শাহলা আহমেদের গল্প ‘রমিজের দীর্ঘশ্বাস’

শাহলা আহমেদ

রমিজের দীর্ঘশ্বাস

অসুস্থ চৌদ্দ বছরের রমিজ মাদুরে শুয়ে শুয়ে আবোল তাবোল ভাবছিল, কি ছিল তার অপরাধ? কেন ভেঙে ফেললো ওরা ওর ফুচকা দোকানটা। ব্যবসাটা বেশ জমে উঠেছিল, পুলিশ ভাইদের কিছু ঘুষ দিয়েও বেশ ভালোই টাকা জমতো। কিন্তু হঠাৎ সেদিন মাথা ঠিক ছিল না পুলিশ ভাই যখন পুরো টাকাটাই চাইয়া বসলো। ও পুরোটা দিতে অস্বীকার করতেই ওরা ওকে বেদম প্রহার করে, পুরো টাকাটা নিয়েই শুধু ক্ষান্ত হয়নি তার ফুচকা দোকান টা ভেঙে গুঁড়িয়ে দিল। পা ধরে অনেক অনুনয় বিনয় করেছিলো -আমারে মাইরেন না..দোকানটা রে ভাইগেন না। কিন্তু ওরা শুনলো না। বন্ধুরা ওকে হাসপাতালে নিয়ে হাতে পায়ে ব্যান্ডেজ করিয়ে বাসায় দিয়ে যায়, ওর এই অবস্থা থেকে বোনটি হতাশায় ভেঙে পড়ে……বোনের চোখমুখ রাগে ক্ষোভে ফেটে পড়ে, কার কাছে বিচার চাইবে? স্বাধীন ব্যবসা ছিল, ভালোই পয়সা আসতো। খুব যত্ন করে চটপটি ফুচকা বানিয়ে দোকান সাজিয়ে দিত ছোট ভাইটিকে, ওর হাতের চটপটি খদ্দেরদের দারুন পছন্দ ছিল।
ওদের জীবনে কেন বার বার আঘাত আসে? কি অপরাধ ওদের? ওরা তো কারো কাছে হাত পেতে ভিক্ষা চায় না, বোবা কান্নায় ওর বুকটা ফেটে যাচ্ছিল….।

ও যখন আট বছরের, দাদু বাবা মা তিন ভাই দু বোনের সুন্দর একটা সাজানো ঘর ছিল। বাবা ভাড়ার রিক্সা চালাতো, মা হোটেলে মশলা বাটার কাজ করতো আর ভাইটি টিফিন বক্স করে অফিসে অফিসে বিলি করতো, ভালোই পয়সা আসতো। দাদু জুহুর চাচার বাসায় কাজ করতো, ছোট দুই ভাইবোন ওরা পাড়ার স্কুলে যেত। হঠাৎই আচমকা দমকা হাওয়ায় ওদের পরিবারে ভাঙ্গন শুরু হল। এক বিকেলে অনেক লোক তার  বড় ভাই কে কোলে নিয়ে ঘরে ঢুকলো, সমস্ত শরীর রক্ত মাখা। ওরা বলছে পুলিশের গুলিতে মারা গেছে।
সবাই হাউ মাউ করে কান্না জুরে দিল, মা বেহুঁশ হয়ে গেল, ভয় পেয়ে সে ও কান্না জুরে দিয়েছিল, কেন আমার ভাই কে ওরা মারলো?  বড় বোনের কাছে শোনা দেশের নির্বাচনে এক পক্ষের ছাত্র রা মিছিলে শ্লোগান দেওয়ার জন্য ভাই সহ পাড়ার অনেক ছেলেকে নিয়ে গিয়েছিল। বিনিময়ে কিছু পয়সা দিবে। অবুঝ ওরা মিছিলে যোগ দিয়ে লাশ হয়ে ফিরে এলো।

মা বাবা দু’জনাই ভেঙে পড়লো। ওই ছাত্ররা ওদের ক্ষতিপূরণ দেবে বলে আশ্বাস দিয়েছিল, পত্রিকায় ভাইয়ের লাশের ছবিও ছাপা হয়েছিল কিন্তু ওরা আর আসে নি। ওরা অশিক্ষিত গরীব, ওদের প্রতিবাদ করার ক্ষমতা নেই….।

মা শোকটা সামলাতে পারে নি প্রায় অসুস্থ হয়ে পড়ে, নিয়মিত কাজে যেতে পারে না। অতিরিক্ত মশলা বাটায় হাত দুটোর ও খুবই খারাপ অবস্থা ……কাজ টা ছেড়ে দিল ওদিকে বৃদ্ধা দাদু ও নিয়মিত কাজে যেতে পারে না আর ওরা স্কুল ছেড়ে দিয়ে দুই ভাই অন্যের দোকানে টুকটাক সাহায্য করতো। জহুর চাচার বাসা থেকে বৃহস্পতি শুক্রবার দাদুর সাথে গামলা ভরে খাওয়া দিত, রোজার সময় ইফতারী, ভোর রাতের খাওয়া দিত কারন দাদু রোজা রাখতো, ঈদে পর্বে সবাইকে জামা কাপড় দিত।মা’র চিকিৎসার খরচ এখন ও দিয়ে যাচ্ছে-তাই তো ওরা পথে বসেনি।

এরই মধ্যে বাবা ও রিক্সা এ্যাকসিডেন্ট করে ঘরে পড়ে রইল। বড় বোনটা ও নিজে পছন্দ করে বিয়ে করে ও সুখ পেল না। জামাই নেশাগ্রস্থ। কোন কারনে জেলে গেল, বাচ্চা টা নানীর বাসায় দিয়ে দিল। জহুর চাচার ছোট মেয়ের খরচে ছোট বোনটা এরই মধ্যে ম্যাট্রিক পাশ করে বের হলো। পাড়ার এক  পার্লারে বউ সাজানো, হাতে মেহেদির কাজ শিখেছিল কিন্তু ওটা ও কপালে সইল না, পার্লারটা বন্ধ হয়ে গেল। ঘরে অসুস্থ লোকদের ওই দেখাশুনা করতো। তাই দূরে গিয়ে কাজ করা সম্ভব হলো না।

অকালে বাবা দাদী মারা গেলে…. ঘরটা কেমন প্রানহীন হয়ে গেল। ঘরটা এখন খুব বড়সড় মনে হয়। তার উপরের ভাইটি বিয়ে করে পৃথক হয়ে গেল। সংসার ছোট হয়ে আসলেও অভাব তো থেকেই যায়। মার অসুখের পিছনে অনেক খরচ, বিছানায়ই পড়ে থাকে। জহুর সাহেব চাচা, চাচী কেউ বেঁচে নেই কিন্তু ওনার মেয়ে এখনও ওদের সাহায্য করে যাচ্ছে নীরবে। পৃথিবী তে কিছু ভালো মানুষ আছে বলেই ওরা বেঁচে আছে। জহুর চাচার বড মেয়ে স্বাধীন ভাবে ব্যবসা করার জন্যে চটপটির দোকান কেনার অর্থ দিয়েছিল। ওর খুব আত্মবিশ্বাস ছিল টাকা জমিয়ে এবার বিয়ে করবে ওর ভালোবাসার মানুষ কে, এবার ওর বাবা অমত করবে না।
-ওই যে কপালে সুখ সইল না। বুক উথলে উঠা কান্না চেপে রাখলো।
-রমিজ্যা ওই রমিজ্যা। কারোর ডাকে…. ওর চিন্তার ছেদ পড়লো, চোখ তুলে দেখে বন্ধু মন্টু, যদিও বয়সে ওর ছোট, খুব বেজার মুখ।
-কি হইল মুখটা এত বেজার ক্যান?
-আমাগো শখ আহ্লাদ থাকতে নাই রে রমিজ্যা…..মা আর বাজানে দুইটা খুব সুন্দর নরম তুল তুইলা লাল আর নীল রঙের কম্বল পাইছিল (দুঃস্থদের জন্য শীতবস্ত্র বিতরণ) লালটা আমার খুব পছন্দ হইছিল, একরাত গায়ে দিয়া কি আরামে যে ঘুমাইছিলাম, ঠান্ডায় কি ওম!
শরীর এক্কেবারে গরম হইয়া গেছিল, বাজান কয়.গরীবের এত সখ থাকতে নাই। পাড়ার মোতালেবের কাছে অল্প দামে বিক্রি কইরা দিল।
-বাজান, ছেঁড়া কাঁথায় ঠান্ডায় জইমা যাই….. অনেক না কইছিলাম, শুনে নাই
মন্টু কান্নায় ভাইঙা পড়ে।
– না রে বন্ধু সামান্য সুখ আমাগো সয় না রে…..সুখ আইতে আইতে রাক্ষুসী রা ছিন্যাইয়া নেয়। ছেঁড়া কাঁথায় শুইয়া আমাগো সুখের স্বপ্ন দেখতে নাই রে..রমিজের বুক ফাইটা একটা চাপা দির্ঘ্যশ্বাস বাইর হইয়া আসে।

ওমেন্স নিউজ/