রুমানা সোবহান পরাগের গল্প ‘অবেলায় চা’

রুমানা সোবহান পরাগ

অবেলায় চা

দু হাজার আট সালের ঘটনা। তখন আমি একটি নামকরা এনজিও তে কাজ করি। মহাখালিতে আমার অফিস। আমার পদবী ছিল  ইনটিগ্রেটেড হেলথ সেন্টর ম্যানেজার  সংক্ষেপে আই এইচ সি ম্যানেজার। আমার তত্ত্বাবধানে দুটো টিম কাজ করতো। এস টি আই টিম ( সেক্সচুয়াল ট্রান্সমিটেড ইনফেকশন) ও আউট রিচ টিম। মূলত এখানে ঝুঁকিপূর্ণ পেশায় নিয়োজিত নারীদের এইডস প্রিভেনশনের ও নানারকম যৌন রোগ প্রতিরোধের জন্য চিকিৎসা দেয়া হয়। আউটরিচ টিমের স্টাফরা ফিল্ড থেকে এ ধরনের পেশায় নিয়োজিত নারীদের ধরে নিয়ে  আসতো আর "এস টি আই" টিমের ডাক্তার, নার্স, কাউন্সিলর এদের চিকিৎসার আওতার নিত। খুব ভাল একটা সেবামূলক প্রতিষ্ঠান এটি। মরণ ব‍্যাধি এইডস রোগ থেকে জাতিকে মুক্ত রাখার জন্যই এই প্রতিষ্ঠান কাজ করছে। সেখানে আমার কাজ ছিল এই দুটো টিমের কাজ গুলোকে সমন্বয় করে প্রজেক্ট ম্যানেজারের কাছে জিপ ফাইল করে পাঠান। এছাড়া অফিস মেনটেনেন্স, লোকাল থানা গুলোর সাথে এ্যাডভোকেসি মিটিং  এবং পার্টনার এনজিও গুলোর সাথে নানান রকম মান্থলি মিটিং কন্ডাক্ট করা। মোটকথা একধরনের মাতব্বরি, খবরদারির কাজ আর কি। আমি বেশ উপভোগই করতাম কাজটা।
অফিসের  কাজ করতে আমার খুব বেশি হলে দুই ঘন্টা সময় লাগতো। বাকি পুরো ছয় ঘন্টা আমি কাচের দেয়ালে মোড়া রুমে জানালার কর্নারে বসে গান শুনতাম আর চা খেতাম । অফিসের ওসব লাল চায়ে আমার পোষাতো না। আমি  আমেনা আপাকে আমার চা কিভাবে বানাবে তা দেখিয়েছিলাম। অফিসের স্টাফরা ভালো। অফিসের পেছনে ছিল রেললাইন আর সামনে বিশাল হাইওয়ে। কি দ্রুত গাড়িগুলো চলে যাচ্ছে। কাচের দেয়ালের ভেতর থেকে মানুষের শব্দহীন ছুটে চলা দেখে আমি আনমনা হয়ে যেতাম, ভাবনার অতলে ডুবে যেতাম আমি।
কয়েক দিনের মধ্যেই প্রজেক্ট ম্যানেজারের কানে গেল যে,  ম্যানেজার আপা সারাদিন অফিসে বসে গান শোনে। উনি একগাদা আর্টিকেল এনে বললেন- পরমা আপনি প্রতিদিন একটা করে আর্টিকেলের রিভিউ লিখবেন। মেজাজটা প্রচণ্ড খারাপ হয়ে গেল জব ডেসক্রিপশনের বাইরে কাজের কথা শুনে। বসের সামনে মেজাজ ঠাণ্ডা রাখার জন্য প্রানী জগতে ওনার সদৃশ‍্য কোনো প্রানী আছে কিনা তা মনে মনে খুঁজতে লাগলাম!  আর উনি ইংরেজিতে আর্টিকেল লেখার উপর একটা বিশদ বক্তৃতা দিচ্ছেন। প্রানী জগতের সকল প্রানীর চেহারা ভাবতে ভাবতে হঠাৎ মনে হলো মুদি দোকানে সাজিয়ে রাখা লাল মুখওয়ালা কাচের চারকোনা বিস্কুটের বৈয়মের মতো দেখতে উনি।  সত্যি সত্যিই মনে হচ্ছিলো একটা বৈয়মের সামনে বসে আছি আমি। পেটফেটে হাসি আসছে কিন্তু হাসতে পারছি না। উনি এমন সিরিয়াস মুডে কথা বলছিলেন হাসি কন্ট্রোল করা মুশকিল হয়ে যাচ্ছিল। বহু কষ্টে হালকা হেসে বললাম ভাই, আমি তো আমার জব ডেসক্রিপশনের বাইরে কোনো কাজ করতে পারবনা।
উনি যুক্তিতে আমার কাছে হেরে গিয়ে বললেন,' আপনি একটা প্রতিষ্ঠানের হেড।  এ রকম একটা পজিশন হোল্ড করে কানে হেডফোন লাগিয়ে  মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে কাজ করা মানায় আপনাকে? এখন তো আপনি আর স্টুডেন্ট না পরমা। আর একটু ফরমাল এ্যটিচুড করেন। আর আবারও বলছি আর্টিকেল পড়লে ইংরেজিতে রিপোর্ট রাইটিং এ দক্ষতা আসবে।  সময়টাকে কাজে লাগান। ক‍্যারিয়ারে ভালো করতে চাইলে এই দক্ষতাগুলো ভীষণ জরুরী।
ভাবলাম আসলেই তো আমাকে আরেকটু পরিণত আচরণ করতে হবে । এরপর থেকে কাজের ফাঁকে পুরো অফিসে রাউন্ড দিতাম। সবার কাজেরও খোঁজখবর নিতাম। আর্টিকেলগুলো নিয়ে বসতাম,  অফিসের ভেতরে একটা হলরুম ছিল ওখানে ট্রেনার আপা ট্রিটমেন্ট নিতে আসা মেয়ে গুলোকে "বিসিসি(বিহেভিয়ার চেন্জ এ্যান্ড কমিউনিকেশন)" ট্রেনিং দিতো। সেখানে ওদের কাউন্সিলিং করা দেখতাম।
একদিন আতকে উঠেছিলাম মেয়েদের বয়স দেখে। বেশিরভাগ মেয়েই পনেরো বছরের নীচে। আমার পিওন আব্দুল্লাকে বললাম  ঐ যে একটা বাচ্চা মেয়েকে দেখলাম হেলান দিয়ে বসে চিপস খাচ্ছে ওকে একটু আমার রুমে পাঠান, কথা বলবো। ছোট্ট একটা মেয়ে, আট নয় বছর বয়স হবে। হাতে চিপসের প্যাকেট নিয়ে আমার রুমে আসলো।  এ ধরনের মেয়েগুলো সাধারণত স্ট্রিট বেইজড সেক্সওয়ার্কার হয়। মাথার উপরে কোনো গার্জিয়ান থাকে না। মানুষের মতো দেখতে শেয়াল-কুকুরেরা এদের এ্যবিউস করে। কিন্তু তাই বলে হোটেলগুলোতেও?  এতো ছোট বাচ্চার উপর এমন পাশবিক নির্যাতন হয় ! ভাবাই যায় না। দেশের প্রশাসন কি কাজ করে, ভাবতেই অবাক লাগে।
স্থম্বিত ফিরে পেলাম ওর কথায়,' আন্টি আমারে ডাকছেন কিল্লিগা?'
তোমার নাম কি?
চিপস খেতে খেতে বলল' আমার নাম শাবনূর। '
তোমার মা বাবা কি করেন?
'মায়ে বারো মাইশ্যা রুগী, তামান দিনই বিছনাত হুইত্তা থাকে।'
আর বাবা কি করেন?
বাজানে হিরিঞ্চি। হুটেলে 'আমারে যে টাকা দেয় বাজানে তার পুরাটাই ডাইল কিনা খায়। '
কি ভয়ংকর একটা শৈশবে বেড়ে উঠছে এই শিশুগুলো ! ওকে আর কোনো প্রশ্ন করতে সাহস হলো না আমার , কারণ আমি জানি আমার ধারণ ক্ষমতা কম। হয়তো আরো ভয়ঙ্কর কিছু শুনলে আমি নিতে পারবো না।
আবদুল্লাহকে ডেকে বললাম ও যা যা খেতে চায় কিনে দেন। খানিকক্ষন বাদে আবদুল্লাহ এসে বলল পোলাপান ছুকরি তো বেশি কিছু চায় নাই। প্রান চকোচকো, জুস, ম্যাংগো বার আর একটা আইসক্রিম কিনে নিল, পুরা টাকাটাই ফেরৎ আসলো আপা। ভালোই করিছেন পোলাপানকে অফার করি, বড়গুলাক খাবার অফার করলি পুরা টাকাটাই শ্যাষ কইত্তো। ওগুলা যে কি পরিমান খাবার খায় আপনি ধারনা করতে পারবেন না আপা।  বললাম-আবদুল্লাহ আপনি কাজে যান তো।
মন দিয়ে কাজ করছি হঠাত দেখি এসটিআই রুমের সামনে জটলা। রুমের চর্তুদিকে গ্লাস দিয়ে দেয়াল দেয়াতে মোটামুটি সবকিছুই রুমের ভেতর থেকে দেখা  যেতো। দেখি তীরের বেগে ডাক্তার শর্মী আমার রুমের দিকে আসছেন পেছনে নার্স আর কাউন্সিলর মিলে এক রূপবতি মেয়েকে টানা হ্যাচড়া করে নিয়ে আসছে। বললাম কি হয়েছে আপা? শর্মী মেজাজ ধরে রাখতে পারছেন না। বললেন পরমা আপা আমি আর এখানে চাকরি করবো না। এই অসভ্য মেয়েটা কি বলে জানেন? শর্মী কথা শুরুর আগেই পর্বত সম নার্স আর কাউন্সিলর সমশ্বরে চিৎকার করে বাকিটা বলতে আরম্ভ করলো। আপা এই মেয়ে এতো খারাপ, বলে কি ডাক্তার আপা আপনার স্বামীকে এই ওষুধ খাওয়াবেন। এই রোগ তো তারাই বহন করে তাহলে আমাদেরকে খাওয়ান ক্যান। আরও বলে কি আপনার  স্বামী, ভাই আর বাপেরে বিসিসি ট্রেনিং দিয়েন। সেই রূপবতিও সমানতালে খিস্তি করতে শুরু করল। বিরাট এক গণ্ডগোলের সৃষ্টি হলো আমার রুমে।
রূপবতিও গো ধরে বলল আপা আমারে মাইরা ফেললেও আমি ওষুধ খামুনা। আফনাগো বাপ, ভাতারের জন্য আমরা এতো কষ্ট করুম কেন? আর এই ওষুধ খাইলে আমার মাথা ঘুরে বমি হয়  তিন চারদিন আমি হুটেলে উঠতে পারিনা। হুটেলে না উঠলে আমার চুলায় হাড়ি ওঠেনা আপা।
কি উওর দেব আমি ওর কথায়? আমার কাছে তো ওর প্রশ্নের কোনো উত্তরই জানা ছিল না। সবাইকে বললাম আপনার অন্য পেশেন্টদের ব্যাবস্থা করেন আর আমেনা আপাকে বললাম-আমার সাথে ওকেও এক কাপ চা দেন।
চা নিয়ে বসেছি দুজনে। একটা কাঠের টেবিলর  এ প্রান্তে আমি আর ও প্রান্তে রূপবতি। একটা টেবিলই তো, চারটা কাঠের পায়ার উপর দাঁড়িয়ে আছে অথচ এর দুইপ্রান্তে দুজন দুই জগতের বাসিন্দা বসে আছে। বয়সের খুব পার্থক্য নেই আমাদের দুজনের মাঝে। ভালো থাকার জন্য যা যা দরকার সৃষ্টিকর্তা আমাকে তার সবই দিয়েছেন। একজন সুদর্শন সৎ চরীত্রবান স্বামী, একটা ফুটফুটে বাচ্চা । মাথা গোঁজার জন্য একচিলতে আবাস আর আমার সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য চাকরিও আছে একটা। ছিমছাম সুন্দর গোছানো একটা জীবন তিনি আমাকে দিয়েছেন।
আর টেবিলের ও প্রান্তে যে আছে তাকে ঠকাবার জন্য সৃষ্টিকর্তা এতটুকুও কার্পণ্য করেননি। সবচেয়ে নিকৃষ্ট আর বিভৎস জীবন দিয়েছেন ওকে। রূপবতি চুপচাপ চা খাচ্ছে। আমি ওর পাশে গিয়ে ওর মাথায় হাত রাখলাম। এতো কান্না ও কোথায় জমিয়ে রেখেছিল তা আমার জানা ছিল না। ওর চোখের পানিতে ভিজে যাচ্ছিলাম আমি, চোখের পানি ধরে রাখা মুশকিল হয়ে যাচ্ছিল আমার। কাঁদতে কাঁদতে বলল- রাস্তার কুকুরেরও একটা পরিচয় আছে যে সে একটা কুকুর অথচ আমাদের কোনো পরিচয় সমাজ দেয়নি। চুরি করে আমাদের কাছে ধনী, গরীব সবাই আসে আর প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলে  আমাদের দেখলে এমন ব‍্যবহার করে যেন আমরা রাস্তার নেড়ি কুকুর। এই ডাক্তার আপাসহ আপনারা সবাই তো এই নেড়ি কুকুরদের চিকিৎসার জন্যই বেতন পান। তাহলে আমাদের সাথে একটু ভালোভাবে কথা বলতে পারেন না কেন আপনারা!
ও উঠে যাবায পর কিছুক্ষণ ভেবেছি। আসলেই তো আমরা কি করছি? আমরা চাই এই যৌন কর্মীরা নীরোগ থাকুক আমাদের বাড়ির পুরুষ সদস্যদের জন্য। আমরা চাই ওরা পতিতা হয়েই বেঁচে থাকুক। আমারা তো ওদের পুনর্বাসনের জন্য  কোনো ব্যবস্থা করছি না। এতদিন তো এভাবে ভাবিনি। ওদের জন্য একটা কিছু করতেই হবে। অফিসে মোটামুটি আমার কাজের দক্ষতা বেড়েছে, আমি আগের মতোই আবার গান শুনি আর নিয়ম মাফিক এক একটা মেয়ের ইনডেপ্থ ইন্টারভিউ করি। তাদের মোটিভেশন দেবার চেষ্টা করি যে কিভাবে তারা এ পেশা থেকে বেড়িয়ে আবার সম্মানিত জীবন যাপন করতে পারবে।
প্রজেক্ট ম্যানেজার আমাকে একদিন ফোনে সুসংবাদ দিলেন যে, আগামী মাসে আমাকে প্রজেক্ট ম্যানেজার করার জন্য উনি আমার নাম পাঠিয়েছেন। আর সেই সাথে আরও বললেন, 'পরমা জব ডেসক্রিপশনের বাইরে আর একটা কাজও করবেন না। ওদের মোটিভেশন দেবার কোনো দরকার নেই। ভুলে যান কেন ওরা যদি যৌনকর্ম ছেড়ে দেয় তাহলে আপনার আমার প্রজেক্টে তো ফান্ড বন্ধ হয়ে যাবে। ওরা আছে বলেই তো আমরা টিকে আছি। আপনি দয়া করে এই অতিরিক্ত কাজ করতে যাবেন না। ঘৃণায় শব্দ সংকটে পরে গেলাম আমি । কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললাম-ভাই প্রতিষ্ঠান কি ভালনারেবল জনগোষ্ঠিকে চিকিৎসা সেবা দিচ্ছে নাকি ভালনারেবলদের পুঁজি করে নিজেদের ফান্ড যোগাচ্ছে?
একদল পতিত মেয়ের জীবনকে পুঁজি করে যে প্রতিষ্ঠানের প্রান রক্ষা পায় সেই প্রতিষ্ঠানের সাথে সম্পৃক্ত থাকাটা কতটা সমীচীন তা নিয়ে এখন ভাবভার সময় হয়েছে এই বলে ফোন রেখে দিলাম আমি । আমার মনে হচ্ছে আর এক মুহূর্তও এই চাকরি আমার পক্ষে করা সম্ভব নয়। একটা রেজিগনেশন লেটার প্রজেক্ট ম্যানেজার বরাবর মেইল করে বাড়ির উদ্দেশ্য রওনা দিলাম।
বাসায় ফিরে দেখি রফিক নাইট ডিউটি সেরে বাসায় এসেছে। আমাকে দেখে বলল এই অবেলায়? চাকরিটা ছাড়লে নাকি চাকরিটা চলে গেল?
বললাম ছেড়েছি।
বলল 'বেশ, বহু দিন তোমার সাথে অবেলায় চা খাওয়া হয় না। একটু চা বানাবে প্লিজ'।

ওমেন্স নিউজ সাহিত্য/