সুলাইমান মাহমুদ রাসেলের বিশেষ প্রবন্ধ ‘মুসলমানের ঈদ: উৎসব ও ঐতিহ্য’

সুলাইমান মাহমুদ রাসেল

মুসলমানের ঈদ: উৎসব ও ঐতিহ্য

ইসলামের ছায়াতলে শান্তি সুনিবিড়। আল্লাহ তায়ালা এমন এক জীবনব্যবস্থার প্রবর্তন করেছেন যেখানে বিশ্ববাসীর হেদায়েতের হুকুমত রয়েছে। মানুষের জন্য যা কল্যাণকর, যা সুখ-শান্তির সেই পথকেই তিনি সহজ ও সরল করেছেন ঈমানদার বান্দাদের জন্য। তাঁরই অকৃত্রিম দয়া ও মায়াতে বিশ্বজগতের রহমত স্বরূপ আলোকবর্তিকা হয়ে আবির্ভূত হয়েছেন বিশ্বের শ্রেষ্ঠমানব আখেরি যমানার পয়গম্বর সাইয়্যেদুল মুরসালিন হযরত মুহাম্মদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। আল্লাহ রব্বুল আলামীন দুনিয়ার জমিনে ও আখিরাতের বাগানে অনন্ত সুখের সন্ধানে খলিফাতুল্লাহ নামক সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব মানুষের কাছে পাঠিয়েছেন অত্যাশ্চর্য আসমানী কিতাব আল কুরআনুল হাকীম। ইসলামের আলোয় আলোকিত হতে পবিত্র ও পরিপূর্ণ এ মহাগ্রন্থের আলোকে যে ব্যক্তি জীবন ও যৌবন কাটিয়ে দিতে পারেন আল্লাহ পাক তাঁর জীন্দেগীকে সুখ-সমৃদ্ধিতে ভরিয়ে দেন। ঈমান-ইখলাস ইবাদত ও আখলাকের মাধ্যমে মহান সৃষ্টিকর্তার নৈকট্য লাভের যে সুগম পথ সে পথকে অবলম্বন করেই সত্য ও সুন্দর জীবনের পাথেয় সংগ্রহ করা সম্ভব। সুন্দর ও শান্তির ধর্ম ইসলামের ছায়ায় নিজেকে পরিপূর্ণ মুসলমান সালেকীন সালেহীন মকবুল বান্দার পর্যায়ে উত্তীর্ণ হতে দ্বীনের ইলম অর্জন ও আত্মশুদ্ধির প্রয়োজনীয়তা অপরিহার্য। আর এই আত্মশুদ্ধির শ্রেষ্ঠ মৌসুম হচ্ছে রমযানুল মোবারক। আরবি মাসের সর্বশ্রেষ্ঠ মাস রমযান। এক মাস আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে সিয়াম সাধনার মধ্য দিয়ে মুমিনের ধৈর্য ও দ্বীনদারিত্বের পরিচয় পাওয়া যায়। রহমত, মাগফিরাত ও নাজাত এই তিন অংশে বিভক্ত রমযানের ত্যাগ তিতিক্ষার পরিণতি পবিত্র ঈদুল ফিতরের আনন্দ ও উৎসব আমেজে।

ঈদের আনন্দ তাদের যারা রমযানের এক মাস সহিহ নিয়তে সিয়াম সাধনা করে, নফল ইবাদত-বন্দেগি, তাহাজ্জুত-তারাবিহ, তালীম-তাযকিয়ায় সময় কাটায়। আত্মার কুপ্রভৃত্তিকে দমন করে, মিথ্যাচার, সুদ-ঘুষ, জিনা-ব্যভিচার থেকে বিরত থাকার প্রচেষ্টাই রমযানের অন্যতম উদ্দেশ্য। বিশ্বনবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যমানায় সাহাবায়ে কিরাম বর্তমান সময়ের মতো এত সুন্দর মসজিদ পাননি। যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল অনুন্নত। নানা রকম ফলমূল খাদ্যসামগ্রিও ছিল না। পানি, খেজুর, আর আটাই ছিল ক্ষুধা নিবারণের একমাত্র অবলম্বন। অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়াও তারা পায়নি। কিন্তু তবু তাঁদের রোযা সহিহ-শুদ্ধ ছিল। রোযার মহব্বত ছিল। তাঁদের ঈমানি দৌলত ছিল। তাঁদের ইবাদত, ইখলাস, আখলাক ও আচার-ব্যবহারের সৌন্দর্য ও নমনীয়তা ছিল। শোকর ও সবরে তাঁরা ছিল উম্মতের সুন্নাতি নিদর্শন।

কিন্তু অবাক লাগে বর্তমান সমাজের দিকে দৃষ্টি নিবন্ধ করলে। আজকে মানুষ সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা পেয়েও আল্লাহ তায়ালাকে ভুলে গেছে। ফরমায়েশি ঈদ উদযাপনে দল বেঁধে ঈদগাহে যাওয়াকে একটা ফ্যাশন, একটা নিয়ম হিসেবে চালিয়ে নিচ্ছে। কিন্তু এই ঈদের অন্তর্নিহিত তাৎপর্য অনুধাবন করছে না। সাহাবায়ে কিরামের যুগে অভাব ছিল অর্থের, অভাব ছিল সম্পদের কিন্তু আমলের ঘাটতি ছিল না। তাঁদের কাছে জাগতিক সহায়-সম্পত্তির দাম ছিল না কিন্তু আমলের বড় কদর ছিল। আর এ কারণেই তাঁরা উম্মতে মোহাম্মাদিয়ার মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত। মানুষগুলি দামি ছিল, মালের দাম ছিল না। আর একালের মুসলমান নামে মাত্র মুসলমান। ঘটা করে শত শত আইটেমের ইফতারি দিয়ে ইফতার করে, আবার যাকাতও দেয়, এতিম-মিসকিনকেও খাওয়ায় কিন্তু সওয়াবের বেলায় কতটুকু শরীঈ আইন মোতাবেক হয় তা বিবেচ্য বিষয়। বাস্তব সমাজচিত্র প্রত্যক্ষ করলে, বেরোযদারের সংখ্যাধিক্য, হারাম পন্থায় রুটিরুজি জোগাড়ের নজিরা হৃদয়কে ব্যথিত করে, সমাজকে কলুষিত করে। আজকের নবীন-প্রবীণ অধিকাংশ মুসলমান দ্বীন সম্পর্কে অজ্ঞতা অসচেতনতার কারণে যাকে ইবাদত মনে করে পরম শ্রদ্ধার সাথে আদায় করে আসলে তা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সুন্নাত তরিকার বাইরে হওয়ায় বেশিরভাগ কাজই বিদআতি কাজে পরিণত হয়। আফসোস, ভাষা-সাহিত্যের উৎকর্ষ সত্ত্বেও দ্বীনি শিক্ষা নৈতিক শিক্ষার অভাবে মাদকাসক্ত যুব সমাজ, সোশ্যাল মিডিয়ায় আসক্ত তরুণ-তরুণি ইসলামের বিধিনিষেধের তোয়াক্কাই করছে না! দৃশ্যমান উন্নতি লক্ষ্য করলেও সত্যিকার মুসলমানিত্ব অর্জনের পরিচয় খুব কমই পাওয়া যায়। এর কারণ পারিবারিক ও সামাজিক, এর কারণ প্রাতিষ্ঠানিক ও রাষ্ট্রীয়। গুরুত্বহীনতার কারণে বর্তমান যুব সমাজ ইবাদতে অপরাগ। ভিনদেশি কৃষ্টি কালচারে অভ্যস্ত।

২.

ঈদ কী? ঈদ কেন? ঈদের করণীয় ও বর্জনীয় কি? রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিভাবে ঈদ পালন করতেন? এসব অত্যবশকীয় সওয়ালগুলো আজও হয়তো কারো কারো মনে উঁকি দেয়নি! অথচ বাঙালি মুসলিম জাতি নিজেকে কত মহান ভাবে! ঈদের দিন নতুন কাপড় পড়ে বিদেশি সংস্কৃতির গোলাম হয়ে ঈদগাহে গিয়ে নামায আদায়, মিষ্টিমুখ, মোলাকাত করে সারাদিন আত্মীয় স্বজনের বাড়ি ঘোরাঘুরি, প্রচুর পয়সা ব্যয়— এটা তরিকায়ে সুন্নাহ নয়, দৃশ্যমান সুন্নাহ থাকলেও ভেতরে আছে ব্যক্তিক দুর্বলতা। বরং এটা হচ্ছে আত্মার খায়েস। অথচ নিকটস্থ আত্মীয় প্রতিবেশি যে না খেয়ে রোযা রেখেছে, অর্থাভাবে ছেলেমেয়েদের নিয়ে ঈদানন্দটুকু করতে পারছে না তা বড়লোক বাবুর অগোচরেই থেকে যায়! ঈদের দিন মহোৎসবের আমেজস্বরূপ কেউ বিবাহ বহির্ভূত বান্ধবী নিয়ে পার্কে অসভ্যতামি করতে যায়, কেউ সিনেমা হলে নতুন সিনেমা দেখতে যায় নানাবিধ অকর্ম-কুকর্মে জড়িয়ে যায়। এটাই কি ঈদ? নাকি মানুষের আত্মবিলাসিতার মহরত।

ঈদ আরবি শব্দ। আভিধানিক অর্থে সুখ দুঃখ বিশেষ স্মৃতিময় দিবস ফিরে আসাকে ঈদ বলে। মহানবী হযরত মুহাম্মদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মদিনা হিজরতের দ্বিতীয় বছর ৬২৪ ঈসায়ী প্রথম ঈদ উদযাপিত হয়। ঈদে নবীজী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এতিম-মিসকিনের খোঁজ খবর নিতেন। সাহাবায়ে কিরাম গুনাহ মাফের ফিকির করতেন। তাঁদের চিন্তা চেতনায় পরিশুদ্ধতা ছিল।

অন্যভাবে বলা যায় ঈদ মানে আনন্দ, ফিতর মানে রোযা। ঈদুল ফিতর মানে রোযা ভাঙার আনন্দ। শাওয়াল মাসের প্রথম দিন বিশ্ব মুসলিম উম্মাহ ব্যাপক উৎসাহ উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে ঈদুল ফিতর উদযাপন করে। ঈদের চাঁদ দেখে তারা পালন করে সর্ববৃহৎ ধর্মীয় এ উৎসব। আল্লাহ তায়ালার কালামুল্লাহ শরীফে বলেন—
❝ তোমার কাছে তারা নতুন চাঁদের বিষয়ে জিজ্ঞেস করে। বলে দাও এটি মানুষের জন্য সময় নির্ধারক এবং হজ্বের সময় ঠিক করার মাধ্যমে।❞

যে মুমিন এক মাস রোযার হক আদায় করে রোযা রেখে তাহাজ্জুদ নামাযে কান্নাকাটি করে নিজের গুনাহ মাফের জন্য আল্লাহ তায়ালার কাছে আত্মসমর্পণ করেছে, সদাকায়ে ফিতর দান করেছে,  শরীঈ আইন মোতাবেক যাকাত প্রদান করেছে সুন্নাতের পাবন্দ থেকেছেন— প্রকৃত ঈদানন্দ তার জন্যই। নাজাতের দশ দিনে ইতিকাফের গুরুত্ব অপরিসীম। বেজোড় রাতে হাজার রাতের শ্রেষ্ঠ রজনী শবে কদর তালাশে যারা সবর করে তাঁরাই সফলকাম। আর এই সুযোগ শুধুমাত্র রমযানুল মোবারকে। কুরআনুল কারিমে আল্লাহ রাব্বে কারীম ইরশাদ করেন—
❝হে মুমিনগন। তোমাদের ওপর রমযান মাসের রোযা  ফরজ করা হয়েছে। যেমন তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর ফরজ করা হয়েছে।❞ ( সূরা বাকারা : ১৮৩)

কাজেই ঈদের আনন্দ, ঈদের পূর্বপ্রস্তুতি সম্পর্কে জেনে বুঝে আমাদেরকে ঈদ উদযাপন করতে হবে। মনগড়া পদ্ধতিতে ঈদ পালনে আছে আত্মতুষ্টি ; আত্মার শান্তি নেই! সওয়াবের বিপরীতে শিরক-বিদআত ও গুনাহের বোঝা বাড়ে।
কুরআন-সুন্নাহর আলোকে রমযানের রোযা রাখা, কুরআনুল কারীমের সহিহ তিলাওয়াত করা, তাহাজ্জুদ আদায়, ইতিকাফ করাসহ সাধ্যমত নফল ইবাদতে মশগুল থাকার পরে আল্লাহ তায়ালার রহমত বরকত ও নাজাতের আশা করা যায়। অন্যথায় আল্লাহ চাহেন তো হক আদায় না হওয়ায় রোযা, তাসবিহ-তাহলিল, যিকির-আযগার সব বিফলে। শুধু রোযাই নয় ঈদুল ফিতরের নামায, ঈদের খুশি কিছুই তার জন্য নয়। বর্তমানে অধিকাংশ আধুনিক শিক্ষিত তরুণ তরুণি সমাজিক অবক্ষয়ের শিকার। তারা পাশ্চাত্য লেবাসে, পাশ্চাত্য খাবার পরিবেশন করে ঈদানন্দ উপভোগ করে। পর্দার খেলাপ করে কিশোর-কিশোরী, যুবক-যুবতির আড্ডা, আনন্দকে ইসলামি শরীয়ত জায়েজ বলেনি। অথচ এটাই ঈদ উৎসবের ডিজিটাল পদ্ধতি। জাতির এটা জানা উচিত, ঈদের আনন্দ পয়লা বৈশাখের নববর্ষ উদযাপনের মতো অতিরঞ্জিত একটি মিশ্র সংস্কৃতির নামান্তর নয়। সাবধান! ধর্মীয় বিষয়ে ফাঁকি নয়৷ শরীয়তে ঈদ উদযাপনেের হুকুমাত ভিন্ন। আল্লাহ তায়ালার আদালতে কোনো অপরাধী কিন্তু ছাড় পাবে না। তিনি সগীরা, কবীরা কোনো গুনাহই ছাড় দিবেন না যতখন না তওবায়ে নাসুহা করবে না।

শরীয়তের দৃষ্টিতে ঈদুল ফিতরের ওয়াজিব বা অবশ্য পালনীয় আমল দুটি। যা না করলে গুনাহ হবে।
১. সদাকাতুল ফিতর বা ফিতরা আদায় করা
২. দুই রাকাত সালাত ছয় তাকবিরের সাথে আদায় করা।

হাদিসের আলোকে ঈদের সুন্নাহ :

১. তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে ওঠা।
২. মিসওয়াক করা
৩. গোসল করা
৪. শরীয়তসম্মত পোষাক-পরিচ্ছদ পরিধান করা
৫. সামর্থ্য থাকলে উত্তম বা নতুন কাপড় পড়া
৬. আতর বা সুগন্ধি ব্যবহার করা
৭. ঈদগাহে যাওয়ার আগে মিষ্টি জাতীয় খাবার (খেজুর) খাওয়া
৮. সকাল সকাল ঈদগাহে যাওয়া
৯. সদকায়ে ফিতর আদায় করে ঈদগাহে যাওয়া
১০. ঈদগাহে সালাত আদায় করা
১১. সম্ভব হলে এক রাস্তা দিয়ে ঈদগাহে যাওয়া, অন্য রাস্তা দিয়ে ফেরা
১২. পায়ে হেঁটে যাওয়া
১৩. আস্তে আস্তে তকবির পড়া— আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার ওয়ালিল্লাহিল হামদ।

এছাড়াও রাসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবায়ে কিরামকে বিভিন্ন আমল শিখিয়েছেন।

উল্লেখ্য,  সদকায়ে ফিতর হচ্ছে ঈদের দিন কোন সাবালক মুসলমান সাড়ে সাত তোলা স্বর্ণ অথবা সাড়ে বায়ান্ন তোলা রৌপ্য বা তার সমান মূল্যের নগদ টাকা বা অন্য মালামালের মালিক ( সাহিবে নিসাব) হলে তার ওপর ফিতরা আদায় ওয়াজিব হওয়া। যাদের ওপর যাকাত ওয়াজিব হয়েছে তাদেরকে যাকাত প্রদান করতে হবে। কুরআন সুন্নাহ মোতাবেক সাওম পালন, ঈদ উদযাপন না করলে তা পাশ্চাত্য উৎসবের মতোই একটি বিদআতি কাজ বলে বিবেচিত হয়।
নবী করিম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঈদের দিন গোসল করে, সুগন্ধি ব্যবহার করে ইবাদত বন্দেগী ও আত্মীয় স্বজন প্রতিবেশীর খোঁজ নিতেন। হাদিস শরীফে ঐতিহাসিক সময়ের খন্ডচিত্র প্রবন্ধের শেষাংশে সংযুক্ত হয়েছে।

৩.

ঈদ আনন্দের, ঈদ শিক্ষার। এই শিক্ষা আত্মশুদ্ধির শিক্ষা, এই শিক্ষা গুনাহ মাফের মুজাহাদা। শান্তি সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির বন্ধন সৃষ্টি করাও ঈদের বিশেষ বৈশিষ্ট্য। রমযান মুসলমানদের ভ্রাতৃত্ববোধকে বাড়িয়ে দেয়। দিনের বেলা পানাহারা, জৈবিক প্রবৃত্তি থেকে বিরত থাকার ক্ষেত্রে ধনী-গরিব সবাই সমান। সাম্যবাদের অতুলনীয় এ শিক্ষা ইসলামি শরীয়তে থাকা সত্ত্বেও মানুষের পুঁজিবাদী সমাজতন্ত্রে অতিউৎসাহী হওয়া সত্যি বিস্ময়ের। রমযানের শিক্ষা ও মাহাত্ম্য হলো মুমিন নর-নারীর গুনাহ বর্জনের ও তুলনামূলক বেশি সওয়াব লাভের সুযোগ করে দেয়। অতীত জীবনের পাপাচার থেকে আত্মাকে পরিশুদ্ধ করার জন্য দীর্ঘ সময়ের একটি প্রক্রিয়া হচ্ছে রমযান। রমযানের চূড়ান্ত পরিণতি ঈদ। ঈদের নামায আদায়ের পর থেকে ওয়াক্ত মতো নামায কায়েম, হালাল-হারাম বাছ-বিচার, সত্যকথা বলা, সৎপথে চলার দীক্ষা আল্লাহ তায়ালার হুকুম-আহকাম মেনে নিলেই কেবল রমযানের সাধনা সার্থক হবে। অন্যথায় এটা রিয়া বা লোক দেখানো ইবাদত বলেই গণ্য হতে পারে।

রাসূলে আকরাম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন— ❝প্রত্যেক জাতির উৎসবের দিন আছে। আর আমাদের উৎসবের দিন হলো ঈদ।❞(সহিহ মুসলিম ও বুখারী শরীফ)

ঈদযাপনে সাধারণ মুসলমানদের যদি না খেয়ে, পুরান কাপড়ে থাকতে হয় তাহলে রমযানের থেকে তথাকথিত ভদ্রলোকেরা কি শিখলো? আল্লাহ তায়ালার সমাজে সমতাবিধান নিশ্চয়নের জন্য যাকাত ও সদকায়ে ফিতরের হুকুম জারি করেছেন। কিন্তু ‘সমাজের নামায পড়া’ প্রবাদের মতো রোযাকালিন নামায-কালামে মনোনিবেশ করলেও হাক্কুল্লাহ ও হক্কুল ইবাদে সম্পূর্ণ উদাসীন থাকা এক শ্রেণির বড়লোক সামাজিক অশান্তির কারণ। তাঁরা মাতব্বরির সময় সর্বাগ্রে আর ইলম-আমলে নিতান্তই মুর্খ! এরা সমাজের প্রধান শত্রু। ইসলামের দুশমন, মানবতার দুশমন। এদের অত্যাচারে সাধারণ মুসলমান যেমন নির্যাতিত নিপীড়িত তেমনি মৌলিক অধিকার, সামাজিক অধিকার থেকেও বঞ্চিত।

ঈদ উদযাপনে মুসলমানদের বর্জনীয় কাজ :

ঈদ পবিত্র, ঈদ একটি ইবাদত। প্রসঙ্গত কুরআন সুন্নাহর বিধিনিষেধের বিষয়টিও চলে আসে। তেমনি চোখে পড়ে অপসংস্কৃতি আর তার থেকে পরিত্রাণের আকাঙ্খা। প্রচলিত গুনাহের মধ্যে একটি বড় গুনাহ বিজাতীয় সংস্কৃতির চর্চা। আতশবাজি, আড্ডাবাজি, নাইট ক্লাবে ড্যান্স করা, অবৈধ প্রেমের নামে পরকীয়া, জিনা-ব্যভিচারে লিপ্ত হওয়া ইত্যাদি বদ-আমল বর্জন করে নিজেকে শোধরানো মানেই ঈদের মাহাত্ম্য বজায় রাখা। বর্তমান সময়ের চিত্র এমন যে, মুসলমান সওয়াবের কাজে মনপ্রাণ বিলিয়ে দিচ্ছে, একইসাথে গুনাহের ভিতরও চব্বিশ ঘন্টা ডুবে থাকছে। আশ্চর্য, গুনাহের কাজকে আদব আর সওয়াবের কাজকে সাজা মনে করে। এরাই মুনাফিকি করছে, এদের ভেতরেই রয়েছে ইবলিশের চক্রান্ত।

ঈদের আনন্দ ভাগাভাগিতেই প্রকৃত সুখ। ধনীরা গরিব-দুঃখিকে দাওয়াত করে, নতুন পোশাক দিয়ে, আত্মীয় স্বজন গৃহকর্মীদের টাকা-পয়সা দিয়ে সাহায্য-সহযোগিতা করবে। মুমিনের আনন্দ এখানেই। শরীয়তের হুকুম মেনে চলার যে পুরস্কার তাতো আখিরাতে পরম প্রশান্তির স্থান — জান্নাত লাভ। জান্নাতের নাজ-নিয়ামত কল্পনাতীত। আর জান্নাত লাভের আমলও সহজ নয়। কিন্তু আল্লাহ রব্বুল আলামীন নির্দেশিত পথে রাসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রবর্তিত ও অনুসৃত রাস্তায় সাহাবায়ে কিরামের ব্যবহারিক জীবন থেকে উম্মতকে সীরাতল মুস্তাকিমের গন্তব্য খুঁজে নিতে হবে। এজন্য ইলমে দ্বীন শিক্ষা যতটা জরুরি তার থেকে বেশি জরুরি হক্কানি ওলামায়ে কিরামের নেক সোহবত ও নেসবতধন্য হওয়া। কারণ ইমাম বা উস্তায আলেমে রব্বানী বা আহলে হক না হলে শিক্ষাও গলদপূর্ণ থেকে যাবে আর ইবাদতও বিফল যাবে। সমাজে মানুষের ব্যস্ততা থাকবেই তবু দ্বীনি শিক্ষা ও পার্থিব শিক্ষার সমন্বয়ে সঠিক শিক্ষা প্রদান এখন সময়ে দাবি। বাল্যকাল থেকেই শিশুকে সঠিক পথে চালানোর জন্য পথ ও পাথেয় পিতামাতাকেই দেখাতে হবে। তাঁরাই প্রথম পথপ্রদর্শক। ছেলেবেলায় সুশিক্ষা না পেলে সন্তান কখনোই শান্তির পথে পরিচালিত হবে না। বিশৃঙ্খল জীবনে অভ্যস্ত হলে সঠিক পথে ফিরে আসা কঠিন। ঈদ কোনো ব্যক্তিক আনন্দ ফূর্তি নয় ঈদ গুনাহ মাফের মাহেন্দ্রক্ষণ, ঈদ প্রকৃত মুসলমানদারিত্বের পয়গাম নিয়ে আসা এক অপার্থিব সুখ।

৪.

মহানবী হযরত মুহাম্মদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর যমানায় তিনি ও সাহাবায়ে কিরাম ঈদানন্দ উপভোগ করতেন। একে অন্যের কুশল জানতেন।

নবীজি (স.) দিনে বের হয়ে দুই রাকাত ঈদের সালাত আদায় করেছেন। (সহিহ বুখারি )

ঈদের দিন গোসল করা সুন্নাত। তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে জেগে উঠে গোসল করে পরিস্কার-পরিচ্ছন হয়ে ঈদগাহে যেতেন প্রিয় নবীজী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।

ইবনে উমর রা. থেকে বিশুদ্ধ সূত্রে বর্ণিত যে, ‘তিনি ঈদুল ফিতরের দিনে ঈদগাহে যাওয়ার পূর্বে গোসল করতেন।’ (সুনান বায়হাকী )


শেরে খোদা হযরত আলী রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত : ‘সুন্নাত হলো ঈদগাহে পায়ে হেঁটে যাওয়া।’ (সুনানে আত-তিরমিযী)

হাদিসে ইরশাদ হয়েছে , ‘নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঈদের দিনে পথ বিপরীত করতেন।’ (সহিহ বুখারি)

ঈদুল ফিতরের দিনে ঈদের সালাত আদায়ের পূর্বে মিষ্টি জাতীয় খাবার গ্রহণ করা উত্তম।

অন্যত্র আবদুল্লাহ বিন সায়েব রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হয়েছে, ‘আমি নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে ঈদ উদযাপন করলাম। যখন তিনি ঈদের সালাত শেষ করলেন, বললেন : আমরা এখন খুতবা দেব। যার ভালো লাগে সে যেন বসে, আর যে চলে যেতে চায় সে যেতে পারে।’ (সুনানে আবু দাউদ)
ঈদের সময় বিভিন্ন আত্মীয়-স্বজনের খোঁজ-খবর নেওয়া ও তাদের বাড়িতে বেড়াতে যাওয়ার বিশেষ সুযোগ তৈরি হয়। নবীজী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঈদের সময় একবার একটি এতিম ছেলেকে ডেকে এনে বলেন, ফাতিমা তোমার বোন, হাসান-হোসাইন তোমার খেলার সাথী। তিনি মানুষকে খুব মহব্বত করতেন আর ঈদের দিন তো উম্মতকে এমন শিক্ষাই দেয়া হয়েছে। এ সম্পর্কে রাসুলুল্লাহু (স.) বলেছেন, ‘যে আখেরাতে বিশ্বাস করে, সে যেন আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখে।’ (সহিহ বুখারি)।
উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা রাদিআল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত ‘রাসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঈদের দিন আমার ঘরে আগমন করলেন, তখন আমার নিকট দুটি ছোট মেয়ে গান গাইতেছিল, বুয়াস যুদ্ধের বীরদের স্মরণে। তারা পেশাদার গায়িকা ছিল না।ইতোমধ্যে সাহাবায়ে আজম হযরত আবু বকর (রা.) ঘরে প্রবেশ করে এই বলে আমাকে ধমকাতে লাগলেন যে, নবীজির ঘরে শয়তানের বাঁশি? রাসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর কথা শুনে বললেন, ‘মেয়ে দুটিকে গাইতে দাও হে আবু বকর! প্রত্যেক জাতির ঈদ আছে, আর এটি আমাদের ঈদের দিন।’ (সহিহ বুখারি)

মহানবী হযরত মুহাম্মদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর যমানায় ঈদানন্দ ছিল ইসলামি ঐতিহ্যের উজ্জ্বল প্রতীক। আর বর্তমানে ঈদকে একটা ভিনদেশি অপসংস্কৃতির সাথে মিলিয়ে ফেলছে যেমন জাহেলিয়াতের যুগে অনেকে নওরোজ ও মেহেরজান নামক বিজাতীয় উৎসবে মেতে উঠলে নবীজী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহার উৎসব পালন করার সুসংবাদ দেন। কুরবানির ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও তাৎপর্য, নবী ইবরাহীম আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আত্মত্যাগ ও ধৈর্য  মুমিন মুসলমানের আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি লাভের উপজীব্য।

ঈদের দিনের প্রচলিত ‘ঈদ মোবারক’ শব্দ ব্যবহার সময়োপযোগী কিন্তু শরীয়তসম্মত নয়। কারণ সাহাবায়ে কিরাম ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করতেন— ❝তাকাব্বালাল্লাহু মিন্না ওয়া মিনকা❞।

সময় বদলাক, বদলে যাক পৃথিবী!  কিন্তু ইসলামের আদর্শ ও ঐতিহ্য কখনোই বিলীন হবে না বরং কুরআন-সুন্নাহর প্রচার-প্রসার ঘটবে ইউরোপ থেকে এশিয়া, দক্ষিণ মেরু থেকে উত্তর মেরু। অন্ধ অনুকরণ নয় নিজেদের ধর্মীয় উৎসবে নিজস্ব সংস্কৃতির লালন না করলে জাতি ভয়ংকর ও ধ্বংসাত্মক পরিণতির দিকে আগাবে। আর ভুল নয়! সহিহ সুন্নাত তরিকায় ঈদ উৎসবে মেতে উঠুক বিশ্ব মুসলিম উম্মাহ। ভালো থাকুক সকল আদমসন্তান।


লেখক পরিচিতি: বরিশালের কবি সুলাইমান মাহমুদ রাসেল ছড়া, কবিতা, প্রবন্ধ ও গদ্যসাহিত্য রচনায় স্বাচ্ছন্দবোধ করেন। বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় লেখা প্রকাশসহ এ পর্যন্ত প্রকাশিত হয়েছে আটটি যৌথকাব্য। মুজিব মানে বাংলাদেশ, হে পিতা, বিনীত প্রকৃতি, মিষ্টি প্রেমের কাব্য, স্বাধীনতার আত্মকথা প্রভৃতি। উচ্চশিক্ষা নিয়েছেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে; করছেন শিক্ষকতা। কবিতা ও প্রবন্ধে বিশেষ অবদান রাখায় পেয়েছেন— আবুল মনসুর আহমদ প্রবন্ধ পুরস্কার (২০২১), শ্রেষ্ঠ লেখক পুরস্কার  ঝালকাঠি জেলা (২০২০), জেলা সরকারি গণগ্রন্থাগার প্রবন্ধ পুরস্কার (৫ বার), বঙ্গবন্ধু শিশু একাডেমি প্রবন্ধ পুরস্কার (২০১১) এবং বিভিন্ন সম্মাননা ও পুরস্কার।

ওমেন্স নিউজ/ 

লাইক, কমেন্টস, শেয়ার দিয়ে আমাদের সাথে থাকুন