাবার জন্য রেডি হচ্ছে।  
পরদিন থেকে ডিউকের শুরু হলো পাতলা পায়খানা। স্যালাইন ও মেট্রোনিডাজল গ্রপের ট্যাবলেট খেয়েও কিছু হচ্ছে না। বলতে গেলে ওকে ল্যাট্রিনেই থাকতে হচ্ছে বেশি। ও দুর্বল হতে শুরু করলো। খাদেজা বেগম আচঁলে অশ্রু মুছছেন ছেলের শিয়রে বসে। ডিউকের চোখ কোটরে ঢুকে গেছে দুইদিনেই।
খাদেজা বেগম ছেলের মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে জিজ্ঞেস করলেন, খুব কি বেশি কষ্ট হচ্ছে বাবা?
ডিউক দুর্বল কণ্ঠে বললেন, আমি আর পারছি না মা। একটা ডোজ নিতে দাও। আমার ব্যাগের সাইড পকেটে একটা নতুন সিরিঞ্জ আর একটা প্যাথেডিনের এ্যম্পল আছে।
খাদেজা বেগম শব্দ করে কেঁদে উঠলেন। আয়েশা নাজনিন কদিনের ছুটি নিয়েছেন। তিনি বেডরুমে শুয়ে এসব নিয়েই ভাবছিলেন। মার কান্না শুনে উঠে ওদের কক্ষে ঢুকলেন। জিজ্ঞেস করলেন, কাঁদছো কেনো মা? কী হয়েছে?
ডিউক ক্ষীণ কণ্ঠে বললেন, একটা ডোজ নিতে দাও আপা। খুব কষ্ট। আমি আর সহ্য করতে পারছি না।
আয়েশা নাজনিনের কান্না চলে এলেও সামলে নিয়ে পাশে খাটে বসে ভায়ের মুখের উপর ঝুকে বললেন, উইথড্রয়ালের শুরু যেহেতু করেছিস, সেহেতু সহ্য কর। আর একটা দিন সহ্য করলে সয়ে আসবে। আর যদি না পারিস তাহলে বল, এখনো সময় আছে তোকে মিশনে পাঠিয়ে দেই।
দুর্বল ডিউক শুয়ে থেকেই প্রতিবাদ করে বললেন, কখখনো না! আমি মিশনে যাবো না। ওখানে আরো বেশি কষ্ট। আমি এখানেই থাকবো। তোমরা আমাকে সাহায্য করো। আমার আবার পায়খানা পেয়েছে। আমাকে উঠিয়ে ধরে বাথরুমে পৌছে দাও আপা।
তুই কী মেট্রিল খাচ্ছিস?
খাচ্ছি আপা। স্যালাইনও খাচ্ছি। স্যালাইন খেতে খেতে মুখটার স্বাদ স্যালাইনের মতো হয়ে গেছে। ভাত খেতে খুব ইচ্ছে করছে। কিন্তু খেতে পারি না। একদম রুচি হয় না।
তুই উঠ। তোকে বাথরুমে পৌছে দিয়ে ডাক্তার আনতে যাই।
ডিউকের শরীরে শক্তি নেই বললেই চলে। সে বহু কষ্ট করে শোয়া থেকে বসতে পারলেও দাঁড়াতে পারলো না।
আয়েশা নাজনিন বহু কষ্টে কান্না সংবরণ করে ভাইকে জড়িয়ে ধরে বললেন, আমি তোকে ধরছি বাপ। তুই আমার গায়ে ভর দিয়ে দাঁড়া।
ডিউক বোনকে জড়িয়ে ধরে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন। মাকেও ধরে ধীরে ধীরে হেটে বাথরুমের ভেতর ঢুকলো। আয়েশা নাজনিন দরজা ভেজিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলেন।
খাদেজা বেগম ম্লান কণ্ঠে বললেন, তুই কাজে যা। আমি এখানে দাঁড়াচ্ছি।
আয়েশা নাজনিন বললেন, তুমি ওকে দেখো। আমি ডাক্তার আনতে যাচ্ছি। সঞ্চিতাকে কি আসতে বলবো মা?
ওকে আসতে বলার দরকার নেই। তুই ডাক্তার ডেকে আন। আমার মন বলছে ওকে এখন ডাক্তার দেখানো দরকার।
আয়েশা নাজনিন একটা ভ্যানেটিব্যাগ হাতে নিয়ে রাস্তায় নামলেন। হেটে রজনীগন্ধা মার্কেটের একটি ক্লিনিকে এসে বাসায় ডাক্তর নেবার কথা বললে ওরা মাদক দ্রব্য নিয়াময় বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের কাছে পাঠালো। আয়েশা নাজনিন চেম্বারে ঢুকে ঘটনা বর্ণনা করে ডাক্তারকে বাসায় যাবার কথা বললে ডাক্তার বললেন, ওকে বাসায় না রেখে ক্লিনিকে ভর্তি করে দেন। এসময়টা নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা দরকার রোগীকে।
আয়েশা নাজনিন বললেন, বহু চেষ্টা করেছি ওকে ক্লিনিকে ভর্তি করতে। কিন্তু ও কিছুতেই কারেকশান সেন্টার বা ক্লিনিকে ভর্তি হবে না। আপনি একটিবার চলেন ডাক্তার। আপনার উপযুক্ত ফি দেবো।
ডাক্তার হাত ঘড়ি দেখে মনে মনে হিসেব কষে বললেন, আমি একটা রোগী দেখি পাঁচ মিনিট। এই পাঁচ মিনিটে ফি নেই তিনশত টাকা। আপনার বাসায় যাওয়া আসা র্পযন্ত যত পাঁচ মিনিট যাবে তত তিশ শত টাকা দিতে হবে ফি হিসেবে।
আয়েশা নাজনিন ম্লান হেসে বললেন, ফি নিয়ে আপনি কোনো চিন্তা করবেন না ডাক্তার সাহেব। আপনার হিসেব মতোই আপনাকে ফি দেয়া হবে।
বেশ। চলেন। কতদূর?
পনেরো মিনিট হাটলে আর রিকশায় চড়লে পাঁচ মিনিট।
ক্লিনিকের বাইরে এসে দুটো রিকশা দাঁড় করিয়ে আয়েশা নাজনিন ডাক্তারকে বললেন, আপনি একটায় চড়েন। আমি অপরটায় চড়ছি।
ডাক্তার নিয়ে বাসায় ঢুকে ডিউকের অবস্থা দেখে হতভম্ব হয়ে পড়লেন আয়েশা নাজনিন। ডিউকের জিভ বেরিয়ে পড়েছে পুরোটা; কমপক্ষে এক হাত লম্বা হবে। ও কুকুরের মতো শ্বাস-প্রশ্বাস নিচ্ছে। খাদেজা বেগম পাশেই মেঝেতে বসে মুখে আঁচল চাপা দিয়ে কাঁদছেন।
ডাক্তার বললেন, ওকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে আপা। আমি ক্লিনিক থেকে লোক আসতে বলছি।
আয়েশা নাজনিনও মুখে শাড়ির আঁচল চেপে ফুপিয়ে উঠলেন। তিনি কাঁদ কাঁদ কণ্ঠে বললেন, যা ভালো হয় তা করেন ডাক্তার সাহেব। আমার ভাইটাকে বাঁচান। ওর জিভ এতো লম্বা হলো কী করে ডাক্তার?
ডাক্তার মোবাইল ফোনের বোতাম টিপতে টিপতে বললেন, উইথড্রয়ালের সময় প্রত্যেক রোগীর এরকম জিভ বেরিয়ে পড়ে। এ নিয়ে তেমন আশঙ্কার কিছু নেই।
ওদিক মোবাইল ফোনে সাড়া দিতেই ডাক্তার বললেন, একজন মেল নার্স পাঠিয়ে দিন পনেরো নম্বর সড়কে সতেরো নম্বর বাসার দোতলায়। এ্যাম্বুলেন্স সহ। জলদি! রোগীর অবস্থা সিরিয়াস!
আয়েশা নাজনিন বললেন, আপনি ড্রয়িংরুমে বসেন ডাক্তার সাহেব। আমি চা করে দিচ্ছি।
ডাক্তারের চা পান শেষ হবার আগেই এ্যাম্বুলেন্স চলে এলো। ডিউককে নেয়া হলো ক্লিনিকে। আয়েশা নাজনিন সঞ্চিতাকে মোবাইল ফোনে সব জানিয়ে দিলেন।

 

ঐদিন আজকের তাজা খবরের রিপোর্টার সোহরাব কাদের বিকেলে বারবার মোবাইল ফোনে রিং করে শারমিন শিলাকে পায় নি। বাসায় এসে জেনেছে শারমিন বাসায় নেই। সে বাসার পাশেই ঘাপটি মেরে বসে ছিলো শারমিন শিলা এলেই ধরবে ইন্টারভ্যু দেবার জন্য। কিন্তু ওকে রাত আটটা র্পযন্ত বাসায় ঢুকতে দেখে নি। সেদিন ব্যর্থ হয়ে ফিরে এলেও আশা ছাড়ে নি। এর মধ্যে শিশু দুধের দাম বেড়ে গেলো কেজি প্রতি কুড়ি টাকা। পত্রিকায় বেশ লেখালেখি হলো; সবাই বানিজ্যমন্ত্রী তথা সরকারকে দোষারোপ করলেন। সরকার প্রথমে সাফাই গাইতে গিয়ে বললো: বিশ্ববাজারে দাম না বাড়া সত্ত্বেও বাংলাদেশে এক ধরনের মুনাফালোভী ব্যবসায়ী সিন্ডিকিটে বেবিফুডের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। এরকম প্রেসবিজ্ঞপ্তিটি প্রকাশের পর কলামিস্টগণ নিয়ন্ত্রণহীন সরকার বলে আরো তুলোধূনো  করলেন। অগত্যা বাণিজ্যমন্ত্রী বেবিফুড ব্যবসায়ীদের ডেকে পাঠালেন মন্ত্রণালয়ে। হৃদ্যতাপূর্ণ পরিবেশে আলোচনা হলো; ব্যবসায়ীরাই দুপুরের প্যাকেট লাঞ্চ সরবরাহ করলেন হোটলে সোনার গাঁ থেকে। তারা প্রতশ্রিুতি দিয়ে গেলেন নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে বেবিফুডের দাম যুক্তিসংগত পর্যায়ে কমিয়ে আনবেন এবং এর পর থেকে বাণিজ্যমন্ত্রীর সাথে আলোচনা না করে বেবিফুডের দাম বাড়াবেন না। কিন্তু তারা কথা রাখেন নি। অনুসন্ধিৎসু কতিপয় প্রতিবেদক খোঁজাখুঁজি করে ভেতরের সংবাদটা জানতে পারলেন যে, বেবিফুড ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটে মন্ত্রীর এক ঘনিষ্ট আত্মীয় সম্প্রতি যোগদান করেছেন। কাজেই ……।
এই ইস্যুটাকে উপলক্ষ্য করে সোহরাব কাদের চলে এলেন শারমিন শিলার কলেজে: ইন্টারভ্যু নিতে নয়, ইন্টারভ্যু নেবার জন্য ডেট নিতে। অপেক্ষা। কিন্তু সেদিন ক্লাশ না থাকায় শারমিন শিলা কলেজেই আসেন নি। সোহরাব কাদের ভ্রু কুচকে অধ্যক্ষের সাথে কথা বলতে গেলেন। অধ্যক্ষ সাহেব জানালেন যে, কলেজে এটা প্রচলিত এখন; কারো ক্লাশ না থাকলে সেদিন শুধু শুধু আসার দরকার নেই-যারা প্রশাসনিক কাজের সাথে জড়িত, তাদের দৈনিক অবশ্যই আসতে হয়।
সোহরাব কাদেরের মনে একটা প্রশ্ন আকুলি-বিকুলি করছিলো। তিনি প্রশ্নটা করেই ফেললেন, তাহলে টিচারদের দৈনিক ক্লাশ দেয়া যায় না স্যার?
অধ্যক্ষ সাহেব জানালেন: টিচারদের লেকচার প্রস্তুতির জন্য লেখাপড়ার প্রয়োজন হয়; সেজন্য মাঝে মাঝে তাঁদের অফ ডে থাকে।
সোহরাব কাদের ফের প্রশ্ন করলেন, এতে টিচারদের শ্রম ঘন্টার অপচয় হচ্ছে না স্যার?
অধ্যক্ষ সাহেব ফের জানালেন: একটা বিষয় আপনাকে বলা হয়নি। কলেজের শিক্ষকগণ সাধারণ সরকারি কর্মচারিদের মতো কোনো ক্যাজুয়াল লিভ পান না।  
সোহরাব কাদের মনে মনে ভেবে মনে মনেই বললেন: তাহলে মাঝে মাঝে অফ ডে থাকাটা ঠিকই আছে। সোহরাব অধ্যক্ষ সাহেবের সহযোগীতার জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে ফের শারমিন শিলাকে মোবাইল ফোনে পেতে চেষ্টা করলেন। কিন্তু রিং হলেও ধরছে না। সহজ চালাকিটা না বুঝার কোনো কারণ নেই। তিনি শারমিন শিলার বাসার যাবার সিদ্ধান্ত নিলেন। এবং তখনই চলে এলেন বাসায়।
দরজার পাশের কলবেল বাজালে ভেতর থেকে শারমিন শিলার কণ্ঠ ভেসে এলো, কে?
সোহরাব কাদের মিথ্যে বললেন, আমি ক্যাবলম্যান। আপনার টিভির ক্যাবল লাইনটা চেক করতে এসেছি।
শারমিন শিলা দরজা খোলে সোহরাব কাদেরকে চিনতে পেরে দরজা বন্ধ করে দিতে চাইলে সোহরাব আধা ভেতরে ঢুকে অনুনয় করে বললেন, মিথ্যে বলার জন্য মাফ চাইছি ম্যাডাম। সরি!
শারমিন শিলা দরজা থেকে না সরে বললেন, আমি কারো সাথে কথা বলতে চাই না।
আমরা বা আমি আপনার বিরুদ্ধে কোনো উল্টাপাল্টা রিপোর্ট করি নাই ম্যাডাম। তাহলে আপনি আমাদেরকে এড়িয়ে চলতে চাচ্ছেন কেনো? সাহিত্যের ভাষায় বলতে গেলে আপনার ভেতর একটা স্ফুলিঙ্গ আছে, যা উপযুক্ত সময়ে নাড়িয়ে দিলে আগ্নেয়গিরির মতো বিস্ফোরিত হবে।
শারমিন শিলা সরে দাঁড়িয়ে হাসিমুখে বললেন, আপনি সাহিত্যিকের মতো কথা বললেন। লেখালেখি করেন নাকি?
সোহরাব কাদের ভেতরে পুরোপুরি ঢুকে দরজাটা লাগিয়ে দিয়ে বললেন, রিপোটিং করা এক রকমের লেখালেখি। তবে এখনো কথা শিল্পীদের মতো গল্প-টল্প লিখছি না। আমার মাথায় কোনো কাহিনী আসে না। বসে কথা বলি ম্যাডাম?
শারমিন শিলা জিভে সামান্য কামড় দিয়ে বললেন, সরি! বসুন। আপনার ক্যামেরাম্যান আসে নি আজ?
বাইরে দাড় করিয়ে রেখেছি। আপনি অনুমতি দিলেই ওকে আসতে বলবো।
শারমিন শিলা সোহরাবের মুখোমুখি সোফায় বসে বললেন, পরে। এখন বলুন কী জানতে চান আমার কাছে।
আপনি হঠাৎ কথা বলা বন্ধ করে দিলেন কেনো ম্যাডাম?
মুখের হাসি বিস্তৃত করে শারমিন শিলা বললেন, কথা বলা বন্ধ করলাম কোথায়! এই যে এখন আপনার সাথে কথা বলছি! তাছাড়া আমাকে সবসময় কলেজে কথা বলতেই হয়!
ঠাট্টা করার জন্য ধন্যবাদ ম্যাডাম। কিন্তু সিরিয়াসলি বলছি। আপনি একদিন মার্কেটে সামান্য বলেছিলেন তাতেই কলামিস্টরা আপনাকে নিয়ে কলাম লিখতে শুরু করেছিলো। কিন্তু আপনি থেমে যাওয়ায় একটা সম্ভাবনার অপমৃত্যু হতে যাচ্ছে ম্যাডাম। ঘুণে ধরা সমাজে আপনাকে দরকার ম্যাডাম। বিশেষ করে মুনাফাখোর অতিলোভী বেনিয়াদের থামানোর জন্য আপনাকে দরকার।
কী বলছেন আপনি সোহরাব সাহেব! ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণের জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয় আছে, সরকার আছে। আপনি সরকারকে ক্ষেপান।
আমরা সবাই জানি মুক্তবাজার র্অথনীতিতে সরকার দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। আপনার মতো সচেতন জনতা এগিয়ে এলেই ব্যবসায়ীদের অতি মুনাফা লুটার লাগাম টানা সম্ভব। আপনি দেখলেন, বলা নেই কওয়া নেই, কোনো কারণ নেই; অথচ বেডিফুডের দাম কেজি প্রতি কুড়ি টাকা বাড়িয়ে দাম দেয়া হয়েছে।
শারমিন শিলা উষ্মা প্রকাশ করে বললেন, আমি ভেবে পাই না একজন মানুষের কত টাকা দরকার। কবরে যাবে সাড়ে তিন হাত থান কাপড়। আশ্চর্য!
কিছু একটা করা দরকার ম্যাডাম। কিছু একটা বলেন। এই অসহনীয় অবস্থা থেকে উদ্ধারের জন্য একটা উসিলা দরকার।
বেবিফুডের বিকল্প আমাদের জানা আছে। দুই বছর র্পযন্ত শিশুদের মায়ের বুকের দুধই যথেষ্ট। আর অন্যদের নরোম ভাত খাওয়ানো যায়; জাউ খাওয়ানো যায়; চাউলের গুড়া রেঁধে খাওয়ানো যায়। দুধের গুড়ার চাইতে এগুলোয় পুষ্টিগুণ অনেক অনেক গুণ বেশি। একমাস বেবিফুড কেনা বন্ধ থাকলে দেখতে পাবেন মুনাফাখোর ব্যবসায়ীদের অবস্থা।
ধন্যবাদ ম্যাডাম। আজ এ র্পযন্তই।

সোহরাব কাদের সংবাদটা শুধু নিজের পত্রিকার জন্য না রেখে গুরুত্ব বাড়ানোর জন্য বলতে গেলে সকল পত্রিকায় প্রকাশের ব্যবস্থা করলেন। পত্রিকায় সংবাদটা পড়ে জনতার মাঝে মিশ্র প্রতিক্রিয়া হলো। সাধারণ পাঠক ঠোঁট উল্টে অন্য সংবাদ পাঠে মন দিলো। বেবিফুড ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট বিদ্রুপ হেসে একে অপরকে ফোন করে হা হা করে হাসলো মাত্র। কনজুমার এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ ক্যাব এর সভাপতি ভ্রু কুচকে সংবাদটা কয়েকবার পাঠ করে সেক্রেটারি জেনারেলকে ফোন করে তখনই আসতে বললেন। দুজন তোপখানা রোডের অফিসে এসে বসলেন। অফিস সহায়ককে দিয়ে চা আনিয়ে দুজনই পান করছেন।
সেক্রেটারি জেনারেল হায়াত আলি জিজ্ঞেস করলেন, এতো সকালে জরুরি তলব কেনো কুদরত ভাই?
ক্যাব সভাপতি কুদরত জাহিদ পত্রিকায় সংবাদটা দেখিয়ে বললেন, এটা কি পড়েছেন আপনি কুদরত জাহিদ?
কুদরত জাহিদ সংবাদটায় একবার চোখ বুলিয়ে বললেন, আশ্চর্য! সংবাদটা কালের কণ্ঠেও ছাপা হয়েছে! আমি যুগান্তরইে পড়েছি।
সংবাদটা পড়ে আপনার মনে স্ট্রাইক করে নি?
একেবারে স্ট্রাইক করে নি তা নয়। মনে হয়েছে একজন সাধারণ গৃহিণীর মিনিংলেস মন্তব্য পত্রিকাগুলো এতো গুরুত্ব দিয়ে ছাপছে কেনো?
পজেটিভ না ভেবে নেগেটিভ দিকটাই ভাবলেন হায়াত সাহেব?
বুঝলাম না।
হিন্দি ছবিতে প্রায়ই একটা ডায়ালগ বলা হয়: চিংগারিতে মওকা মতো উসকে দিতে পারলে তা জ্বালামুখি হয়ে প্রকাশ পায়।
তারপরও বুঝলাম না কুদরত ভাই।
চিংগারি হলো আগুনের স্ফুলিঙ্গ আর জ্বালামুখি হলো আগ্নেয়গিরি। একটা আগুনের স্ফুলিঙ্গকে সময়মতো উসকে দিতে পারলে তা আগ্নেয়গিরি হয়ে প্রকাশ পায়। এবার বুঝেছেন?
জি। কিন্তু এই ডায়লগের সাথে আজকের এই সংবাদের সম্পর্ক কী?
শারমিন শিলা হলো চিংগারি; ওর মন্তব্যগুলো কাজে খাটাতে পারলে আগ্নেয়গিরি হবে।
আপনার কথাও আমার কাছে হেয়ালি মনে হচ্ছে।
আরো পরিস্কার করে বলছি। আমরা ক্যাব গঠন করেছি ভোক্তা অধিকার আদায়ের জন্য। কিন্তু আজ র্পযন্ত বক্তব্য-বিবৃতি দেয়া ছাড়া কাজের কাজ কিছুই করতে পারি নি। শারমিন শিলা নামের ভদ্রমহিলাকে উসিলা করে এবার সুযোগ এসেছে কিছু একটা করার।
এবার বুঝতে পেরেছি। আমাদের প্ল্যান অব একশন কী হায়াৎ ভাই?
আপনি ওয়ার্ড সভাপতিদের জরুরি মিটিং ডাকুন। সবাইকে কাজে ঝাঁপিয়ে পড়তে বলবো।
কী করতে বলবেন ওদের হায়াৎ ভাই?
ওদের বলবো এলাকার গৃহিণীদের বাসায় বাসায় গিয়ে বুঝাবে কমপক্ষে একমাস বেবিফুড ক্রয় বন্ধ রাখার জন্য এবং বিকল্প কী খাওয়াতে হবে শিশুদের তাও বুঝাবে। মুনাফালোভি বেবিফুড বিক্রেতাদের উচিত শিক্ষা দিতে হলে এর কোনো বিকল্প নেই। হুমকি ধামকিতে কাজ হবে না হায়াত।
বুঝতে পারছি। গান্ধির মতো সত্যাগ্রহ করতে হবে; বিদেশি কাপড় বর্জনের মতো আমাদেরও ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের পণ্য বর্জনের আন্দোলন শুরু করতে হবে।
ঠিক বলেছেন আপনি হায়াত। তাহলে কাজে লেগে যান আজ থেকে।
আজ থেকে না, এখন থেকেই! আমাদের চোখ খুলে দেবার জন্য ভদ্রমহিলাকে ধন্যবাদ।


রাত বারোটায় ফোনে খবরটা জেনেও মোস্তাকিম মাসুদের তেমন মন খারাপ হলো না। তিনি এর জন্য প্রস্তুতই ছিলেন। আতিয়া সৈয়দ তখনো বাসার অফিসে নিজ এনজিওর কাজ করছিলেন। কিছুটা অনিচ্ছা নিয়েই এগিয়ে গেলেন সেদিকে। এখন তা না জানালে পরে শুধু শুধু মনোমালিন্য হবে। এ বয়সে দাম্পত্য জীবনের টক-ঝাল জমে না তেমন। কথা বন্ধ কার্যক্রম দীর্ঘস্থায়ী হয়ে যায়। অফিসে ঢুকতেই আতিয়া সৈয়দ স্বামীর দিকে তাকিয়ে বিস্মিত কণ্ঠে বললেন, সূর্য আজ কোনদিকে উঠলো গো মিস্টার মাসুদ!
মোস্তাকিম মাসুদ বললেন, ভুল হলো, রাতে সূর্য উঠে না মিজ আতিয়া সৈয়দ! রাতে উঠে চাঁদ। আজ ঘোর অমাবশ্যা থাকায় চাঁদও উঠে নি।
কিন্তু আমার অফিসে কিছু একটা উঠেছে। ঘুম আসছে না নাকি তোমার?
মোস্তাকিম মাসুদ স্ত্রীর মুখোমুখি একটা চেয়ারে বসে বললেন, ফোনটা শেষ র্পযন্ত পেলাম। তাই তোমাকে জানাতে এলাম।
ক্যাবিনেট সেক্রেটারি হওয়ার সম্ভাবনা তোমার কম। তাহলে কি কুইট করেছে তোমাকে?
বুদ্ধিমতি তুমি আতিয়া। পচিশ বছর পূতি হওয়ায় সরকার গণকর্মচারি অবসর আইনে আমাকে অবসরে পাঠিয়ে দিয়েছে। আগামীকাল থেকেই কার্যকর হবে।
আতিয়া সৈয়দ ফাইলটা বন্ধ করে চেয়ারে সোজা হয়ে বসে স্বামীর দিকে তাকিয়ে বললেন, এতোদিনের চাকরি হঠাৎ করেই শেষ হয়ে গেলো! মন কি খুব বেশি খারাপ হচ্ছে তোমার গো?
ভাবছি সাতাশটা বছর কার চাকরি করলাম। সরকারি কর্মচারিদের শাস্তি দেবার জন্য কতগুলো নিবর্তনমূলক আইন আছে। তার মধ্যে এটা হলো জঘন্যতম নিবর্তনমূলক আইন। সভ্য দেশে নিবর্তনমূলক কোনো আইনই থাকা উচিত না। অথচ কোনো সরকারই এটা বাতিল করে না। সবাই নিজ স্বার্থে কাজে লাগায়। ব্যুরোক্রেসি এতো শক্তিশালি, কিন্তু এরাও কোনো বাচ্যই করে না এই আইন নিয়ে।
বুঝেছি তুমি মনকে শান্ত করতে পারছো না। কিন্তু তুমি আশঙ্কা করছিলে যে, তোমার বিরুদ্ধে এমনই কোনো ব্যবস্থা নিতে পারে সরকার। মন্ত্রীর কথা শুনলে এমনটি হতো না।
না না কী বলছো তুমি! আমি অন্যায়ের সাথে কম্প্রোমাইজ করতে রাজি না। সচিব হয়ে রিটায়ার করছি। যে কোনো প্রাইভেট কোম্পানিতে চাইলেই চাকরি পেয়ে যাবো।
উহু, কমপক্ষে আগামী তিনমাস কোনো চাকরিতে ঢুকবে না। একদম বিশ্রাম। হাইতি থেকে ঘুরে আসো একবার।
সুন্দর কথা বলেছো। তুমিও চলো আমার সাথে।
দেখি। এনজিওর কাজ গুছাতে পারলে যাবো হয়তো বা।
হয়তো বা না। তুমি না গেলে আমি যাচ্ছি না। বুড়ো বয়সে বুড়ি সাথে না থাকলে বড্ড একা একা লাগে গো।
এটা একটা যথার্থ কথা বলেছো। মনটা নিশ্চয়ই হালকা হয়েছে তোমার। এবার গিয়ে শুয়ে পড়ো। আমি আধা ঘন্টার মধ্যে চলে আসছি।
উহু, সেটি হচ্ছে না। আজ একসাথে বিছানায় যাবো। যদি এখন যেতে পারো তো ভালো। নইলে তোমার কাজ শেষ না হওয়া র্পযন্ত আমি এখানে বসে থেকে তোমার কাজ দখেবো। তারপর একত্রে বিছানায় যাবো।
বুড়ো বয়সে প্রেম উতলে উঠছে দেখছি!
কিশোর বয়স আর বুড়ো বয়সের প্রেম সাংঘাতিক! উতলেই উঠে শুধু!
বলেই মোস্তাকিম মাসুদ গলা ছেড়ে হেসে উঠলেন। সাথে আতিয়া সৈয়দও শব্দ করে হেসে উঠলেন।

একমাস পর। গুড়ো দুধ ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের সভাপতি সোলায়মান শাহীন আজ পুরো ভ্রু কুচকে তাকিয়ে আছেন ডিস্ট্রিবিউটরস লিস্টের দিকে। কিছুদিন যাবৎ বিভিন্ন সুপারভাইজারের টেলিফোন আসছিলো; কিন্তু তা গা করেন নি; ভেবেছিলেন ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু ঠিক হয় নি! তিনি আজ বিকেল তিনটায় গুড়ো দুধ ব্যবসায়ী সমিতির জরুরি সভা ডেকেছেন। সমিতির সদস্য মাত্র চারজন। সবাই পনেরো মিনিট আগেই চলে এসেছেন। সবার সামনে হোটলে সোনারগাঁও থেকে নাস্তা আনিয়ে পরিবেশন করা হয়েছে। সফট ড্রিংক হার্ড ড্রিংক দুটোই আছে। দেখা গেলো সবাই সফট ড্রিংক হার্ড ড্রিংক দুটোই পান করছেন; একজন হার্ড ড্রিংক-এর সাথে সফট ড্রিংক মিশিয়ে পান করছেন।
সোলায়মান শাহীন ওর দিকে তাকিয়ে বললেন, ক্যান ইউ রিয়েলাইজ দ্য প্রবলেম মিস্টার রিয়াজুল হাসান?
রিয়াজুল হাসান তখন হার্ড ড্রিংক-এর সাথে সফট ড্রিংক মিশিয়ে একটা পেগ তৈরি করছিলেন। তিনি পেগটা তৈরি করে এক চুমুক পান করে বললেন, কিছুদিন যাবৎ গুড়ো দুধ কম বিক্রি হচ্ছে।
আনিসুল হাসিব এক চুমুক র হার্ড ড্রিংক পান করে বললেন, কম বিক্রি হচ্ছে কথাটা ঠিক না রিয়াজ ভাই। একদম বিক্রি বন্ধ। হঠাৎ করেই সেপ্টেম্বর মাসের ২৯ তারিখে হতে গুড়ো দুধ কেউ কিনছে না। বাংলাদেশে কি শিশু জন্ম বন্ধ হয়ে গেলো?
বেলায়েত সিদ্দিক এবার সফট ড্রিংক নিয়েছেন। তিনি কোকের ক্যান খুলে এক চুমুক দিয়ে বললেন, জাস্ট নো ফ্যামিলি ইজ পারচেজিং বেবি ফুড অর পাউডার মিল্ক। আমি সুপারভাইজারদের কয়েকটা ফ্যামিলির বাসায় পাঠিয়েছিলাম।
সোলায়মান শাহীন বললেন, আপনি ভালো উদ্যোগ নিয়েছিলেন সোহরাব ভাই। হোয়াট ইউ হ্যাভ গট ফ্রম দিজ সার্ভে?
বলছে এমনিতেই তারা গুড়ো দুধ কিনছে না। তাছাড়া ডাক্তারও নাকি বলছে যে বর্তমানে গুড়ো দুধে ফুড ভেল্যু বলতে কিছু নেই। এর চেয়ে চাউল আটা এবং অন্যান্য নিউট্রিয়েন্টস ইনগ্রেডিয়েন্টস দিয়ে ঘরে তৈরি বেবি ফুড বেশি উপকারি। ওরা এখন ঐ কাজটিই করছে।
রিয়াজুল হাসান কৃত্রিমভাবে বিস্ময় প্রকাশ করে বললেন, সর্বনাশ! তাহলে কি বেবি ফুডের বিজনেস শেষ! আমার পঞ্চাশ লাখ টাকা পুজি খেটে আছে। আরো বিশ লাখ টাকার মাল সমুদ্রে ভাসছে।
সোলায়মান শাহীন সবাইকে একবার দেখে বললেন, টাকা নিয়ে আমরা ভাবি? টাকা ব্যাংক থেকে নেয়া। লাভ না হলে লোন পরিশোধ নেই!
লাভ হলেই বা কত লোন পরিশোধ করছি আমরা!
আনিসুল হাসিব বললেন, আমাদের আলোচনা অন্যদিকে চলে যাচ্ছে। বেবি ফুড বিজনেস নিয়ে একটা সংকট তৈরি হচ্ছে। এ সংকট কতদিন স্থায়ী হবে জানি না। সংকট যদি শর্টও হয় তবুও আমাদের মোকাবেলার একটা উপায় বের করা দরকার।
রিয়াজুল হাসান বললেন, আগে আমাদের সংকটের কারণ বের করতে হবে। কারণটা বের করতে পারলেই মোকাবলো করার পথও পাওয়া যাবে।
কারণটা কি এখনো কেউ ধরতে পারেন নাই? মূল্য বৃদ্ধি। ইফ উই রিডিউস দ্য প্রাইজ দেন দ্য সিচুয়েশন উইড বি নরমাল।
তাহলে তাই করে ফেলি। বেবি ফুড বিক্রি বন্ধ থাকলে লস হবে; কিন্তু দাম কমালে লস হবে না।
আপনি ঠিক বলেছেন। আমরা কোনো কারণ ছাড়াই দফায় দফায় বেবি ফুড আর গুড়ো দুধের দাম বাড়িয়ে অত্যাধিক লাভ করছি, তা ভোক্তার ধরে ফেলেছে। তাই তারা বেবি ফুড ও গুড়ো দুধ বয়কট করছে।
সোলায়মান শাহীন বললেন, সরকার বারবার ওয়ার্নিং দিয়েও আমাদের সিন্ডিকেট ভাংতে পারে নি। আমরা এখন সাধাসিধা কনজুমারের কাছে হার মেনে যাবো? বাট দ্য রিয়েলিটি ইজ দ্যট উই হ্যাভ টু বি ডিফিটেড। তবে এটা নিয়ে আমরা একটা স্ট্যান্টবাজি করতে চাই।
সবাই উৎসুক হয়ে ওর দিকে তাকালেও শুধু বেলায়েত সিদ্দিক বললেন, কী সেটা?
আমরা সরকারের সাথে আলোচনার নাটক করে দাম কমাবো। তাহলে সরকারের কাছে আমাদের ভাবমূর্তি বাড়বে।
দিস ইজ দি বেস্ট আইডিয়া! ইউ উইল টেক দি রেসপনসিবিলিটি টু মেক এন এরেঞ্জমেন্ট ফর সিটিং উইথ দি গভমেন্ট।
ডোন্ট ওরি। আই উইল ডু ইট। টুমরো এট টেন উই উইল সিট উইথ মিনিস্ট্রি অব কমার্স। চিয়ার্স!
নিউজটা কি আজ রাতে টিভি চ্যানেলগুলায় যাবে?
অবশ্যই যাবে। তার আগে কমার্স মিনিস্টারের সাথে আলোচনা করে প্রোগ্রামটা ফিক্স আপ করে নেই। দেশ বিদেশের সব মিডিয়াই হাজির থাকবে আগামীকালের আলোচনা সভায়।

বদরুল হায়দার টিভি রুমে বসে আজকের দৈনিক পত্রিকার অপেক্ষায় আছেন। পত্রিকা সাড়ে সাতটার মধ্যেই চলে আসে। তিনি বারবার দেয়াল ঘড়ি দেখছেন আর টিভির চ্যানেল পরিবর্তন করছেন। মনে হচ্ছে সাড়ে সাতটা বাজতে আরো কয়েক যুগ বাকি! বাংলা চ্যানেলগুলোয় সকালে বিনোদনমূলক কিছুই  থাকে না; টকশোর রিপিটেশন, খবর আর খবরের পর্যালোচনা। বিরক্তিকর! সকাল ছ’টায় একবার বিবিসি ওয়ার্ল্ড দেখা হয়ে গেছে। দুপুর র্পযন্ত ঐ খবরই পুনরাবৃত্তি করা হবে। স্টার মুভিতে চলছে জ্যাকি চ্যানের একটা ছবি: হু এম আই। ওটাই দেখছেন আর পত্রিকার অপেক্ষা করছেন। কলবেল বাজতেই দ্রুত উঠে দরজা খুলে মেঝে থেকে পত্রিকাটা উঠিয়ে দরজার ছিটকিনি আটকে বসলেন পত্রিকা পাঠে। পাতা উল্টাতে উল্টাতে ভেতরের পাতায় খবরটা পড়ে চমকে উঠলেন। বলা নেই কওয়া নেই বদলি? এটা কেনো? তিনি ল্যান্ড ফোনের কাছে গিয়ে রিং করলেন। ওদিকে সাড়া দিতেই বললেন, আমি বদরুল হায়দার। পেপারে দেখলাম তোমার বদলি হয়েছে। হঠাৎ?
ওদিক থেকে শাফায়াত আজিজ বললেন, আমিও তোমার মতো পত্রিকা দেখে জানতে পারলাম।
কী আশ্চর্য! তুমি একজন জয়েন্ট সেক্রেটারি, তোমার বদলির আগে তুমি জানতে পারবে না?
আমি তিনদিনের ছুটিতে আছি। গতকালই বদলিটা হয়েছে।
আজ আমার সারাদিন বেশ কয়েকটা মিটিং আছে। তুমি আগামীকাল আমার অফিসে আসো। নিশ্চয়ই কোথাও একটা ঘটনা আছে।
ওকে। আমি আগামীকাল তোমার অফিসে আসছি।
বদরুল হায়দার রিসিভার ক্রাডলে রেখে ঘুরে দেখেন শারমিনা শিলা সোফায় বসে পত্রিকা দেখছেন। পত্রিকা থেকে নজর না সরিয়েই জিজ্ঞেস করলেন, কার বদলি হয়েছে?
শাফায়াত আজিজের। ও জানেই না ওর বদলি হয়েছে। ও-ও পেপার থেকে জানতে পারলো।
উনি জানি কোথায় ছিলেন? মনে পড়েছে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনে সচিব পদে। কী এমন মজা আছে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনে যে ওকে সরিয়ে দিয়ে ঢুকতে হবে?
এটার জবাব সেই দিতে পারবে যে ওটা আগ্রাসন করেছে।
মাঝে মাঝে আমারও ভয় হয়, কখন কে আমাকে নেত্রকোণার কোনো এক প্রত্যন্ত অঞ্চলের কলেজে বদলি করে আমার পোস্টটা দখল করে নেবে।
তখন কী করবে তুমি?
চাকরি ছেড়ে দেবো অবশ্যই।
কেনো?
ছেলেমেয়ে বড় হয়েছে; মধ্য বয়স। এই মধ্য বয়সে একা পরিবার ছেড়ে দূরে থাকাটা কোনোমতেই সম্ভব হবে না। এই বিষয়টা সরকার কখনো বিবেচনা করে না। সেজন্যই দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের অফিসগুলোয় অফিসাররা থাকেন না, ডাক্তার থাকেন না, স্কুল-কলেজে ভালো শিক্ষক থাকে না।
আমাদের দেশটা এভাবেই চলছে। এ বিষয়ে তোমাকে একটা ঘটনার কথা বলি। ক বছর পূর্বে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে এক সিনিয়র সহকারী সচিবকে স্বাস্থ্য রক্ষা বিষয়ে দুই বছরের একটা কোর্সে বিদেশ পাঠিয়েছিলো। নিয়ম আছে দশ মাসের বেশি কোনো কোর্সে বিদেশে গেলে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে ওএসডি হতে হয়। তো দুই বছর পর ঐ অফিসার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে যোগদান করলেন। তখন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে ওকে পোস্টিং দেবার জন্য ডিও লেটার দিয়েও ঐ অফিসারকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে আনতে পারলো না।
আশ্চর্য! তাহলে ঐ অফিসার দুই বছরে বিদেশে কোর্স করে যা শিখে এলো তা কোথায় কাজে লাগাবে?
কোথাও না। কিছুদিন পর জাস্ট ভুলে যাবে।
এ কারণেই এদেশে উন্নয়ন না এগিয়ে পিছিয়ে যায়। প্রত্যেক সরকারের আমলে আমরা যে তিমিরে সে তিমিরেই থেকে যাই।
থাক। রাজনীতি নিয়ে কথা বলার দরকার নেই।  
কেনো? নিষেধ আছে নাকি?
নিষেধ নেই। তুমি আমি রাজনৈতিক আলোচনা করে কী লাভ হবে দেশের?
তাই বলে কি আমজনতা মনের ক্ষোভ ঘরে বসেও প্রকাশ করবে না?
আমি সে অর্থে বলি নাই।
তাহলে?
শুধু শুধু সময় নষ্ট। তোমার আমার আলোচনা বাইরে যাবে না। আর যদি বাইরে যায়, তাহলে সরকার বিরোধী কথা বলার জন্য বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠিয়ে দেবে।
চাকরির ভয়!
কী করবো বলো। আমি তো আর রাজনীতিবিদ না; এবং ভবিষ্যতে রাজনীতি করবো, এমন কোনো উচ্চাভিলাসও নেই আমার। তাই নির্বিঘ্নে চাকরি থেকে রিটায়ার করতে চাই।
তথাস্তু স্যার!
শারমিন শিলা পত্রিকাটা হাতে নিয়ে শিরোনাম দেখে দেখে পাতা উল্টাচ্ছেন। শেষ পৃষ্ঠার একটা শিরোনাম দেখে চমকে ভেতর পড়ে স্বামীর দিকে তাকিয়ে বললেন, তুমি এই নিউজটা দেখো নি?
বদরুল হায়দার জিজ্ঞেস করলেন, কোন্ নিউজটা?
বেবিফুডের মূল্য হ্রাস করার জন্য ব্যবসায়ীরা কমার্স মিনিস্ট্রির সাথে আলোচনায় বসছে।
তার মানে তোমাদের নিরব বেবিফুড বয়কটের কার্যক্রম কাজে লেগে গেছে।
তাই তো মনে হচ্ছে। মনে হচ্ছে কুত্তার লেজও মাঝে মাঝে সোজা হয়!
পেপারটা দাও। নিউজটা পড়ে দেখি।
বদরুল হায়দার স্ত্রীর হাত থেকে পত্রিকাটা নিয়ে খবরটা পুরো পড়ে হাত তালি দিয়ে উঠলেন। বললেন, বাহবা! বাহবা। তাহলে তুমি আমভোক্তাদের নেতা হয়েই গেলে।
ঠাট্টা করছো কী?
আরে নাহ! ভুক্তভোগীর ব্রেন থেকেই উপযুক্ত প্রতিকারটা বের হয়। ওরা ফের তোমার কাছে আসবে পরবর্তী পরামর্শ নিতে। এগিয়ে যাও মাই লেডি। আই এম অলওয়েজ উইথ ইউ।
থ্যাঙ্ক ইউ মাই ডিয়ার।
বদরুল হায়দার সাড়ে আটটায় অফিসের উদ্দেশ্যে বাসা থেকে বের হতেই সোহরাব কাদির কলবেল টিপে দিলো। শারমিন শিলা বারান্দায় গিয়ে উকি দিয়ে সোহরাব কাদিরকে দেখে মুচকি হেসে হাত ইশারায় অপেক্ষা করতে বললেন। চাবিটা ফেলে দিয়ে বললেন, সরি সোহরাব সাহেব। চাবিটা দিয়ে গেট খুলে ভেতরে আসুন।
দরজার বাইরে পদশব্দ শুনে শারমিন শিলা দরজা খুলে সোহরাব কাদিরকে বললেন, ভেতরে আসুন মিস্টার সোহরাব। আর চাবিটা আমাকে দিন।
শারমিনা শিলা সোহরাব কাদিরের হাত থেকে চাবির গোছাটা নিয়ে দরজা পুরো খুলে দিয়ে সরে দাঁড়ালেন। সোহরাব কাদির ভেতরে ঢুকলে দরজা আটকে দিয়ে বললেন, বসুন মিস্টার সোহরাব।
শারমিন সোহরাব কাদিরের মুখোমুখি একক সোফায় বসে জিজ্ঞেস করলেন, বলুন কী জানতে চান আজ?
সোহরাব কাদির হাতের একটা পত্রিকা দেখিয়ে বললেন, বেবি ফুডের সিন্ডিকেট আগামীকাল বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সাথে মিটিং করতে যাচ্ছে এবং মিটিং করে বেবি ফুডের দাম কমাবে আশা করা যাচ্ছে।
খবরটা ভালো। কিন্তু এ বিষয়ে আমার কাছে এসেছেন কেনো? আমার কোনো ভূমিকা আছে কি এ বিষয়ে?
পেপারে কোনো নিউজ না এলেও আমি জানি আপনার পরমর্শে বেডি ফুডের কনজিউমাররা গত কয়েক মাস যাবৎ বেবি ফুড কেনা থেকে বিরত আছে।
শারমিন শিলা কিছু না বলে মুচকি হাসলেন শুধু।
সোহরাব কাদির সবজান্তার মতো মাথা দুলিয়ে জিজ্ঞেস করলো, আগামীতে কী প্রোগ্রাম আসছে?
ভোক্তাগণই স্থির করবেন আগামীতে কী প্রোগ্রাম নেবেন। তবে আমি একটা বিষয় বলতে চাই; দেশটায় ব্যবসায়িক অনাচার বেড়েই চলেছে। যদি ভোক্তাগণ সঠিক সময়ে সঠিকভাবে সদ্ধিান্ত নিয়ে দৃঢ় থাকতে পারে, তাহলে ব্যবসায়ীদের কিছুটা হলেও শিক্ষা দেয়া যাবে। আমাদের দেশে ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটকে সরকারও শিক্ষা দিতে পারবে না। কেনো পারবে না, তা আমি আপনি সরকার সবাই জানি।

 

পরদিন বদরুল হায়দার জনকল্যাণ মন্ত্রণালয়রে নিজ চেম্বারে ঢুকলেন। পাশাপাশি সাজিয়ে রাখা দুটো টেলিফোন সেটের দিকে তাকালেন। আব্দুল মান্নান ব্যাগ থেকে পানির বোতল ও টিফিন বক্স বের করে পাশের টেবিলের উপর রাখলেন। বদরুল হায়দার  বললেন, এক গ্লাস পানি দাও। গ্লাসটা বোতলের পানি দিয়ে ধূয়ে দেবে।
জি স্যার।
বলে আব্দুল মান্নান গ্লাসটা ধূয়ে এক গ্লাস পানি বদরুল হায়দারকে দিলেন।
বদরুল হায়দার পানি পান করে গ্লাসটা আব্দুল মান্নানকে দিতেই দরজা খুলে শাফায়াত আজিজ চেম্বারে অর্ধেক ঢুকে বললেন, মে আই কাম ইন, ফ্রেন্ড?
বদরুল হায়দার চেয়ার ছেড়ে এগিয়ে গেলেন দরজার দিকে। শাফায়াত আজিজকে জড়িয়ে বুকে বুক মেলালেন। হাত ধরে পাশের সোফাসেটে গিয়ে একটা একক সোফায় বসিয়ে নিজে পাশেরটায় বসলেন। আব্দুল মান্নানকে বললেন, সিঙ্গারা আর চা নিয়ে আসবে। আরেকজন মেহমান আসবে। মোট তিনজনের জন্য আনবে। এই নাও টাকা। পকেট থেকে পঞ্চাশ টাকার একটা নোট বের করে আব্দুল মান্নানকে দিলে মান্নান চলে গেলো বাইরে।
বদরুল হায়দার শাফায়াত আজিজের দিকে তাকিয়ে বললেন, এবার বলো ফ্রেন্ড, কী এমন ঘটলো যে তোমাকে হঠাৎ বদলি করা হলো?
আমি কিছুই জানি না। গত বৃহস্পতিবার তিনদিনের ছুটি নিলাম। তখন চেয়ারম্যান সাহেব খোশ মেজাজেই জানতে চাইলেন ছুটি নিয়ে কী করবো। বললাম এ বছর কোনে ছুটি নেই তাই নিলাম। তাছাড়া চেয়ারম্যান সাহেবও কয়েকদিনের জন্য নেপাল যাচ্ছেন। আজ সকালে চাঁদপুর থেকে একজন বললো যে, পেপারে দেখেছে আমাকে ওএসডি করা হয়েছে। আমি বিশ্বাস করি নি। কিছুক্ষণ পর অফিস থেকে এক স্টাফ ফোন করে জানালো যে পেপারে বদলির খবর প্রকাশ হয়েছে। তখন আমি ইন্টারনেট অপেন করে দেখতে পেলাম ঠিকই বদলি হয়েছে। আমার জায়গায় দিয়েছে রাজিব কৌশিককে। ওকে চিনো নিশ্চয়ই?
চিনবো না কেনো? আমাদের ব্যাচমেট। আমরা একত্রে এসিএডি ট্রেনিং করেছি; ফরেন ট্যুরে থাইল্যান্ডে এক রুমে থেকেছি। ও এই কাজটা করতে পারলো? আমি ওর সাথে কথা বলবো। ওর মোবাইল ফোন নম্বর আছে তোমার কাছে?
না।
ও এর আগে কোথায় ছিলো?
পরিসংখ্যান ব্যুরোতে ডিডিজি পদে ছিলো। দুই তিন মাস আগে ওকে ওএসডি করা হয়।
ওকে। আমি ওর মোবাইল নম্বরটা বের করছি।
বদরুল হায়দার উঠে চেয়ারে বসে ইন্টারকমে পার্সোনাল অফিসারকে বললেন, জনাব রাজিব কৌশিক। কিছুদিন আগে ব্যুরো অব স্টেটেসটিক্সে ডিডিজি পদে ছিলেন। এখন ওএসডি। উনার মোবাইল ফোন নম্বরটা দরকার। খুবই জরুরি। পাঁচ মিনিটের মধ্যে সংগ্রহ করে দিন।
বদরুল হায়দার ফের এসে শাফায়াত আজিজের পাশে বসলেন। বললেন, নিশ্চয়ই মন খারাপ তোমার?
মন খারাপ হবারই কথা। রাজিবের সাথে বেশ কয়েকটা ট্রেনিং করেছি। সেদিক দিয়ে বলা যায় বেশ কাছের মানুষ। সে আমাকে জিজ্ঞেস না করে আমার জায়গায় আসবে ভাবতেই অবাক লাগছে। ব্যুারোক্রেসিটা একদম নষ্ট হয়ে গেছে। সবাই একে অপরকে ল্যাং মারার সুযোগ খুঁজে।
আমিও অবাক হয়েছি কথাটা শুনে। ওকে আমি এই কথাটাই জিজ্ঞেস করবো। তারপর কথা বলবো এসোসিয়েশনের প্রেসিডেণ্টের সাথে।
প্রেসিডেণ্টের সাথে কথা বলবে কেনো? আমাদের এসোসিয়েশনের বর্তমান অবস্থা মূর্তির মতো। অস্তত্বি আছে; তবে কোনো কিছু করার ক্ষমতা নেই।
তারপরও কথা বলবো। সরকারের অন্যায় আচরণের ক্ষোভ যে আমাদের ভেতর জমে আছে তা জানাবো।
আশ্চর্যের ব্যাপার হলো রাজিব গতকাল বদলির অর্ডার নিয়ে অফিসে যোগদান করেছে। চেয়ারম্যান বিদেশে থাকায় একটিং চেয়ারম্যানকে দিয়ে জয়েনিং লেটার একসেপ্ট করিয়ে বিভিন্ন অফিসে এনডোর্স করিয়েছে।
হাউ স্ট্রেঞ্জ! একটিং চেয়ারম্যান কে ছিলেন?
একজন স্থায়ী সদস্য। উনি তেহাত্তর ব্যাচের একজন কর্মকর্তা। সচিব।
পার্সোনাল অফিসার এক টুকরো কাগজে রাজিব কৌশিকের মোবাইল ফোন নম্বর লিখে বদরুল হায়দাররে হাতে দিয়ে চলে গেলো। বদরুল হায়দার মোবাইল ফোনে নম্বর টিপে কানে ঠেকালেন, হ্যালো? রাজিব কৌশিক?…. আমি জয়েন্ট সেক্রেটারি বদরুল হায়দার বলছি জনকল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে। তোমার সাথে একটা জরুরি আলাপ আছে। তুমি এখনই আমার চেম্বারে চলে আসো।
শাফায়াত আজিজ বললেন, আমি চলে যাই। রাজিবের সামনাসামনি হতে ইচ্ছে হচ্ছে না এখন।
না না! তুমিও থাকো। কাজটা যে ঠিক করে নি সে এটা তোমার সামনেই বলতে চাই। ল্যাং মারার বেড প্র্যাকটিস বন্ধ হওয়া দরকার। তুমি কী করবে এখন? চেয়ারম্যানের সাথে কথা বলবে? উনি কি তোমাকে অপছন্দ করেন?
আমি ফুল টাইম মেম্বারের সাথে কথা বলেছি।
কী বললেন উনি?
উনি ছুটি শেষের পরদিনই চার্জ দিতে বললেন। এবং আরো বললেন যে উনি চেয়ারম্যান সাহেবের সাথে কথা বলে নিয়েছেন।
হঠাৎ তুমি কমিশনের কাছে এতো অপ্রিয় হয়ে গেলে কেনো?
বুঝতে পারছি না। আমি খোঁজ নিয়ে জেনেছি স্থায়ী সদস্য ও রাজিব কৌশিক এক সময় এক জেলায় কাজ করেছে। র্পামানন্টে মেম্বার ছিলেন ডিসি আর রাজিব ইউএনও।
তোমার হঠাৎ বদলির কারণটা এতক্ষণে বুঝা গেলো। তোমাকে ছাড়তেই হচ্ছে কমিশন।
আপত্তি নেই আমার। তবে একটা পোস্টিং থাকলে ভালো হতো। ওএসডি করেছে। কবে পোস্টিং হয় কে জানে। গাড়ি ছাড়া কি ঢাকায় চলাফেরা করা যায়?
তখন রাজিব কৌশকি দরজা ঠেলে ঢুকলো ভেতরে।
বদরুল হায়দার উদার কণ্ঠে বললেন, আরে এসো এসো রাজিব কৌশকি। বহুদিন পর দেখা তোমার সাথে। শাফায়াত আজিজকে দেখিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, একে চিনো নিশ্চয়ই?
রাজিব কৌশকি পাশের একটি সোফায় বসে বললেন, চিনবো না কেনো? আমরা একত্রে বেশ কয়েকটা ট্রেনিং করেছি। এসিএডি ট্রেনিং-এ এক্সপোজার ভিজিটে থাইল্যান্ডে একই রুমে থেকেছি।
বদরুল হায়দার বললেন, আমরা তিনজন একই ব্যাচের এবং একই সাথে জয়েন্ট সেক্রেটারি প্রমোশন পেয়েছি। পোস্টিংও পেয়েছিলাম সাথে সাথেই। সম্ভবত রাজিব মার্চে ওএসডি হয়ে গিয়েছিলো।
রাজিব কৌশকি বললো, পরিসংখ্যান ক্যাডারের এক ভদ্রমহিলা ঢুকে আমাকে বের করে দিয়েছে।
শাফায়াত আজিজ কিছুটা ক্ষোভের সাথেই বললেন, আর তুমি সুযোগ পেয়ে আমাকে বের করে দিলে।
আমারটা তেমন না।
তাহলে?
জন প্রশাসন মন্ত্রণালয়ের জয়েন্ট সেক্রেটারি এপিডি বললেন বসের সাথে বনিবনা না হওয়ায় তোমার বদলি হয়েছে।
কথাটা একদম ঠিক না! বসের সাথে বনিবনা না হলে ডেনমার্কে একটা ট্রেনিং-এ আমার নাম পাঠাতেন না।
বদরুল হায়দার বললেন, এ তর্ক শেষ হবে না। রাজিব বন্ধু তোমার একটু ভুল হয়েছে। এপিডি যখন ওর জায়গায় তোমার পোস্টিং-এর কথা বললেন তখন তুমি বলতে পারতে ঐ পোস্টে আমার বন্ধু আছে, ওর টেন্যুর পুরো হয় নি; তাই আমার পক্ষে ঐ পদে যাওয়া সম্ভব না।
এ কথায় রাজিব কৌশকি থতমত খেলেন। কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেলেন।
এটুকু সিমপ্যাথি যদি আমাদের মাঝে না থাকে তাহলে এই বন্ধুত্বের লাভ কী!
তখন আব্দুল মান্নান প্লেটে সাজিয়ে সিঙ্গারা দিয়ে গেলো।
বদরুল হায়দার বললেন, সিঙ্গারা ফ্রেন্ডস।
তিনজন সিঙ্গারা খেতে আরম্ভ করলেন। আব্দুল মান্নান পানি ও চা দিয়ে গেলো।
তিনজনের মাঝে এ নিয়ে তেমন আর আলাপ হলো না। রাজিব কৌশিক বুঝতে পারএন দু’জনের কেউ-ই তার পোস্টিংটা সহজভাবে নিচ্ছে না। তাতে ওর কী! এখন ল্যাং মারার যুগ চলছে! রাজিব কৌশিক বদরুল হায়দাররে চেম্বার থেকে বের হয়ে হাফ ছেড়ে বাঁচলেন যেনো।
বদরুল হায়দার নিজ চেয়ারে বসলেন এবং শাফায়াত আজিজ টেবিলের পাশের চেয়ারে বসলেন। বদরুল হায়দার শাফায়াত আজিজের দিকে তাকিয়ে বললেন, দুঃখ করো না বন্ধু। বন্ধু বান্ধব আপনজনদের ল্যাং মারার যুগ শুরু হয়ে গেছে। এ নিয়ে আমি এসোসিয়েশনের সভাপতিকে কয়েকটা কথা শুনাবো এখন।
বাদ দাও ফ্রেন্ড। কোন লাভ হবে না।
তবু অন্যায়ের প্রতিবাদ করা দরকার। সরকারের শীর্ষ কর্মকর্তারা জানুক সরকারের অন্যায় আচরণে আমাদের মাঝে ক্ষোভ সৃষ্টি হচ্ছে।
বদরুল হায়দার টেলিফোন সেটটা কাছে নিয়ে টেবিলটপ গ্লাসের নিচে রাখা গুরুত্বপূর্ণ টেলিফোন নম্বরের তালিকা থেকে নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিবের নম্বরে দেখে ডায়াল করলেন। বর্তমানে নৌ-পরিবহন সচিব বিসিএস এডমিনিস্ট্রেটিভ এসোসিয়েশনের সভাপতি। পার্সোনাল অফিসার সাড়া দিতেই বললেন, আসসালামু আলাইকুম। আমি বদরুল হায়দার, জয়েন্ট সেক্রেটারি, জনকল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে বলছি। সেক্রেটারি স্যার কি আছেন?
আছেন স্যার।
আমি স্যারের সাথে কথা বলবো।
দিচ্ছি স্যার।
নৌ-পরিবহন সচিব ‘হ্যালো’ বলতেই বদরুল হায়দার বললেন, আসসালামু আলাআইকুম স্যার। আমি বদরুল হায়দার বলছি স্যার। ভালো আছেন স্যার?
নৌ-পরিবহন সচিব গম্ভীর কণ্ঠে বললেন, হু।
স্যার, আমি আপনার সাথে নৌ-পরিবহন সচিব নয়, বিসিএস এডমিনিস্ট্রেটিভ এসোসিয়েশনের সভাপতি হিসেবে দুটো কথা বলতে চাই, যদি দয়া করে অনুমতি দেন।
হোয়াট উইল বি দ্য ডিফারেন্স বিটুইন দিস টু পজিশনস, এস বিকজ দ্য ম্যান হোল্ডিং দিজ টু পজিসনস ইজ সেম।
পার্থক্য আছে স্যার। আমি এখন যে কথাগুলো বলতে চাই, তা নৌ-পরিবহন সচিবের কাছে বলা নিরর্থক, তবে এসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্টের কাছে বলা যাবে।  
ওকে। তাহলে তুমি এসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্টের সাথে কথা বলছো। তবে খুব সংক্ষিপ্তভাবে বলবে।
থ্যাঙ্কু ভেরি মাচ স্যার। বলা হয়ে থাকে জয়েন্ট সেক্রেটারি পোস্টটা সরকারের নীতিনির্ধারকের পোস্ট। অথচ একটা জয়েন্ট সেক্রেটারিকে হঠাৎই বদলি করা হয়। এটা কি ঠিক স্যার?
সরকারের পছন্দ না হলে সচিবকেও হঠাৎ বদলি করা হতে পারে।
উত্তর শুনে বদরুল আলম থতমত খেলেন। বললেন, না মানে বলছিলাম কী সরকারের পছন্দ না হলে অবশ্যই একজনকে বদলি করবে। কিন্তু বদলির একদিন আগেও যদি বলা হয় সরকারের পছন্দ না হওয়ায় তোমাকে বদলি করা হচ্ছে; প্রস্তুত হয়ে যাও।
নৌ-পরিবহন সচিব ‘সরকারের নীতি নিয়ে তোমার মাথা ঘামানোর দরকার নেই!’ বলে ফোনের লাইন কেটে দিলেন।
শাফায়াত আজিজ জিজ্ঞেস করলেন, কী হলো? কী বললেন তোমার এসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট?
নৌ-পরিবহন সচিব এসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট হিসেবে আমার কথা শুনলেও জবাবটা দিলেন সরকারের সচিব হিসেবেই। এবং যদি একশন নিতে চান তাহলে আমার বক্তব্যকে ওডাসিটি হিসেবে ধরে ওএসডি করার জন্য সরকারকে বলতে পারবেন এবং তখন শীঘ্রই আমিও তোমার দলে ভিড়ে যাবো।
শুধু শুধু আমার পক্ষে কথা বলতে গিয়ে তুমি নিজের বিপদটা ডেকে আনলে।
ডোন্ট ওরি ফ্রেন্ড! যা হোগা দেখা যায়ে গা।

 

শাফায়াত আজিজ জাতীয় মানবাধিকার কমিশন থেকে অব্যাহতি নিয়ে পরদিন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে যোগদান পত্র জমা দিয়ে যুগ্ম-সচিব এপিডি-এর চেম্বারে ঢুকলেন। চারজন অফিসার বসে আছেন। একে একে চারজনকে দেখলেন। সবাই ওএসডি যুগ্ম-সচিব; একজন বেশ সিনিয়র; বর্তমান সরকারের বৈরিতার শিকার। ব্যাচমেট বন্ধু বসে আছেন যুগ্ম-সচিব এপিডির চেয়ারে।
শাফায়াত আজিজ যুগ্ম-সচিব এপিডি-এর মুখোমুখি একটা চেয়ারে বসে বললেন, ওএসডি হিসেবে আজ জয়েন করলাম বন্ধু।
যুগ্ম-সচিব এপিডি জায়দে হাশমি কোনো কথা না বলে ব্যবসায়িক মুচকি হাসলেন শুধু।
শাফায়াত আজিজ জিজ্ঞেস করলেন, সহসা কি পোস্টিং পাবার সম্ভাবনা আছে ফ্রেন্ড?
এবার যুগ্ম-সচিব এপিডি বললেন, সবে আজ জয়েন করলা। কিছুদিন যাক।
সিনিয়র যুগ্ম-সচিব বললেন, আমি যতদূর জানি তুমি কখনো ওএসডি হও নি। এটা আমার দ্বিতীয়বারের মতো ওএসডি হওয়া। ওএসডি হবার যন্ত্রণা যে হয়, সে-ই বুঝে। তুমি একবার ওএসডি হও, বুঝতে পারবে, তাতে কত হাসি আর কত যন্ত্রণা আছে।
শাফায়াত আজিজ চেম্বারে বসে থাকা সবাইকে একবার দেখে বললেন, যখন ক্যাডার সার্ভিস নেবার জন্য প্রস্তুতি নিতে শুরু করি, তখন যদি ঘুর্ণাক্ষরে জানতে পারতাম এই চাকরিতে ওএসডি হওয়ার মতো যন্ত্রণাদায়ক পোস্টিং আছে, দলবাজি না করলে পদোন্নতি বা ভালো পোস্টিং হবে না বা দলবাজি করলে অন্য দল ক্ষমতায় এলে ওএসডি হতে হবে বা বিভিন্ন ধরনের বিড়ম্বনার শিকার হতে হবে, তাহলে এই চাকরিতে ঢুকার চেষ্টাই করতাম না।
মোবাইল ফোন বেজে উঠতেই শাফায়াত আজিজ নম্বর দেখে বাইরে বেরিয়ে এসে এন্টার বাটন টিপে কানে ঠেকালেন, হ্যালো?
ওদিক থেকে রওশন আজিজ বললেন, সেক্রেটারিয়েটে কখন পৌছেছো? জয়েন দিয়েছো কি?
একটু আগেই জয়েনিং লেটার সাবমিট করেছি।
এপিডির সাথে সাক্ষাৎ করেছো? কী বললেন উনি?
কী আর বলবে সেই গতানগতিক কথা ছাড়া। কোনো খবর নেই।
তোমার কি আসতে দেরি হবে?
দুয়েক জায়গায় দেখা করে চলে আসবো। দুপুরে বাসায় এসে খাবো।
আমরা তোমার জন্য অপেক্ষা করবো। তুমি এলে আমরা একত্রে বসে খাবো।
মোবাইল ফোনটা পকেটে ঢুকিয়ে এগিয়ে গেলেন সামনের দিকে। আরো দুই সহকর্মীর সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ করে বেরিয়ে এলেন সচিবালয় থেকে। সরাসরি চলে এলেন প্রেসক্লাবের সামনে। বাসে করে চলে এলেন শংকর। সেখান থেকে হেটে বাসায়। এটুকু হেটেই ঘেমে গেছেন শাফায়াত আজিজ। কলবেল টিপে দিলে রওশন আজিজ দরজা খুলে দিলেন। ড্রয়িংরুমে বসে টিভিতে কার্টুন দেখছিলো ছোট ছেলে ইমন। বাবাকে দেখে ছুটে এসে জড়িয়ে ধরলো।
শাফায়াত আজিজ ইমনকে কোলে তুলে কপালে চুমু খেয়ে জিজ্ঞেস করলেন, কী করছিলো আমার ছোট বাবা?
ইমন বাবার গলা জড়িয়ে ধরে বললো, ডরিমন দেখছি বাবা। জানো বাবা দাদা আমাকে মেরেছে।
কী সাংঘাতিক! কখন? কেনো?
রওশন আজিজ বললেন, বড়টাকে নিয়ে আর পারা যাচ্ছে না। ও ছোটকে একদম সহ্যই করতে পারছে না।
সে তো জানি। এর সমাধান কী ভেবে পাচ্ছি না। কতভাবে কতদিন ওকে বুঝালাম; কিন্তু রেজাল্ট যেইকে সেই। তুমি প্রচুর মেরেছেও; কিন্তু লাভ হচ্ছে না কিছুই। পাজিটা এখন কোথায়?
বকা দেয়ায় নিজের রুমে চলে গেছে।
শাফায়াত আজিজ ভেতরের দিকে রওয়ানা দিতেই ইমন বললো, আমাকে নামিয়ে দাও বাবা। আমি ডরিমন দেখবো।
শাফায়াত আজিজ ইমনকে নামিয়ে দিয়ে ওদিকে যেতে থাকলে রওশন আজিজ পেছন থেকে বললেন, তুমি আবার ওকে বকতে যেয়ো না। আর তাড়াতাড়ি কাপড় পাল্টে আসো। ক্ষিধে লেগেছে বেশ। আমি খেয়ে পরে বাবুকে খাওয়াবো। তুমি আসলে কিভাবে?
বাসে।
জয়েন্ট সেক্রেটারিদের পোস্টিং না থাকলে গাড়ি পায় না, তাই না?
একটা গাড়ি পাওয়া গেলে পোস্টিং নিয়ে এতো ভাবতো না কেউ। কিন্তু গাড়ি দেয়া হয় না।
আর কথা না। তুমি তাড়াতাড়ি কাপড় পাল্টে হাত-মুখ ধুয়ে আসো। নামাজ আদায় করেছো কি?
নাহ।
খেয়ে নামাজ আদায় করো। আবার বলছি বড়কে ছোটকে মারার ব্যাপারে কিছু বলো না। ওকে ডাইনিং টেবিলে আসতে বলো।
শাফায়াত আজিজ নিঃশব্দে মুচকি হেসে এগিয়ে গেলেন ঈশানের কক্ষের দিকে। নিঃশব্দে ওর কক্ষে ঢুকে পেছনে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করলেন, আমার বড় বাবার মন খারাপ নাকি?
ম্লান কণ্ঠে ঈশান বললো, না বাবা।
বাবার আগমন টের পাও নি বুঝি?
পেয়েছি।
তাহলে দরজা খুলতে যাও নি যে? বুঝেছি মা বকেছে।
শাফায়াত আজিজ ঈশানের মাথার চুল নেড়ে দিয়ে বললেন, ছোটটাকে এখনো সহ্য করতে পারছো না কেনো বুঝতে পারছি না। তোমার ধারনা আমরা এখন ওকে বেশি আদর করছি, আর তোমাকে আদর করছি না। বহুবার বলেছি, আজও বলছি; তোমার ধারনা ভুল। আমরা তোমাদের দুই ভাইকেই সমান ভালোবাসি। ও ছোট বলে ওর প্রতি বেশি যত্ন নেয়া হয়। যখন তুমি ছোট ছিলে ওর মতো তখন তোমার প্রতিও তেমন যত্ন নিতাম। এখন গোস্যা ছেড়ে ডাইনিং টেবিলের দিকে যাও। আমি কাপড় পাল্টে হাত-মুখ ধূয়ে আসছি।
রওশন আজিজ উচ্চ কণ্ঠে বললেন, টয়লেট দুটোয় হারপিক লাগিয়ে রেখেছি। গোসলের আগে টয়লেট দুটো ধূয়ে নিয়ো। আজ আমি ঘর মুছে নিয়েছি। আগামীকাল থেকে তোমার রেগুলার অফিস যাওয়া নেই পোস্টিং না পাওয়া র্পযন্ত। তাই একদিন পর পর তোমাকে ঘর মুছতে হবে।
শাফায়াত আজিজ কাপড় পাল্টে বাথরুমে ঢুকে গেলেন। টয়লেট দুটো পরিস্কার করে গোসল সেরে বেরিয়ে সরাসরি চলে এলেন ডাইনিং টেবিলে। বললেন, টয়লেট দুটো আজ তুমি পরিস্কার করলেও পারতে?
কেনো? তোমার পরিস্কার করতে কি সমস্যা হয়েছে?
আমি সকালে গোসল সেরে সেক্রেটারিয়েটে গিয়েছিলাম। টয়লেট পরিস্কার করে আবার গোসল করতে হলো। তুমি তো জানো আমার কোল্ড এলার্জি আছে। আমি একদিনে কখনো দুইবার গোসল করতে চাই না। যাক ওসব কথা। যা হবার হয়েছে। নাক দিয়ে পানি বের হতে শুরু করলে রাতে শোবার সময় একটা এলাট্রল খেয়ে নিলেই হবে। এবার চলো খাওয়া শুরু করা যাক। আমার বেশ ক্ষিধে পেয়েছে।
ঈশান বললো, আমারও খুব ক্ষিধে পেয়েছে বাবা।
তুমি খেয়ে নিলে না কেনো?
মা বলেছিলো; কিন্তু আমিই রাজি হই নাই। শুনলাম তুমি আসছো, তাই ভাবলাম একসাথে খাই। আগে শুক্র শনিবার ছাড়া তোমার সাথে একত্রে দুপুরের খাবার খাওয়া যায় না। এখন থেকে খাওয়া যাবে, তাই না বাবা?
শাফায়াত আজিজ থালায় ভাত নিতে নিতে বললেন, পোস্টিং না হওয়া র্পযন্ত।
পরদিন মাসের বাজার করতে বাজারে যেতে হলো শাফায়াত আজিজকে। শাক-সব্জির বাজারে গিয়ে মেজাজ খারাপ হয়ে যাবার জোগার ওঁর। একমাস হলো রোজা গিয়েছে, তবু বেগুনের কেজি ষাট-সত্তর টাকা; দুন্দল এক শ টাকা, পেপে চল্লিশ টাকা, শাকের আটি পনের থেকে ত্রিশ টাকা; কাঁচা মরিচ এক শ কুড়ি টাকা। এসব কী হচ্ছে দেশটায়? লাগাম টানার কি কেউ নেই দেশে? ভুড়ি কমানোর জন্য কার্বোহাইড্রেট কম খেয়ে শাক-সব্জি বেশি খেতাম, সেটাও কমিয়ে ফেলতে হবে।
বাসায় এসে শাফায়াত আজিজ ইন্টারনেট খুলে ফেসবুকে লিখে ফেললেন: ‘urgent needs to do sometings regarding curtailing price hike of vegelables.’
অফিসে বসে ফেসবুক খুলে স্ট্যাটাসে শাক-সব্জির লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি সংক্রান্ত মন্তব্যটা পড়ে একজন লখিলনে: ‘I agree with this comment. Let us do something to stop price hike.’
শাক-সব্জির মূল্যবৃদ্ধির ক্ষোভে ফেসবুকে একের পর এক মন্তব্য যোগ হতে থাকলো।

 

মোস্তাকিম মাসুদ অবসরে গিয়ে ‘উই আর ক্যাটালিস্ট’ নামের একটি এনজিও-এ নির্বাহি পরিচালক হিসেবে কাজ করছেন। এনজিও-তে যোগ দেবার পর থেকে ফেসবুকে স্ট্যাটাস লেখা ওঁর এক প্রকার শখ হয়ে গিয়েছে। তিনি ফেসবুকে খুলে শাক-সব্জির অত্যাধিক মূল্যবৃদ্ধি সংক্রান্ত মন্তব্য দেখে অট্টহাসিতে ফেটে পড়লেন। হাসি থামিয়ে মনে মনে বললেন: কথা বলা সহজ, তবে কাজ করা কঠিন। সবাই জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান না। তিনি লিখলেন: ‘making comment is easy, but execution is not so easy.’
মোবাইল ফোনটা বেজে উঠায় নম্বর দেখে কানে ঠেকালেন, কেমন আছো লুৎফর জহির? বহুদিন পর! কী ব্যাপার?
লুৎফর জহির বললেন, আমি ভালো আছি স্যার। আপনি ভালো আছেন স্যার?
ভালো। এনজিওতে ভালোই কেটে যাচ্ছে। এবার বলো কেনো ফোন করেছো।
আপনার সাথে একটা জরুরি কথা ছিলো স্যার। এখন আসবো কি?
চলে আসো জেন্টলম্যান। তোমার কথা শেষ হলে আমি বাইরে যাবো।
থ্যাঙ্ক ইউ স্যার। আমি আধা ঘন্টার মধ্যে চলে আসছি।
লুৎফর জহির আধা ঘন্টার মধ্যইে চলে এলেন ধানমণ্ডি ‘উই আর ক্যাটালিস্ট’-এর অফিসে। মোস্তাকিম মাসুমের চেম্বারে ঢুকে সালাম জানিয়ে মুখোমুখি একটা চেয়ারে বসলেন। ঘাড় ঘুরিয়ে চেম্বারটা একবার দেখে বললেন, চেম্বারটা আপনার বেশ হয়েছে স্যার। এখানে কেমন লাগছে আপনার স্যার?
খুব ভালো লুৎফর জহির। মন্ত্রী বা সরকারি দলের কারো কথা না শুনলে ওএসডি হবার দুশ্চিন্তা নেই। এই দিকটা ভাবলে আমার বেশ শান্তি লাগে।  
আর?
আর কী? সব দিক দিয়েই ভালো। বেতনও বেশি দিচ্ছে। চমৎকার একটা গাড়ি দিয়েছে। ইনসেনটিভ আছে। যাক সে কথা। এবার বলো কী জরুরি কথা বলতে তুমি আমার কাছে এসেছো। আমি তো আর সরকারি চাকরিতে নেই। তোমাদের কোনো কাজে লাগতে পারবো না।
অফিসিয়াল কোনো কাজ না স্যার, পারিবারিক।
পারিবারিক?
পারিবারিক এবং বেশ বিব্রতকর। নিতান্ত বাধ্য হয়ে আপনার সাহায্য চাইতে এসেছি। একমাত্র আপনিই সমস্যাটার সমাধান করতে পারবেন স্যার।
বেশ। এবার বলো তোমার কথা বা সমস্যাটা কী?
আমার বড় শ্যালকের স্ত্রী সঞ্চিতা শ্যামলিতে নতুন কুড়ি স্কুল এন্ড কলেজে জুনিয়র সেকশনের টিচার। আপনার ছেলে মোর্শেদুল মাসুদ ঐ স্কুলের একজন প্রতিষ্ঠাতা পার্টনার ও গভর্নিং বডির পরিচালক।
মোস্তাকিম মাসুদ একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে হতাশ কণ্ঠে বললেন, ছাত্রাবস্থায় কত তাগিদ দিয়েছি মনোযোগ দিয়ে লেখাপড়া করতে। হয় নি। শাদামাটা রেজাল্ট করে কোথাও চাকরি না পেয়ে এখন হাবিজাবি করে বেড়াচ্ছে। এটাতে কদিন থাকবে ও-ই জানে। জানো লুৎফর, আমাদের দুশ্চিন্তা এখন সন্তানদরে নিয়ে। মেয়েটাকে আজো বিয়ে দিতে পারলাম না। ছেলেটাও পার্মানেন্টলি সেটেলড হতে পারলো না কোথাও। এই দেখো, বুড়োমি রোগে ধরে ফেলেছে আমাকে! তুমি এলে তোমার সমস্যার কথা আমাকে শুনাতে; আমি তোমারটা না শুনে আমার কষ্টের কথা তোমাকে বলতে শুরু করেছি।
লুৎফর জহির নিস্প্রাণ কণ্ঠে বললেন, স্কুলে মোর্শেদুলের সাথে নিশ্চয়ই সঞ্চিতার দেখা হতো। কিভাবে ওরা একে অপরের প্রতি আসক্ত হলো তা আমি জানি না স্যার।
মোস্তাকিম মাসুদ চেয়ারে সোজা হয়ে বসে বললেন, কী বলছো তুমি লুৎফর! তারপর?
গতকাল সঞ্চিতা মানে আমার শ্যালকের স্ত্রী স্কুল থেকে বাসায় ফেরে নি। রাতে মোবাইল ফোন করে আমার শ্যালককে বলেছে ওকে আর না খুঁজতে; সে মোর্শেদুলকে খুব ভালোবাসে এবং ওর সাথে চলে গেছে; দুই একদিনের মধ্যে তালাকনামা পাঠিয়ে দেবে।
কী সাংঘাতিক! ইডিয়টটা এতো বড় একটা ঘটনা ঘটিয়ে ফেললো আর আমরা ঘূর্ণাক্ষরেও টের পাই নি! এখন মনে পড়েছে ফাজিলটা গতরাতে বাসায় আসে নি। ওর মাকে জানিয়েছে: একটা জরুরি কাজে আটকে গেছে; বাসায় ফিরতে দুই তিনদিন দেরি হতে পারে। তাহলে এই ঘটনা ঘটিয়ে ফেলেছে! দাঁড়াও আগে শকিং নিউজটা আমার স্ত্রীকে জানাই।
মোস্তাকিম মাসুদ মোবাইল ফোনে আকলিমা সৈয়দকে ফোন করলেন, হ্যালো? কী করছো এখন?
আকলিমা সৈয়দ বললেন, আমি এখন বিউটি পার্লারে।
কী আশ্চর্য! মোস্তাকিম মাসুদ দেয়াল ঘড়িতে সময়টা দেখে বললেন, দুপুর বারোটায় বিউটি পার্লারে! ব্যাপার কী গো?
দুপুর একটা হতে বিউটি কনটেস্ট শুরু হবে। জাজ হিসেবে আমি সেখানে যাচ্ছি। তাই নিজের বিউটিটা একটু পোলিশড করতে এলাম আর কী!
শোনো, আমাদের সোনার ছেলে কী করছে, তার কি কোনো খবর রাখছি আমরা?
কেনো? ও তো এখন ব্যবসা করছে। পার্টনারশিপে একটা স্কুল চালাচ্ছে।
সেই সুবাদে প্রেম করে এক বিবাহিতে মেয়েকে ভাগিয়ে নিয়ে এসেছে।
আর ইউ কিডিং?
নো ডার্লিং! পুত্রধন জয়েন্ট সেক্রেটারি লুৎফর জহিরের শ্যালকের স্ত্রীকে ভাগিয়ে নিয়েছে।
হাউ স্ট্রেঞ্জ! কবে সে কাজটা করেছে? কোথায় এখন সে?
গতরাতে। কোথায় সে জানি না এখনো।
খোঁজার কাজটা তুমি করো না প্লিজ! আমাকে ওখানে যেতেই হবে। ইডিয়টটাকে বিকেল পাঁচটায় বাসায় আসতে বলো। সাথে অবশ্যই মেয়েটাকে নিয়ে আসবে।
মোস্তাকিম মাসুদ মোবাইল ফোনের লাইন কেটে দিয়ে লুৎফর জহিরের দিকে তাকিয়ে বললেন, ব্যাপারটা নিয়ে থানা পুলিশ করা ঠিক হবে না। তাতে উভয় পরিবারের মান-সম্মান যাবে। তাছাড়া আমার মনে হয় না তোমার শ্যালক আর মেয়েটাকে ঘরে নিতে চাইবে। স্বেচ্ছায় মেয়েটাও যেতে চাইবে বলে মনে হয় না। সে কারণে পজেটিভলি চিন্তা করাই ভালো হবে।
ইউ মিন সেপারেশন স্যার?
ইউ হ্যাভ গট দ্য পয়েন্ট মাই ফ্রেন্ড!
আমার শ্যালকটা ড্রাগ এডিক্ট। মনের উপর জোর খাটিয়ে সুস্থ হয়ে উঠছিলো স্যার। আবার আগের লেভেলে চলে যাবে সে।
সো স্যাড! কিন্তু কী করার আছে বলো। দোষ আমার ছেলের একার না। মেয়ে এগ্রি না করলে ছেলের প্রস্তাবে কী আসে যায়।
লুৎফর জহির আবেগ প্রবণ হয়ে পড়লেন। তিনি নিজকে সামলে নিয়ে দ্রুত সালাম জানিয়ে বেরিয়ে এলেন মোস্তাকিম মাসুদের চেম্বার থেকে।

সেদিন বিকেল পাঁচটা। মোস্তাকিম মাসুদের বাড়ি। ঠিক পাঁচটায় মোর্শেদুল মাসুদ সঞ্চিতাকে নিয়ে বাসায় ঢুকলেন। সঞ্চিতার সৌন্দর্যে দুজনেই হতবাক।
মোস্তাকিম মাসুদ স্ত্রীর কানের কাছে মুখ নিয়ে বললেন, হাউ বিউটিফুল গার্ল সি ইজ!
আকলিমা সৈয়দ মুগ্ধস্বরে নিম্নকণ্ঠে বললেন, ইয়েস! আই এম জাস্ট স্পিচলেস!
চারজন ড্রয়িংরুমে এলেন। মা-বাবা কিছু বলার আগেই মোর্শেদুল মাসুদ সঞ্চিতাকে দেখিয়ে বললেন, আমি ওকে বিয়ে করে ফেলেছি মাম ডেড। এ তোমাদের পুত্রবধূ। ওর নাম সঞ্চিতা।
ছেলের কথায় মোস্তাকিম মাসুদ সঞ্চিতার সৌন্দর্যের মুগ্ধতা থেকে বেরিয়ে এসে বললেন, বিয়ে করেছো ভালো কথা।      কিন্তু কাকে বিয়ে করেছো তুমি? অন্যের স্ত্রীকে ভাগিয়ে এনে বিয়ে করলেই কি বিয়ে শুদ্ধ হয়ে যায়?
সঞ্চিতা গতকাল তালাকের নোটিস পাঠিয়ে দিয়েছে ড্যাড।
আকলিমা সৈয়দ সঞ্চিতার দিকে তাকিয়ে বললেন, তুমি এসে আমার পাশে বসো মা। সঞ্চিতা আকলিমা সৈয়দের পাশে এসে বসলে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি এই কাজটা কেনো করলে মা?
ও একটা ড্রাগ এডিক্ট আন্টি। বহু চেষ্টা করেছি ওকে ফিরিয়ে আনতে; কিন্তু পারি নি। কোনো চাকরিই সে কয়েক মাসের বেশি করতে পারে না। দুইবার কারেকশান সেন্টারে পাঠানো হয়েছিলো। সুস্থ হয়ে এসে একটা চাকরিতে জয়েন করে দুই তিন মাস যাবার পরই আবার ড্রাগ নেয়া শুরু করে। আমি পাঁচ হাজার টাকা বেতনে স্কুলটায় চাকরি করছি। পাঁচ হাজার টাকায় কি সংসার চলে আন্টি? খুব কষ্ট করছিলাম ওখানে।
তোমার বাড়ি কোথায়? তোমার মা-বাবা কি বেঁচে আছেন?
আমার বাড়ি শেরপুর জেলায়। মা-বাবা আর এক বোন। মা-বাবা বেঁচে আছেন। বোনটা আমার ছোট। বিয়ে হয়েছে।
তোমার মা-বাবা কি এই ব্যাপারটা জানে?
ওরা এখনো জানে না।
তুমি এখনই ওদের জানিয়ে আমারদের বাসায় আসতে বলো। ভয় পাবে না। তোমার কিছু হতে দেবো না আমি। আকলিমা সৈয়দ মোস্তাকিম মাসুদের দিকে তাকিয়ে বললেন, পুত্রবধূ হিসেবে সঞ্চিতাকে আমার খুব পছন্দ হয়েছে। আইনি ঝামলো যদি কিছু থেকে থাকে তা মিটিয়ে বিয়েটা রেগুলার করো। আগামী মাসের এক তারিখ বধূবরণ অনুষ্ঠান হবে লেডিস ক্লাবে। এই অনুষ্ঠানের আয়োজনটা আমিই করবো। তবে খরচটা তোমাকেই দিতে হবে আর কী!
মোস্তাকিম মাসুদ রাগবেন না হাসবেন, বুঝতে পারছে না। শেষে তিনি হেসে দিলেন।
র্মোশদেুল মাসুদ বাবার দিকে তাকালে মোস্তাকিম মাসুদ বললেন, তুমি আমার কাছে এসো। র্মোশদেুল মাসুদ বাবার পাশে গিয়ে বসলে মাথায় স্নেহের একটা চাটি মেরে বললেন, ছাত্রজীবনটা হলো প্রেম করার মোক্ষম সময়। তখন কোনো প্রেম করতে শুনলাম না। আর এখন অসময়ে এসে প্রেম করলি! তবে তোর পছন্দ আছে বলতে হবে! সঞ্চিতাকে আমারও খুব পছন্দ হয়েছে। একটা নোটিশ সিটি কর্পোরেশনে দিতে হবে। তা দিয়েছো তোমরা?
সঞ্চিতা বললেন, না আঙ্কল।
আকলিমা সৈয়দ বললেন, আর আঙ্কল আন্টি ডাক না। তোমাদের বিয়ে হয়ে গেছে। তাই বাবা মা ডাকবে। ড্যাডি মাম্মি বা ড্যাড মাম ডাক আমার পছন্দ না।
মোস্তাকিম মাসুদ বললেন, আসল কাজটাই তোমরা করো নি। সিটি কর্পোরেশনে তালাকের নোটিশ না পাঠালে ওরা তালাক কার্যকরের ব্যবস্থা নেবে কিভাবে? মোর্শেদুল, তুমি আগামীকাল দশটার মধ্যে তালাকের নোটিশ নিয়ে সিটি কর্পোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার সাথে কথা বলবে। আমার কথা বললেই কাজটা করে দেবে। আমিও বলে দেবে। জাহাঙ্গীর ফিরোজ একসময় আমার সাবওর্ডিনেট ছিলেন।
আকলিমা সৈয়দ শঙ্কিত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন, ওরা কোনো মামলা-মোকদ্দমা করবে?
পুওর ছেলেটার দুলাভাই জয়েন্ট সেক্রেটারি লুৎফর জহির। আমি যখন সচিব তখন ও আমার জয়েন্ট সক্রেটোরি ছিলো। খুব ভক্ত আমার।
জানি।
ও এসেছিলো আমার কাছে। বলেছি মামলা-মোকদ্দমা করে কোনো লাভ হবে না। মাঝখান থেকে উভয় ফ্যামেলির মান-সম্মান যাবে। মনে হয় না ওরা কোনো মামলা করবে।
আকলিম সৈয়দ একবার হাফ ছেড়ে বললেন, যাক! কোনো মামলা না হলেই হলো। মামলা-মোকদ্দমা হলেই পুলিশি ঝামেলা। মাগো! পুলিশকে আমার সবসময় ভয় করে! তিনি শিউরে উঠলেন।
মোস্তাকিম মাসুদ পুত্রকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা বিয়েটা করেছো কোথায়? ম্যারেজ সার্টিফিকেট উঠিয়েছো?
র্মোশদেুল সঞ্চিতাকে একবার দেখে বললেন, আমি মিথ্যে বলেছি ড্যাড। আমরা এখনো বিয়ে করি নি।
কী বলছো তুমি! বিয়ে না করেই একত্রে থাকতে শুরু করেছো? লিভিং টুগেদার?
না ড্যাড। আমরা একত্রে থাকি নি।
তাহলে গতরাতে কোথায় ছিলে? কিভাবে ছিলে?
গতরাত শ্যামলীতে এক বন্ধুর বাসায় ছিলাম। সেপারেট বেডে।
আকলিম সৈয়দ হতাশ কণ্ঠে বললেন, কী মুস্কিল! আমি ভাবলাম কোনো ঝামেলাই নেই। এখন দেখছি আসল কাজটাই বাকি রয়ে গেছে।
শরিয়ত অনুযায়ী তালাক কার্যকর না হওয়া র্পযন্ত আরেকটা বিয়ে করা যায় না। করলে তা নাজায়েজ।
তাহলে ওদের এতোদিন অপেক্ষা করতে হবে?
এছাড়া অন্যকোনো পথ দেখছি না। সঞ্চিতার মা-বাবা এলে ওকে ওদের কাছে দিয়ে দাও। তালাক কার্যকর হলে ধুমধাম করে বিয়ে হবে।
র্মোশদেুল মেঝের দিকে দৃষ্টি রেখে বললেন, আমি এতোদিন ওকে দেখতে না পেলে বাঁচবো না বাবা!
ওকে নিয়ে ত্রিশ মিনিটের একটা ভিডিও করে রাখ! মনে পড়লেই ভিডিওটা দেখে নিবি! রাস্কেল!
আকলিমা সৈয়দ বললেন, তুমি ছেলের সাথে ঠাট্টা করছো!
কথাটা ঠাট্টার মতো শুনালেও এটাই ওর মনকে শান্তি দিতে পারবে।
ধর্মের সব অনুশাসন মানার কী দরকার বাবা!
শাট আপ ইডিয়ট! ধর্মের অনুশাসন না মানলে ধর্ম থেকে খারিজ হয়ে যেতে হয়। ধর্ম থেকে খারিজ হয়ে গেলে তোমাদের সাথে আমাদের কোনো সম্পর্ক থাকবে না। তাই কি চাও তুমি?
সঞ্চিতা বললেন, আমি ধর্মের বাইরে কোনো কাজ করবো না আঙ্কল।
গুড! তাহলে? তুমি একা ধর্মচ্যুত হলে কোনো লাভ হচ্ছে না তোমার বাছাধন! লাইনে থাকো! তাহলে দেরিতে হলেও মিলে যাবে কাঙ্খিত বস্তু!

 

এক শুক্রবার, সাপ্তাহিক ছুটির প্রথম দিন। শারমিন শিলার জন্য একদিনই সাপ্তাহিক ছুটি। তাই শিলা বরাবরের মতো আজো দেরি করে ঘুম থেকে উঠলেন। ছেলে দুটো এখনো ঘুমুচ্ছে। ওদের দিকে চেয়ে মুচকি হেসে দুজনের মাথার চুল আলগোছে নেড়ে দিয়ে একবার হাই তুলে এগিয়ে গেলেন ড্রয়িংরুমরে দিকে। যথারীতি বদরুল হায়দার পত্রিকা পড়ছেন। পাশের সোফায় বসে পত্রিকার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, গরম কোনো খবর আছে কি মিস্টার বদরুল হায়দার?
বদরুল হায়দার পত্রিকা থেকে চোখ না সরিয়ে বললেন, শেয়ারবাজারের দরপতন অব্যাহত আছে।  
শারমিন শিলা একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, আমিও শেয়ারবাজারে ঢুকলাম, পতনও শুরু হলো। নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম যদি এভাবে পতন হতে থাকতো!
শকুনের কথায় গরু মরে না!
তবে কৌশল প্রয়োগ করতে পারলে পতনও হয়। বেবি ফুডের ক্ষেত্রে ভোক্তারা তা দেখিয়ে দিয়েছে!
বদরুল হায়দার স্ত্রীকে একবার দেখে বললেন, চমৎকার খেলা দেখিয়েছো শিলা। আগামীতে প্রোগাম কী তোমাদের?
আমার কোনো প্রোগ্রাম নেই। তবে কিছুদিন যাবৎ ফেসবুকে কিছু কমেন্টস দেখছি শাক-সব্জির মূল্য নিয়ে। তুমিও একটা কমেন্ট করেছো। শাক-সব্জি নিয়ে একটা প্রোগ্রাম করা যেতে পারে।
তখন কলবেল বেজে উঠলে শারমিন শিলা বললেন, বুয়া এসেছে। তুমি পেপারটা আমাকে দিয়ে দরজাটা খুলে দাও। তুমি যথেষ্ট পড়েছো, বাকিটা অফিসে গিয়ে পড়ে নিয়ো।
বদরুল হায়দার মুচকি হেসে পত্রিকাটা স্ত্রীর হাতে দিয়ে দরজা খুলতেই বুয়া বললো, চারজন লোক আসছে আফার সাথে দেখা করতে।
কোথায় ওরা?
গেটের বাইরে।
ঠিক আছে, তুমি ভেতরে যাও। আমি দেখছি।
শারমিন শিলা কণ্ঠ উচিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, কী হয়েছে? কার সাথে কথা বলছো তুমি?
বদরুল হায়দার বললেন, বুয়ার সাথে কথা বলছি। কয়েকজন লোক তোমার সাথে দেখা করতে এসেছেন। নিচে অপেক্ষা করছেন।
আমার সাথে?
বুয়া তো তাই বললো। আমি নিচে গিয়ে দেখছি। ডোন্ট ওরি।
দরজাটা ভেজিয়ে দিয়ে বদরুল হায়দার নিচে নেমে এলেন। তিনি লোকগুলোকে চিনতে পারলেন না। জিজ্ঞেস করলেন, আপনারা কোত্থেকে এসেছেন? মিসেস শারমিন শিলার সাথে কেনো দেখা করতে চান?
হায়াৎ আলি বললেন, আমরা ক্যাব থেকে এসেছি। আমি ক্যাবের সেক্রেটারি হায়াৎ আলি। উনি সভাপতি কুদরত জাহিদ। আর এই দুই জন সদস্য।
বদরুল হায়দার মুচকি হেসে বললেন, আর বলতে হবে না। আসুন আমার সাথে। মিসেস শারমিন শিলা এইমাত্র ঘুম থেকে উঠলেন।
কুদরত জাহিদ বললেন, তাহলে আমরা দশ মিনিট পরে আসি।
প্রয়োজনীয় নেই। আপনারা আসুন আমার সাথে। আধা ঘন্টা পর তিনি বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে ব্যস্তা হয়ে পড়বনে।
আপনি নিশ্চয়ই উনার হাসব্যান্ড?
জি। আসুন আমার সাথে।
বদরুল হায়দার ক্যাবের চার কর্মকর্তাকে নিয়ে ঘরে ঢুকে দরজার ছিটকিনি আটকাতে আটকাতে বললেন, তোমার গেস্ট শারমিন। উনারা ক্যাব থেকে এসেছেন।
চারজন একত্রে সালাম দিয়ে শারমিনের দিকে তাকিয়ে থাকলেন। শারমিন ওদের দিকে তাকিয়ে হাসিমুখে বললেন, আপনার দাঁড়িয়ে আছেন কেনো? বসুন।
চারজন মুখমণ্ডল হাসি হাসি করে সোফায় পাশাপাশি বসলেন।
বদরুল হায়দার স্ত্রীর হাত থেকে পত্রিকা নিয়ে পাশেই বসে পত্রিকায় চোখ রাখলেও কানটা ওদের দিকে তাক করে রাখলেন। শারমিন শিলা স্বামীকে একবার দেখে অদৃশ্যভাবে একটু হেসে ওদের জিজ্ঞেস করলেন, এবার বলুন, আপনারা কেমন আছেন?
কুদরত জাহিদ বললেন, ভালো আছি আপা। আপনি ভালো আছেন?
এই আক্রার বাজারে ভালো থাকাটা খুব কঠিন সভাপতি সাহেব।
আমরা এই ব্যাপারেই আপনার সাথে পরামর্শ করতে এসেছি।
হায়াৎ আলি বললেন, বেবিফুডের প্রোগ্রামটা ল্যান্ডস্লাইড ভিক্টরির মতো হয়েছে। সবাই প্রশংসা করছে আমাদের সাকসেসের। আমরা আরেকটা প্রোগ্রাম হাতে নিয়ে চাই। এবারের বিষয়টা কী হবে তা নিয়েই আপনার এডভাইস নিতে এসেছি আপা।
একজন সদস্য বললেন, বাড়িভাড়া নিয়ে কিছু একটা করা যায় না আপা? বাড়িওয়ালাদের ভাড়া বৃদ্ধির অত্যাচারে ঢাকার ভাড়াটিয়ারা জর্জরিত। এ বিষয়ে শীঘ্রই কিছু একটা করা দরকার।
শারমিন শিলা বললেন, আমিও একজন ভাড়াটে। বাড়িওয়ালাদের বাড়ি বয়কট করলে থাকবো কোথায়? বস্তিতে?
কুদরত জাহিদ বললেন, তা সম্ভব না আপা।
এ বিষয়ে আরো গভীরভাবে ভাবতে হবে। তখন বাড়িওয়ালাদেও শায়স্তো করার জন্য নিশ্চয়ই কোনো না কোনো উপযুক্ত এবং ইফেকটিভ পথ খুঁজে পাওয়া যাবে।
ঠিক বলেছেন আপা। এখন আমরা শাক-সব্জির ব্যাপারে কী প্রোগ্রাম নেয়া যায় তা ভেবে বের করি। আপনি একটা পরামর্শ দেন আপা। আপনার প্রোগ্রাম উত্তম! একেবারে পয়েন্টে পয়েন্টে কাজে লাগে।
অপর সদস্য বললেন, আমার বাড়ি নরসিংদি আপা। আপনি জানেন নরসিংদিতে প্রচুর শাক-সব্জি উৎপন্ন হয়। আমারও কিছু ক্ষেত আছে যাতে সব্জি আবাদ করা হয়। আমরা বেগুনে পাই প্রতি কেজি সর্বোচ্চ পাঁচ টাকা। পটল দুই তিন টাকার বেশি দেয় না।
শারমিন শিলা আশ্চর্য হয়ে বললেন, পাইকারি?
জি আপা। আমরা খুচরা বিক্রি করতে পারি না।
আর আমরা ঢাকায় বেগুন খাচ্চি সত্তর আশি টাকা করে। এবার রোজার সময় এক শ টাকা কেজিও বেগুন বিক্রি করা হয়েছে।
হায়াৎ আলি বললেন, কাঁচা বাজারেরও একটা শক্তিশালি সিন্ডিকেট আছে।
কারণ সরকার চাল ডালের মতো শাক-সব্জি রেশনে বিক্রি করতে পারবে না; ইমপোর্টও করতে পারবে না।
শারমিন শিলা বললেন, বেবিফুডের মতো কমপক্ষে এক সপ্তাহ শাকসব্জি বয়কট করা যেতে পারে।
কুদরত জাহিদ বললেন, আমরাও তাই ভাবছিলাম। এ বিষয়েই আপনার উপদেশ পরামর্শ নেবার জন্য এসেছি।
বদরুল হায়দার বললেন, বেবিফুড আর শাক-সব্জির পরিস্থিতি এক নয়।
আপনার কথাটা বুঝলাম না স্যার।
বেবিফুট বিক্রি হয় গ্রোসারি শপে। গ্রোসারি শপের দোকানদাররা বেবিফুডের সাথে আরো বহুকিছু বিক্রি করে। তাই বেবিফুড বিক্রি না হলেও ওদের অন্যান্য দ্রব্যসামগ্রি বিক্রি হওয়ায় ওদের কোনো সমস্যা হয়নি। কিন্তু কাঁচা বাজারে একজন বিক্রেতা শুধু শাক-সব্জিই বিক্রি করে থাকে। এক সপ্তাহ শাক-সব্জি বিক্রি বন্ধ থাকলে ওরা না খেয়ে মারা যাবে; ক্ষতিও হবে প্রচুর। এই সমস্যাটা কিভাবে মোকাবেলা করা যাবে তা বের করে প্রোগ্রাম বাস্তবায়নে নামতে হবে।
শারমিন শিলা বললেন, সমস্যাটা জেনুইন। নিশ্চয়ই তোমার মাথায় সমাধানটাও আছে। বলে দাও প্লজি!
যে কয়দিন শাক-সব্জি বয়কট করা হবে, সে কদিন বিকল্প বিক্রির ব্যবস্থা করতে হবে। যেমন: আলু পেয়াজ, রসুন, এরকম অন্যান্য দ্রব্যসামগ্রী। আর কনজিউমারদেও সেই কটা দিন শাক-সব্জির বদলে আলু খেতে পরামর্শ দেয়া যেতে পারে। তাহলে সরকারও খুশি হবে।
উহু! সরকার খুশি হবে না!
কেনো?
বিগত এক সরকারের অর্থমন্ত্রী বলেছিলেন বেশি করে আলু খান, ভাতের উপর চাপ কমান!
কিন্তু আমাদের প্রোগ্রামে ভাতের উপর চাপ কমানোর জন্য আলু খাবার পরামর্শ দিতে যাচ্ছি না, শাক-সব্জির বদলে আলু খেতে পরামর্শ দিতে যাচ্ছি।
ঐ হলো। যাহা বাহান্ন, তাহাই তেপান্ন।
হায়াৎ আলি বললেন, তাহলে আমরা মাঠে নেমে পড়ি আপা।
এই প্রোগ্রামটা সাকসেসফুল করতে হলে কনজিউমারদের সাথে শাক-সব্জি বিক্রেতাদেরকেও কনভিন্স করতে হবে। এতে বেশ সময় লেগে যাবে। সময় লাগুক। তবু প্রোগ্রাম সাকসেসফুল করতে হলে এই গ্রাউন্ড ওয়র্ক করতেই হবে। উভয় পার্টি ফুল কনভিন্স হবার পরই একশন শুরু করতে হবে।
ওকে আপা। আমরা এখন আসি। দরকার পড়লে আমরা আবার আপনার কাছে আসবো আপা। আর সময়ে সময়ে গ্রাউন্ড ওয়র্কের প্রোগ্রেস আপনাকে জানাবো। খোদা হাফেজ।
ওরা চলে গেলেন। বদরুল হায়দার পত্রিকাটা টি-টেবিলে রেখে স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বললেন, তুমি এখন ক্যাবের অঘোষিত উপদষ্টো। তুমি সাহস ধরে রেখেছো বলে তোমাকে ধন্যবাদ জানাই।   
শারমিন শিলা চোখের তারা নাচিয়ে বললেন, তুমি এখনো ড্রয়িংরুমে বসে আছো কেনো! তোমার দেরি হয়ে যাচ্ছে না!
বদরুল হায়দার দেয়াল ঘড়িটা দেখে বললেন, একটা মহৎ কাজে সহযোগীতা করতে গিয়ে আধাঘণ্টা দেরিতে অফিসে গেলে কোনো সমস্যা হবে না। তুমি এগারোটায় কলেজে যাচ্ছো। তাই না?
বরাবর তা-ই যাই। ছেলে দুইটাকে স্কুলে পৌঁছে দিয়ে যেতে হয় কলেজে।
ছেলে দুটোর স্কুলে আনা-নেয়ার ব্যাপারে আমি তোমাকে কোনো সাহায্য করতে পারলাম না। মাঝে মাঝে বেশ খারাপ লাগে।
কি যে বলো না তুমি! সংসারের কাজ কে বেশি করলো আর কে কম করলো, সেই হিসাব করলে কি আর সংসার চালানো যাবে?
থ্যাঙ্ক ইউ! প্রতিটি সংসারে তোমার মতো গৃহিনী থাকলে এবং তোমার মতো করে ভাবতে পারলে কোনো সংসারেই ভাঙ্গন দেখা দিতো না। আমি উঠলাম।
তুমি বাথরুম থেকে বের হতে হতেই নাস্তা তৈরি হয়ে যাবে।

 

বদরুল হায়দার অফিসে এসে বসতেই জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম-সচিব(এপিডি)-এর ফোনটা এলো। ক্যাবিনেট সচিবের ইচ্ছানুসারে তাঁকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে যুগ্ম-সচিব(ওএসডি) করা হবে; মানসিক প্রস্তুতি নিতে তাঁকে জানালো হলো। বদরুল হায়দার চমকে উঠলেও ক’দিন আগে নৌ-পরিবহন সচিবের সাথে শাফায়াত আজিজের বদলির পরিপ্রেক্ষিতে কথোপকথন মনে পড়লো। তিনি ছুটে গেলেন বিষয়টি নিয়ে জনপ্রশাসন সচিবের সাথে কথা বলার জন্য। কিন্তু একান্ত সচিবকে দিয়ে চিরকুট পাঠালে জনপ্রশাসন সচিব তাঁকে সাক্ষাৎ দেবেন না মর্মে জানালেন। বদরুল হায়দার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম-সচিব(এপিডি) জায়দে হাশমিরে চেম্বারে ঢুকলেন।
জায়দে হাশমি জিজ্ঞেস করলেন, কী হয়েছে তোমার নৌ-পরিবহন সচিবের সাথে? বদরুল হায়দার সেদিনের ঘটনা বলতেই জায়দে হাশমি ফের বললেন, কী দরকার ছিলো তোমার নৌ-পরিবহন সচিবের সাথে এসব কথা বলার?
বদরুল হায়দার বললেন, আমি কি অন্যায় কিছু বলেছি?
জয়েন্ট সেক্রেটারি হবার পর তোমাকে কি এটা বুঝাতে হবে যে ব্যুরোক্রেসিতে ন্যায়ের পক্ষে কথা বলা ঘোরতর অন্যায়?
যুগ্ম-সচিব(এপিডি)-এর চেম্বারে আরো দুজন সিনিয়র যুগ্ম-সচিব বসেছিলেন, যারা কয়েক মাস যাবৎ বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে জনপ্রশান মন্ত্রণালয়ের বারান্দায় ঘুরাফেরা করছেন।
তাঁদের একজন জাকির হাসান বললেন, আমার কথাটা হাস্যাকর শোনালেও আমি একটা প্রস্তাব করতে চাচ্ছি।
জায়দে হাশমি বললেন, কী প্রস্তাব স্যার?
ওএসডি অফিসারদের নিয়ে একটা সোসাইটি করতে চাই। নাম হবে ‘ওয়েলফেয়ার এসোসিয়েশন অব ওএসডিস’।
পাশে বসা যুগ্ম-সচিব আব্দুল খালেক বললেন, কী হবে এই এসোসিয়েশন করে?
আমরা আমাদের দাবিদাওয়া পেশ করবো।
যেমন?
আমাদের একটা বসার পৃথক বসার জায়গা দরকার। আমরা এখন লাইব্রেরিতে গিয়ে বসি। ওখানে বসে পারস্পরিক কথা বলা যায় না। ঐ রুমে কম করে হলেও দশ বারোটা কম্পিউটার থাকবে ইন্টারনেট সংযোগসহ।
বদরুল হায়দার বললেন, আরো আছে।
যেমন?
একজন যুগ্ম-সচিব/অতরিক্তি সচিব প্রাধিকার অনুযায়ী যা যা প্রাপ্য সেগুলো প্রদান নিশ্চিত করতে হবে; যেমন: পেপার, এরোসোল, রুম ফ্রেশনার, ইত্যাদি।
যথার্থ কথাই বলেছো তুমি।
ওএসডি র্কমর্কতাদরে দেখভালের জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে একটা শাখা খোলা যেতে পারে, যার প্রধান হবে একজন অতিরিক্ত সচিব, তাঁর অধীনে একজন যুগ্ম-সচিব, দুইজন উপ-সচিব একং আনুসাঙ্গিক স্টাফ থাকবে। আরো আছে স্যার।
বলো।
ওএসডিদের বিভিন্ন কাজও দেয়া যেতে পারে; তবে যাদের পলিটিক্যাল কারণে ওএসডি করা হয়, তাঁদের কোনো কাজ দিতে না চাইলে দরকার নেই। অন্যাদের রেগুলার পোস্টিং না দেয়া র্পযন্ত বিভিন্ন ডিপার্টমেন্টাল প্রসিডিং-এর তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করা যেতে পারে; জরুরি প্রয়োজনে অন্য কোনো এসাইনমেন্ট দেয়া যেতে পারে। ইত্যাদি।
জায়দে হাশমি বললেন, সেদিন নৌ-পরিবহন সচিবের সাথে একটা অন্যায়ের মৃদু প্রতিবাদ করায় তোমাকে ওএসডি করতে বলেছেন ক্যাবিনেট সচিব। তুমি এসব দাবি-দাওয়া জানালে সরকার তোমাকে বাধ্যতামূলক অবসরে নিশ্চিত পাঠিয়ে দেবে!
বদরুল হায়দার যুগ্ম-সচিব(এপিডি)-এর চেম্বার থেকে বের হয়ে শারমিন শিলাকে মোবাইল ফোনে রিং করলেন, আজ সকালেই আক্ষেপ করে বলেছিলাম, ছেলেদের কোনোদিন আমি স্কুলে দিতে পারি নি, স্কুল থেকে নিয়ে আসতেও পারি নি। সরকার আমাকে সেই সুযোগ করে দিচ্ছেন গো।
শারমিন শিলা স্বাভাবিক কণ্ঠে বললেন, তার মানে তুমি ওএসডি হচ্ছো! হঠাৎ?
সেদনি শাফায়াত আজিজকে ওএসডি করার বিষয় নিয়ে নৌ-পরিবহন সচিবের সাথে আমি কথা বলেছিলাম। সম্ভবত নৌ-পরিবহন সচিবের আমার কথাগুলো পছন্দ হয়নি; তাই ক্যাবিনেট সচিব অথবা জনপ্রশাসন সচিবের সাথে কথা বলে আমাকে ওএসডি করার ব্যবস্থা নিয়েছেন!
অর্ডার হাতে পেয়েছো?
না। আজ অথবা কাল অর্ডার হয়ে যাবে।

 

ডিউকের পক্ষ থেকে তালাকের নোটিশের কোনো জবাব না দেয়ায় খুব সহজেই তালাক সম্পাদন হয়ে গেলো ডিউক ও সঞ্চিতার। উভয় পক্ষে আলোচনার মাধ্যমে বিয়ের তারিখ ধার্য হয়েছে। আজ বিয়ে। জবরদস্ত আয়োজন। হাজারের উপর মেহামন দাওয়াত দেয়া হয়েছে। সবাই আসবে আশা করা হচ্ছে। একপক্ষ অবসরপ্রাপ্ত সচিব হওয়ায় সরকার ও বিরোধী দলের বহু নেতা দাওয়াত পেয়েছে। যুগ্ম-সচবি লুৎফর জহিরও পেয়েছেন দাওয়াত; কিন্তু ফোন করে জানিয়েছেন যে সঙ্গত কারণইে ওর পক্ষে এই বিয়েতে আসা সম্ভব হবে না। মোস্তাকিম মাসুদ তা মেনে নিয়েছেনে। দুই বেয়াই কমিউনিটি সেন্টারের গেটে দাঁড়িয়ে মেহমানদের অর্কিডের স্টিক দিয়ে অভ্যর্থনা জানাচ্ছেন। বর কনে তখনো এসে পৌঁছায় নি। উভয়ে দুটো বিউটি পার্লারে সাজুগুজু করছে।
রাত আটটায় মোবাইল ফোনে সংবাদ এলো কনে সাজানো শেষ হয়েছে; এখনই রওয়ানা দিচ্ছে। কনের গাড়ি এসে থামলো কমিউনিটি সেন্টারের গেটের সামনে। দুই বেয়াই এগিয়ে এলেন কনেকে গাড়ি থেকে নামাতে। গাড়ি থেকে আগে নামলো কনের বোন এবং বান্ধবী সুমি। ওরাই সঞ্চিতার হাত ধরে ধীরে ধীরে গাড়ি থেকে নামালো। কনের লম্বা ঘোমটা টানা। সবাই কনেকে নিয়ে ব্যস্ত।
মাদকাসক্ত ডিউক আড়ালে দাঁড়িয়ে অপেক্ষায় ছিলো সঞ্চিতার আগমনের। সে শাদা কাপড়ে মুখমণ্ডল পেঁচিয়ে এগিয়ে গেলো গাড়ির দিকে। ফাঁক-ফোকর গলে চলে এলো কনের মুখোমুখি। হাতে ধরা সালফিউরিক এসিডের শিশির মুখ খুলে ছিটিয়ে দিলো সঞ্চিতার মুখমণ্ডলে। অসহ্য যন্ত্রণায় সঞ্চিতা ভয়ার্ত চিৎকার দিয়ে জ্ঞান হারিয়ে পড়ে গেলো সেখানেই। সবাই হতভম্ব। হঠাৎ কী হলো সঞ্চিতার?
ডিউক না পালিয়ে হা হা করে হেসে উঠলো। হাত উচিয়ে সে হাতের শিশিটা দেখালো।

লেখক পরিচিতি: আমাদের সাহিত্যের অতি পরিচিত মুখ রানা জামান। দীর্ঘদিন ধরে নিরলসভাবে লিখে চলেছেন গল্প, কবিতা, উপন্যাস, প্রবন্ধ, শিশুতোষ, সাইন্সফিকশনসহ নানা ধরনের লেখা। সবমিলিয়ে ৯০টির বেশি বই বেরিয়েছে তার। এগুলোর মধ্যে ছোটগল্প- ক্রীড়নক, পুষি বেড়ালের বিদ্রোহ, একজন জাহেদ আলী, ভালোবাসা ক্রসফায়ারে; উপন্যাস- বৃক্ষমানব, রোবো সক্রেটিস(সায়েন্স ফিকশন), ভালোবাসার মূল্য কত, রোদ-বৃষ্টির খেলা এবং কাব্যগ্রন্থ- পদ্মপাতার শিশিরবিন্দু, ক্যাকটাস, তোমার নয়ন কাকচক্ষু জল(সনেট), তালগাছ আমার যে যাই বলুক, ননসেন্স কবিতা ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। লেখকের দেশের বাড়ি কিশোরগঞ্জ জেলায়। তিনি দীর্ঘদিন বাংলাদেশ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন শেষে অতিরিক্ত সচিব হিসাবে অবসর নিয়েছেন।

ওমেন্স নিউজ/

লাইক, কমেন্টস, শেয়ার দিয়ে আমাদের সাথে থাকুন