আমি সবসময় প্রান্তিক মানুষের কথা তুলে ধরার চেষ্ট করি: দিলারা মেসবাহ

সাহিত্যিক দিলারা মেসবাহ

দিলারা মেসবাহ একজন প্রথিতযশা সাহিত্যিক। লিখছেন চার দশকের বেশি সময় ধরে। কবিতা, গল্প, উপন্যাস, রম্যরচনা, কিশোরসাহিত্যসহ সাহিত্যের সব শাখাতেই তার দৃঢ় পদচারণা। কিন্তু কিছুটা নির্ভৃতচারী ও প্রচারবিমুখকতার কারণে সেভাবে আলোচনায় আসেননি। দেশের উল্লেখযোগ্য পুরস্কারও রয়েছে অধরা। অধচ কেবল সাহিত্য রচনা নয়, সংগঠক হিসাবেও খ্যাতিমান এই লেখক। দীর্ঘ ৩০ বছরের বেশি সময় ধরে নেতৃত্ব দিয়েছেন ঐতিহ্যবাহী সাহিত্য সংগঠন নারী লেখক সংঘের, সাধারণ সম্পাদক ও প্রেসিডেন্ট হিসাবে।
দিলারা মেসবাহর জন্ম ২৮ আগস্ট, ১৯৫০ সালে পাবনার বিখ্যাত লোহানী পরিবারে। পিতা তাসাদ্দুক হোসেন লোহানী শিক্ষাবিদ ও খ্যাতিমান সাহিত্যিক। মা বেগম বদরুননেসা লোহানী। বাবার বদলি চাকুরির সুবাদে বিভিন্ন জেলার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তাকে লেখাপড়া করতে হয়। এর মধ্য দিয়ে সমাজের মানুষ ও প্রকৃতি সম্পর্কে জানাশোনার সুযোগ ঘটে তার ছাত্রজীবন থেকে। স্বামীর কর্মসূত্রে দেশের বিভিন্ন জেলায় অবস্থানগত কারণেও তার অভিজ্ঞতার পরিস্ফুটন ঘটে নানাভাবে। আর অনিবার্যভাবে তা তার লেখার জগৎকে করে প্রসারিত। তাই কখনো ঢাকা বেতারের টকার, স্ক্রিপ্ট রাইটার, সদালাপী ছদ্ম নামে রম্যরচনা, সাপ্তাহিক রোববারে দীর্ঘদিন 'প্রিয়দর্শিনী' নামে কলাম লিখেন তিনি। ১৯৬৫ সালে 'সবুজ পাতা'য় কবিতা প্রকাশিত হওয়ার মধ্য দিয়ে তার লেখালেখি শুরু। বর্তমানে ছোটগল্প, নিবন্ধ, শিশুতোষ রচনায় তিনি নিরন্তরভাবে মগ্ন।

সম্প্রতি অনলাইন নিউজ পোর্টাল ওমেন্স নিউজ২৪য়ের সম্পাদক মাহমুদা আকতার এই সুসাহিত্যিকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন তার ধানমন্ডির বাসভবনে। এই সাক্ষাতে লেখক দিলারা মেসবাহ তার লেখালেখি ছাড়াও সমসাময়িক নানা বিষয়ে কথা বলেছেন। মতামত দিয়েছেন নিজের অগ্রজ এবং এ সময়ের সাহিত্যিকদের লেখালেখি নিয়েও। লেখকের সঙ্গে আলাপচারিতার সম্পূর্ণ অংশ ওমেন্স নিউজের পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো-

ওমেন্স নিউজ-এখন কি লিখছেন?
দিলারা মেসবাহ– কিছু অসমাপ্ত গল্প শেষ করার চেষ্টা করছি। এছাড়া একটা আত্মজীবনী লেখারও পরিকল্পনা আছে। একসময় ভাবতাম আমি এমন কি করেছি যে এসব লিখে রেখে যেতে হেবে। কিন্তু এখন মনে হয়, যা দেখেছি বা দেখছি সেসব লিপিবদ্ধ করে রেখে যাওয়া উচিত। এতে যদি আগামী প্রজন্ম কিছুটা হলেও উপকৃত হয়। একজন মানুষের জীবন তো কেবল তার ব্যক্তিগত বিষয়াশয় নয়, এতে রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজব্যবস্থার অনেক বিষয় থাকে।
এখন মাঝে মাঝে আফসোস হয়। মনে হয়-আগে যদি লেখালেখিতে আরও বেশি সময় সময় দিতাম তাহলে হয়তো আরও অনেক করা সম্ভব ছিলো। একই সঙ্গে এটাও মনে হয় যে, আমার সময় বোধহয় এখনই, যদিও বয়স হয়ে গেছে। অনেকে বলতে পারেন এই বয়সে এসে এত লেখালেখির কি আছে! কিন্তু আমি মনে করি মন যতদিন তরুণ থাকে মানুষও ততদিন তরুণ থাকে। সুতরাং আমি মনে করি আমার ভিতরে যদি সেই সাহস, উদ্যোগ, স্বপ্ন, থাকে তাহলে আমি বৃদ্ধ হবো না কখনও। কখনও বৃদ্ধ হবো না এই অর্থে যে, আমার মন তরুণ, শরীর বৃদ্ধ হলেও আমার মন তরতাজা। দু মাস আগে স্বামী অসুস্থ হয়ে পড়ায় লেখালেখির কাজে একটু ব্যাঘাত ঘটছে। এর আগে যখনই সময় পেয়েছি তখনই লিখতে বসেছি।

ওমেন্স নিউজ-আপনি কীভাবে লেখেন, হাতে না সরাসরি কম্পিউটারে?
দিলারা মেসবাহ– আগে খাতা কলমে লিখে নেই। পরে সেটা কম্পোজ করি। আমি কিন্তু এমনিতেও কম লিখি। অর্ডারি লেখা লিখতে পারিনা। পত্রিকাওয়ালাদের তাড়ায় কখনও লিখতে বসি না। আমি নিজের পছন্দমতো স্বাধীনভাবে লিখি। এটা আমার স্বভাব-দোষ বা গুণ যা-ই বলো, আমি এমনই।
আর এ কারণে আমার লেখার সংখ্যা একটু কম। আমি যখন লিখতে বসি তার আগে অনেক দিন ধরে মনের মধ্যে সেটা নিয়ে জাবর কাটতে হয়। মাথার মধ্যে তাকে লালন করতে হয়। অনেকক্ষণ তার শব্দ ও ভাষা নিয়ে ভাবি, কীভাবে শুরু করবো, শেষটাই বা কি হবে-এসবও ভাবনায় থাকে। এটা নিয়ে কি নতুন কোনও নীরিক্ষার দিকে যাব, নাকি সনাতন ধারায় লিখে যাব-নাকি দুইয়ের মিশ্রণ থাকবে. যাদু বাস্তবতা থাকবে কি-এসব নানা বিষয় নিয়ে ভাবতে থাকি। আমাদের দৈনন্দিন জীবনযাপনের গল্পও হতে পারে। যাই লেখি না কেন এটা সবসময় মাথায় থাকে লেখাটা যেন পাঠযোগ্য, খানিকটা মানসম্মত হয়। এ ব্যাপারে কতটা সার্থক হয়েছি সেটা তো পাঠক বিবেচনা করবে। কিন্তু আমার এই চেষ্টাটা সব ধরনের লেখার ক্ষেত্রেই থাকে।

ওমেন্স নিউজ- আপনার লেখালেখির শুরু কীভাবে?
দিলারা মেসবাহ-আমার বাবা ছিলেন রাইটার। আমি যখন খুব ছোট তখন তার বই ‘রূপকথার মায়াপুরী’ বইটি বের হয়। সেই বইটা সেইসময় খুবই জনপ্রিয় ছিলো, গোটা বাংলাদেশজুড়ে। বিদেশের সব বিখ্যাত রূপকথার বইয়ের সাবলীল অনবাদ করেছিলেন আমার বাবা। তার সেইসব অনুবাদের মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় ছিলো রূপকথার মায়াপুরী। এই বইয়ের ছবিগুলো এঁকেছিলেন তৎকালীন বিখ্যাত চিত্রশিল্পী আবুল কাসেম। তো সেইটা দেখে আমার সবসময় মনে হতো আমার বাবার যদি এরকম একম একটা বই থাকে তাহলে তো উনার আর কিছুর দরকার নাই। ভাবতাম-আমার নিজের এরকম একটা বই কবে হবে? এটা ছিলো আমার একটা অদ্ভুত খেয়াল। সত্যি কথা বলতে কি বাবাকে হিংসা করতাম। ভাবতাম-আহারে বাবার একটা কত সুন্দর বই আছে, কী চকচকে রং! আমার এরকম একটা বই যদি থাকতো। যদিও আমার বাবা কখনও আমাকে লেখার জগতে আসার জন্য কিছু বলতেন না। তিনি শুধু বলতেন, দেখো, লেখালেখি কোনও বিলাসিতা নয়, এ পথে আসতে হলে তোমাকে অনেক আরাধনা আর সাধনা করতে হবে। তাছাড়া তিনি ছিলেন একটু রক্ষণশীল।

ওমেন্স নিউজ-তবে কি বাবার তাগিদেইই লেখালেখির জগতে আগমন?
দিলারা মেসবাহ– না, বাবা সেভাবে কখনই লেখালেখিতে আসতে উৎসাহিত করেননি। যদিও বাবার লেখালেখি দেখেই এই জগতে আসার প্রেরণা পেয়েছি। তবে বাবার চেয়ে তার মা-ই আমাকে লেখালেখিতে বেশি উৎসাহ দিয়েছেন। সত্যিকার অর্থে মা ছাড়া আমি পরিবারের আর কারো কাছ থেকে তেমন উৎসাহ পাইনি। আরও স্পষ্ট করে বললে আমি লেখালেখিতে কোনও বটবৃক্ষের ছায়া পাইনি। লেখক জীবনের যতটুকু অর্জন সেটুকু কেবলই নিজের চেষ্টা আর পরিশ্রমের ফসল।

ওমেন্স নিউজ-আপনার প্রথম লেখা প্রকাশিত হয় কবে?
দিলারা মেসবাহ- ক্লাস নাইনে পড়ার সময় স্কুল ম্যাগাজিনে আমার প্রথম লেখা বের হয়। ছোটবেলায় আমি তেমন লিখতাম না, খুব ছবি আঁকতাম।

ওমেন্স নিউজ- আপনার প্রথম বই বেরিয়েছে কোন সালে?
দিলারা মেসবাহ- আমার প্রথম বই বেরিয়েছে ১৯৮৬ সালে-একসঙ্গে দুটি, কবিতার বই ‘কষ্টের কাঠঠোঁকরা’ আর ‘ইষ্টি কুটুম মিষ্টি কুটুম’ নামের একটি ছড়ার বই।

ওমেন্স নিউজ-আপনি শুরু করেছিলেন কবিতা দিয়ে তারপর কথাসাহিত্যে কীভাবে এলেন?
দিলারা মেসবাহ– আসলে গল্প বিশেষ করে উপন্যাসের ক্যানভাস খুব বড়-এখানে অনেক কিছু বলা যায় এবং মনের মতো কাজ করা যায়। কবিতায় সেসব হয় না। তাই কথাসাহিত্য শুরু করলাম।

ওমেন্স নিউজ-এ পর্যন্ত কতগুলো বই বরে হয়েছে আপনার?
দিলারা মেসবাহ-গল্প, উপন্যাস, কবিতা, প্রবন্ধ, গবেষণাগ্রন্থ সবমিলিয়ে ৪৩টা। আমি ছোটদের জন্যও অনেক লিখেছি। এজন্য অনেকে আমাকে শিশুসাহিত্যিক হিসাবেও আখ্যায়িত করে থাকেন। যদিও আমি কোনও বিশেষণে বিষেষায়িত হতে চাই না। আমি সাহিত্যের সব শাখাতেই কাজ করেছি এবং এখনও করে যাচ্ছি।

ওমেন্স নিউজ-এগুলোর মধ্যে আপনার প্রিয় বই কোনগুলি?
দিলারা মেসবাহ -‘রন্ধন বন্ধন নন্দন তত্ত্ব’ নামে একটা প্রবন্ধের বই আছে আমার। আসলে প্রবন্ধ নয় খানিকটা হালকা ঢংঙে লেখা এই বইটা আমার কেন জানি ভালো লাগে। এতে আমি যেন বা বাংলাদেশের ঐতিহ্যকে আত্মস্থ করতে পেরেছি, একটু হলেও। চর্যাপদ থেকে শুরু করে মোগল যুগ, ঠাকুরবাড়ি এমনকি আমাদের সাহিত্যিক আবদুর রাজ্জাক ও আহমদ ছফার মতো সাহিত্যিকদের কথাও আছে এতে। একই সঙ্গে উঠে এসেছে আমাদের গ্রাম অঞ্চলের রান্নবান্নার কথাও।

ওমেন্স নিউজ- সাহিত্যের নানা শাখায় কাজ করলেও গল্পকার হিসাবে আপনি বিশেষ খ্যাত। আপনি এসব গল্পে কাদের নিয়ে কাজ করেছেন। আরও স্পষ্ট করে বললে গল্প বলার ক্ষেত্রে আপনার প্রিয় বিষয় কোনগুলো?
দিলারা মেসবাহ- আমি নিজের লেখালেখিতে সবসময় প্রান্তিক মানুষের কথা তুলে ধরার চেষ্ট করি। আমি কখনও উচ্চবিত্তদের নিয়ে লিখিনি, কেননা তাদের জীবনযাত্রা আমার কাছে মেকি মনে হয়। অন্যদিকে মধ্যবিত্তের জীবনযাত্রায় কোনও বৈচিত্র্য খুঁজে পাইনা। একই ভাবধারা, আদর্শ আর প্যানপ্যানানি আমার পছন্দ না। এজন্য আমি সবসময় প্রান্তিক মানুষদের কথা তুলে ধরতে পছন্দ করি। এইসব মানুষের জীবনসংগ্রাম, ওদের সত্য-মিথ্যা, ভণ্ডামি, বদমাইশি, ভালোমানুষী, মানবিকতা এই সবকিছুর মধ্যে সত্যিকারের জীবন খুঁজে পাওয়া যায়। এজন্য ওদের জীবনযাত্রা আমার গল্পের প্রধান বিষয়।

সাহিত্যিক দিলারা মেসবাহ’র সাক্ষাৎকার নিচ্ছেন লেখক ও সাংবাদিক মাহমুদা আকতার

ওমেন্স নিউজ-কিন্তু আপনি তো প্রান্তিক মানুষদের প্রতিনিধিত্ব করেন না। মানে আপনি নিজেও উচ্চ মধ্যবিত্ত সমাজের মানুষ-কিন্তু প্রান্তিক মানুষদের কাছে কীভাবে পৌঁছালেন-এদের নিয়ে আপনার লেখাগুলোর সবই কি আপনার কল্পনা নাকি বাস্তব?
দিলারা মেসবাহ– মাহমুদা তুমি ঠিকই বলেছো আমি প্রান্তিক সমাজের অংশ নই। কিন্তু আমি ওদের সঙ্গে মেশার সুযোগ তৈরি করে নিয়েছি। বাবার বদলির চাকরির সুবাদে আমাকে বিভিন্ন অঞ্চলে থাকতে হয়েছে। আমি সে সময় বিভিন্ন অঞ্চলের লোকজনের জীবনযাত্রা ঘনিষ্ঠভাবে লক্ষ্য করেছি। এছাড়া আমার বাড়ির বাবুর্চি, সুইপার, মালি বিভিন্ন হ্যাল্পিং হ্যান্ডদের সঙ্গে সুন্দর সম্পর্ক গড়ে তুলেছি-যারা আমার কাছেতাদের জীবনের সব দুঃখ-কষ্ট, আনন্দ-বেদনা নির্ধিদ্বায় তুলে ধরেছি। আমার একটা গল্প ‘খুরপি কাহিনী’ যা অনেকের পছন্দ। গ্রামীণ পটভূমিকায় লেখা গল্পটি সত্য ঘটনার ওপর লেখা। একজন কৃষক যখন তার অবস্থা ফেরার পরও জমিতে নিড়ানি দেয়ার কাজ থেকে অব্যাহতি নিতে চায় না। সারাক্ষণ খুরপি নিয়ে জমিতে পড়ে থাকতে চায়।

ওমেন্স নিউজ -অনেক প্রস্তুতি বা পরিকল্পনা নিয়ে কোনও লেখা লিখেছেন কি?
দিলারা মেসবাহ– অবশ্যই লিখেছি। পরিকল্পনা বা প্রস্তুতি ছাড়া তো আর লেখা হয় না। একটা গল্প অনেক দিন ধরে মাথায় ঘুরতে থাকে তারপরই না সেটা কাগজে ওঠে আসে। যেমন একটা গল্প সাত আট মাস ধরে ফেলে রেখেছি এটার উপসংহার টানতে পারছি না। শেষটা কীরকম হলে ভালো হয় তা নিয়ে সিদ্ধান্তে আসতে না পারায় এটা এত দিন ধরে পড়ে আছে।

ওমেন্স নিউজ -কি গল্প এটা?
দিলারা মেসবাহ--এর নাম ‘আলী দোকানের ধলা বিবি’…

ওমেন্স নিউজ -আপা, আপনার গল্পের নামগুলো খুব অদ্ভুত। মানে অন্যরকম এবং অবশ্যই এট্রাকটিভ। যেমন ‘একজোড়া পয়পন্থ ইলিশ’ কিংবা ‘চামেলি ভিলার পরম্পরা’ এরকম আরও অনেক গল্প আছে-
দিলারা মেসবাহ--তুমি ঠিকই বলেছো। গল্পের নামটা এট্রাকটিভ না হলে পড়তে ভালো লাগে না। তাই সবসময় গল্পের নামটা একটু আনকমন দেয়ার চেষ্টা করি।

ওমেন্স নিউজ-আপনি তো রম্যরচনাও লিখেছেন অনেক…
দিলারা মেসবাহ- প্রয়াত কেজি মোস্তফা ‘সচিত্র বাংলাদেশ’ পত্রিকায় থাকতে সেখানে আমার ‘খোপা ও চোপা’ শিরোনামে একটা লেখা প্রকাশিত হয়। এটা পড়ে তিনি এতটাই মুগ্ধ হন যে আমাকে মাসে দুইটা রম্য লেখার কথা বলেন। তার চাপে পড়ে আমি দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে সচিত্র বাংলাদেশে রম্যরচনা লিখেছি। পরে এসব রম্য রচনার সঙ্কলন করেছি ‘খোপা ও চোপা’ শিরোনামে। এছাড়া রোববার পত্রিকায় নিবন্ধ লিখেছি ৫ বছর ধরে।

ওমেন্স নিউজ-ছোটবেলা থেকেই আপনার পড়ার অভ্যাস শুনেছি-এখনও কি পড়েন?
দিলারা মেসবাহ- হ্যা, প্রতিদিনই পড়ি-অল্প করে হলেও পড়ি। এটা আমার শৈশবের অভ্যাস। আমার বাবা এই অভ্যাস তৈরি করে দিয়েছেন। লেখালেখিতে উৎসাহ না দিলেও তিনি পড়ার জন্য বলতেন খুব। মেট্রিক ও আইএ পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর বিভিন্ন ক্ল্যাসিক বই কিনে আনতেন। আমরা সেগুলো গোগ্রাসে গিলতাম। রবীন্দ্র, নজরুল, বঙ্কিম, শরৎচন্দ্র এইসব ক্ল্যাসিক বইগুলো তো আমরা কিশোরবেলাতেই পড়ে নিয়েছি।

ওমেন্স নিউজ- এখন কি পড়ছেন?
দিলারা মেসবাহ-– বঙ্গবন্ধুর ওপর নানারকম বই পড়ছি। ভবিষ্যতে এই মহান নেতার ওপর কাজ করার ইচ্ছা আছে। এছাড়া খনাকে নিয়েও একটা বই লিখতে চাই। তারওপরও পড়াশোনা করছি এখন।

ওমেন্স নিউজ-আপনার প্রিয় কবি ও লেখক সম্পর্কে যদি বলতেন-
দিলারা মেসবাহ–আমার প্রিয় লেখক সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ, আকতারুজ্জামান ইলিয়াস, হাসান আজিজুল হক ও রিজিয়া রহমান। তার বাঘবন্দি উপন্যাস তো অসাধারণ সাহিত্য। আমার প্রিয় কবি আল মাহমুদ। তবে তার কবিতা আর গদ্য দুটোই আমার পছন্দ। তার লেখা ‘গন্ধবণিক’ তো একটা অসাধারণ গল্প।

ওমেন্স নিউজ- আপনি তো একটা আলোকিত পরিবারের সদস্য। লেখালেখিতে আপনার পারিবারিক ঐতিহ্য কতটা আপনাকে কতটা প্রভাবিত করেছে?
দিলারা মেসবাহ-হ্যা আমার চাচাতো ভাই ফতেহ লোহানি বিখ্যাত অভিনয় শিল্পী এবং সাহিত্যিক। তিনি আর্নেস্ট হ্যামিংওয়ের ‘ওল্ডম্যান এন্ড দ্য সি’ বইটির নান্দনিক অনুবাদ করেছেন। আরেক কাজিন বিখ্যাত টিভি ম্যাগাজিন যদি কিছু মনে না করেন’য়ের উপস্থাপক ফজলে লোহানিও কিন্তু ভালো লিখতেন। চাচাতো ভাই কামাল লোহানিও লেখার জগতে আছেন। আমি তাদের সান্নিধ্যে বেড়ে ওঠেছি। আমার মেন আছে বিখ্যাত ‘আছিয়া’ চলচ্চিত্রটি যখন তৈরি হয় তখন চাচা ফতেহ লোহানি বাড়িতে এ নিয়ে কথাবার্তা বলতেন। তখন অনেকে এসে বাবাকে বলতেন‘আপনার মেয়েদের কি সিনেমায় নামাবেন? এসব কথা শুনে আমার বাবা খুবই বিরক্ত হতেন।
আমার চাচাতো বোন হুসনা খানম গান গাইতেন, তার রেকর্ড আছে। তিনি ছিলেন মুসলিম নারীদের মধ্যে তৃতীয় সঙ্গীতশিল্পী যার রেকর্ড বেরিয়েছিলো। তিনি গাহস্থ্য অর্থনীতি কলেজের অধ্যাপক ছিলেন, পাশপাশি চলচ্চিত্র বিষয়ক সাংবাদিকতাও করতেন। বেগম ও অন্যান্য পত্রিকায় তার লেখা প্রকাশিত হতো। একই সঙ্গে জাপানি ফুলের তোড়া তৈরি অর্থাৎ ইকোবানা শিক্ষক ছিলেন। নিজের ইকোবানা ক্লাসে আমাকেও ডাকতেন। কিন্তু সংসার সামলে আমি তো যেতে পারতাম না। আমার কেবল মনে হতো অন্য কোনও কাজে ব্যস্ত হলে সংসারের যদি কোনও ক্ষতি হয়। আমি তো লেখাপড়াও করেছি সংসার আর বাচ্চাদের সামলে।

ওমেন্স নিউজ- আপনার বিশ্ববিদ্যালয় জীবন সম্পর্কে কিছু বলুন।
দিলারা মেসবাহ- আমার তো ইন্টার পাস করে বিয়ে হয়ে যায়। ছেলেদের সঙ্গে পড়তে হবে এজন্য অনার্স করতে দেয়া হয়নি। ফলে বিএ পাস করে ১৯৭৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা সাহিত্যে ভর্তি হলাম। পাস করে বের হলাম ১৯৭৬ সালে। যৌথ পরিবারে রান্নবান্নাসহ নানা সাংসারিক কাজ সামলে তারপর ভিার্সিটিতে যেতাম। সকাল ৭টায় মহিলা বাস ধরতাম ইত্তেফাকের মোড় থেকে ছাড়তো বাসটা। আবার ১১টার দিকে ফিরে আসতাম। বাচ্চাকে দোলনায় ঘুম পাড়িয়ে যেতাম আর কাজের মেয়েকে বলে যেতাম-তুই কেবল বাচ্চা দেখবি, সংসারের আর কোনও কাজ তোকে করতে হবে না। এভাবে চারটা ননদের রান্না আর তিনটা বাচ্চার দেখভাল করে সেকেন্ড ক্লাস পেয়ে পাস করলাম। যদিও আমি বরাবরই কিন্তু খুব ভালো ছাত্রী ছিলাম।

ওমেন্স নিউজ–এখন কি আপনার সেইসব দিনের কথা ভেবে আফসোস হয়?
দিলারা মেসবাহ- না ঠিক আফসোস না। এত কষ্ট করে লেখাপড়া করেছি তারপরও বড় প্রাপ্তি নীলিমা ইব্রাহীম, সানজিদা আপা, মনিরুজ্জামান, আহমদ শরীফ স্যারের মতো ব্যক্তিত্বদের শিক্ষক হিসাবে পেয়েছি।

ওমেন্স নিউজ– এ সময়ের নারীরা কীভাবে আরও এগিয়ে আসতে পারে?
দিলারা মেসবাহ- এখন তো আর আগের মতো পতিবন্ধকতা নাই, অনেক বদলেছে সামাজিক পরিস্থিতি, তাই নারীদের নিজেদেরকেই এগিয়ে আসতে হবে। যদিও পুরুষতান্ত্রিক সমাজ তো একটা ব্যাধীর মতো। যেখানে যেখানে পুরুষ বসে আছে দণ্ডমুণ্ডের কর্তা হয়ে, তারা তো নারীদের লেখা একপাশে ফেলেই রাখবে, এই প্রবণতা তো এখনও আছে। পুরস্কার দেয়ার ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। এবছর তো বাংলা একাডেমি পুরস্কারে কোনও নারী লেখক নেই। এমন তো না যে বাংলা একাডেমির পুরস্কার পেতে পারেন এমন নারী লেখক এদেশে বর্তমান নেই। বরং এখনকার নারীরা তো অনেক ভালো লিখছেন।

ওমেন্স নিউজ- নারী লেখকদের জন্য আপনার কোনও পরামর্শ বা সাজেশন আছে কি?
দিলারা মেসবাহ- নারী লেখকদের প্রচুর পড়তে হবে। আমারা পড়াশোনা খুব কম করি। কিন্তু পড়াশোনা বেশি না করলে তো নতুন নতুন লেখার আইডিয়া বেশি আসবে না। অনেক নারী লেখকদের আড্ডা দিতে না পারার যে আক্ষেপ আছে-পড়ালেখার মাধ্যমে সেটাও মোচন করা সম্ভব। তবে লেখালেখির জন্য কিন্তু আড্ডাও জরুরি। আমাদের ভালো মনের পুরুষ লেখকদের সঙ্গে আড্ডা দিতে হবে। তবে এটাও খেয়াল রাখতে হবে আড্ডা দিতে গিয়ে এগিয়ে যাওয়ার বদলে আমরা যেন আবার পিছিয়ে না পরি। এজন্য নারী লেখকদের ব্যক্তিত্বকে প্রখর করতে হবে। প্রখর ব্যাক্তিত্ব ছাড়া এসময়ে কোনও নারী এগিয়ে আসতে পারবেন না। একটু দুর্মুখও হতে হবে আমাদের। একটু শক্তিমান হতে হবে, আবার মধুর ব্যবহারও করতে হবে। আসলে সবই করতে হবে-কেবল মুখরা হলেও তো চলবে না। আমি মনে করি মধু, বিষ, তেতো, মিঠা -এইসব মিলিয়ে নারীকে কৌশলী হতে হবে। নারী এত কৌশল করে একটা সংসার চালায়, বাচ্চাকাচ্চা মানুষ করে আর তারা মেলামেলার ক্ষেত্রে , কাজ আদায়ের ক্ষেত্রে কৌশলী হতে পারবে না-এটা তো হতে পারে না। সামনে অনেক সুযোগ, নারীদের নিজেদের যোগ্যতায় এগিয়ে এসে সেইসব সুযোগ নিতে হবে।

সাহিত্যিক দিলারা মেহবাহের সঙ্গে মাহমুদা আকতার

ওমেন্স নিউজ- আপনার পাঠকদের জন্য কি কিছু বলতে চান?
দিলারা মেসবাহ- আমি পাঠকসহ সবাইকে বলতে চাই লেখকদের লেখা পড়ুন। আপনার যে লেখককেই ভালো লাগে তার লেখাই পড়ুন, বেশি বেশি পড়ুন। কারণ অনেকখানি লেখা না পড়লে একজন লেখককে উপলব্ধি করা সম্ভব না।  আর পড়ার ওপর আর কিছু হতে পারে না।
– আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।
দিলারা মেসবাহ- ধন্যবাদ তোমাকেও, ভালো থাক সবসময়।

মাহমুদা আকতার: লেখক, অনুবাদক ও সাংবাদিক। প্রকাশিত গ্রন্থ ছয়টি।

ওমেন্স নিউজ/