জলে জঙ্গলে হাসি আর আনন্দে কয়েকটা দিন

জাহাজের ডেকে সঙ্গীদের সাথে লেখক, পিছনে সুন্দরবন

মাহমুদা সুলতানা

রাফসানের জেএসসি পরীক্ষা শেষ। বেড়াতে যাব। কর্তা মহোদয় তালবাহানা করেই চলেছেন। অবশ্য এটা নতুন নয়। আমার বাইরে যাওয়ার কথা হলেই সারা পৃথিবী যেন তার তালগোল পাকিয়ে যায়। তার কারণে বাইরে কোথাও বেড়াতে যাওয়া এক রকম যুদ্ধ আমার কাছে।

যাই হোক ছেলের পরীক্ষা শেষ। মেজ ননদের বর অধ্যক্ষ সাহেব আগেই বলে রেখেছেন আমরা যেন তাদের সাথে বেড়াতে যাই। বলে রাখা ভালো ননদের বর কিন্তু আমার আনিস কাকা। গ্রাম সম্পর্কের কাকা। কিন্তু আমি বিয়ের পরও কাকা ডাক বদলাতে পারি নি। আমাদের পরিকল্পনা সুন্দরবন ভ্রমণে যাওয়া। আমি ঢাকা থেকে ফরিদপুর আসছি দুদিন হয়। কর্তাকে বলে এসেছি একমাসের মধ্যে আমার খবর নেওয়া যাবে না। কে শোনে কার কথা! তৃতীয় দিনেই তিনি হাজির। রওয়ানা হলাম সবাই মিলে। গোপালগঞ্জ হয়ে ১৫০ জনের বিশাল বহর-তিনতলা জাহাজে করে-সুন্দর বনের পথে। থাকা খাওয়া সব জাহাজে। যাওয়া-আসা মিলিয়ে পাঁচ দিনের সফর। সব চেনা লোকজন, অধ্যক্ষ সাহেবের কলেজ টিম। সবাই বন্ধু সুলভ, আর আমিও যেহেতু আড্ডাবাজ, ব্যস জমে গেলাম মুহূর্তে। সারাদিন ঘোরাঘুরি, রাতে বিশাল হলরুমে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, সাথে বিভিন্ন রকমের মজাদার খানাপিনা তো আছেই।

সুন্দরবন প্রকৃতির বিস্ময়। প্রকৃতি যেন একে নিজ হাতে মনের মাধুরি মিশিয়ে সাজিয়েছে। এতবড় লবণাত্মক ম্যানগ্রোভ বন পৃথিবীর আর কোথাও নেই। সুন্দরবনের মোট আয়তন ১০ হাজার বর্গকিলোমিটার যা বাংলাদেশ ও ভারতে যৌথভাবে বিস্তৃত। তবে এর সিংহভাগই বাংলাদেশে পড়েছে। জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ এই অরণ্যকে প্রকৃতির জাদুঘর বললেও ভুল হবে না। রয়েল বেঙ্গল টাইগার, চিত্রা হরিণ, বানর, কুমিরেএবং নানা জাতের  সাপ আর পাখি। এই জঙ্গলে রয়েছে ৩৫০ প্রজাতির গাছ। জালের মত সমুদ্র থেকে উৎসরিত বিভিন্ন নদী চলে গেছে এদিক সেদিক। উভচর, সরীসৃপ কত যে প্রজাতি সব এখানে আছে!

শরনখোলায় প্রকৃতির রূপে বিভোর লেখক

সুন্দরী গাছে ভরা এই জঙ্গল। সুন্দরী গাছের নাম অনুযায়ী এ বনের নাম সুন্দরবন। একটা মজার কথা বলি। সুন্দরী গাছ আমি এর আগে কখনো দেখিনি। বনের বুক চিড়ে যেতে যেতে দেখছি কত সফেদা গাছ, কিন্তু একটাতেও সফেদা নেই। কারণ জানতে চাইতেই দলের একজন বলেন-‘কই সফেদা গাছ। এই যে এগুলো কি? দুটো পাতা ছিড়ে খান। এগুলো সুন্দরী গাছ।’ একদম বোকা বনে গেলাম।

শরনখোলা গেলাম একদম সূর্যোদয়ের আগে। যেতে হবে চুপিচুপি। ভোরবেলা হরিণেরা খাবার খেতে আসে। একটু দূর থেকে দেখতে হবে, মানুষের আনাগোনা পেলে দৌড়ে ছুটে যায় ওরা। তবে আমার মনে হল মানুষ দেখে দেখে ওদের ভয় বেশ ভেঙে গেছে। আস্তে আস্তে আমরা ওদের কাছে গেলাম ডাল পাতা ভেঙ্গে নিয়ে। ওরা ও বুঝতে পারল যেন। ছুটে পালালোনা। আমরা হরিণের সাথে ছবি তোলার সুযোগ পেলাম তবে বেশ খানিকটা দূরে ওরা। শরনখোলা গিয়ে দেখতে পেলাম সিডরের চিহ্ন। গাছগুলো যেন উপরে নিয়ে গেছে। অনেক জায়গায় কোন গাছ নেই, যা আছে আধা ভাঙ্গা। শরনখোলা যেন বিরান ভূমি। বেশ ভিতরে গিয়ে আবার গাছে ভরা।

সাগরে তো সব নোনাজল। হরিণ, বাঘ ইত্যাদি প্রাণি তো নোনাপানি খায় না। তাই ওদের জন্য বনের মধ্যে মিঠা পানির বিশাল পুকুর করা আছে। পুকুরে আছে পদ্মফুলের সমারোহ। তবে ওখানে গাইড খুব সাবধান করে দিল-কেউ যেন দলছুট না হই। কেননা বাঘের কবলে পরার বিপদ আছে। তবে বাঘ দেখতে পেলে তো ভালোই হয়! কিন্তু বাঘ তো দূরের কথা, আমি তো বাঘ্র মামার ছায়া পর্যন্ত দেখি নি। তবে হরিণ খেতে বাঘ আসবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আমাদের সাথে দেখা হল না। আফসোস!

জাহাজ থেকে নামা আর ওঠা তো আরেক অ্যাডভেঞ্চার। জাহাজ সরাসরি কূলে ভিড়তে পারেনা। তাই জাহাজ থেকে ট্রলারে করে তীরে পৌঁছাতে হয়। আবার তীর থেকে জাহাজে ফিরতে হয় একই কায়দায়। এভাবে পারাপারের সময় ট্রলার থেকে কোনওক্রমে পা ফসকে সাগরে পরে গেলে কিন্তু খবর আছে। তখন আর তীরে উঠা অত সহজ নয়।

0"]

বণ্যপ্রাণি প্রজনন কেন্দ্র করমজল যাবার পথে

করমজল মূলত বণ্যপ্রাণি প্রজনন কেন্দ্র। এখানে এলে রেয়েলবেঙ্গল টাইগার দেখার ইচ্ছা পূরণ হয়, অনেকটা দুধের সাধ ঘোলে মিটানো আর কি! আমরা বাঘ্র সাবক দেখেতে পেয়েছিলাম বেশ কয়েকটা। সাপ আর কুমিরের বাচ্চারা কিলবিল করছে। ছোটছোট হরিণ শাবকগুলো দৌড়ে বেড়ায়। তবে করমজলে সবই কিন্তু খাঁচায় ভরা।

হিরণপয়েন্ট এক অন্য রকম জায়গা। এত এত বেশি গাছ আর এত সবুজ আমি আর কোথাও দেখি নি। চিকন চিকন কি গাছ বট পাতার মত পাতা। ও গাছ দিয়ে নাকি ম্যাচের কাঠি হয়। ওরে বাবা, বনের একটু ভিতরে গেলেই অন্ধকার। যাওয়ার সাহস হবে না কারো। একটু পরেই জোয়ার এসে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। আবার একটু পরে কোথায় যেন পানি চলে যায়। এ এক দারুন খেলা! কত রূপ যে রুপসী বাংলার তা এক জীবনে দেখে শেষ করা যাবে না।

সমুদ্রের মাঝ খানে বিশাল চর জেগে আছে, নাম তার দুবলার চর। সেখানে নেমেই সবাই খেলায় মেতে উঠল। ফুটবল, ক্রিকেট যে যার মতো। ১০ হাজারের উপরে লোক ওখানে একটা নির্দিষ্ট সময় ধরে শুটকি মাছ তৈরির কাজ করে। হায় গো আল্লাহ, কত যে শুটকি মাছ! সাথে গন্ধ ফ্রি। দম বন্ধ হবার উপক্রম। সবাই ইচ্ছে মত শুটকি কিনলো।

আমরা সমুদ্রের বুকে জেগে ওঠা চরে দাঁড়িয়ে, সূর্যটা ওই পাশেই আস্তে আস্তে হারিয়ে যাচ্ছে। কত যে আবির ছড়িয়ে দিল, লালে লাল হয়ে উঠলো বঙ্গোপসাগর। সাগরে যেন আগুন জ্বলছে। নিজের চোখে না দেখলে এ রূপ বুঝানো যাবে না। আমি হারিয়ে গেলাম ও রূপের মোহমায়ায়, কোনও গন্ধ আর নাকে এলো না। এক রাশ মুগ্ধতা নিয়ে ফিরে এলাম জাহাজে।

এভাবেই আমাদের সুন্দরবন ভ্রমণের দিনগুলো শেষ হয়ে গেল। আর কয়েক ঘন্টা পর মোংলায় নামিয়ে দিবে।  আমাদের জন্য ওখানে অপেক্ষা করছে বাস। আবার আমরা ফিরে আসবো কোলাহলময় ব্যস্ত জীবনে। এ পাঁচ দিন কিন্তু আমরা নেটওয়ার্কের বাইরেই ছিলাম। মনেই পরে নি। বাসে উঠেই সবাই ব্যাস্ত হয়ে গেলাম যে যার ফোন নিয়ে।

আইলায় বিধ্বস্ত সুন্দরবনের শরণখোলা, পিছনে হরিণের দল

মাহমুদা সুলতানা: কবি ও লেখক। তার প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থের নাম ‘নতুন রুপে এসো’।

ওমেন্স নিউজ সাহিত্য/