মফিদা আকবররে গল্প ‘অতীত এবং বর্তমান’

মফিদা আকবর

অতীত এবং বর্তমান

সত্যিই কি কেউ বদলে যেতে পারে? ইচ্ছেয় হোক অথবা অনিচ্ছেয়? মনের কোণে কেমন করা একটি অজানা বিষয় তোলপাড় করছিল। সেটি যে কেমন এবং কেন তাও জানি না। তবুও একটি উপলব্ধি অনুভবের শিরায় শিরায় টোকা মেরে জানিয়ে দিয়ে গেল কোনো একটি বিষয়। যে বিষয়টির আলাদা কোনো একটি নাম পেলাম না। কিন্তু বিষয়টি বীজ হিসেবে রোপিত হলো আমার মনের সীমানার মধ্যখানে। বোধ করি এ বীজ কুড়ি মেলে পত্রপল্লবে, ফুলে-ফলে শেকড় গেড়ে দাঁড়িয়ে যেতে সময় নেবে না। এ গাছটিকে আগাছা ভেবে উপড়ে ফেলতে পারব কিনা কে জানে! কথাগুলো ভাবতে ভাবতে রিনি ফুঁপিয়ে কেঁদে ফেলে নিজেরই অজান্তে। এ কান্না বাঁধ মানতে চায় না। কাঁদতে চায় না রিনি। কাঁদবে কেন সে? নিজেকেই সে নিজে বলেÑ
আমি তো কারো জন্য কিছু করিনি কিছু পাওয়ার জন্য! তবে? তাহলে কষ্ট কেন? মৃত্যু চিন্তাও এর মাঝেই বা আসে কেন? ফ্যামিলির সবাই আমাকে মৃত্যুটাই বারবার  দেখিয়ে দেয় বলেই কি?
আমি কি আসলেই সবার বারডেন হয়ে গেলাম?
এ প্রশ্নটা নানাভাবে তাড়া করে ফিরে তাকে। এসব ভাবনার মাঝে মায়ের মৃত্যুর কথাটাও মাঝে মাঝেই খুবই কঠিনভাবে ওর ভেতরটাকে নাড়িয়ে দিয়ে যায়। অসময়ে মায়ের মৃত্যুটা না হলে তো এতো ঘটনার সৃষ্টিই হতো না। যে ভাই-বোন নিজের সন্তানের চেয়ে কোনো অংশেই কম ছিল না। যাদের জন্য নিজের সংসারটা পর্যন্ত সাজানো হলো না। ইমরানকে বলেছিলাম ইমু তুমি কি আমার জন্য দশ বছর অপেক্ষা করতে পারবে? যদি পারো তাহলে থাকো আমার জন্য। না হয় সংসার সাজিয়ে ফেল আমার কোন আক্ষেপ থাকবে না।
বিনি, মিনি আর শাকিলকে দাঁড় না করিয়ে তো আর আমার নিজের সংসার নিয়ে পড়ে থাকতে পারব না। উত্তরে ইমু খুব শান্তভাবেই বলেছিল,
দেখো রিনি, পরিবারের পক্ষ থেকে বিয়ের জন্য চাপ দিচ্ছে আমাকে । ইতোমধ্যে অনেক মেয়ে দেখিয়েছে ওরা। কোনো মেয়েকেই পছন্দ করি না বলে মা সেদিন জানতে চাইলেন,
আমার কেনো পছন্দ আছে কি না। তাহলে তারা সেই মেয়েকেই ঘরে আনবে। অবশ্য, মা হয়তো ধারণা করতে পেরেছিলেন তোমার আমার ব্যাপারটা। মার আপত্তি না থাকলেও বাবাসহ অন্যরা আপত্তি করলেও সব সামলে নিয়েছি। এসব নিয়ে তুমি ভেবো না।
মিনি, বিনি আর শাকিলের কথা বললে না? ওরা আমার নিজের ভাই-বোনের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। ওদের জন্য সব করবো আমরা দুজনে মিলে। তুমি আমার পাশে থাকলে আমি সব করতে পারবো? রিনি, তুমি আর আপত্তি করো না সোনা। আমি যে আর পারছি না। রিনি শান্ত এবং ক্লান্তস্বরে বললো,
না ইমু। তুমি বুঝতে পারছো না। তুমি একটা পরিবার নিয়ে বসবাস করো তো। তারা আমার এসব বারডেন মানবেন কেন? পরবর্তীতে এসব নিয়ে অনেক ঝামেলা হবে তোমার আর আমার সংসার জীবনে। তুমি মা-বাবার কথা রাখো। তুমি বিয়ে করে ফেল।  আমি কিচ্ছুটি মনে করবো না। আমি ভাববো তুমি আমারই ছিলে এবং আছো।
সেই ব্রাইট ক্যারিয়ারের ইমু বিয়ে করেনি। কেমন একটু অগোছালো আর অপ্রকৃতিস্থ হয়ে গিয়েছিল সে। তখন থেকে সে রিনিদের বাড়িতে খুব একটা আসতো না । একা থাকতেই পছন্দ করত সে বেশিরভাগ সময়। রিনি অনেক পীড়াপিড়ি করলে কখনো কখনো এলেও কিছুই বলতো না সে রিনিকে। কিছুই খেতেও চাইত না চা ছাড়া। চা আর একটি পর একটি সিগারেট ধরাত। রিনি অনেক কথা বললেও সে শুধু উদাস হয়ে রিনির দিকে কিম্বা অন্যদিকে তাকিয়ে থাকতো আর রিনির কথা শুনত। কোন কথার প্রতিবাদ করত না। যেদিন ওর পছন্দের ভালো-মন্দ তৈরি করতো রিনি বিশেষ করে সেদিনই ওকে ডাকতো। কিছুই খেতো না সে। রিনি অনেক কথা বলার পর যখন কোনো কথাই বলতো না সে। তখন ওরা দু’জন মিলেই সিগারেট টানতো। একটার পর একটা। ওদের দু’জনের ঘণ্টাখানেক সময় চলে যেতো এভাবেই। যাওয়ার সময় হলে সে রিনিকে জড়িয়ে ধরে আবেগে কিছুক্ষণ কাঁপতে থাকতো থর থর করে। তারপর অনেকক্ষণ বুকের সাথে বুক মিলিয়ে রাখতো। এরপর কিছুক্ষণ পাগলের মতো ওকে চুমু খেতো। বোধকরি ওই সময়টায় রিনিও কিছুটা পাগল হয়ে যেতো ওকে আরো একটু বেশি পাওয়ার জন্য। কিন্তু এরচেয়ে বেশি সেও এগেতো না। রিনিও না। এক সময় ধীর পায়ে সে চলে যেত মাথার চুলে আঙুল ডুবিয়ে রগরাতে রগরাতে। রিনি অনেকক্ষণ ধরে ওর চলে যাওয়াটা দেখতো একমনে। ইমু একবারও  পেছন ফিরে তাকাতো না। এভাবেই চলছিল রিনি আর ইমুর জীবন। অকস্মাৎ খবর এলো অ্যাক্সিডেন্টে ইমু মারা গেছে। সেই খবর রিনি পেয়েছিলো সাতদিন পর। ওর মৃত মুখখানাও দেখতে পারেনি সে। সেই কষ্টাও কি ভোলার মতো ছিলো রিনির জন্য?
 রিনি মনে মনে ভাবে, মৃত্যুচিন্তাটা কতোভাবেই না ফিরে ফিরে আসে আমার কাছে। একবার ইমুর মৃত্যুমুখের কথা মনে পড়ে। মৃত্যুকালে কেমন হয়েছিলো ওর মুখটা? কেউ কি একটু খবর দিতে পারতো না একটিবারও ? শেষ দেখাটাও হলো না ওর সাথে?  আমাকে শেষ কথাটিও তো বলতে পারেনি সে। মনে হলে স্থির থাকতে পারি না। আর যখন মায়ের কথা মনে পড়েÑ তখন মায়ের নিমিলিত চোখ, স্থির মুখ। কেমন একটা পাথর সময়। স্তব্ধ করে দিয়েছিল আমাকে। মাহারা জীবন কখনো চলবে কি না, অথবা বাপ-ভাইবোনকে নিয়ে এ জীবন চালানো যাবে কি না। কতো কিছুই না ভেবেছিলাম সেদিন। মায়ের কিছুদিন পর বাপও চলে গিয়েছিলেন আমাদের ছেড়ে। এরপর আমি, বিনি, মিনি আর শাকিল জড়াজড়ি করেই ছিলাম সুখে এবং দুঃখে। আমরা ছিলাম আপনার চেয়ে আপন। আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী আমাদের দেখে হিংসে করত। এ নিয়েও আমরা ভাই-বোনেরা হাসাহাসি করতাম। মানুষ হিংসা করবেইবা না কেন? একজনের একটা কিছু হলে সবাই ঝাঁপিয়ে পড়তাম যে। মা-বাবার মতো অসময়ে ওদেরকে যেন হারাতে না হয়।
এখনো মনে পড়ে মিনির ছেলে সিয়ামটা যখন এ পৃথিবীর মুখ দেখলো প্রথম। সেদিনের কথা। মিনির সিজার হয়ে সিয়ামকে বের করার পরপরই ডাক্তাররা বললেন, ওকে তাড়াতাড়ি শিশু হাসপাতালে নিয়ে যান। ওর অবস্থা খুব খারাপ। মিনির কাছে বিনি আর শাকিল রইল। রাত তখন দেড়টা। আমি আর আনোয়ার দৌড়ালাম শিশু হাসাপাতালে। তিনদিন পর যদিও মিনি হাসপাতাল ছেড়ে আমার বাড়ি চলে গেল। ও সিজারের প্যাশেন্ট বলে সিয়ামকে নিয়ে প্রায় দেড় মাস একটানা শিশু হাসপাতালে ছিলাম। বেশিরভাগ সময় ওকে নিয়ে দাঁড়িয়েই থাকতে হতো আমাকে। অফিস থেকেও ছুটি পাইনি। অফিস আর হাসপাতাল একসাথে চলতো। আমার পাগুলো ফুলে ড্যাবডেবে হয়ে থাকত। এসব বিষয় আমার কাছে আনন্দেরই ছিল।
সেই সিয়ামের আজ বিয়ে। নিজের সন্তান নেই বলে ওদেরকে তো নিজের সন্তানের মতো করেই মানুষ করেছিলাম। সে জন্য অনেকটা ভুলেই গিয়েছিলাম যে, নিজের পেটের সন্তান নেই। আমি ভাবতাম, আমি বুঝি, বিনি, মিনি আর শাকিলের কাছে মা সমতুল্য। কিন্তু আজ তা পরিষ্কার হলো।. . .
ওদের বুকের ভেতর যে আমাকে নিয়ে এতো জমাট বাঁধা কষ্ট জমা হয়েছিল তা তো জানতামই না। আসলে নিজ সন্তানকেও লালন-পালনের সময় শাসন-বারণ করতে হয়। ওদেরকে আদরের পাশাপাশি শাসন-বারণও করেছিলাম অনেক। ওরা আমার জীবনের সেক্রিফাইসটা ভুলে গেছে। তবে শাসন-বারণটা মনে রেখেছে। আজ তা প্রকাশ পেল। মিনি আর আনোয়ার মেহমান-অতিথিদের সামনেও বেসামাল ঝগড়া লেগে যায়। প্রতিনিয়ত ওদেরকে আমি সামলাতাম। সিয়াম ওর পছন্দমতোই বিয়ে করেছে এটাই ওদের ঝগড়ার বড় কারণ। আমি নিজেকে মা সমতুল্য বড় মনে করে অনেক শাসনের অধিকারী ভেবে আল্টিমেটাম দিয়েছিলাম। এরকম ঝগড়া করলে আমি চলে যাব। ভেবেছিলাম এ কথা শুনলে ওরা থামবে।  ভেবেছিলাম, আমাকে ছাড়া আর যাই হোক বিয়ে তো হবে না। এসবই ছিলো আমার ভুল ধারণা মাত্র।
তাই বরাবর একটু মুড নিয়েই ছিলাম যাতে ওরা ভয় পায়, ঝগড়া না করে। সিয়ামের হলুদের অনুষ্ঠানের মধ্যেই ওদের তুমুল ঝগড়া। আমি আনোয়ারকে বললাম,
তোমরা এরকম করলে আমি তো চলে যাবো। আনোয়ার বললো, যান যান, চলে যান। আপনাকে কে থাকতে বলেছে।
আনোয়ারের এ কথা শুনে মৃত্যুর সামিল মনে হলো। পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে যেতে লাগলো। তারপরও এতো অতিথিদের মধ্যে মিনিকে বোঝানোর চেষ্টা করলাম। ওর চেঁচামেচিও থামল না। নিজেকেই সামলালাম। ওরা যে  কোটি কোটিপতি সে কথাও বার বার বলছিলো। সে তুলনায় আমি তো গরীব। এবং পরিবারের সবার থেকেই। ওরা আমাকে মান্য না করার এটাও যে একটি কারণ ছিলো তাও বুঝলাম অনেক পর। তবুও বউ ঘরে আনা পর্যন্ত ধৈর্য ধরলাম।
পরদিন সিয়ামের বউ নিয়ে ফিরতে ফিরতে আমাদের রাত বারোটা বেজে গেল। বউ ঘরে আনার পর অনেক রিচুয়ালিটিতে ওরা আমায় ডাকল। আমি অ্যাটেন্ড করিনি। খুব ক্লান্ত ছিলাম এবং সুগারের প্যাশেন্ট বলে কিছু একটু মুখে দিয়ে ওদের একটি ঘরের ফ্লোরে কাঁথা-বালিশ ছাড়াই শুয়ে পরলাম। আমি নিজ কানে শুনলাম। মিনি ডাইনিংয়ে গিয়ে বলল, আমি একটি দৃশ্য দেখে এসেছি, তোমরা গিয়ে দেখগে। সবাই দেখলো দৃশ্যটি। সবাই মনে হয় মজাই পেলো।
আমার জন্য মজার বিষয় হলো, সবাই জানে তোষক বিছিয়েও আমি কখনো ফ্লোরে ঘুমাতে পারি না। ওদের সব কাজ শেষ হলে কেউ একজন বোধ করি আমাকে ডেকেছিল। আমি বলেছিলাম;
এখানেই ঘুমাব। সময়টা শীতের শেষ সময় হলেও মফস্বলে  বেশ শীতের আমেজ ছিলোই। ভেবেছিলাম আমাকে বোধ করি ওরা এখানেই চাদর-বালিশ, কম্বল দিয়ে যাবে। নাহ, ওই বাড়িতে আমার জন্য দরদ দেখাবে এমন কেউ ছিল না সেদিন। সারারাত ফ্লোরে শুয়ে সকালে উঠে চলে যেতে চাইলেও সকলে মিলে আটকাল। সকালবেলায় কাশি, ঠা-া, গলা ব্যথা এবং গলা বসে যাওয়ায় কথা বলতে পারছিলাম না।
আমার ভুল ভেঙেছে। কিন্তু আসল চমক অপেক্ষা করছিলো আরো আমার জন্য। সবাই আমাকে নিয়ে  বৈঠকে বসল। কেন আমি ফ্লোরে শুয়ে এবং চলে যাওয়ার চেষ্টা করলাম! এ মিটিংয়ে সভাপতিত্ব করছিল ভাই শাকিল। যদিও আমারই তা করার কথা। কারণ, আমিই ছিলাম এ বাড়ির সবার বড় এবং প্রধান মুরুব্বি। যেহেতু আমি গরীব, আমার বাড়ি-গাড়ি নেই এবং আমাকে নিয়েই মিটিং সেখানে তো আর আমি সভাপতিত্ব করতে পারি না। মিনি আর আনোয়ারের এসব আচরণে সারাজীবন এবং বিয়েতেও সবাই অতিষ্ঠ হলেও  সবার বিরক্তি প্রকাশ পেলো আমার ওপর। সবার কথাতেই তা প্রকাশ পেল। আমি অনেকবার কথা বলতে চাইলেও থামিয়ে দেওয়া হলো।
অবশেষে শাকিল সভার সমাপ্তি ঘোষণা করল আমার উদ্দেশ্যে শেষ কথাগুলো বলে। তোমার এখন বয়স হয়েছে। উচ্চাশা ছেড়ে দাও। বাইরে দৌড়-ঝাঁপ বাদ দাও। এমনকি পারলে লেখালেখিটাও বাদ দাও। আমি কারো কোনো কথায় প্রতিবাদ না করে চলে এলাম। অথচ শাকিল নিজেও একজন লেখক। ওর প্রথম লেখাটা ছেপেছিলাম আমিই। প্রথম বইটা আমিই প্রকাশ করে দিয়েছিলাম। ওরা লেখাপড়া চাকরি, বিয়ে এবং লেখালেখি কোনোটাই আমাকে ছাড়া হতো না। অদ্যাবধিও ওর বইয়ের প্রুফটা আমিই দেখে দিই।
মনে পড়ে গেল সেদিনের কথা। ওর মাস্টার্সের ফাইনাল ইয়ার। তখন অকস্মাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লাম। অনেকদিন উঠতে পারছিলাম না বিছানা থেকে। দুটো চাকরি করতাম একই সাথে। এ সংসারটা চালানোর জন্য। আমার মূল চাকরিতে ছুটি নিতে পারলেও পার্টটাইম চাকরিতে ছুটি নিতে পারছিলাম না। তাই আমার বসকে বলে-কয়ে নিজের চাকরিটা দিয়ে দিয়েছিলাম ভাই শাকিলকে। চাকরি আর বেতন ওর হলেও ঘরে বসে কাজটা আমিই করে দিতাম। আর ও যখন অফিসে যেতো তখন ফোনে ফোনেও অনেক কাজ করে দিতাম। যে শাকিল এখনো অনেক কিছুতেই আমার ওপর নির্ভরশীল।  সেই এখন আমার পরামর্শদাতা!
ভাবছি, মৃত্যু এবং কবরের কথা। কেউ কি মৃত্যুর বাইরে? ফ্যামিলির সবাই আমাকে মৃত্যুর কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছে।  আজকাল দেয় বারবারই। ভাবছি ওদের কি মৃত্যু হবে না? মৃত্যুটা কি আমার একার জন্য? আমাকে নিয়ে যখন আলোচনা হচ্ছিল তখন বিনি বলল,
আমি তো আমার মৃত্যুর সময় পর্যন্ত বলে যাবো তুমি যে কতটা ভালো? অর্থাৎ আমি চরম খারাপ।
জীবনে কখনো ওর এবং সবার জন্য ভালো ছাড়া অন্য কিছুতো করিনি। ওর জীবনে খারাপ কিছু হোক স্বপ্নেও কল্পনা করিনি কখনো এবং এখনো। বরং ওদের সবার জন্য নিয়মিত রোজা রাখি এবং নামাজ পড়ে দোয়া করি। আর বিনি নাকি মৃত্যুর সময়ও আমাকে খারাপ বলতে বলতে মৃত্যুবরণ করবে বলে ঘোষণা দিলো ঘর ভরতি লোকের সামনে।
হতবাক হয়ে ওর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম! ভেবে পাই না কী করেছিলাম ওকে। ভাবছি ছেলেবেলায় কী এমন কিছু করেছিলাম? যা আমার মনে নেই।  কিন্তু সে মনে রেখেছে?
ঘুরে ফিরে মৃত্যু ভাবনাটাই আজ মনে পড়ছে যেমন, তেমনি আরেকটি কথা খুব মনে পড়ছেÑ আমি কি তবে উচ্ছৃঙ্খল জীবন যাপন করছি? অথবা ইমু নেই বলে কি শরীরী চাহিদা মেটাতে দেহ ব্যবসা করি? একথাটাই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে কি ওরা বলতে চায় আমাকে ? কিন্তু পারছে না? অথচ ঐ জীবনে কি যুদ্ধই না করেছিলাম! অফিস, সংসার ভাই-বোনকে নিয়ে। এই আজকে আমার প্রতিদান?
হ্যাঁ, ওরা যে কথাটা বলতে পারতো আমাকেÑ সেটা কিন্তু কেউ বলেনি।
ওরা বলতে পারত। সারাজীবন তুমি আমাদের জন্য অনেক কষ্ট করেছো। এখন যেমন মনে চায় আমাদের কাছেই থাকবে। যার কাছে যখন- যতদিন ইচ্ছে থাকবে। আনন্দ করবে। ভালো-মন্দ খাবে। লিখবে আর যেহেতু আমাদের সেই সাড়ে তিন হাত ঘরে যেতে হবে সেই কাজটিও করবে একান্ত মনে মন দিয়ে।
কিন্তু ওরা শুধু ওই জায়গটা আমাকেই দেখাল। আমি জেনে নিলাম, আমাকে প্রথমে এবং শেষে শুদ্ধ হতে হবে ওদের সাথে মিলেমিশে থাকতে হলে। আর ওদের কথায় উঠতে এবং বসতে হবে। যেটা আগে ওরা করতো আমার কথায়। ওরা যে সবাই শুদ্ধ। আমি যে অশুদ্ধÑ ওদের সাথে বেমানান। আমাকে ওদের সাথে মানানসই এবং শুদ্ধ হতে হবে আগে। তারপর আর অন্য অন্য যা কিছু। এসব ওদের কথা।
আর আমি? আজ থেকে জেনে নিলাম কখনো কোনোদিন আমার কেউ ছিল না। আজ থেকে আমার আর পিছুটান রইলো না। আমি স্বাধীন। জীবনটা যার যার তার তার। ইমু আমি সে সময় তোমার কথা বুঝিনি। আজ খুব মনে পড়ছে তোমাকে। অসময়ে চলে গেলে । সেও কি আমারই জন্য?
ভাবছি, সবার বাড়ি-গাড়ি আছে। আমার ভাড়া বাড়ি আর ডাল-ভাত তো আছে এখনো। ডাক এলেই হয়তো  চলে যাবো। যেতে তো হবেই। এবং শুদ্ধভাবেই।  কিন্তু কিছুতেই তোদের মতো করে নয়। আমার মতো শুদ্ধ করেই। ওরা বলেছিল অতীত মনে রাখতে নেই। আমি অতীতকে বর্তমান ভেবে আজ থেকে ভুলে গেলাম সব, সবকিছু . . .। আর অতীত এবং বর্তমানকে সাথে নিয়েই সদ্য ভূমিষ্ঠ হলাম। বোধ করি এরই নাম হয়তো বা বাস্তবতা এবং জীবন! অতীত এবং বর্তমান!

মফিদা আকবর: কবি, লেখক, প্রাবন্ধিক, শিশু সাহিত্যিক ও সমালোচক।  লেখকের প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ৯১টি।

ওমেন্স নিউজ/