পানির জন্য সম্ভ্রম বেঁচতে বাধ্য হচ্ছেন যেখানকার নারীরা

প্রতীকী ছবি

পানির আরেক নাম জীবন। পানি ছাড়া তো জীবনযাপন কল্পনাই করা যায়। আমাদের দেশের মতো কল খুললে বা চাপলেই পানি পাওয়া যায় না সব দেশে। তাছাড়া প্রাকৃতিক উপায়ে যেমন খাল, বিল বা পুকুরেও পর্যাপ্ত পানি মেলে না। তো সেইসব দেশে পানি জোগারের কাজটা কিন্তু নারীদের ওপরই বর্তায়। পানি সংগ্রহ করতে গিয়ে নানা ধরনের শারীরিক কষ্ট তো আছেই, উপরন্তুষ্ট সম্ভ্রমও খোয়াতে হয় অনেককে।

আফ্রিকার দেশ কেনিয়ার নারীদের এইসব কষ্টকর অভিজ্ঞতা মোকাবেলা করেই পানি সংগ্রহ করতে হয়। পানি আনতে যাবেন অথচ পুরুষ বিক্রেতাদের শারীরিক চাহিদা মেটাবন না তা তো হয় না। ফলে পানি আনতে গিয়ে যৌন হয়রানির অভিজ্ঞতা রয়েছে দেশটির অনেক নারীর। এইজন্য সেখানে ‘সেক্স ফর ওয়াটার’ বা ‘পানির বিনিময়ে যৌনতা’ কথাটি চালু রয়েছে। যদিও সাম্প্রতিক সময়ে এই পরিস্থিতি বদলানোর চেষ্টা করছেন সমাজ সচেতন লোকজন।

কেনিয়ার রাজধানী নাইরোবির সবচেয়ে বড় অস্থায়ী বসতি কিবেরা। সেখানে পানি জোগার করা একটা চ্যালেঞ্জ। সেখানকার বাসিন্দা মেরি প্রতিদিন এরকম আটটি ড্র্রাম বহন করেন। পানির জন্য মাসে তার ১৮ ডলার ব্যয় হয়, যা তার বেতনের এক চতুর্থাংশ। কিবেরার বহু মানুষ গরীব এবং পানির দাম দিতে তারা হিমশিম খায়।

এক রাতে পানি আনার সময় মেরির ওপর হামলা করেছিল এক পানি বিক্রেতা। সেখানে ছিল দুইজন পুরুষ এবং তারা তার পোশাক ছিড়ে ফেলেছিল। তার চিৎকার শুনে অন্য নারীরা ছুটে আসে। কিন্তু তার আগেই তারা তার পোশাক ছিড়ে ফেলে। বিষয়টি সেখানে খুবই স্বাভাবিক। এজন্য মেরি বলছেন- ‘রাতে যারা পানি বিক্রি করবে তারা আপনার শরীরের দিকে এগুবে। আর আপনি তা প্রত্যাখ্যান করবেন তা তো হয় না। তাহলে যে আপনি পানি পাবেন না।’

মেরি একা নন-এ ধরনের পরিস্থিতির শিকার হন সেখানকার বহু নারী। কিন্তু লজ্জা আর ভীতির কারণে তারা পুলিশের কাছে যায় না। পুলিশ জানায়, এসব ঘটনা অভিযোগ দায়ের করা অনেক কঠিন। কেননা অধিকাংশ ভুক্তভোগীরা থানায় এসব ঘটনা জানাতে চান না।

কেনিয়ায় পানির জন্য কিছু সরকারি পয়েন্ট আছে। কিন্তু সেগুলো পানির এতো বিশাল চাহিদা মেটানোর জন্য যথেষ্ট নয়। নাইরোবিতে পানির অভাব চলছে ২০০৫ সাল থেকেই। পানির চাহিদা মেটাতে কিবেরার মতো বসতিতে এগিয়ে এসেছেন বেসরকারি বিক্রেতারা। কিন্তু তাদের কাছ থেকে নগদ অর্থ বা বাকিতে দিয়ে পানি কিনতে গিয়ে নানা সমস্যায় পড়েছেন নারীরা। নিজের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে যেয়ে এক নারী বলেন- আমি বাকিতে পানি নিতাম। কিন্তু একটা সময় পানি বিক্রেতা আমাকে বললো-এত টাকা তুমি কীভাবে শোধ করবে?
উত্তরে ওই নারী বললেন-করোনা মহামারির কারণে আমি সর্বস্বান্ত হয়ে গেছি।
তখন ওই বিক্রেতা তাকে সরাসরি সেক্স করার অফার দিলেন। বললে-তাহলে তোমার শরীর দিয়ে আমার দেনা পরিশোধ করে দাও। নাইরোবিতে এটা কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়।

এইসব ভোক্তভোগী নারীদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে মানসিক পরামর্শ দিয়ে থাকে উমান্ডে ট্রাস্ট। এইসব নারীদের মানসিক চাপ কমানোর জন্য ওই ক্লিনিকে বিভিন্ন সেশন পরিচালনা করে থাকেন উমান্ডে নামের একজন চিকিৎসক। তার উদ্ভাবিত এসব সেশন নারীদের জন্য সত্যিই কার্যকর বলে প্রমাণিত। এছাড়া পানির বিনিময়ে সেক্স বন্ধের উদ্যোগ নিয়েছেন কিছু সচেতন লোকজন। গঠন করা হয়েছে একটি সংগঠন-যারা এ নিয়ে ব্যাপক প্রচার চালাতে শুরু করেছে।

সেখানকার স্থানীয় কয়েকজন বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন। সমস্যাটির সমাধানে তারা পানি সরবরাহের কাজে অধিক সংখ্যক নারী নিয়োগের পক্ষে। এজন্য তারা ট্যাঙ্ক মালিকদের বোঝানোর চেষ্টা চালাচ্ছেন। ইতিমধ্যে বেশ কিছু নারী নিয়োগ করা হয়েছে পানি সরবরাহের কাজে। এ নিয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন নিজের অভিব্যক্তি ব্যক্ত করে বলেন- কোনও নারী আমার কাছে পানি বিক্রি করছেন এটা দেখতে বেশ ভালো লাগে। এর আগে এখানে আসলে যুবকদের ঘোরাফেরা ও গাড়া সেবন করতে দেখতাম।

জাতীয় পযায়ে একটা পরিবর্তন আনার চেষ্টা করছে একটি বেসরকারি সংস্থা। সংস্থার একজন একজন বলেন-তাদের উদ্দেশ্য পানি সরবরাহের সময় নাজুক ক্রেতাদের যেন কেউ শোষণ করতে না পারে। আমরা এসব ইস্যুতে একটা আইন চাই যাতে নারীদের সম্মান, নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা যায়। আর এর সাথে অবশ্যই তাদের স্বাধীনতা।

মেরির মতো অনেকেরই আশা এরকম হস্তক্ষেপের পর পানির জন্য অন্যান্য নারীদের সংগ্রাম তার থেকে সহজ হয়ে উঠবে।

বিবিসির ভিডিও অবলম্বনে
ভাষান্তর-মাহমুদা আকতার

ওমেন্স নিউজ ডেস্ক/