‌ইউসুফ শরীফের গল্প ‘ হায় বালিকা!’

‌ইউসুফ শরীফ

হায় বালিকা!

তুমি যদি কিছু মনে না কর-
গিশেলা থেমে তাকায় আমার দিকে। আমি মুখ তুলি- চোখ পড়ে তার চোখে। এই এক সপ্তাহ গিশেলা আমাকে শুধু তথ্য জানিয়েছে। ভাল শ্রোতা পেলে অভিজ্ঞ গাইডের চোখে তৃপ্তির যে আবেশ নামে- তার সাথেই আমি পরিচিত হয়েছি। এ মুহূর্তে গিশেলার চোখ আলোর যে জাল বুনছে তা দেখতে অভ্যস্ত নই আমি।
গিশেলা দৃষ্টি না নামিয়েই কথা শেষ করল, তোমার চোখ এমন এক আগ্রাসী মাদকতা রহিয়াছে- যাহার বিদ্যুৎস্পর্শ উপভোগ করিয়াছি আমি।
কফির কাপ ধরা হাতের ভরশুদ্ধ টেবিল থরোথরো হয়ে ওঠে তার চাপা অথচ প্রলম্বিত হাসিতে। মন্তব্যটি যেন খুবই স্বাভাবিক এবং মজার- গিশেলা সেই মজা তারিয়ে তারিয়ে ভোগ করবে বলে পায়ের ওপর পা তুলে আয়েশ করে বসল।
আচমকা এমন একটা মন্তব্য। গিশেলার সাথে দিনে কম করেও ষোলঘণ্টা কাটে আমার- এরকম বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হয়নি এর আগে। অপমানিত বোধ করব না হেসে উড়িয়ে দেব- তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারছি না।
সামনের আয়নায় এক যুগ আগের আমি- আমার মুখের রেখা ভেঙেচুরে চিকন ধারায় রক্ত ঝরছে- চোখ চুঁইয়ে বেরুচ্ছে ফোঁটায় ফোঁটায় হলুদ লাভা : বীভৎস গলিত এক আমি। দৃষ্টি সরাতে ভয় পাচ্ছি।
বাব্বাহ! ক্লাসে সবার সামনে অমন করে তাকাও যেন গিলে নিয়ে হাড়গোড় পর্যন্ত চিবিয়ে ছ্যাবড়া করে ফেলবে।
দূর পাগলী! আমিতো তোমার সাগর চোখজোড়ায় দৃষ্টি রাখি মাত্র। এভাবে কি চিবানো যায়!
চাপা হাসির গমক ঃ এইমাত্র ফোটে ওঠে সাথে সাথে ছড়িয়ে পড়া একমুঠি গোলাপ পাপড়ি। শেলীর হাসি এক কথায় প্রকাশিতব্য নয়। ছ’মাস পর সেই শেলীর উদ্ধৃতি হেলেন ভাবির রসঘন কণ্ঠে ঃ ভাবি আপনার দেবর না, ভীতুর একশেষ। বললাম- চল একদিন লং ড্রাইভে আরিচার দিকে যাই। পাঙ্গাস মাছের ঝাল তরকারি দিয়ে ভাত খেয়ে হোটেলে একটা ঘরে দুপুরে খুব করে গড়াব। শুনে চুপসে যাওয়া বেলুনের মত নেতিয়ে পড়ল আপনার দেবর। দেখতে দশাসই হলে কি হবে- আসলে মেন্দা-
এক পশলা ঘন কুয়াশায় ঢেকে দিল সামনের আয়নাটা। তারপর স্লোমোশনে কুয়াশার মেঘ উড়ে গিয়ে স্কার্ট সরে যাওয়ায় গিশেলার উরুর যে অংশটুকু নিরাবরণ তা প্রতিবিম্বিত হল পেছনের আয়না থেকে আমার সামনের আয়নায়। চাপাকলির মত দীর্ঘছন্দ অবয়ব গিশেলার। দৃশ্যটির আড়ালে যাওয়া যায়- এমন সরে বসতে গিয়ে নড়ে উঠে হাতেধরা কফিমগ। খানিকটা কফি ছলকে গিয়ে পড়ে গিলেশার উন্মুক্ত সোনালী লাবণ্যে।
দৃষ্টিতে মজার ভাবটি বজায় রেখে গিশেলা তাকায় আমার দিকে। তারপর দীর্ঘ সুগোল আঙুলে টিস্যু পেপার তুলে নেয় টেবিল থেকে- ধীরেসুস্থে উজ্জ্বল মসৃনতায় চেপেচেপে মুছে ঈষৎধূসর ফেনার তরঙ্গ।
আমি বললাম, দুঃখিত মিস গিশেলা- আমি সত্যিই দুঃখিত।
গিশেলা আমার দিকে চোখ তুলে হাসি ফুটিয়ে বলল, ওহ্ না- না তোমার লজ্জিত হওয়ার কিছু নাই। আমি উহাা অস্বাভাবিক কিছু মনে করিব কেন!
গিশেলা শেষবার টিস্যু পেপার বুলিয়ে আবারও তাকাল। এবার তার দৃষ্টিতে কৌতুক নাকি অন্য কিছু- বুঝতে পারছি না। অস্বস্তিতে সংকুচিত হয়ে ওঠলেও দৃষ্টি ফেরাতে পারলাম না। গিশেলার তাকাবার ভঙ্গিটা এমন- অমনোযোগী হওয়ার উপায় থাকে না। তার দৃষ্টি শুধু সম্মোহিত করে না- ঘন ঘন রং বদলায়- রং আবার ধ্বনিময়। দৃষ্টির এ নিঃশেষ ধ্বনিময়তা বর্তমান-অতীত-ভবিষ্যতে অবলীলায় সঞ্চরণশীল হয়ে ওঠে।
গিশেলাই দৃষ্টি সরিয়ে নিল। ভাবল কিছু একটা- তারপর ক্লান্ত অসহায় ভঙ্গিতে দু’হাত ঝুলিয়ে গা এলিয়ে দিল চেয়ারে- গিশেলার এক অস্বাভাবিক ভঙ্গি। গত এক সপ্তাহে কখনও এমন দেখিনি। গিশেলার প্রতিটি মুহূর্ত প্রাণবন্ত-স্বতঃস্ফূর্ত-সক্রিয়। কফির কাপে মনোযোগী হতে চেয়েও পারলাম না। সত্যিই কী গিশেলার প্রতি আমার দৃষ্টিপাতে মাদকতার প্রকাশ ঘটেছে? আর গিশেলার দৃষ্টিতে তা আগ্রাসী কামনা- যা ভব্যতার সীমা ডিঙিয়েছে। আমিতো তার চোখে অচেনা দৃষ্টির মমার্থ উদ্ধারের কৌতূহলকেই মুহূর্তের জন্য প্রশ্রয় দিয়েছি মাত্র।
গিশেলা বাইরের দিকে তাকিয়ে আচমকা আমার হাত খামছে ধরে বলে ওঠল, মি. রহমান- চল এখন আমরা উঠি।
বিল মিটিয়ে দিয়ে বাইরে বেরিয়ে এল গিশেলা। ক্যাথিড্রালের সামনে বাঁধানো বিশাল চত্বরে উঠার আগেই দেখলাম- সূর্যের আলো চিকচিক করছে ক্যাথিড্যালের সুউচ্চ শীর্ষদেশে। রাইন নদীর তীরে ইতিহাসখ্যাত কলোন ক্যাথিড্রাল- এর সোনালি রং বহিরঙ্গে এই হঠাৎ বিচ্ছুরিত সূর্যের বিরল চমক বিশেষ চমকিত করতে পারল না আমাকে। গিশেলা বাইরে বেরিয়েই স্বচ্ছন্দ্য হয়ে ওঠল বরাবরের মত। সেকি সূর্যালোকের জন্য!
গিশেলা আমার একটা হাত চেপে ধরে বলে উঠল, ওহ্ মি. রহমান- তুমি সত্যিই ভাগ্যবান। গত দুই সপ্তাহ কলোনের আকাশে সূর্যের আলো দেখা যায় নাই। তুমি ভাবিতেই পারিতেছ না- বিকেলের এই সোনাঝরা রৌদ্রলোক ক্যাথিড্রালের অভ্যন্তরকে কী অপরূপ আলোর তরঙ্গে ভরিয়া  দিবে। এই বিরল মুহূর্তে কলোন ক্যাথিড্রাল যাহারা দেখে নাই তাহারা দেখিয়াছে নিষ্প্রাণ কিছু। গত দুই সপ্তাহে কত নিষ্ফল দর্শনার্থী যে মন খারাপ করিয়া ফিরিয়া গিয়াছে!
এ মুহূর্তটির জন্য গিশেলা দেড়টি ঘণ্টা অপেক্ষা করেছে আমাকে নিয়ে সামনের ওই কফি হাউসে। বন-কলোনে আমার এসকর্ট গিশেলা। ইন্টারনেশনেসের অফিসে আমার সাথে গিশেলার পরিচয় করিয়ে দেন একজন কর্মকর্তা। শেষদিকে তিনি বলেন- মিস গিশেলা নিছক একজন এসকর্ট বা গাইড নহেন- ইতিহাসের একজন গবেষকও। রাইন নদীর তীরবর্তী জনপদ নিয়া তাহার গবেষণাপত্রও রহিয়াছে। জানিলাম- তুমিও ইতিহাসের ছাত্র ছিলে- তোমার জন্য উপভোগ্য হইবে গিশেলার সাহচর্য।
কথাটা মিথ্যে নয়- গত এক সপ্তাহে গিশেলা রাইন নদীতীরস্থ জনপদ শুধু নয়- প্রায় গোটা জামার্নির ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো প্রাঞ্জল করে তুলে ধরেছে আমার কাছে। রাইনল্যান্ড নিয়ে তার আবেগ কখনও নিছক আবেগ মনে হয়নি। আবেগকে যুক্তির কড়ি-বরগায় ঢেলে লাবণ্যময় অবয়ব নির্মাণে সিদ্ধহস্ত গিশেলা। বন-কলোনের প্রাচীন নিদর্শনাদি-মিউজিয়ামগুলোতে সংরক্ষিত প্রত্মসম্পদ রীতিমত জীবন্ত করে তুলেছে আমার কাছে। কো-অপারেটিভ ভার্সাস কো-অপারেশন শীর্ষক যে প্রোগ্রামে অংশ নিচ্ছি- তা আমার জন্য এক নতুন অভিজ্ঞতা। স্বল্পোন্নত দেশগুলোর জন্য সমবায় যে সহযোগিতার চেয়ে উন্নয়নে অনেক বেশি কার্যকর- এটা আগে এমন করে কখনও ভাবিনি। বাংলাদেশে এটা ভাবা হয় না- হয় না বলেই দাতাগোষ্ঠির সাহায্য লাভের তদবিরে সকল শক্তি-সামর্থ নিয়োগ করা হয়। আর এ জন্যই গজিয়ে উঠেছে হাজার হাজার এনজিও- যাদের অধিকাংশই সহযোগিতার নামে লাভজনক ব্যবসায় লিপ্ত। অথচ, সমবায়ের প্রতি যথাযথ গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে না। কৃষি ও কৃষি সংশ্লিষ্ট খাতে অপরিমেয় সম্ভবনা থাকা সত্ত্বেও সমবায় গড়ে উঠছে না। আরেকটি নতুন অভিজ্ঞতা- জার্মান জাতির ঐতিহ্যপ্রীতি- যা তাদের উন্নয়নের ভিত্তি মজবুত করেছে। কনফারেন্স-ওয়ার্কশপের বাইরে জার্মান ঐতিহ্য চেতনার মূল সূত্রটির সাথে আমায় পরিচয় করিয়ে দিয়েছে গিশেলা।
গিশেলা কিন্তু থেমে নেই- বলছে- ডিসেম্বরে সূর্যালোক শুধু কলোন কেন- গোটা ইউরোপেই দুর্লভ। তবু লোকজন অপেক্ষা করে এই কফি হাউসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা- যদি কুয়াশার মেঘ ফেঁড়ে সূর্য দেখা দেয়- আচমকা তার আলোয় ঝলমালিয়ে উঠে কলোন ক্যালিড্রাল। কেউ কেউ এ ফাঁকে বিশাল চত্বরে দাঁড়িয়ে ছবি তুলে স্মৃতিবন্দি করে কলোন ক্যাথিড্রালকে- কেউবা আবার টুকটাক শপিং সারে। তবে দৃষ্টি সবার আকাশে- সূর্যের আলো দেখা দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে সবাই হুড়মুড় করে ঢোকে ক্যাথিড্রালে।
গিশেলা আমার হাত চেপে ধরে ওভাবেই ঢোকাল কলোন ক্যাথিড্রালে। ভেতরে পা রেখেই নিজেকে আবিষ্কার করলাম থই থই নীলাভ আলোর তরঙ্গের অন্তরাত্মায়। আমার অবস্থাটা বোঝার জন্যই গিশেলা তার বিশাল আয়ত চোখ-জোড়া তুলে তাকাল। তার চোখের ঘন নীল সেই নীলাভ তরঙ্গে মিশে একাকার। দর্শনার্থীদের ভিড় তলিয়ে গেল অবাক করা নীলে। লিনার্দো দা ভিঞ্চির মোনালিসার পেছনে ঈষৎনীলাভ সর্পিল পথ- লাস্ট সাপার-এর গবাক্ষের ওপারে নীলের ওড়াউড়ি- এসব যখন চেতনায় প্রবাহিত হচ্ছে- তখন হাতের নাগালে মোনালিসার সেই রহস্যময় হাসিতে অচঞ্চল গিশেলার অবয়ব আবার নীল আলোর তরঙ্গে শিল্পীর তুলির আঁচড়ের মত কোথাও হালকা-কোথাও গভীর- কোথাও লতানো। নীলের এত রূপ- এত ভাঙচুর! গিশেলা খুব বাড়িয়ে কিছু বলেনি।
গিশেলা ডান হাতে আমার কোমর জড়িয়ে কাঁধে মাথা রেখে অনুচ্চ চাপাকণ্ঠে কিছু বলছে। সেকি জার্মান বলছে- না ইংরেজি- নাকি এমন এক ভাষা- যা না শুনেও বোঝা যায়- না বুঝেও পাঠ করা যায়! থরে থরে বিন্যস্ত লতানো এই নীলিমার এমন কিছু অষ্পষ্ট ধ্বনি সব কিছুকে আবৃত করে আমার চেতনায় বয়ে যাচ্ছে- যা অতীতের-বর্তমানের- না ভবিষ্যতের কিছু ঠাহর করতে পারছি না-
-তুমি কিছু শুনছ না- তুমি আমাকে অপমান করছ- একটা অসভ্য তুমি- ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানে টিনশেড ক্ষুদে বাংলোয় তুমুল বৃষ্টি ছাপিয়ে শেলীর কণ্ঠ ছুরির ফলা হয়ে ওঠে। বাইরে বৃষ্টির পানি নীরব রক্তপাতে ঘোলাটে হয়ে গড়াচ্ছে।
কি করে বোঝাই- অল্পক্ষণ আগে তোমার যে উচ্চ চাপা কণ্ঠের অস্পষ্ট লহর আমার চেতনায় সেই ঝর্ণার কলকল ধ্বনি জীবন্ত করে তুলেছে- যে ঝর্ণাধ্বনির কাছে পৃথিবীর তাবৎ ধ্বনি মৌন-মুক। তুমি কি বলছ, তার চেয়ে অনেক বড় পাওয়া এ মুহূর্তের অনুভূতি দিয়ে চিরায়ত সেই ধ্বনিময়তার আস্বাদন।
-তুমি একটিবার আমার হাতটি স্পর্শ করছ না। তুমি কি মনে কর আমি এতই হেলাফেলা করার মত? যে ভালবাসতে জানে না- সে আবার পুরুষ নাকি!
হায় শেলী! আমিতো এইমাত্র তোমার হৃদয় স্পর্শ করেছি- দীঘ নি-িদ্র চুম্বন করেছি- গভীরতর আলিঙ্গনে একাত্ম হয়েছি- আবেশিত হয়েছি- আপ্লুত হয়েছি- শিহরিত হয়েছি। হায় রমণী! তুমি কী নিবিড় স্পর্শ অনুভব করতে পারনি? যে নারী এ হৃদয়-স্পর্শের অনুভূতিহীন- সেকি নারী না পাত্র বিশেষ? হে নারী তুমি হয় মর্যাদাবোধহীন নারী নামে পাত্রমাত্র- যা পুরুষের অপ্রেম বীর্য ধারণ করে ভালবাসার চেতনাবিহীন সন্তান জন্মায়- না হয় নর-নারীর রহস্যমগ্ন প্রকৃত সম্পর্ক-বোধ থেকে দূরবর্তী বালিকামাত্র।
নীলাভ তরঙ্গে লীন এ নীলিমায় ঘননীল দ্যুতিময় এই চোখজোড়া নিছক বালিকা মাত্রের নয়- নয় অপ্রেম বীর্য ধারণের পাত্র বিশেষেরও। এই চোখে আমার চোখ এখন আমূল প্রোথিত। ক্রমব্যপ্ত নীল তরঙ্গমালা থমকে গিয়ে নিবিড় আড়াল তৈরি করল। মুহূর্তে আমার বাহুলগ্ন পূর্ণাবয়ব এক নারী আমার হৃদয়ের গভীর উষ্ণ পরশে মোমের মত গলেগলে আমাকেই ঢেকে ফেলে। নীল তরঙ্গের দোলায় দুলতে দুলতে আচমকা স্থির হই! চারপাশে অসংখ্য যুগল যে অবস্থায় ছিল- সে অবস্থাতেই স্থির হয়ে গেল। কোমরে হাত-কাঁধে মাথা-এছাড়া একত্মতার আর কোন ভঙ্গি নেই এখানে। দর্শনার্থীদের জোড়ায় জোড়ায় স্থির করে দিয়ে নীলাভ সেই আলো কি হাওয়ায় মিলিয়ে গেল? ছাদের কাছাকাছি কাচের দীর্ঘছন্দ শার্সিগুলোর দিকে তাকালাম- সেখানে ঘঁষা কাচের মত বাদামি রঙ অন্ধকার উঁকিঝুঁকি মারছে। দর্শনার্থীরা তাদের স্থিরচিত্রকে স্মৃতিতে সমর্পিত করে ক্যাথিড্রাল থেকে বেরিয়ে গেছে। বিশাল ফাঁকা ক্যাথিড্রালের মাঝখানে আমি আর পূর্ণাবয়ব এক রমণী গিশেলা।
গিশেলার হাত ধরে বাইরে বেরিয়ে মনেই হল না- এই একটু আগে কলোনের আকাশে সূর্য ছিল- সেই সূর্যের আবার আলোও ছিল। শীতল বাতাস থেকে রক্ষা পাবার জন্য ওভারকোটের কলার পর্যন্ত খাড়া করে দিতে হল।
গিশেলা বলল, মি. রহমান এইক্ষণে ইচ্ছা করিলে টুকটাক কেনাকাটা করিয়া ফেলিতে পার তুমি। অবশ্য ইহার পূর্বে একটা ছোট ড্রিংক গ্রহণ করা যায়- কি বল? তারপর ডিনার সারিয়া সোজা হোটেলে। কাল ভোর ছ’টা বাজিয়া তিরিশে ফ্লাইট তোমার- স্মরণে রহিয়াছে তো!
আমি ভাবছিলাম, গিশেলার প্রতি বারবার তাকানোটা কি সে ভালভাবে নিতে পারছে না? কিন্তু নিছক তাকানোতেই মনোক্ষুণœ হবার কথাতো গিশেলার নয়। তাহলে কি গিশেলা বিশেষ কিছু বলতে চেয়েছে কিংবা বলছে? ক্যাথিড্রালের ভেতর কাঁধে মাথা রেখে কোমর জড়িয়ে পূর্ণাবয়ব রমণী গিশেলা কি তার দেহভাষার কোন বার্তা আমাকে অবগত করাতে চেয়েছে? নাকি এ হল এক নারী আর এক নরের চলবার-হাঁটবার-দেখবার এখানকার ভঙ্গি- বিশেষ করে এই তীব্র শৈত্যপ্রবাহে? গত এক সপ্তাহে তো দেখছি এই একই ভঙ্গি নর-নারীর। এই ভঙ্গি নিছক শীত তাড়াবার হয়ত কিংবা নয়। তবে আজ ক্যাথিড্রালের ভেতর ঢোকার আগে একবারও এই ভঙ্গিটি আমার ওপর চাপিয়ে দেয়নি গিশেলা। এইমাত্র কেনাকাটা-ডিনার-ফ্লাইট যা যা বলল তাতে কোথায় অল্প আগের পূর্ণাবয়ব রমণী গিশেলা? এই সবইতো ইন্টারনেশনেসের স্টাফ মিস গিশেলার কথা। গিশেলা কি আমাকে একটু বাজিয়ে দেখছে? দেখুক- যত দেখতে চায়। এতো আর-
গিশেলা আমাকে নিশ্চুপ হাঁটতে দেখে বলল, কি ব্যাপার মি. রহমান, তোমার কোন অসুবিধা হইতেছে?
বলতে বলতে আমার বাম হাতটা তুলে নিয়ে চাপ দিল। দাস্তানার ওপর দিয়েও এক ধরনের মমত্ব অনুভব করলাম।
আমি বললাম, না কিছু না- আমার কোন অসুবিধাই হইতেছে না।
গিশেলা বলল, এই যে ড্রিংকের কথা বলিলাম- কেনাকাটার কথা বলিলাম- তোমার কোন রকম উৎসাহ দেখিতেছি না।
গিশেলা একটু থেমে চিন্তা করল। তারপর বলল, আমরা একটা কাজ করিতে পারি- চল আমার এপার্টমেন্ট হইতে ঘুরিয়া আসি। তুমি অমত না করিলে ডিনারটাও তখন সারিয়া  ফেলিতে পারি। ব্যাড গোডেসবার্গ ক্যাসেলের রেস্তোরাঁয় টেবিল বুক করা রহিয়াছে- ওইখানে টেলিফোন করিয়া দিব। বুঝিতেই পারিতেছ, ওইখানকার খাবার আর এই গিশেলার খাবার এক রকম হইবে না। তবে জার্মানরা বাড়িতে কি রকম করিয়া থাকে- তাহাদের সাধারণ খাওয়া-দাওয়া কেমন- এই সর্ম্পকে সংক্ষিপ্ত হইলেও একটা ধারণা তোমার হইবে।
গিশেলা তার এপার্টমেন্টে নিয়ে যেতে চাইছে। তবে এটা স্পষ্ট তার চোখে কোন অচেনা আলো নেই- নেই কণ্ঠস্বরে কোন অজানা ভাষা। কোন ইঙ্গিতময়তা নেই বলবার ভঙ্গিতে। নাকি আমারই এরকম মনে হচ্ছে!
বললাম, ওহ্ নিশ্চয়ই, আমার জন্য ইহা হইবে আনন্দময় এক অভিজ্ঞতা।
গিশেলা গাড়িতে উঠে বলল, মি. রহমান আমার এপার্টমেন্ট কিন্তু বনে। অসুবিধা নাই পঁচিশ মিনিটের মাথায় আমরা পৌঁছাইয়া যাইব।
কলোনের সীমা ছাড়িয়ে শহর যেখানে একটু হালকা ওইখানটায় পৌঁছে দেখলাম ধূসর মরা আলো কুয়াশার ওড়াওড়ির সাথে মিশে ঘন নীল হয়ে ওঠছে। অন্ধকারের রঙ কালো- নাকি ঘন নীল- এ প্রশ্নের তোলপাড় ধ্বনি শুনতে শুনতে হাওয়ার বেগে বিএমডব্লিউ গাড়িটি আমাদের নিয়ে এল বনে। ইউরোপে বনের পরিচিতি সবুজ নগরী হিসেবে। গাছপবৃক্ষের বুক চিরে আলোর রেখার মত লীলায়িত বনের সড়ক- সামনে দূর দিগন্তরেখা হালকা সবুজ তরঙ্গ-উচ্ছল। হাজার হাজার গাড়ি চলছে নিঃশব্দে। চারিদিকে সুনসান নীরবতা- কথা বললে দুলে উঠবে সবুজ তরঙ্গ।
সবুজ দুলিয়ে দিয়ে জার্মান ভাষার ড্রাইভারকে কিছু একটা বলে গিশেলা আমাকে বলল, মি. রহমান আমরা পৌঁছাইয়া গিয়াছি।
গাড়ি বামে বাঁক নিয়ে ঢুকে গেল গাছপালার মাঝখানে সরু রাস্তায়। গাছপালার প্রলম্বিত ঝোপ আসলে দেয়ালের কাজ কাজ করছে। তার ভেতর বিশাল লন এবং লন পেরিয়ে এপার্টমেন্ট হাউস উঁচু টিলার ওপর। বেশ ক’টি ভবন পরপর বন নগরীর সবুজ গাছপালার ঢেউ ভেদ করে দাাঁড়িয়ে আছে। চারপাশে বিস্তীর্ণ খালি জায়গা ছাড়িয়ে গাছপালার বেষ্টনী আর আলোর ¯িœগ্ধ প্রবাহ দেখে চোখ জুড়িয়ে গেল। একটা স্বপ্নিল ভাললাগা নিয়ে গাড়ি থেকে নামলাম।
গিশেলা বলল, কী মি. রহমান তুমি তো সবুজের দেশের মানুষ- কেমন লাগিতেছে তোমার?
বললাম, আমরা সবুজ-শ্যামলিমাকে ব্যবহার করিতে পারছি না। তোমরা সবুজকে চমৎকারভাবে ব্যবহার করিতেছ। সবুজ প্রকৃতিকে নির্বিচারে ব্যবহার করিতেছ না বরং সবুজের প্রকৃতিক বৈশিষ্ট অক্ষুণœ রাখিয়া তার পরতে পরতে সহাবস্থান করিতেছ তোমরা- বনবাসীরা।
গিশেলা বলল, ঠিক- একদম ঠিক কথাটি বলিয়াছ তুমি। বন নগরীর একজন ক্ষুদ্র নাগরিক হিসাবে তোমাকে অসংখ্য ধন্যবাদ এই সুন্দর মূল্যায়নের জন্য।
লিফটে দশ তলায় উঠে গিশেলা দরাজায় কী হোলে চাবি ঢুকিয়ে বলল, এই এপার্টমেন্ট আমার বাবা দিয়াছেন। মজার ব্যাপার হইল- বাবাকে আমি কখনও দেখি নাই। কী- তুমি বেশ অবাক হইতেছ! একদম সহজ বিষয়- আমার জন্মের পর বাবা-মা’র সেপারেশন হইয়া যায়।
দরজায় পাল্লা খোলার সাথে সাথে ভেতরে একটা হুড়মুড় শব্দ হল। আমি বিস্মিত হলাম- ভেতরে কি চোর ঢুকেছে। বাতি জ¦ালিয়ে চোররা কাজ-কারবার সারছিল? গিশেলার চোখে বিস্ময় নেই- এক প্রকার বিরক্তির ছায়াপাত লক্ষ্য করলাম। গিশেলা ঠাঁয় দাঁয়িয়ে দম নিল। স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করছে- বুঝলাম।
তারপর হাতের ব্যাগটা দরজার পাশে কেবিনেটের উপর রেখে বলল, মি. রহমান সরি! দয়াকনে তুমি আসন গ্রহণ কর -আমি দেখিতেছি-
গিশেলা স্বচ্ছন্দ্য ভঙ্গিতে হেঁটে গেল বেডরুমের দিকে। বেডরুমের দরজায় ভারী পর্দাটা দুলছে দ্রুততালে- গুটিয়ে রাখা পর্দা ছেড়ে দেয়ার পর যেমন দোলে। আমি স্বস্তি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলাম সুপরিসর ড্রয়িং কাম ডাইনিংয়ে। রিয়ার কর্নারে কিচেন। সব খোলামেলা- কোথাও বেশি আড়াল নেই। পাশের জানালা দিয়ে দেখা যাচ্ছে পাহাড়ের ওপর আলোকিত গোডের্সবাগ ক্যাসেলের ধসেপড়া শীর্ষদেশ। মনে করা হয়- বননগরীর প্রতীক। আলো এবং ছায়া এমনভাবে পড়েছে তার ওপর এখান থেকে মনে হচ্ছে ধসে পড়ে উঁবু হয়ে আছে ক্যাসলের শীষ চূড়াটি!
পেছনে শব্দ শুনে ফিরে তাকিয়ে দেখি, প্রায় বিবস্ত্র একটি মেয়ে এক হাতে কিছু দলামোচড়া জামা-কাপড় কোনরকমে বুকে আগলে আরেক হাতে হাইহিল ঝুলিয়ে দৌঁড়াচ্ছে দরজার দিকে। দরজায় দড়াম শব্দের সাথে মিশে গেল জার্মান ভাষায় কথা কাটাকাটির তুমুল শব্দ। নারী কণ্ঠটি গিশেলার অনুমান করতে পারছি। অনুমান- কারণ গিশেলাকে কখনও জার্মান ভাষায় কথা বলতে শুনিনি তা নয়- তবে তখন তার কণ্ঠস্বরে উচ্চারণ ভঙ্গিজনিত কি রকম পরিবর্তন আসে তা মনোযোগ দিয়ে খেয়াল করিনি।
আমি কি গিশেলাকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলেছি? এখন মনে হচ্ছে- না আসাটাই বোধহয় ভাল ছিল। গিশেলা যত সহজভাবে প্রস্তাবটা দিল- আমিও ততটা সহজভাবেই রাজি হয়ে গেলাম। সব সময় যে সহজ কাজটি করতে নেই- এ নীতি বাক্যটি অবহেলা করার পরিণতি কি- কে জানে। দাঁড়িয়ে থাকব- বসব- চলে যাব- অপেক্ষা করব গিশেলার জন্য? এসব প্রশ্ন আমাকে একটি শূন্য ফাঁকা জায়গায় দাঁড় করিয়ে দিল। আমি স্ট্যাচুর মতো অপলক চোখে দেখলাম- কোট কাঁধে ঝুলিয়ে আলুথালু এক পুরুষ সেই মেয়েটির পথ অনুসরণ করল। সে দরজার কাছে পৌঁছে ফিরে তাকাল বেডরুমের দিকে আর তখনই ওইদিন থেকে একটা সুটকেস উড়ে এল শ্লো মোশনে। সে দু’হাত বাড়িয়ে ধরে না ফেললে ঠিক তার মুখে আঘাত করত স্যুটকেসটা।
এবার দরজা বন্ধের দড়াম শব্দটা অনেকক্ষণ অনুরণিত হল। অনুরণন এক সময় উত্তেজিত শ^াস-প্রশ^াসের শব্দে রূপান্তরিত হল। গিশেলা বেডরুম থেকে বেরিয়ে এখানটায় পৌঁছতে একটু বেশি সময় নিল। নিজেকে স্বাভাবিক করে তোলার জন্য- হাসল গিশেলা- হাসতে হবে সে জন্য হাসা।
বলল, অসহ্য! দিলাম বের করে- যাক কোন নরকে যাবে-
কিছু বলা দরকার ভেবেই হালকাভাবে জিজ্ঞেস করলাম, কে?
গিশেলা মাথা নাড়ল, না না- মি. রহমান- তুমি হয়ত ভাবিয়াছ আমার স্বামী না- কখনই না- ও লম্পট স্বামী হইবে- ইহা হইতেই পারে না-
একটু হেসে জানালার দিকে তাকিয়ে বলল, এক সাথে থাকিতাম আমরা- এই এক সাথে থাকা আর কি-
কথা শেষ না করে গিশেলা আচমকা দু’হাতে মুখ ঢেকে ফুঁপিয়ে ওঠল, আমি- আমি একটা বালিকা মাত্র- সত্যই এক সময় আমি ভাবিয়াছিলাম- আমরা বিবাহ করিব- কি ভয়ংকর বালখিল্যতা-
আমি চুপ করে থাকলাম- ওকে সামলে নেয়ার জন্য একটু সময় দেয়া দরকার।
গিশেলা টিস্যু পেপার চেপে চেপে তার দুঃখ ও অপমান মুছে ফেলে হেসে উঠল, দুঃখিত- দুঃখিত মি. রহমান আমি গভীর দুঃখ প্রকাশ করিতেছি। দয়া করিয়া তুমি মনে কর- এই সময়টুকু নাই- এই রকম কোন সময় ছিল না- দয়া করিয়া ইহাই ভাবিবে-
আমি বললাম, কেন তুমি অতটা বিব্রত হইতেছ? যাহা ঘটিয়াছে ইহা কোন অস্বাভাবিক বিষয় নয়- আমি সহজভাবেই নিয়াছি এবং তোমার কথা মত ভুলিয়া গিয়াছি-
গিশেলা হেসে ওঠল, বাহ্ এইটাই ভাল বালকের মত কথা। চল- বাইরে কোথাও খাবার সারিয়া হোটেলে পৌঁছাইয়া দিই তোমাকে-
ভাল বালকের মত গিশেলার পেছন পেছন নেমে এলাম কারপার্কে। গাড়িতে উঠতে উঠতে আচমকা একটা দীর্ঘশ^াস বেরিয়ে এল। মনে মনে বললাম, হলিউডি ছায়াছবিতে এরকম দৃশ্য মেলাই দেখেছি। কিন্তু হায় বালিকা! তোমাকে অন্যরকম মনে হয়েছিল, মনে হয়েছিল এক পরিপূর্ণ নারী- বালিকা মাত্র নয়!

লেখক পরিচিতি : ইউসুফ শরীফ-এর জন্ম- ২১ জানুয়ারি, ১৯৪৮ ময়মনসিংহ নগরীর ব্রহ্মপুত্র-পাড়ে শেরশাহী সড়কে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলাভাষা-সাহিত্যে মাস্টার্স [১৯৭২]। প্রায় সাড়ে চার দশক প্রথম শ্রেণীর তিনটি দৈনিক ‘আজাদ’, ‘ইত্তেফাক’ এবং ‘ইনকিলাব’-এ শীর্ষস্থানীয় পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। ডিইউজে’র একাধিক বারের সহসভাপতি এবং জাতীয় প্রেসক্লাব-এর স্থায়ী সদস্য। জার্মানিতে সাংবাদিকতা বিষয়ে উচ্চতর প্রোগ্রামে অংশ নিয়েছেন [১৯৮৮]। ‘কথাসাহিত্য কেন্দ্র’র প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি।
ইউসুফ শরীফ-এর প্রকাশিত গ্রন্থ :  আশি ও নব্বই দশকে প্রকাশিত হয়েছে ১০টি উপন্যাস, ৩টি গল্পগ্রন্থ, ১টি নির্বাচিত কলাম। এরপর প্রকাশিত হয়েছে- ‘নির্বাচিত গল্প’ [৩৯টি গল্প ২০০০],  ‘উপন্যাসসমগ্র প্রথমখন্ড’ [৯টি উপন্যাস ২০০৬], ‘উপন্যাসসমগ্র দ্বিতীয়খন্ড’ [ ৭টি উপন্যাস ২০১৮], ‘যুদ্ধদিন’ [মুক্তিযুদ্ধের ১৩টি নির্বাচিত গল্প ২০১০], ‘ধ্বনির বিস্ফোরণ’ [মুক্তিযুদ্ধের ৪টি উপন্যাস ২০১৬],‘মানুষমাছি’, ‘নীল জোছনায় বৃষ্টি’ [উপন্যাস ২০০৯], ‘চেনাঅচেনার মাঝখানের মানুষ’ [১৫টি গল্প ২০১৭], ‘উপন্যাসসমগ্র দ্বিতীয়খ-’ [৭টি উপন্যাস] এবং ‘ইউরোপের রূপকথা’, ‘তিন দেশের সেরা গল্প’ এবং ২০২২-এ প্রকাশিত হচ্ছে- ‘গল্পসমগ্র’ [৮০টি গল্প] এবং ‘উপন্যাসসমগ্র তৃতীয়খ-’ [৯টি উপন্যাস]।

ওমেন্স নিউজ/

লাইক, কমেন্টস, শেয়ার দিয়ে আমাদের সাথে থাকুন