বেগম রোকেয়ার স্মৃতি যথাযথভাবে সংরক্ষণের দায় কার?

বেগম রোকেয়া (ফাইল ফটো)

হোমায়রা হুমা

নারী জাগরণের অবিস্মরণীয় আলোকবর্তিকা বেগম রোকেয়ার প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা জানাই। আমাদেরকে এ কথাটি বিশ্বাস করতে হয় যে, প্রতি বছর 'রোকেয়া দিবস' স্মরণ উদযাপনে মুষ্ঠিমেয় আনুষ্ঠিকতা পালন শেষে রংপুরে পায়রাবন্দের সবুজ মাঠে অবহেলায় তার স্মৃতিস্তম্ভটি ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকে আরেকটা ৯ ডিসেম্বরের অপেক্ষায়। যদিও মাঝে মাঝে প্রয়োজনীয় সময়ে প্রথিশযশা নারী নেত্রীদের লেখায় ও ভাষণে তাকে ও তার লেখার পংতি অনুপ্রেরণাদায়ক বিষয় হিসেবে উল্লেখ লক্ষ্য করা যায়। ব্যাস এ পর্যন্তই। বেগম রোকেয়ার অস্তিত্বের গভীরে কিছুই আর খোঁজ থাকে না কারো।

২০০১,১ জানিয়ারি রংপুরের পায়রাবন্দ ইউনিয়নের খোর্দ্দ মুরাদপুরে  প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বেগম রোকেয়া কমপ্লেক্সের একটি অংশ বেগম রোকেয়া  স্মৃতিকেন্দ্র হিসেবে উদ্বোধন করেন। সেই থেকে কেন্দ্রের সবুজ মাঠে বেগম রোকেয়ার একটি পিতলের ভাস্কর্য স্হাপিত হয়েছে, যা একেবারেই যত্নহীন এবং অভিভাবকহীন পড়ে থাকে। এ কমপ্লেক্সটি ২০১৭ থেকে তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব বাংলা একাডেমির, এরপূর্বেও বাংলা একাডেমিই কর্তব্যহীন দায়িত্ব পেয়েছিল। জানা যায়,বাংলা একাডেমির অধীনে থাকার পরও তেমন বড় কোনো পরিকল্পনা নেয়া হয়নি রোকেয়া কমপ্লেক্সকে ঘিরে। ফলে রংপুরে রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর উক্ত কেন্দ্রটির কার্যকারিতা নেই-ই। আর কেন্দ্রটিকে ঘিরে পরিকল্পনা নেই বলে অর্থ বরাদ্দও নেই। এখানেই প্রশ্ন যে, বেগম রোকেয়ার স্মৃতিসংরক্ষণে ১৪০ বছর পরও কেন বাস্তব কোনো পরিকল্পনা নেয়নি বাংলা একাডেমি? রোকেয়ার কবরও পায়রাবন্দে আজো স্নানান্তর হয়নি কেন?

নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের পাঞ্জেরী এই মহিয়সী নারী "নারীর অধিকার" বিষয়ক প্রবন্ধ  লিখতে লিখতেই লেখার খাতাটির ওপর মাথা রেখে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছিলেন। প্রজ্ঞাবান এই নেত্রীর এ দেশের মাটিতে যথাযোগ্য মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করা হয়নি, সম্ভব হয়নি, আজো কেন? বেগম রোকেয়ার জন্ম ও মৃত্যু দিবসে স্মরণের পাদটীকা জ্বালিয়েই কি দায় শেষ আমাদের ? আমরা কি জানি বাংলা একাডেমিতে বেগম রোকেয়ার নামে কোনো মিলনায়ন করা হয়েছে কিনা- জাতীয় জাদুঘরে বেগম রোকেয়া স্মৃতি কর্ণার আছে কিনা? বেগম রোকেয়াকে গবেষণা বিষয়ে অন্তর্ভুক্ত করেননি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষও। খোদ বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় নামে উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষ এই নামটির মর্যাদা রক্ষায় ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন।

বেগম রোকেয়া উত্তরসূরী মাজেদা সাবের বেগম পত্রিকা অফিসে রোকেয়ার স্মৃতি ও জীবনীভিত্তিক বিজড়িত মূল্যবান লেখাগুলো তিনি অতিযত্নে নুরজাহান আপার কাছে পৌছে দিতেন,বেগমে প্রকাশের জন্য। নূরজাহান বেগম ধারাবাহিকভাবে বেগমে তা ছাপা হতো কৃতজ্ঞতাচিত্তে। মাজেদা সাবের নিজের কাছে বেগম রোকেয়ার ব্যবহৃত তসবি,পানের বাটাসহ বিভিন্ন মূল্যবান জিনিসপত্র সংগ্রহ করে রেখেছেন। হারানোর ভয়ে স্মারকগুলো স্মৃতিকেন্দ্রে দিতে সাহস পাননি। তিনি জানান যে,এর আগে জাতীয় জাদুঘরে রোকেয়ার কিছু স্মারক দিয়েছিলেন, সেগুলোর বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে তিনি কিছু জানেন না। উল্লেখ্য যে, রোকেয়ার বৈমাত্রের ভাইয়ের মেয়ে রণজিনা সাবেরের বাড়িতেও তিনি রোকেয়ার বাবার কোরাণ শরিফ, লবনদানিসহ বেশকিছু জিনিস সংরক্ষণ করছেন। প্রশ্ন হলো বাংলা একাডেমি কেন এখনো এ স্মারকসমূহ সংগ্রহ করে রোকেয়া স্মৃতি সংরক্ষণে পরিকল্পনাই নেয় নি কেন?
অধ্যাপক মাজেদা সাবের রচিত 'রোকেয়ার উত্তরসূরি' বইটি কি বাংলা একাডেমির পাঠাগারে সংগ্রহে আছে? কেন রাষ্ট্রীয়ভাবে রোকেয়ার কর্মময় জীবন ও স্মারক সংরক্ষণের উদ্যোগ নেয়া হয়নি?
স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশে ২০০১ সালের জুলাই মাসে বেগম রোকেয়ার স্মৃতিসংরক্ষণে স্মৃতিস্তম্ভ, স্মৃতিকেন্দ্র নির্মাণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ব্যতিত আর কেউ এই দায়কে স্বিকার করেনি, পালনও করেননি। নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের স্মৃতি তার বিভিন্ন অবদান স্মরণে "রোকেয়া পদক" প্রবর্তনও হয়েছিল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মাধ্যমেই। কিন্তু তারপর রোকেয়া কমপ্লেক্স ও স্মৃতিকেন্দ্র পরিচালনার দায়িত্ব পাওয়া বাংলা একাডেমি,মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়, বিকেএমইএ কেন যথাযথভাবে রোকেয়া স্মৃতি সংরক্ষণে যথার্থ কর্তব্য পালন করেনি? তাহলে প্রতিয়মান হয় যে, বেগম রোকেয়ার আদর্শ বিরোধী একজোট মৌলবাদী আজো কি এসব প্রতিষ্ঠানে ঘুপটি দিয়ে বসে আছেন?
প্রজন্মের পর প্রজন্মে নারী অধিকার নিয়ে এত বক্তৃতা, বাণী দিয়ে কি লাভ যদি বেগম রোকেয়ার স্মৃতি সংরক্ষণে প্রগতিশীল নারী সমাজ দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হয়ে এগিয়ে আসতে না পারে! নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠার অগ্রবর্তিনী পাঞ্জেরী বেগম রোকেয়া আজো অবহেলিত। আচ্ছা আমরা কি জানি রোকেয়া কমপ্লেক্স রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব এখন কার ওপর ন্যস্ত ?
তথ্যসূত্র:প্রথম আলো

হোমায়রা হুমা

ওমেন্স নিউজ ডেস্ক/